“অগ্নিসাক্ষী”- রত্না চক্রবর্তী’র ছোটগল্প

0
379
রত্না চক্রবর্তী

অগ্নিসাক্ষী- রত্না চক্রবর্তী 

এবারও আনুপিসি ভীষণ রেগে গেছে।কিন্তু মিতু কি করবে মিতুর মাথার ঠিক ছিল না।অমিতকাকুর ভাগ্নি আর নিজেকে ও এক ভাবতে শুরু করেছিল।বিশ্বনাথমেসো জানে মিতু এই রকম পরিস্থিতিগুলোতে কেমন যেন পাল্টে যায়।এটা ওর প্রতিশোধ স্পৃহা নয়।এটা ওর একটা রোগ।ও নিজেকে সেই মেয়েটি ভাবতে শুরু করে।তার মত আচার আচরণ করতে থাকে।
অমিতকাকু মানে অমিতাভ আনুপিসির ছোটবেলার বন্ধু।অমিতাভের মা বাপ মরা ভাগ্নি সাথী মামার কাছেই মানুষ।অগাধ সম্পত্তি সাথীর।মা বাবা দুজনের আদর দিয়ে অমিতাভ ওকে মানুষ করেছে।এই কারণে নিজে বিয়ে পর্যন্ত করেনি।তাই সাথী যখন এসে বলেছিল সে রূপেশকে বিয়ে করতে চায় অমিতাভ না করতে পারেনি।আনু অবশ্য একটু খুঁতখুঁত করেছিল।ওর জীবনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আজও ওকে পিছু করে বেরায়।সেও তো গৌতমকে ভালোবেসে ছিল।বিশ্বাস করেছিল।আনুর সরল বাবাও রাজী ছিলেন গৌতমের মত সুন্দর মিষ্টি ব্যবহারের ছেলেকে নিজের একমাত্র জামাই করতে।বিশ্বাস কিভাবে অর্জন করতে হয় গৌতম জানত।জোর করে ব্যবসার দশ বিশ হাজার টাকা গচ্ছিত রাখত আনুর কাছে।

সাজানো দাদা বৌদি সোনার চেন দিয়ে আশীর্বাদ করে গিয়েছিল আনু মানে অনিন্দিতাকে।তারপর বিয়ের দুদিন আগে সেই বিপর্যয়ের রাত।উদভ্রান্তের মত এসেছিল গৌতম।একটা পাঁচলাখ টাকার পেমেন্ট আটকে গেছে ওর। ওই টাকার ভরসায় ও একটা বড় অর্ডার নিয়ে বসে আছে। পরশু ডেলিভারী দিতে হবে।কোনমতে দুলাখ যোগাড় করেছে।আরো তিনলাখ চাই। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। অথচ সেই সপ্তাহের শেষেই পুরো পাঁচ লাখটাকার পেমেন্টটাই ও পেয়ে যাবে।কিন্তু ততক্ষনে এই ডেলিভারি না দিতে পারলে বাজারে যা বদনাম হবে নতুন অর্ডার আর আসবে না।আনুর বাবা বিয়ের জন্য গড়ানো সব গয়না তুলে দিতে চাইলেন। গৌতম কিছুতেই নিল না। বলল অর্ডার চলে গেলে যাক সে এসব নিতে পারবে না।তাছাড়া এতে বড়জোর একলাখ হবে। আরো দুলাখ চাই। আনুর বাবার বন্ধু অনাদি ঘোষ বন্ধকী কারবার করতেন। গৌতমকে ছেলের চেয়ে বেশী বিশ্বাস করেছিলেন আনুর বাবা। গৌতমের কোন ওজর আপত্তি না শুনে বাড়ি বন্ধক দিয়ে তিনলাখ টাকা দিলেন তিনি। অনাদি ঘোষ মৃদু আপত্তি করেছিলেন। এতটা বিশ্বাস করা কি ঠিক হচ্ছে? আনুর বাবা বলেছিলেন এ সপ্তাহের শেষে টাকা পেয়েই গৌতম দলিল ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে।কিন্তু টাকা নিয়ে গৌতমের সেই যাওয়াই শেষ যাওয়া ছিল।

গৌতমের বাড়ি অফিস সব ছিল ছয়মাসের জন্য ভাড়ায় নেওয়া। দাদা বৌদির কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। শোকটা সামলাতে পারেননি আনুর বাবা। অর্থ নয় প্রতারণাটা মেনে নিতে পারেননি। একরাতের স্ট্রোকে মা মরা আনুকে সারা পৃথিবীতে একা করে চলে গিয়েছিলেন তিনি। আনু পাথর হয়ে গিয়েছিল।অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তখন এই অমিতাভ, আনুর ছোটবেলার পুলিশ বান্ধবী গোপা আর গোপার স্বামী বিশ্বনাথের পরিচর্যায় আনু ধীরে ধীরে সুস্থ হয়। স্বাভাবিক জীবনে ফেরে। বাড়ি নিলাম করে অনাদিবাবু নিজের দেয় টাকাটুকু নিয়ে বাকী টাকা আনুকে যা দিয়েছিল তাই দিয়ে একটা এককামরার বাড়ি কিনে আনু নতুন করে জীবন শুরু করে। অমিতাভর আনুকুল্যে একটা বেসরকারি স্কুলে চাকরীও পায়। বাইরের ক্ষত শুকিয়ে গেলেও ভিতরের অবিশ্বাস বোধটা থেকেই যায়। সবের মধ্যেই একটা জটীলতার ইঙ্গিত পেত। অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে বেশ কিছু কেস সলভ করে ও। গোপাও অনেক কেসে এখন ওর সাহায্য নেয়। তবে আর্থাইটিসের জন্য ও বেশী ছোটাছুটি করতে পারে না।

দৌড় ঝাঁপের কাজগুলো আনুর হয়ে করে মিতু। মিতুর এখনকার পোশাকী নাম মিত্রানী। কিন্তু এটা ওর আসল নাম নয়। মিতু মেদিনীপুরের মেয়ে। ওর নাম ছিল মাতঙ্গিনী। জন্মের পর বাবা মরে যায়।দুই বোনের পর এই মেয়ে আপদবালাইয়ের মতই বাড়তে থাকে। এত অযত্নেও অটুট স্বাস্থ্য মিতুর।খেলাধুলায় তুখোড়। পড়াশোনায় আহামরি না হলেও ফেল করে না। স্কুলের হয়ে প্রতিবার প্রাইজ নিয়ে আসে খেলায়। একটু যেন পুরুষালী হাবভাব। মাধ্যমিকের পর সম্বন্ধ আসে। যদিও দোজবর তবু বিধবা মা বিয়ের জন্য আর অপেক্ষা করে না। বিয়ের পর মিতু টের পায় বরের মধ্যে অস্বাভাবিকত্ব। অকারণ মারধর। সঙ্গে শ্বাশুড়ী ননদের অকথ্য অত্যাচার। শেষে একদিন গরম চাটুতে মুখ চেপে ধরে মিতুর শ্বাশুড়ী। মুখের একদিক বিভৎস ভাবে পুড়ে যায়।মিতু সেই হ্যান্ডেলওয়ালা চাটু তুলে শ্বাশুড়ীর মাথায় মেরে পালায়। শ্বাশুড়ী মারা যায়।মিতুকে দীঘার সমুদ্রের তীরে পেয়েছিল গোপা বিশ্বনাথ।তিনমাস সময় লেগেছিল ওকে সুস্থ করতে। মুখের পোড়া দাগ ছাড়া এখন মিতুর সব পুরানো চিহ্ন মুছে গেছে। গোপাই মিতুকে আনুর কাছে রেখেছিল। মিতু প্রাইভেটে গ্রাজুয়েশান শেষ করেছে। রাইফেল শুটিং শিখেছে। ক্যারাটে শিখেছে। বিশ্বনাথ আংকেল কসমেটিক সার্জেনের সাথে কথা বলেছেন ওর মুখের বিভৎস দাগটা যাতে মুছে ফেলা যায়।

কিন্তু ভিতরের দাগটা কোনদিনও মুছবে কি? আনুপিসি আর মিতু দুজনেই জীবনের দুই যন্ত্রণাকে বয়ে বেড়াচ্ছে। তাই ওরা কেমন যেন পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল। আনুর মনে সন্দেহ ছিল রূপেশকে নিয়ে। সাথীর অগাধ টাকার লোভে ছেলেটা বিয়ে করতে চাইছে না তো। অমিতাভও ভালো করে খোঁজ নিয়েছিল। তেমন সন্দেহজনক কিছু পায় নি। স্কুল কলেজ অফিস কোথাও কোন সন্দেহ জনক কিছু নেই। অমিতাভ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দিয়েছিল। তারপর অমিতাভ অফিসের কাজে বেশ কিছুদিনের জন্য দিল্লী চলে যায়। সেখানেই একদিন খবর আসে গ্যাস লিক করে সাথী সাংঘাতিক ভাবে পুড়ে গেছে। প্লেনে তক্ষুনি ফিরে আসে। পাগলের মত কাঁদছিল রূপেশ। সাথী বাঁচেনি। ভেঙে গুঁড়িয়ে গিয়েছিল অমিতাভ। সব কাজ মেটার পর ছুটে গিয়েছিল আনুর কাছে সান্ত্বনার আশায়। আনু ও কাঁদছিল।দুহাতে মুখ ঢেকে বসেছিল অমিতাভ। কেউ কোন কথা বলতে পারেনি। ঘরে নেমে এসেছিল সন্ধ্যার অন্ধকার। একসময় ভেজা গলায় আনু বলে -“সাথীর টাকা পয়সা সব ব্যাঙ্কে আছে?” এই সময় এমন অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নে অবাক হয় অমিতাভ। কি ভাবছে আনু? সাথীর মৃত্যুকে খুন ভাবছে?রূপেশকে খুনি ভাবছে? রূপেশের কান্না তো আর ও দেখে নি।
সময় থেমে থাকে না। দিন সপ্তাহ মাস নিজের মত পেরিয়ে যায়।

কয়েকমাস পর অমিতাভ কি একটা প্রয়োজনে পোষ্ট অফিস যায়। অমিতাভের এক বন্ধু অলোক এজেন্সি করে পোস্টঅফিসে ।সে অমিতাভকে ধরে পড়ল একটা কিষাণ বিকাশ পত্র করার জন্য।অমিতাভ বলল-“না বাবা, তোদের এই ছোট পোষ্টঅফিসে অনেক ঝামেলা।আমার ব্যাঙ্কই ভালো। এ তো ইচ্ছেমত ভাঙাতে পারব না।” অলোক বলল-“কে বলল ভাঙাতে পারবি না?এই তো তোর ভাগ্নির অত্তগুলো টাকা ভাঙিয়ে দিলাম না? প্রায় আটলাখের উপর টাকা।” অমিতাভ অবাক হয়। সাথী টাকা ভাঙিয়েছিল? কিন্তু কেন? অলোককে জিজ্ঞেস করতে ও বলল সাথী নাকি বলেছিল কি শেয়ারে ইনভেস্ট করবে। অমিতাভর সাথে ব্যাঙ্ক ম্যনেজারের ভালো সম্পর্ক। এবার ব্যাঙ্কে খোঁজ নিতে অমিতাভ জানলো সাথীর সেভিংস আকাউন্টে হাজার দশেক টাকা থাকলেও ফিক্সড একটাও নেই। সেদিন সন্ধ্যায় অমিতাভ আনুর বাড়ি গেল। অমিতাভের অস্থিরতা আনুর নজর এড়ালো না।কফিতে চুমুক দিতে দিতে আনু প্রশ্ন করল-“ব্যাঙ্কে টাকা নেই বুঝি?” অমিতাভ ইতস্ততভাবে বলল-“না মানে ওরা শেয়ার কিনেছিল।” আনু আস্তে আস্তে বলল-“ওরা না রূপেশ?”
কাঁটা একটা বিঁধেই রইল।দুমাস পর হঠাৎ একদিন উত্তেজিত ভাবে অমিতাভের ফোন এল আনুর কাছে। রূপেশ ফোন করেছিল। সাথীর বাড়িটায় সর্বত্র সাথীর স্মৃতি। রূপেশ সহ্য করতে পারে না।তাই ওই বাড়ি সে বিক্রি করে দিতে চায়।বাড়ির দলিল অমিতাভের কাছে। তাই অমিতাভের সঙ্গে দেখা করতে চায়। আনু বলল -“ব্যাপারটা দেখতে হচ্ছে। ” আনু গোপাকে ফোন করল। আনফিসিয়ালি ছেলেটার ব্যাপারে খোঁজ নিতে। দুদিন পর আনুর বাড়িতে আনু অমিতাভ গোপা আর মিতু বসল আলোচনায়।
গোপা খোঁজ নিয়ে জেনেছে রূপেশ আজকাল বেশ রাজসিক ভাবে জীবন কাটাচ্ছে। প্রচুর ড্রিঙ্ক করে। একটি মেয়ের সাথে ঘনিষ্ট ভাবে মেলামেশা করতেও দেখা গেছে। এক প্রমোটার বন্ধুর সাথে প্রায়ই মিটিং হচ্ছে।

আনু গম্ভীর ভাবে বলে-“বৌ এর শোকে কান্নাকাটি সবটাই তবে নাটক। টাকা আগেই নিজের নামে করেছে। বাড়ির দলিল নিজের কাছে থাকলে বিক্রির ব্যবস্থা নিজেই করত। জানত না যে সাথী মামার জিম্মায় রেখে গেছে দলিল।” মিতু সবটা জানত না। সবটা শুনে ওর আপাত সুস্থ জীবনে প্রতিক্রিয়া দেখা দিল।চোখমুখ লাল হয়ে উঠল। মুখে একটাই কথা-“লোকটাকে মেরে ফেল। ও পুড়িয়েছে।আমায় জ্বালিয়েছে। ওকেও জ্বালিয়ে দাও।” আনু ওকে বোঝায়-“শান্ত হ মিতু,রূপেশ তোকে জ্বালায়নি। জ্বালিয়েছে সাথীকে। তাছাড়া সবটাই আমাদের অনুমান। এমনও তো হতে পারে দুর্ঘটনাটা ভুলতে মদ খায়। সত্যি হয়ত বাড়িটাতে সাথীর স্মৃতি জড়িয়ে আছে বলে বিক্রি করে চলে যেতে চায়। সাথী নেই বলে রূপেশ সারাজীবন একা কাটাবে এটা তো হয় না। আমরা প্রথম থেকে রূপেশ কে খুনি ধরে এগোব না। শুধু খোঁজ খবর নেব। ” অমিতাভের কাছে সাথীর বাড়ির ডুব্লিকেট চাবি আছে সেটা রূপেশ জানে না। এই সুযোগটাই নিল আনুরা। একদিন সন্ধ্যাবেলা আনু মিতু আর অমিতাভ গেল বাড়িটায়। বাড়িটায় এসে অমিতাভ খুব আপসেট হয়ে গেল। আনু আর মিতু ঘুরে ঘুরে বাড়িটা দেখতে লাগল। মিতু যেন কেমন বিহ্বল হয়ে পড়ল।দোতলার ঘরে টেবিলের উপর রাখা স্মিত হাস্যমুখী মেয়েটার ছবির দিকে মোমের আলোয় বহুক্ষণ চেয়ে রইল।পুড়ে মরে গেছে। নিজের অজান্তেই নিজের পোড়া গালে হাত বোলায় মিতু। আনুপিসি ওকে ডেকে নিয়ে যায়। আনুপিসি একটা ডাইরী পেল সাথীর আলমারি থেকে। সাথীর ডাইরী। সন্দেহজনক কিছুই নেই। রোজকার খুঁটিনাটি কথা। তবে বোঝা যায় রূপেশকে সাথী খুব ভালোবাসত।

রূপেশ কি খেতে ভালোবাসে, রূপেশ কেমন করে তাকায়, কেমন করে হাসে, সাথীর কি মনে হয়, সাথী কি রান্না করবে, কি কি কিনল, মাসকাবারি হিসাব এইসব। সাথীর লেখা থেকে ওরা জানল শেয়ার রূপেশের নামেই কেনা হয়েছিল। সাথী লিখেছে রূপেশ আর সে কি আলাদা? রূপেশ দাঁড়াতে চাইছে,সাথীকে তো ওর পাশে থাকতেই হবে।আনুপিসি আগাগোড়া খুব মন দিয়ে ডাইরী পড়ল। আর মিতু মন থেকে অনুভব করছিল।আনুপিসি এবার পাড়ায় খোঁজখবর করতে চাইলেন। মিতু একটা নামী শ্যাম্পু কোম্পানীর সেলসগার্ল হয়ে বাড়ি বাড়ি ফ্রি স্যাম্পেল দেবার আছিলায় খোঁজ নিতে লাগল। কেউই রূপেশের বিপক্ষে কিছু বলল না। ওদের কখনো ঝগড়া হয়নি। সাথী আর রূপেশ সুখী দম্পতি ছিল। মিতু মুদির দোকানে জিনিস কেনার বাহানায় কথায় কথায় খোঁজ নিতে লাগল। মুদি লোকটি সরল।বলল-“কপাল দিদিমনি কপাল। মাত্র কয়েকদিন আগে সাথীদিদি মাসকাবারি মশলা কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেদিন জামাইবাবু অল্প অল্প করে মশলা নিলেন। অল্প অল্প বলে মেপে ওজন করে দিতে সময় লেগে গেল। আর যদি একটু আগে জামাইবাবু বাড়ি যেতেন তবে দিদিটাকে বাঁচানো যেত।” এবার মিতু বাচ্চুদার পানবিড়ির দোকানে গেল খোঁজ নিতে। মিতু দুপুরদুপুর এসেছে। অন্য সময় দোকানে লোকের ভীড়। কথা বলা যায় না।এখানে কি কিনবে মিতু।ও একটা কোল্ডডিংঙ্ক নিল। মিতু এসব খায়না। ওর ঝাঁজ লাগে। আস্তে আস্তে খেতে লাগল। বাচ্চুদা সুপুরি কাটছে। মিতু জিজ্ঞেস করল-“আপনাদের পাড়ায় ওই দিকের বাড়িটায় একটা বৌ পুড়ে মরে গিয়েছিল না? আত্মহত্যা নাকি?” বাচ্চুদা হাতের সুপুরি কাটা থামিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মিতুর দিকে চেয়ে রইল। তারপর বলল-“কে বলল আত্মহত্যা? পুলিশ বলছে এক্সিডেন্ট।” মিতু বলল-“বাড়িতে কেউ ছিল না নাকি?” বাচ্চুদা বলল-“কেন যেখানে খবর পেয়েছেন সেখানে শোনেননি?” মিতুর অস্বস্তি লাগছে। সবাই কেমন ঠিকঠাক উত্তর দিল।মিতু বলল-“না মানে খবরেকাগজে পড়েছিলাম।ছোট্ট করে বেরিয়েছিল খবরটা।ডিটেলস লেখেনি।”বাচ্চুদা সুপুরি কাটতে কাটতে বলল-“কোন কাগজ?” মিতু ঢোঁক গিলে বলল-“আনন্দবাজার।” বাচ্চুদার ঠোঁটে বাঁকা হাসি দেখা গেল।বলল-“খবরটা বর্তমানে বেরিয়েছিল।” মিতু বিষম খেল।

বাচ্চুদা বলল-“আহা আস্তে আস্তে।অভ্যেস নেই।” কোল্ডড্রিংকের বোতলের শেষে তখনও অনেকটা তরল রয়েছে। মিতু বোতল নামিয়ে দিল। বলল-“না আসলে বাড়িটা কিনব ভাবছি। তাই খোঁজখবর নিচ্ছিলাম আর কি।” বাচ্চুদার হাতে টাকা দিল মিতু। বাচ্চুদা টাকাটা হাতে নিয়ে বসে রইলেন। তারপর বললেন-“বাড়িটা তবে ওরা বেচেই দেবে। আমিও এটাই ভাবছিলাম।” মিতু বলল-“কেন দাদা একথা বলছেন?” বাচ্চুদাএকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-“সত্যি কিনবে বাড়িটা?” বাচ্চুদার চোখের দিকে তাকিয়ে নেতিবাচিক ঘাড় নাড়ল মিতু।বাচ্চুদা বলল-“কে পাঠিয়েছে তোমায়?অমিতবাবু? ওরাও কি তবে সন্দেহ করছে?” মিতু বলল-“কেউ পাঠায়নি। আমি নিজেই খোঁজ নিচ্ছি।” বাচ্চুদা বলল-“তুমি বাচ্চা মেয়ে পারবে?” মিতু দৃঢ় ভাবে ঘাড় নাড়ে বাচ্চুদা বলে -“সাথী দিদিভায়ের দাদু আমার বড় উপকার করেছিলেন। রকে বসতাম। মাথার উপর চাল ছিল না। উনি টাকা দিলেন। দোকান করলাম।কোনদিন সে টাকা ফেরত চান নি। আমি নিজে গিয়ে দিয়ে আসতাম। মেয়েটা বড় ভালো ছিল।শান্ত ভীতু ভদ্র। বিয়ের সময় জামাই দেখেই আমার পছন্দ হয়নি। মেয়ে দেখতে খুব সাধারণ।আর ছেলে অপূর্ব সুন্দর। কেমন মনে হয়েছিল পয়সার জন্য বিয়ে করছে। দুর্ঘটনার দিন সকালে জামাইবাবু আমার দোকানে এসেছিলেন।সিগারেট কিনতে। পয়সা দেবার সময় ওনার প্যান্টের পকেটে আমি সিগারেটের প্যাকেট দেখেছিলাম। পাড়ার গদাই ওদের বাড়ি কাগজ দেয়। সেদিন উনি বললেন গদাই কাগজ দেয়নি।আমি দোকানে আনন্দবাজার বর্তমান দুটো কাগজই রাখি। খদ্দের টানে। সেদিনও দুটো কাগজই রেখেছিলাম। ওরা আনন্দবাজার নেয়।কিন্তু জামাইবাবু বর্তমান টেনে নিলেন। অথচ সেদিন আনন্দবাজারের ফ্রন্টপেজে ভারত পাকিস্তানের বড় খবর ছিল। উনি বেশ কয়েকবার ঘড়ি দেখেছিলেন। পরে আমার কেমন মনে হয়েছিল উনি প্রমাণ রাখছিলেন। দুর্ঘটনার সময় বাড়ির বাইরে থাকার প্রমাণ। আমি বিকেলে গদাইকে বলেছিলাম আজ কাগজ দিতে গেলি না বলে সাথীদিদিভাইকে শেষ দেখাটা দেখতে পেলি না। গদাই বলেছিল ও কাগজ দিয়ে এসেছিল।দিদি রান্নাঘরে ছিল বলে জামাইবাবুই কাগজ নিয়েছিল।খুব বাজে ভাবে পুড়ে গিয়েছিল মেয়েটা।”
ওরা দুজনেই খানেকক্ষণ চুপ করে থাকে।মিতু রোদ চশমা খুলে চোখ মোছে। বাচ্চুদা দেখে স্কার্ফ জড়ানো রোদচশমা পরা মেয়েটির গালের একদিক পোড়া। আর সেখানে গড়িয়ে পড়ছে জলের ফোঁটা। বাচ্চুদা বলে-“দিদিভাই…”
মিতু বলে-“আচ্ছা চলি দাদা।
অনেক উপকার করলেন।আবার দরকার হলে আসব।”
বাচ্চুদা বলল-“নিশ্চয় আসবেন দিদি। যতটুকু সাধ্য করব।”
আনুপিসিকে সবটা বলে মিতু। আনুপিসির মুখ শুনতে শুনতে লাল হয়ে যায়। একটু চুপ করে থেকে আনুপিসি বলে-“কাল অমিতের সাথে সাথীর বাড়ি গিয়ে তুই দেখবি মশলার কৌটোগুলো। এমনও হতে পারে হয়ত কেউ এসেছিল। বেশী রান্না হয়েছিল। মশলা শেষ হয়ে গিয়েছিল। কোন সন্দেহের অবকাশ রাখব না মনে।”
মিতু বলে-“কাল নয়, আজই যাব।” সেদিন একটু রাত করে ওরা গেল। মিতু দেখল পরীক্ষা করে।রান্নাঘরে কিছু কৌটো আগুনে পুড়ে গেছে। কিন্তু কিছু কৌটো এখনো অক্ষত আছে। তার ভিতরে মশলা রয়েছে পোকা লাগা। মোটামুটি যে কটা শিশি হাতে পেল সবগুলোই অর্ধেকের বেশী ভর্তি।সোফার নীচে প্লাস্টিকের ব্যাগে কিছু খুচরো মশলার প্যাকেট পেল মিতু। এটাই সম্ভবত রূপেশ নিয়ে ঢুকেছিল।
আনু অমিত গোপা বিশ্বনাথ মিতু সবাই বসেছিল।কেউ কোন কথা বলতে পারছিল না।অমিতই নীরবতা ভেঙে কান্না ভেজা গলায় বলল-“কোন সন্দেহ নেই তবে? এটা খুন?” আনু ঘাড় নাড়ল।কান্নায় ভেঙে পড়ল অমিতাভ। “আমি মেয়েটার কি সর্বনাশ করলাম। কেন বিয়ে দিলাম আমি মেয়েটার।”
আনু স্বান্তনা দেয়-“তুমি কি জানতে বল যে রূপেশ অমানুষ।”
বিশ্বনাথ বলে-“কিন্তু এতো মেনে নেওয়া যায় না।এর শাস্তি চাই।” গোপা বলে-“আইনের পথে কিছু করা যাবে না। কোন প্রমান নেই। একমাত্র পথ স্বীকারোক্তি। বে আইনী ভাবে তুলে এনে রাম ধোলাই দেব। সত্যিটা স্বীকার করলে তারপর আইনের পথে শাস্তি।” অমিতাভ বলে-“আমার ইচ্ছে করছে রূপেশ কে গুলি করে মারতে।” মিতু বলে-“না কাকু গুলি নয়।ওর উপযুক্ত শাস্তি ওর গায়ে কেরোসিন ঢেলে ওকে জ্বালিয়ে দেওয়া।তোমরা না পারলে আমায় বল। আমি ঠিক পারব।” ধমকে ওঠে আনু-“আ:,তোমরা কি খুনী?অমিত গোপা তোমরা না আইনের রক্ষক। কোন কাজ বে আইনী করব না। আচ্ছা বিশ্বনাথ দা কোন ভাবে ভয় দেখিয়ে বা মানসিক চাপ সৃষ্টি করে কি রূপেশের থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা সম্ভব?” বিশ্বনাথ একটু মাথা নীচু করে থাকে।তারপর বলে-“অসম্ভব নয়।তবে হবেই কিনা বলা যায় না। ফিফটি ফিফটি চান্স।” আনু বলে-“তবু সেই চান্সটা একবার নিয়ে দেখাই যায়। ওরা সোজা হয়ে পরস্পরের দিকে তাকায়।

(১)

আজ কতদিন পর তুমি আসবে।আমি তাই পথ চেয়ে আছি।তুমি আসবে কি করে জানলাম?কেউ বলে নি।আমি বাতাসে তোমার গন্ধ পাই।মনে আছে তুমি যখন অফিস থেকে ফিরতে, মোড়ের মাথায়,আমি ঠিক বুঝতে পারতাম তুমি আসছ।দরজা খুলে দাঁড়াতাম।তুমি হেসে বলতে-“সাথী কি করে বোঝ।”
কতদিন পর তোমায় দেখব আজ।আমি একা একা বুকে কান্না চেপে ঘুরে বেড়াই এই বাড়িতে।তোমার টাই,লাইটার চিরুনি ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি।ওগুলোতে তোমার স্পর্শ পাই। আর তোমার ওই কাটগ্লাসের গ্লাসটা। ওটার উপর খুব রাগ আমার।তোমার ওই মদ খাবার নেশা তোমাকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছিল।
আমি ছাদে এসে দাঁড়ালাম। তুমি এলে অনেক দূর থেকে তোমায় দেখতে পাব। পথচারীদের মধ্যে তো তুমি নেই। কোন রিক্সাতেও তোমায় দেখতে পাচ্ছি না রূপেশ। আমাদের বাড়ির গেটের সামনে বড় গাড়িটা এসে থামল। তুমি নামলে। কি সুন্দর দেখাচ্ছে তোমাকে!কিন্তু তোমার সঙ্গে ওরা দুজন কারা। ওই ভদ্রলোক, আর ওই মেয়েটি? ওদের আমি চিনি না। লোকটি বলল-“কমপ্লেক্সটা বেশ বড়।অনেকটা জায়গা।”
মেয়েটা বলল-“যাই বল কেমন যেন ভূতুড়ে বাড়ির মত।
আমার রাগ হয়ে গেল। আমার ভালোবাসার বাড়িকে ভূতুড়ে বলছে। এখানে আমার বাবা মা দাদু ছিলেন। তারা নেই কিন্তু তাদের স্মৃতি তো আছে এই বাড়ির কোনায় কোনায়। আর রূপেশকে বিয়ে করেও তো এই বাড়িতেই ঘর বেঁধেছিলাম।সেই সব দিনের স্মৃতি…….
তাকে বলছে ভূতুরে….আমি মেয়েটাকে দেখার জন্য আলসে থেকে ঝুঁকলাম।মেয়েটা বলল-“রূপ ছাদে কে গো?ঝুঁকে দেখল।” আমি সরে এলাম।রূপেশ বলল-“কেউ না তো।আরে তালা দেওয়া বাড়ি। কে থাকবে?”মেয়েটা অবাক হয়ে একবার উপরে তাকাল।তালা খুলে ওরা ঘরে ঢুকল।মেয়েটা রূপেশকে রূপ বলে ডাকছে। কে ও?আমি এখনই ওদের সামনে যাবনা। নিজেকে লুকিয়ে রাখব।
(২)
রূপেশরা ঘরে ঢুকল। ব্যাগ থেকে ইমার্জেন্সী লাইট বের করে জ্বালালো। যখনই ওরা বাইরে আউটিং এ যায় এগুলো সঙ্গে রাখে। এবার অবশ্য ওরা আউটিং এ আসে নি।এসেছে কাজে।সাথীর এই বিশাল বাড়ি রূপেশ বিক্রি করে দেবে।জিতু প্রোমোটার। ও কিনবে। তাই দেখতে এসেছে।
রূপেশ বলে-“চল তোমাদের আশপাশটা ঘুরে দেখাই।” অহনা বলে-“না না আগে ফ্রেশ হই। এতটা লঙ ড্রাইভ খুব টায়ার্ড। তাছাড়া যা অন্ধকার। আগে স্নান করতে চাই।”
রূপেশ বলে “তবে এস বাথরুম আর শোবার ঘরগুলো দেখিয়ে দিই। আসার সময় বাচ্চুদার দোকানে বলে এসেছি। বাচ্চুদা এখুনি একটা কাজের মেয়ে পাঠিয়ে দেবে। সে এসে জল তুলে দেবে। ঘরও পরিষ্কার করে দেবে। “ওরা উঠে দাঁড়ায়।

(৩)
দোতলায় আমার শোবার ঘরে আরামকেদারাটাতে বসে আমি ভাবছি…এরা কারা?কে ওই মেয়েটা?জিতু বলে ওই ছেলেটার বৌ? রূপেশের গায়ে সবসময় ঢলে পড়ছে। রূপেশ আপত্তি করছে না কেন? রূপেশ তো এমনিতে খুব লাজুক। খুব পালটে গেছে ও। এসে থেকে একবারও আমার নাম করল না। কত খুশী খুশী লাগছে ওকে। অথচ টালিগঞ্জ হাসপাতালে যখন যেত পাগলের মত কাঁদত আমার জন্য।আমার সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। আমি ঠিক করলাম ওদের উপর আড়াল থেকে নজর রাখব।
নীচে নেমে এলাম।বাচ্চুদা যে মেয়েটিকে পাঠিয়েছে সে এসে ঘর পরিষ্কার করে দিয়েছে।রূপেশ ব্যাগ থেকে চাবি বার করে আমার আলমারী খুলল।চাদর বের করল।আমার গায়ে দেবার চাদরটা মাটিতে পরে গেল।ওটা আমার মাও গায়ে দিত। অহনা বলে মেয়েটা বলল-“এই রূপ, কি একটা পড়ে গেল।” রূপেশ বলল-“ওহ হো”…রূপেশ পায়ের বুড়ো আঙুলে তুলল চাদরটা। তারপর দলা পাকিয়ে ঢুকিয়ে দিল আলমারীতে। আমার বুকের ভিতরটা মুচড়ে উঠল। অহনা বলল-“যাক বাবা এতক্ষণে ঠিক লাগছে। চারদিকে যা ধুলো। আমার তো এলার্জী হয়ে যেত। এবার স্নান করে কফি খেয়ে সুস্থ হব।”
কাজের মেয়েটা বলল-“আমি রান্নাঘর পরিষ্কার করে বাসন টাসন মেজে দেব?” রূপেশ চেঁচিয়ে বলল-“না..কোন দরকার নেই।আমরা রান্না করা খাবার খাব না। বাচ্চুদা কে বলা আছে হোম ডেলিভারী খাবার আর মিনারেল ওয়াটারের বোতল পাঠিয়ে দেবে।” মেয়েটা থতমত খেয়ে গেল। রূপেশ পকেট থেকে দুটো একশ টাকার নোট বার করে মেয়েটার দিকে বাড়িয়ে দিল।মেয়েটা মনে হয় আশা করে নি। খুশী হয়ে চলে গেল। মেয়েটা চলে যেতে অহনা রূপেশের কাছ ঘেঁষে দাঁড়াল। রূপেশের চোখে সেই পাগল করা দৃষ্টি। গভীর স্বরে ডাকল-“অহনা”….আমার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। সেই এক স্বর। শুধু নামটা পালটে গেছে। অহনা মোচড় দিয়ে সরে এসে হেসে গড়িয়ে পড়ল। বলল-“আগে স্নান করে আসি তারপর।” রূপেশ এই মেয়েটাকে ভালোবাসে। কত সুন্দর মেয়েটা? আমি ওকে সামনাসামনি ভালো করে দেখতে চাই। অহনা বাথরুমে ঢুকল। আমাদের বাথরুমটা বেশ বড়। ঘষা কাঁচের জানলা। আমি ঘষা কাঁচের জানলায় চোখ রাখলাম। আমাদের বাথরুমে সাওয়ার নেই।অহনা ওর পোশাক খুলে বালতি থেকে মগে জল তুলে গায়ে ঢালতে থাকে। সত্যি সুন্দর চেহারা মেয়েটার। আমার দীর্ঘশ্বাস পরে। অহনা কেমন চমকে ওঠে। তাড়াতাড়ি গা মুছে পোষাক পরে বেরিয়ে যায় বাথরুম থেকে। রূপেশ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে অহনার দিকে। অহনা অস্বস্তি ভরা গলায় বলে-“রূপেশ তোমাদের বাথরুমটা এত বড় সব জায়গায় আলো পৌঁছায় না।

আমার মনে হচ্ছিল কে যেন দেখছে।” রুপেশ হেসে বলে -“নিশ্চয় দেওয়ালের টিকটিকি মুগ্ধ দৃষ্টি মেলে চেয়ে ছিল তোমার দিকে। আফটার অল তোমার যা ফিগার।” অহনা ধ্যাৎ বলে হাসতে হাসতে পাশের ঘরে আসে। এই ঘরে সেই আয়নাটা যেটাতে স্নান সেরে উঠে আমি সিঁদুর পরতাম।অহনা পাশের ঘর থেকেই রূপেশ কে বলল-“রূপেশ তুমি তো এখানে আসো নি বহুদিন। ঘরে এত ধূলো জমেছিল।কিন্তু আয়নাটা কি ঝকঝক করছে দেখ।” রূপেশ সেই পুরানো ভঙ্গীতে সোফায় গা হেলিয়ে দিয়ে চুরুট ধরিয়ে চাপা ঠোঁটে উত্তর দিল-“সবই তোমার অপেক্ষায় ডার্লিং।” বাব্বা কত ঘুরিয়ে কায়দায় উত্তর দিচ্ছে রূপেশ। এমন ভাবে কথা বলতেও জানত ও!? কই জানতাম না তো।আমি তো জানতাম ও লাজুক হাসতে পারে। আর আনমনে কি যেন সব হিসেব করে। আমি বাগানে এলাম।ড্রেসিংটেবিলের ঘরটার একটা জানলা বাগানের দিকে।সেই জানলার সামনে এসে দাঁড়ালাম।আমাদের বাড়ির জানলাগুলো খড়খড়ি দেওয়া। অহনা ড্রেসিংটেবিলের সামনে চুল আঁচড়াচ্ছে।আমি খড়খড়ি সরালাম ওকে ভালো করে দেখব বলে।অহনা চমকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল।আমি দ্রুত সরে গেলাম।রূপেশ ছুটে এল।অহনা আঙ্গুল তুলে জানলাটা দেখিয়ে ঢোঁক গিলে বলল-“এখানে কেউ ছিল।”রূপেশ কাউকে দেখতে না পেলেও খড়খড়ি তোলা দেখল। দ্রুত বাগানে এল। আমি তখন অন্ধকারে মিশে গেছি।ও চারদিক খুঁজে দেখল। তারপর অহনাকে বলল-“এতদিন ফাঁকা পরে আছে বাড়িটা। নিশ্চয় পাড়ার ছেলেরা আড্ডা জমায় বাগানটাতে।তাদেরই কেউ নিশ্চয় উঁকি মারছিল। খেয়াল রাখতে হবে। তুমি ভয় পেও না।” অহনা কেমন অস্বস্তি নিয়ে বলে “এসে থেকে মনে হচ্ছে কে যেন দেখছে সবসময়।”
আমি উপরে আমার ঘরে এলাম।এভাবে আড়ালেই থাকব আমি।নজর রাখব ওদের উপর।আমার পছন্দের আর ব্যবহারের টুকটাক সামগ্রী পরিষ্কার করে রাখি আমি।ড্রেসিং টেবিলটা তাই তো পরিষ্কার দেখেছে অহনা। কিন্তু ওদের সামনে এখন আমি যাব না।
(৪)
অহনা মেয়েটা বেশ দমে গেছে। পাশের ঘরে এসে সোফায় বসল। রূপেশ আয়েস করে ওর কোলে মাথা রেখে শুলো। অহনা বলল-“যাই বল,এই বাড়িতে এসে থেকে আমার কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে। সবসময় মনে হচ্ছে কে যেন আড়াল থেকে আমাদের উপর নজর রাখছে।”
রূপেশ বলে-“ও কিছু নয় অহনা।আসলে আমরা চিরকাল ফ্ল্যাটবাড়িতে মানুষ তো। তাই এই হাভেলী গোছের এত বড় বাড়িতে এসে কেমন কেমন লাগছে। বাট ডোন্ট ওড়ি। আমরা তো এখানে চিরকাল থাকব না। জীতু এই বাড়িটা নিয়ে নেবে। ফ্ল্যাট বানাবে। আর আমরা যা টাকা পাব তাই দিয়ে অন্য জায়গায় ফ্ল্যাট কিনে বিয়ের পর সেখানেই থাকব।”

(৫)
দারুণ চমকালাম আমি। আমার সবকিছু ভেঙে যাচ্ছে। গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। এতগুলো ধাক্কা কি একসাথে সামলানো সম্ভব? আমার ভালোবাসার বাসা ভেঙে যাবে। ফ্ল্যাটবাড়ি হবে। আমার স্বামী রূপেশ আমায় ভুলে গেছে। সে অহনাকে বিয়ে করবে। আমি ওর জন্য কেঁদে কেঁদে পাগল। ওর জন্যই আমি এই বাড়ি ছেড়ে কোত্থাও যেতে পারিনি। অথচ ও আমার কথা ভুলে গেছে। আমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলাম। অনেক চেষ্টা করছি চাপার। কিন্তু পারছি না।

(৬)
রূপেশের বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পরেছিল অহনা। তিনপেগ খেয়ে রূপেশও ঘুমিয়ে পরেছিল।হঠাৎ হালকা ফোঁপানির শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল অহনার। ও কান খাড়া করে শুনে রূপেশকে ডাকল-“রূপেশ…এই রূপেশ…শোন কেউ যেন কাঁদছে।” রূপেশেরও ঘুম ভেঙে যায়। সত্যি তো কে যেন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে। এত রাতে এই ফাঁকা বাড়িতে কে কাঁদবে। তাও বোঝা যাচ্ছে গলাটা মেয়ের। ভ্রু কুঁচকে ওঠে রূপেশের। কান্নাটা দোতলার ঘর থেকে আসছে বলে মনে হচ্ছে।রূপেশ হাতে টর্চ নিয়ে উঠে দাঁড়ায়।বাইরের বসার ঘরটায় আসে।এখান থেকে দুটো সিঁড়ি দুদিক দিয়ে দোতলায় উঠে গেছে।রূপেশ বাঁদিকের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে থাকে। পিছন পিছন অহনাও আসে।রূপেশের এখন একটু এলকোহলিক ফ্যাট জমেছে। ইদানীং একটা হার্টের প্রবলেমও ধরা পড়েছে। দ্রুত সিঁড়ি ভাঙলে হাঁফ ধরে। কয়েকধাপ ওঠার পর রূপেশ দেখে সাথীর ঘরের পর্দার একটা দিক ঝুলে গিয়ে হাওয়ায় মাটিতে ঘষা খাচ্ছে।তার থেকেই এরকম শব্দ উঠছে।একটা নিশ্বাস ফেলে ও। নেমে আসতেই যাবে, এমন সময় পাশের ডানদিকের সিঁড়িতে দ্রুত পায়ের শব্দ শোনা গেল। অহনা অস্ফুট চিৎকার করে উঠল। রূপেশ ওর দিকে টর্চ ঘোরাতেই অহনা ফ্যাকাশে মুখে বলল-“ওদিকের সিঁড়ি দিয়ে কে যেন নেমে ওই ঘরটায় ঢুকল।” অহনা আঙ্গুল দিয়ে যে ঘরটা দেখাল সেটা রান্নাঘর। রূপেশ যেন কেমন হয়ে গেল। অহনা বলল-“জীতুকে ডাকব?দেখবে?” রূপেশ বলল-“না”। শক্ত হাতে অহনার হাত ধরে প্রায় টানতে টানতে ঘরে নিয়ে এল।অহনা দেখল রূপেশের হাত কাঁপছে। অনেক রাত অবধি ওদের ঘুম এল না। পরেরদিন যখন ঘুম ভাঙলো তখন অনেক বেলা হয়ে গেছে। কাজের মেয়েটা এসে ঘর পরিষ্কার করে দিল। রূপেশ বাচ্চুদার দোকান থেকে একটা তালা আনিয়ে রান্নাঘরে নিজে হাতে লাগিয়ে দিল।

(৭)
আজ জিতু বলে ছেলেটা কোন এক উকিল বন্ধুর বাড়ি এই বাড়ির দলিলপত্র নিয়ে গেল। অহনা স্নানে গেল। রূপেশ আলমারি থেকে চাবি বার করে দোতলার সিঁড়ি বেয়ে উঠে এল আমি দোতলা থেকে চিলেকোঠার সিঁড়িতে গিয়ে দাঁড়ালাম। রূপেশের ভ্রূ কুঁচকে আছে। কেন রূপেশ? তুমি আমায় মনে করে আমার ঘরে এসেছ। তোমার মধ্যে দু:খ থাকবে। ভালোবাসার ব্যাথা ভরা স্মৃতি থাকবে। কিন্তু এমন সন্দেহ কুটিল মুখ কেন? রূপেশ চাবি বার করল দরজা খুলবে বলে। অবাক হয়ে দেখল তালাটা দরজার একটা আংটায় ঝুলছে। ও তো জানে না আমি এই ঘরেই থাকি। ও ঠেলা দিয়ে দরজা খুলল।আমি একটা জানলা খুলে রেখেছিলাম। সেখান দিয়ে রোদ এসেছে। টেবিলের উপর রাখা আমার আইবুড়ো বেলার ছবিটার উপর পড়েছে। টেবিলে আমার লেখার কলমটা ঢাকা খোলা অবস্থায় পরে আছে। রূপেশ হাতে তুলে দাগ টানল।লেখা পড়ল না। কালি শুকিয়ে গেছে। রূপেশ সোফার দিকে ঘুরল। আমার ঘরে পরার শাড়ীটা রাখা।আর সোফার সামনে আমার ঘরে পরার চপ্পলটা।রূপেশ বাথরুমের সামনে এসে দাঁড়াল।জোরে ধাক্কা দিয়ে দরজাটা খুলল।দেখল গামলার জলে মগটা দুলছে। বাথরুমের জানলা বন্ধ। হাওয়া নেই….তাও দুলছে। রূপেশ দুপা পিছিয়ে এল। আর তখনই দারুণ চমকে দেখল বাথরুমে রডের উপর আমার আধপোড়া হলুদ লাল জয়পুরী শাড়ীটা। বিস্ফারিত চোখে পিছু হাঁটতে হাঁটতে দেওয়ালে ধাক্কা খেল রূপেশ। পিছন ঘুরতেই দেখল টেবিলে নয়, আমার ছবিটা বাথরুমের মুখোমুখি বইএর তাকে। ওর দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে।

(৮)

রূপেশ জোর করে ভাবতে চেষ্টা করে,সে অকারণ ভয় পাচ্ছে। সাথীকে সে নিজে হাতে পুড়িয়েছে।আত্মা ভূত এসবে সে বিশ্বাস করে না।কিন্তু কেন জানি না মনের ভিতর জোর পায় না।
সেদিন সারাদিন ওরা বাইরেই কাটালো।বোটানিক্স ঘুরতে গেল। অহনা বলল-“দেখ মনে হচ্ছে আমরা কচি প্রেমিক প্রেমিকা।” সারাদিনের হৈচৈ তে মনে জমা কালো ছায়াটা একটু হালকা হল রূপেশের। সন্ধ্যায় ওরা বাড়ি ফিরল। বাড়ি ঢুকেই অহনা বলল-“আহ…লাভলী…কি সুন্দর রজনীগন্ধার গন্ধ দেখ। তোমাদের বাগানে রজনীগন্ধার গাছ আছে বুঝি।” রূপেশেও পেয়েছে গন্ধটা। খুব পরিচিত এই গন্ধ। সাথী প্রতি সন্ধ্যায় টাটকা রজনীগন্ধা ফুল রাখত ফুলদানি তে। ওর খুব প্রিয় ছিল। বাগানে রজনীগন্ধার গাছ নেই। বন্ধ ঘরে এত তীব্র রজনীগন্ধার গন্ধ!…মাথা নাড়ে রূপেশ। কেমন একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে যায় শিরদাঁড়া দিয়ে।
অহনা বাথরুমে গেল।জিতু নিজের ঘরে ফ্রেস হতে গেল। রূপেশ সোফায় গা এলিয়ে দিল।অহনার বোধহয় ঠান্ডা লেগেছে। হাঁচছে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে অহনা বলল-“ইস জল কম আছে,ভাবলাম একটু স্নান করব।” রূপেশ বলল-“ঠান্ডা লাগিয়ে হাঁচছ। আর এর মধ্যে স্নান করবে?” অহনা বিস্মিত হয়ে বলল-“ঠান্ডা!ঠান্ডা আমাকে ভয় পায় মশাই। আমি এভার হট। আমার কোন হাঁচি টাচি হয় নি।” অহনা ইঙ্গিতপূর্ণ হাসে। কিন্তু তা রূপেশকে তাতাতে পারে না। সাথীর এলার্জী ছিল। রোজ সকাল সন্ধ্যে পরপর দশ বারোবার হেঁচেই যেত। খুব বিরক্ত লাগত রূপেশের যদিও বুঝতে দিত না। রূপেশ একটা ঘুমের ওষুধ খেয়ে শুলো। সে জানে ঘুম আজ তার আসবে না। আগামী কাল বাড়ির কাগজপত্র দেখে জিতুর সাথে বাড়ির ব্যাপারটা ফাইনাল হবে। হলেই তারা পরশু চলে যাবে এখান থেকে।
পরেরদিন বেশ বেলায় ঘুম থেকে উঠল ওরা।রূপেশের মনের ভয় সকালের সোনারোদে ফিকে হয়ে আসে। ও বাথরুমের দিকে পা বাড়ায়। আর তখনই শুনতে পায় বন্ধ রান্নাঘরে কে পরপর চারবার হাঁচল। সকালের রোদটা কেমন ম্যাড়মেড়ে হয়ে গেল রূপেশের কাছে। অহনা ঘুম থেকে উঠে বলল-“কি মি:কোল্ড। আমাকে তো খুব ঠান্ডা লাগার কথা বলা হচ্ছিল। আর নিজেই ঠান্ডা লাগিয়ে হাঁচছ।” অহনাও তবে হাঁচির শব্দ শুনেছে। রূপেশ যেটাকে ভুল শুনেছে,মনের কল্পনা ভেবে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করছিল সেটা আর পারল না। আজও ওরা সারাদিন বাইরে বাইরে কাটাবে ঠিক করল। রূপেশ বাড়িতে থাকতেই চাইছে না। আজই সব ফাইনাল হয়ে যাবে। আজ রাতটুকু থেকে কালই ওরা চলে যাবে এখান থেকে।

(৯)
আর আমার হাতে সময় নেই রূপেশের মুখোমুখি হবার।ওকে যে অনেকগুলো প্রশ্ন করার আছে আমার।অনেক কিছু জানার আছে।হ্যাঁ, আজই আজই ওর মুখোমুখি হব আমি।

(১০)
রাতে ফিরে ওরা আজ বেশ কয়েক পেগ খেল।জিতু জানিয়েছে বাড়িটা ও নেবে। রূপেশ মনে মনে ভাবছে-“ব্যাস শুধু আজকে রাতটুকু।”রূপেশ আজও ঘুমের অষুধ খেল।একটা সাউন্ড স্লিপ চাই। ঘুমিয়েও গিয়েছিল। কিন্তু ঘুমের মধ্যেও একটা ফিসফিস শব্দ কানের কাছে। রূপেশ চোখ খোলে।মুখের উপর ঝুঁকে আছে একটা বীভৎস পোড়া মুখ। সে ক্রমাগত বলে চলেছে-“কেন গো কেন…কেন করলে গো এমন?কেন করলে বল….”
মর্মান্তিক আর্ত চিৎকারে কেঁপে ওঠে বাড়িটা। পাশের ঘর থেকে জিতু, অহনা আসতে গিয়ে দেখে পুরানো দিনের দরজা চেপে আটকে গেছে।অনেক টানা টানি করে দুজন দুজনের ঘর থেকে ছুটে এসে দেখে বিস্ফারিত চোখে রূপেশ হাঁফরের মত হাঁফাচ্ছে।অহনা বলতে থাকে-“কি হয়েছে রূপ…বল কি হয়েছে…”রূপেশ তখনো দেখতে পাচ্ছে দরজার পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে আধপোড়া জয়পুরী লাল হলুদ শাড়ীতে সাথী…পোড়া গলা একটা মুখ।রূপেশ জ্ঞান হারায়।
কেঁদে ফেলে অহনা। বাচ্চুদাকে খবর দেয় জিতু।ডাক্তার ডাকার জন্য।

বাচ্চুদা ডাক্তারকে খবর দেন। ড:বিশ্বনাথ এসে দেখে ইমিডিয়েট হসপিটালে ভর্তি করতে বলেন।হাসপাতালের বেডে শুয়ে এখন রূপেশ, ছায়াছবির মত চোখের সামনে সরে যাচ্ছে ছবিগুলো। সেদিনও সাথীর নাক বন্ধ ছিল। হেঁচে চলেছিল ও। তবু রূপেশের জন্য সাথী টিফিন করছিল ও।।সাথী বাথরুমে গেল।রূপেশ রান্নাঘরে ঢুকে গ্যাসের নলটা খুলে দিল।নাক বন্ধ সাথী গন্ধ পাবে না। রূপেশ বলল -“আমি সিগারেট কিনে এসে টিফিন করব।”সাথী বলল-“একেবারেই খেয়ে বেরিয়ো। ” রূপেশ বলল-“না, আমি কিনে আসছি।” রূপেশ সিগেরেট কিনল। অনেকক্ষণ পেপারের ফ্রণ্টপেজটা মেলে অপেক্ষা করল।ইচ্ছে করে খুব অল্প অল্প মশলা কিনল।যাতে দোকানীর দিতে সময় লাগে।তারপর যখন বাড়ির কম্পাউন্ডে ঢুকল তখনই দেখল তার বাইরে থেকে হ্যাসবল লাগিয়ে দিয়ে যাওয়া দরজার তলা দিয়ে গলগল করে বেরিয়ে আসছে ধোঁয়া।দরজা খুলে ও দেখে আকাঙ্ক্ষিত বীভৎস দৃশ্য। জ্বলছে সাথী।মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। তারপর টালিগঞ্জের হাসপাতালে দুদিন মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করে সাথী মারা যায়। কিন্তু মরেও যে পিছু ছাড়ছে না সাথী।অবশ আচ্ছন্ন চোখ মেলে রূপেশ। দেখে পায়ের কাছের টুলে বসে আছে সাথী,পোড়া ঝলসানো গাল, সেই খয়েরী হলুদ জয়পুরী আধপোড়া শাড়ী…বিড় বিড় করে বলে চলেছে-কেন কেন বল….আতংকে চিৎকার করে ওঠে রূপেশ-“হ্যাঁ হ্যাঁ মেরেছি আমি…আমিই মেরেছি।টাকার জন্য মেরেছি তোমাকে….

(১১)
সেদিন আলোচনার পরই আনুপিসিরা ঠিক করেছিল ভয় দেখিয়েই স্বীকারোক্তি আদায় করতে হবে। তাই মিতুকে সাথী সাজানো হয়।ওর পোড়া গালটা ওর বেনিফিট ছিল। মিতুকে খুব অভিনয়ও করতে হয় না। সে তার নিজস্ব সমস্যা থেকেই নিজে ভিতরে ভিতরে সাথী হয়ে ওঠে।অমিতকাকু আনুপিসির কথা মত দলিল দেবার নাম করে রূপেশকে ডাকেন। মুখে হাসি টেনে কথা বলেন। তারপর সরবতে অষুধ মিশিয়ে অসুস্থ করে ফেলে তাকে নিয়ে যান বিশ্বনাথ মেসোর শেখানো পড়ানো এক ডাক্তারের কাছে।সে ডাক্তার আপাদমস্তক পরীক্ষা করে বলেন সব ঠিক থাকলেও হার্টে সমস্যা আছে।এলকোহলিক ফ্যাটের জন্য এমনিতেই রূপেশে সিঁড়ি ভাঙলে বা ভারী কাজ করলে হাঁফ ধরে। তাই এই হার্টের রোগের মিথ্যেটা অবিশ্বাস করল না রূপেশ। এর পর সাথীর বাড়ি যাবার পর থেকে নাকে নস্যি দিয়ে হাঁচি, রুমফ্রেশনারে রজনীগন্ধার গন্ধ,জলে মগের কারসাজি, ছবি সরানো সব করেছে মিতু।আর কিছুদিন সময় পেলে রূপেশকে দিয়ে স্বীকার করিয়ে নেওয়াই যেত। কিন্তু মিতু যখন জানল ওরা পরেরদিনেই চলে যাবে, ও মরিয়া হয়ে ওঠে। বিশ্বনাথ মেসোর সাহায্যে আনুপিসিকে না বলে রূপেশের ঘুমের অষুধের বদলে তন্দ্রা সৃষ্টিকারী অষুধ রেখে আসে মিতু। বাধ্য হয়েই তাড়াহুড়ো করে সামনে আসে। বাচ্চুদাও প্রচুর সাহায্য করেছিল মিতুকে। বন্ধ রান্নাঘরের ডুব্লিকেট চাবি ওই জোগাড় করে দিয়েছিল।
রূপেশ এখন পুলিশ হেফাজতে। মনে মনে শান্তি পেয়েছে মিতু। কিন্তু এভাবে ওষুধ পালটে আইন নিজের হাতে নেওয়ায় আনুপিসি খুব রেগে গেছে।মিতু ধীর পায়ে বারন্দায় আসে।আনুপিসির কোলে মুখ গুঁজে দেয়।বলে-“কি করব বল। ওরা আমাদের বার বার পুড়িয়ে যাবে আর আমরা সহ্য করে যাব? আমি যে পারি না পিসি…”মিতুর গলা ভিজে ওঠে। আনুপিসি ওর মাথায় হাত রাখেন।

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধ“অধার্মিক”- অনিন্দিতা সেনের কবিতা
পরবর্তী নিবন্ধ“মেহেদি ফুল” বৃক্ষকথা -তাহমিনা শিখা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে