ইসলামে ধর্ষণের শাস্তি- মাওলানা মুফতি মো: ওমর ফারুক

0
37

ইসলামে ধর্ষণের শাস্তি- মাওলানা মুফতি মো: ওমর ফারুক

ইসলামি আইন শাস্ত্রে ধর্ষকের শাস্তি ব্যভিচারকারীর শাস্তির অনুরূপ। তবে অনেক আলেমগণ ধর্ষণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কিছু শাস্তির কথা উল্লেখ করেছেন। ব্যভিচার সুস্পষ্ট হারাম কবিরা গুনা এবং শিরক ও হত্যার পর বৃহত্তম অপরাধ। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন তোমরা  ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ। সূরা আল ইসরাঃ৩২ ইমাম কুরতুবী(রহ.) বলেন ওলামায়ে কেরাম বলেছেন তোমরা ব্যভিচার করো না-এবং ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। এটা অনেক বেশি কঠোর বাক্য।  এর অর্থ যেসব বিষয় ব্যভিচারে ভূমিকা রাখে সেগুলোও হারাম।

হাদিস দ্বারা ধর্ষণের শাস্তির বিষয়টি নিশ্চিত হয়। যেমন- ১।হযরত ওয়াইল ইবনে হোজর (রা.) বর্ণনা করেন হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে এক মহিলাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হলে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে কোনোরূপ শাস্তি দেননি বরং ধর্ষককে হদের শাস্তি দেন। ইবনে মাজাহঃ২৫৯৮ ২। সরকারি মালিকানাধীন এক গোলাম গণিমতের পঞ্চমাংশে পাওয়া এক দাসির সঙ্গে জবরদস্তি করে ব্যভিচার (ধর্ষণ) করে। এতে তার কুমারিত্ব নষ্ট হয়ে যায়। হজরত ওমর (রা.) ঐগোলামকে বেত্রাঘাত  করেন এবং নির্বাসন দেন। কিন্তু দাসিটিকে সে বাধ্য করেছিল বলে তাকে বেত্রাঘাত  করেননি।  –সহী  বুখারীঃ ৬৯৪৯

ব্যভিচারের শাস্তি ইসলামে ব্যভিচারের শাস্তি ব্যক্তিভেদে একটু ভিন্ন। ব্যভিচারী যদি বিবাহিত হয়, তাহলে তাকে প্রকাশ্যে পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে। আর যদি অবিবাহিত হয়, তাহলে তাকে প্রকাশ্যে একশ বেত্রাঘাত করা  হবে। নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য একই শাস্তি। কোরআনে এরশাদ হয়েছে ব্যভিচারিণী নারী ব্যভিচারী পুরুষ, তাদের প্রত্যেককে একশ’ করে বেত্রাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকর করার কারণে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়। যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাকো। মুসলমানদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করবে।

সূরা নূরঃ ২ হাদিসে এরশাদ হয়েছে,অবিবাহিত পুরুষ-নারীর ক্ষেত্রে শাস্তি একশ’ বেত্রাঘাত এবং এক বছরের জন্য দেশান্তর। আর বিবাহিত পুরুষ-নারীর ক্ষেত্রে একশ’ বেত্রাঘাত ও রজম (পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ড)। সহী মুসলীম এই হাদিসের আলোকে অন্য মাজহাবের ইসলামী স্কলাররা বলেছেন ব্যভিচারী অবিবাহিত হলে তার শাস্তি দুইটা । (১) একশ বেত্রাঘাত (২)এক বছরের জন্য দেশান্তর।   আর হানাফী মাযহাবের বিশেষজ্ঞগণ বলেন এক্ষেত্রে হদ (শরীয়োত কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তি) হলো- একশ বেত্রাঘাত। আর দেশান্তরের বিষয়টি বিচারকের বিবেচনাধীন। তিনি ব্যক্তি বিশেষে তা প্রয়োগ করতে পারেন। ধর্ষণের শাস্তি বল প্রয়োগে যে ব্যভিচার সংঘঠিত হয় তাই ধর্ষণ। এক্ষেত্রে যে বল প্রয়োগ করে ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্ষণ করবে তার শাস্তি হবে।

আর যে বল প্রয়োগের শিকার হবে তার কোনো শাস্তি হবে না। তবে ধর্ষকের শাস্তি প্রয়োগে একাধিক মত রয়েছে। যা তুলে ধরা হলো- >> ইমাম আবু হানিফা, শাফেঈ ও আহমদ ইবনে হাম্বাল রাহমাতুল্লাহি আলাইহিম-এর মত হলো- ‘ধর্ষণের জন্য ব্যভিচারের শাস্তি প্রযোজ্য হবে।’ অর্থাৎ ধর্ষক অবিবাহিত হলে ১০০ বেত্রাঘাত আর বিবাহিত হলে পাথর মেরে মৃত্যু নিশ্চিত করা। >> ইমাম মালেক রহমাতুল্লাহি আলাইহির মত- ‘ধর্ষণের অপরাধে ব্যভিচারের শাস্তি প্রয়োগের পাশাপাশি ‘মুহারাবা’র শাস্তিও প্রয়োগ করতে হবে। মুহারাবা কি? ‘মুহারাবা’ হলো অস্ত্র দেখিয়ে বা অস্ত্র ছাড়াই ভীতি প্রদর্শন করে ডাকাতি করা কিংবা লুণ্ঠন করা। এক কথায় ‘মুহারাবা’ হলো পৃথিবীতে অনাচার সৃষ্টি, লুণ্ঠন, নিরাপত্তা বিঘ্নিতকরণ, ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা ইত্যাদি।

এ সব অপরাধের শাস্তি হিসেবে আল্লাহ ঘোষণা করেন- ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সাথে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে এই যে- >> তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা >> শূলীতে চড়ানো হবে অথবা >> তাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে (ডান হাত বাম পা/বাম হাত ডান পা) কেটে দেয়া হবে অথবা >> দেশ থেকে বহিষ্কার তথা নির্বাসিত করা হবে। এটি হল তাদের জন্য দুনিয়ার লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শাস্তি।’ (সুরা মায়িদা : আয়াত ৩৩) এ আয়াতের আলোকে বিচারক ধর্ষণকারীকে ব্যভিচারের শাস্তির সঙ্গে সঙ্গে উল্লেখিত ৪ ধরনের যে কোনো শাস্তি প্রয়োগ করতে পারবে।

কেননা ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য ধর্ষণ হলো আল্লাহ ও তার রাসুলের নিয়ম-নীতি বিরুদ্ধ অপরাধ। আর তা তাদের সঙ্গে যুদ্ধে উপনীত হওয়ার শামিল। তাছাড়া ধর্ষণের ক্ষেত্রে বল প্রয়োগ করা হয়। ইসলামের বিধান লঙ্ঘনে বল প্রয়োগ করলেও এ শাস্তি প্রযোজ্য হবে। তাই সমাজে যখন ধর্ষণ মহামারী আকার ধারণ করে তখন সমাজ থেকে ধর্ষণ সমূলে উৎপাটন করতে (মুহারাবার) মতো ভয়াবহ শাস্তি প্রয়োগ করাও জরুরি। আর যদি ধর্ষণ কারণে হত্যাজনিত অপরাধ সংঘটিত হয় কিংবা ধর্ষণের শিকার কোনো মহিলা মৃত্যুবরণ করে তবে ঘাতকের একমাত্র শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। মোটকথা, হাঙ্গামা ও ত্রাস সৃষ্টি করে করা অপরাধের শাস্তি ত্রাস ও হাঙ্গামাহীন অপরাধের শাস্তি থেকে গুরুতর।

বাংলাদেশের আইনে ধর্ষণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে,যদি কোনো পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত ষোল বৎসরের অধিক বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তাহার সম্মতি আদায় করিয়া, অথবা ষোল বৎসরের কম বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন, তাহা হইলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন। ’ ইসলামের সঙ্গে এই সংজ্ঞার তেমন কোনো বিরোধ নেই। তবে এতে কিছু অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। ইসলাম সম্মতি-অসম্মতি উভয় ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বিবাহ বহির্ভূত দৈহিক মিলনকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু এই আইনে কেবল অসম্মতির ক্ষেত্রে তাকে অপরাধ বলা হয়েছে।

সম্মতি ছাড়া বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ইসলাম ও দেশীয় আইন উভয়ের চোখে অপরাধ।   বাংলাদেশের আইনে ধর্ষণের কারণে মৃত্যু না হলে তার মৃত্যুদণ্ড নেই। কেবল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড। পক্ষান্তরে ইসলামে বিবাহিত কেউ ধর্ষণ বা ব্যভিচার করলে তার শাস্তি পাথর মেরে মৃত্যুদণ্ডের কথা বলেছে।   আইনে ধর্ষণের কারণে মৃত্যু হলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আর ইসলামে ধর্ষণের কারণে মৃত্যু হলে সে প্রথমে ব্যভিচারের শাস্তি পাবে। পরে হত্যার শাস্তি পাবে।

হত্যা যদি অস্ত্র দিয়ে হয় তাহলে কেসাস বা মৃত্যুদণ্ড। আর যদি অস্ত্র দিয়ে না হয়, এমন কিছু দিয়ে হয়- যা দিয়ে সাধারণত হত্যা করা যায় না। তাহলে অর্থদণ্ড। যার পরিমাণ একশ’ উটের মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ (প্রায় কোটি টাকা)। ধর্ষণের সঙ্গে যদি আরও কিছু সংশ্লিষ্ট হয়- যেমন ভিডিওধারণ, ওই ভিডিও প্রচার ইত্যাদি; তাহলে আরও শাস্তি যুক্ত হবে।   ইসলামে ধর্ষণ প্রমাণের নীতিমালা ব্যভিচার প্রমাণের জন্য ইসলামে দু’টোর যে কোনোটি জরুরি। ১। চারজন সাক্ষী। ২। ধর্ষকের স্বীকারোক্তি। তবে সাক্ষী না পাওয়া গেলে আধুনিক ডিএনএ টেস্ট, সিসি ক্যামেরা, মোবাইল ভিডিও, ধর্ষিতার বক্তব্য ইত্যাদি অনুযায়ী ধর্ষককে দ্রুত গ্রেফতার করে স্বীকার করার জন্য চাপ দেওয়া হবে। স্বীকারোক্তি পেলে তার ওপর শাস্তি কার্যকর করা হবে।

ইসলামে ধর্ষণ ও ব্যভিচার, সম্মতি-অসম্মতি উভয় ক্ষেত্রেই পুরুষের শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে। তবে নারীর ক্ষেত্রে ধর্ষিতা হলে কোনো শাস্তি নেই, সম্মতিতে হলে শাস্তি আছে। যৌন অপরাধ নির্ণয়ে ইসলাম নির্ধারিত বিভাজনরেখা (বিবাহিত-অবিবাহিত) সর্বোৎকৃষ্ট। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে যতটুকু শাস্তি রয়েছে, তা প্রয়োগে নানাবিধ বিলম্ব আর বিভিন্ন রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক চাপের কারণে ধর্ষণের উপযুক্ত শাস্তি হয় না।  উপরন্তু ধর্ষিতাকে একঘরে করে রাখা হয়, তাকে সমাজে বাঁকা চোখে দেখা হয়। তার পরিবারকে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়। ইসলাম এসব সমর্থন করে না। তবে এসব শাস্তি কেবল রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের অনুমোদনপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রয়োগ করবে, ব্যক্তি পর্যায়ের কেউ এমন শাস্তি প্রয়োগ করতে পারবেনা।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে