উৎসব সংস্কৃতি ও বাংলাদেশ – স্বকৃত নোমান

0
416
Swakrito Noman

উৎসব সংস্কৃতি ও বাংলাদেশ – স্বকৃত নোমান

উৎসব মানুষের জন্য কল্যাণকর। পৃথিবীতে যত ধর্মসম্প্রদায় আছে, সবচেয়ে কম উৎসব মুসলমান ধর্মসম্প্রদায়ের মধ্যে। আর সবচেয়ে বেশি উৎসব সম্ভবত বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে। মুসলমানদের উৎসব প্রধানত দুটি। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। জাতিভেদে আরো উৎসব অবশ্য রয়েছে। যেমন ইরানিদের নওরোজ, বাঙালিদের পয়লা বৈশাখ। অবশ্য বাঙালি মুসলমানের উৎসব আরো আছে। বারো মাসে তেরো পার্বণের দেশ বাংলাদেশ। এটা অবশ্য অতীতের কথা। এখন আর তেরো পার্বণ নেই। অনেকগুলো বিলুপ্ত। কিছু উৎসব এখনো টিকে আছে। বাঙালি মুসলমানের প্রধান উৎসব ঈদ-উৎসবে এসেছে পরিবর্তন। এই উৎসবের ধরন পাল্টেছে। সময়ের সঙ্গে ঈদসংস্কৃতির পরিবর্তন হয়েছে, হচ্ছে। শত বছর আগের যে ঈদসংস্কৃতি, তার সঙ্গে বর্তমানের ঈদসংস্কৃতির অনেক ফারাক। বাঙালি মুসলমান সমাজে গত তিন দশকে ঈদসংস্কৃতির কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। অতীতের ঈদসংস্কৃতি বর্তমানের সঙ্গে মৌলিকভাবে ঠিক থাকলেও আনুষাঙ্গিক বহু কিছুর পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।

উদাহরণ হিসেবে গত শতকের আশির দশকের গ্রামীণ ঈদসংস্কৃতির একটা চিত্র তুলে ধরা যেতে পারে। রমজানের বিশ তারিখ রাতে যখন গ্রামের দু-একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মুসল্লি এতেকাফ আদায়ের লক্ষ্যে দশ দিনের জন্য মসজিদে অন্তরীণ হতো, সেদিন থেকেই ঈদের দূরায়ত হাতছানি দেখতে পেত সবাই। ঈদের আরো নয় কি দশ দিন বাকি থাকলেও একটা চাপা উত্তেজনা দেখা যেত সবার মধ্যে। আসন্ন ঈদের দিনটিকে উদযাপনের জন্য সবার ভেতর দেখা যেত এক ধরনের চাঞ্চল্য, ব্যস্ততা। তারপর শবে কদর বা মহিমান্বিত রাত থেকে সেই ব্যস্ততা তুঙ্গে উঠত। ঈদকে বরণ করে নেওয়ার জন্য সবাই জোর প্রস্তুতি নিতো। হাতে আর মাত্র কয়েকটা দিন, তারপরই ঈদ। শুরু হতো হাট-বাজারে কেনা-বেচার ধুম। গ্রামের দোকানগুলো ভরে উঠত সেমাই-চিনি-নারিকেল-বাদাম-কিসমিস ইত্যাদি জিনিসপত্রে। মা-বাবারা তাদের মেয়ের শ্বশুর বাড়িতে উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দিতো এসব জিনিস, জামাতাকে উপহার দিতো পায়জামা-পাঞ্জাবি-টুপি ইত্যাদি, ছেলেমেয়েদের কিনে দিতো নতুন জামা-কাপড়। ঈদের আগের রাত পর্যন্ত চলত ধুম বেচা-কেনা। শবে কদরের পরদিন থেকে গ্রামের ফকির-মিসকিনরা গেরস্তের বাড়ি বাড়ি ধর্ণা দিতো ফিতরার টাকার আশায়। ছেলেমেয়েরা পাঁচ-দশ টাকা দামের ঈদকার্ড পাঠিয়ে শুভেচ্ছা ও আমন্ত্রণ জানাতো বন্ধুবান্ধবদের। ঈদের আগের দিন বিকেলে মেহেদি পাতা সংগ্রহের ধুম পড়ে যেত। ইফতারির সময় বাবা-মায়ের সঙ্গে বসে ইফতার খাওয়া ফেলে খোলা মাঠে চলে যেত ঈদের নতুন বাঁকা চাঁদ দেখার জন্য। পশ্চিমাকাশে সন্ধ্যাতারার পাশে নখাকৃতির বাঁকা চাঁদ দেখা গেলে হৈ-হৈ রৈ-রৈ পড়ে যেত দিকে দিকে। পড়ে যেত মেহেদি বাটার ধুম। গভীর রাত অবধি হাতে আর নখে নানা আল্পনায় মেহেদি লাগাত ছেলেমেয়েরা।

ঈদের দিন ভোরে গোসল করত সবাই। গ্রীষ্মকাল হলে তো কথা নেই, পৌষ-মাঘ মাসের কড়া শীত হলেও গ্রামের পুকুরঘাটে তিলঠাঁই জায়গা থাকত না। কসকো কোম্পানির সুগন্ধী সাবান, নতুন লুঙ্গি আর গামছা নিয়ে সবাই ঘাটে হাজির হতো। পুকুরের পানি ঘোলা হয়ে উঠত অসংখ্য মানুষের গোসলের কারণে। কারো মুখে বিষাদের এতটুকু ছাপ নেই, সবাই প্রাণখোলা হাসিখুশি। বিষণ্ণ বুড়োদের ঠোঁটের কোণেও ঝুলত হাসির রেখা। গোসল করে বাড়ি ফিরে নতুন কিংবা ধুয়ে ইস্ত্রি করে রাখা পুরনো জামা-কাপড় গায়ে দেওয়ার পালা। ঈদ উপলক্ষ্যে গ্রামের দোকান থেকে কেনা দুই কি পাঁচ টাকা দামের সুগন্ধী আতর পাঞ্জাবি-পায়জামায় লাগাত সবাই। তারপর নকশাদার জায়নামায কি নলখাগড়ার তৈরি পাটিটা বগলদাবা করে ঈদগাহের দিকে রওনা হতো।

ঈদের আনন্দটা বড়দের চাইতে ছোটদেরই ছিল বেশি। ঈদগাহে গিয়ে নামাজ পড়ার চাইতে তারা বেশি ব্যস্ত থাকত বাঁশি, বেলুন ইত্যাদি খেলনা নিয়ে। গ্রামের দোকানিরা ঈদের দিন দোকানের বাইরে চাটাই বিছিয়ে নানা খেলনা সামগ্রী নিয়ে বসতো। সেসব খেলনার মধ্যে অন্যতম ছিল বিশেষভাবে তৈরি বাঁশের বাঁশি। এই বাঁশির পেছনের দিকটা রাজা কনডমের ভেতর ঢুকিয়ে সুতা দিয়ে ভালো করে বেঁধে নিতে হতো। তারপর ফুঁ দিয়ে কনডমটাকে ফুলিয়ে লাউ কি কুমড়ার মতো করে বহিরাংশের ছিদ্রটি ছেড়ে দিলে শুরু হতো ইস্টিমারের সাইরেনের মতো ভোঁ-ওঁয়া ভোঁ-ওঁয়া শব্দ। শিশু-কিশোরদের কাছে ঈদের দিনে এই বিশেষ খেলনাটি ছিল খুবই জনপ্রিয়। খেলনার মধ্যে আরো ছিল রেপারি বাঁশি, প্লাস্টিকের তৈরি প্রাইভেট কার। কারটির সামনের সরু ছিদ্রটাতে মোটা একটা সুতা বেঁধে টেনে টেনে চালাতে হতো। অনেকটা দুধের স্বাধ ঘোলে মেটানোর মতো। আর লাটিম তো ছিল ব্যাপক জনপ্রিয় খেলনা। পুরনোটা ফেলে দিয়ে ঈদের দিন কেনা হতো নতুন লাটিম।

ঈদগাহে নামাজ শেষে শুরু হতো পারস্পরিক কোলাকুলি। তারপর মুসল্লিরা দল বেঁধে চলে যেত গ্রামের গোরস্তানে। মৃত আত্মীয়-স্বজনদের রুহের মাগফেরাত কামনায় কবরের সামনে সার বেঁধে পশ্চিমুখী দাঁড়িয়ে মোনাজাত করত। মোনাজাত শেষে আবার শুরু হতো কোলাকুলি। এরপর দলে দলে ভাগ হয়ে আত্মীয়-স্বজনদের বাড়ি বাড়ি সেমাই খেতে যেত। সেমাই বলতে তখন গ্রামের মানুষদের ভাষায় ‘বাংলা সেমাই’ বা ‘আলবা সেমাই’ ছিল প্রধান। চিনি-নারিকেল-বাদাম-কিসমিস ও দুধসহযোগে রান্না হতো এ সেমাই। চিনামাটির ছোট ছোট পিরিচে পরিবেশন করা হতো অতিথিদের। ছোটরা বড়দের পা ছুঁয়ে সালাম করে শ্রদ্ধা জানাতো। খুশি হয়ে বড়রা দু-চার টাকা বকশিশ না দিয়ে পারত না। ঈদের দিন বিকেলবেলা কারো হাতে কোনো কাজ থাকত না। পার্থিব যাবতীয় কর্মযজ্ঞ থেকে আজ একেবারেই মুক্ত। কেবলই অখণ্ড অবসরতা। গ্রামের চা দোকানে ব্যাটারি-চালিত টেলিভিশনে ঈদের সিনেমা দেখার ভিড় লেগে যেত। যাদের বাড়িতে ক্যাসেট প্লেয়ার থাকত তারা চড়া শব্দে গান বাজাতো। কিশোররা গ্রামের নির্জন রাস্তাঘাটে পয়সা, মার্বেল আর গুটি খেলায় মেতে উঠতো। মেয়েরা নতুন জামা-কাপড় পরে ঘুরে বেড়াত গোটা গ্রাম। রাতের প্রথম প্রহর পর্যন্ত লেগে থাকত এসব আনন্দ।

ঈদের পরদিন শুরু হতো অন্য আয়োজন। তরুণ-যুবকরা দলবেঁধে চলে যেত শহরে। ঈদ উপলক্ষ্যে রাজ্জাক-ববিতা বা ইলিয়াস কাঞ্চন-চম্পার নতুন মারদাঙ্গা কি বিরহকাতর ছবি মুক্তি পেত। রেডিওতে গাজী মাজহারুল আনোয়ার কি নাজমুল হোসাইনের ভরাট কণ্ঠে সেই ছবির বিজ্ঞাপন শুনতে শুনতে ছবিটি দেখার জন্য তীব্র আগ্রহ তৈরি হতো তাদের মধ্যে। তাই দল বেঁধে সবাই শহরের সিনেমা হলে সেটি দেখতে যেত। সিনেমা দেখা শেষে চলে যেত দূর-দূরান্তের আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে। মামা-মামি, খালা-খালু, ফুফা-ফুফিদের সঙ্গে দেখা না করলে তো ঈদ আনন্দ অপূর্ণই থেকে যায়।

এবার আসা যাক সমকালীন ঈদসংস্কৃতি প্রসঙ্গে। ঈদের মৌলিক দিকটা অপরিবর্তিত থাকলেও ঈদ-সংস্কৃতির অনেক কিছুরই পরিবর্তন ঘটেছে। উপরে যেমন ঈদের দিন শিশু-কিশোরদের যেসব খেলনার কথা বলা হলো, বর্তমানে সেসব খেলনার গুণগত মান উন্নত হয়েছে। রাজা কনডমের বদলে এখন এসেছে বড় বড় মজবুত যতসব বাহারি বেলুন। এসেছে ভুভুজেলা। এসেছে ব্যাটারি চালিত নানা খেলনা গাড়ি, প্লাস্টিকের পুতুল, পশু-পাখিসহ কত কি। এখন মেহেদিগাছ থেকে মেহেদি পাতা সংগ্রহ করে কষ্ট করে বেটে হাতে লাগাতে হয় না, বিভিন্ন কোম্পানি এনেছে নানা প্যাকেটজাত মেহেদি। নাগরিক জীবন তো বটেই, গ্রামীণ জীবনেও লেগেছে এই পরিবর্তনের ছোঁয়া। কোনো কোনো প্রত্যন্ত এলাকায় এখনও ঈদকার্ডের প্রচলন আছে বটে, কিন্তু তাতে লেগেছে প্রযুক্তির হাওয়া। এখন নানা ডিজাইনের ঈদকার্ড বাজারে পাওয়া যায়। ঈদকার্ডের মধ্যে বাতিও জ্বলতে দেখা যায়, সুইস অন করলে বেজে ওঠে নানা মিউজিক। এখন ঈদের শুভেচ্ছা পাঠানো হয় মোবাইলে এসএমএস করে, ই-মেইল কিংবা ফেসবুকের ইনবক্সে। বিশই রমজানের পর থেকে হাটে-বাজারে এমনকি নগরে টাঙানো হয় ‘ঈদ-শুভেচ্ছা’ লেখা বড় বড় ব্যানার। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা শহরে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা বড় বড় তোরণ বানায় জনগণকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে।

ঈদসংস্কৃতির পরিবর্তন হয়েছে খাবার-দাবারের ক্ষেত্রেও। গত শতকের শেষের দিকে লাচ্চা সেমাই প্রত্যন্ত গ্রাম অবধি পৌঁছে যায়। আগে এ সেমাই খোলা বিক্রি হতো। এখনো হয়। তবে এখন খোলা লাচ্চা সেমাইর চাইতে বাহারি প্যাকেটজাত আধুনিক লাচ্চা সেমাইর কদর বেশি। লাচ্চা সেমাইয়ের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে নুডুলস। মাংস বা ডিম দিয়ে রান্না করা এই মুখরোচক খাবারটি সেমাইর সঙ্গে পরিবেশিত হয়। একটু অবস্থাসম্পন্ন গেরস্তরা আরো একধাপ এগিয়ে। তারা সেমাই বা নুডুলস-এর পরিবর্তে মাংসে পাকানো খিঁচুড়ি পরিবেশন করে থাকে। সকাল বেলায় সেমাই খাওয়া হলেও দুপুরে সামর্থ অনুযায়ী মুরগি, গরুর মাংস বা খাসির মাংসের ভোজ চলে। অবস্থাসম্পন্নদের ঘরে তৈরি হয় হালিম, কাবাব, বিরিয়ানি প্রভৃতি মুখরোচক খাবার।

আগে ছেলেমেয়েরা বড়দের পা ছুঁয়ে সালাম করত। এখন সালাফি-ওয়াহাবি মৌলবি-মাওলানারা মনে করে এভাবে সালাম করা হারাম। কারণ তাতে মাথা নোয়াতে হয়। আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে মাথা নোয়ানো শিরিক। আবার সহজিয়া বাঙালি মুসলমানরা মনে করে, এভাবে বড়দের পা ছুঁয়ে সালাম করাতে দোষের কিছু নেই। ছোটরা তো বড়দের আল্লাহ মনে করে পা ছুঁয়ে সালাম করছে না। যেমন মাওলানা গিয়াস উদ্দিন তাহেরি বলেন, ‘মাথা নোয়ালেই যদি শিরিক হয়, তাহলে তো ইরি ক্ষেতে রোয়া লাগানোও শিরিক। কারণ রোয়া লাগাতে গেলেও মাথা নোয়াতে হয়।’ তার মতাদর্শের অন্য আলেমরাও মনে করেন, প্রত্যেক কর্মই নিয়তের উপর নির্ভর করে। সুতরাং পা ধরে সালাম করাতে দোষের কিছু নয়। বাংলাদেশে ওয়াহাবি-সালাফি যেমন আছে, তেমনি আছে বিস্তর উদার ও সহজিয়া মুসলমান।

ঈদসংস্কৃতির পরিবর্তন হয়েছে পোশাক-আশাকের ক্ষেত্রেও। ঈদকে সামনে রেখে নতুন নতুন আদরার কাপড়-চোপড় বাজারে আনার প্রতিযোগিতায় নামে ব্যবসায়ীরা। এখন ঈদ উপলক্ষ্যে জিনসপত্রের দাম বেড়ে যায় দ্বিগুণ। ঈদ এলে অধিকাংশ মানুষ যে যেভাবে পারে অন্যকে ঠকিয়ে দুই পয়সা আদায় করে নেয়ার ধান্দায় থাকে। তিন শ টাকার শাড়ি ছয় শ টাকায়, এক হাজার টাকার জামা দুই হাজারে গিয়ে ঠেকে। বিপণী বিতানে গিয়ে কাপড়-চোপড়ের দাম দেখে নিম্ন মধ্যবিত্তদের মানসিকভাবে ভেঙে পড়া ছাড়া উপায় থাকে না। ঈদ এলে বিক্রেতরা এতই ব্যস্ত থাকে যে, ক্রেতাদের সঙ্গে ভালোমতো কথা বলারও সময় পায় না। তাই কাপড়ের গায়ে দাম লিখে রাখে। দরাদরি করার কোনো সুযোগ নেই। এক দাম। যার ইচ্ছে হয় সে কিনবে। ঈদকে কেন্দ্র করে গণপরিবহনের ভাড়া বেড়ে যায় দ্বিগুণ। পাড়ায়-মহল্লায় চাঁদাবাজিও কম চলে না। রাজধানী ঢাকা শহরে দ্বিগুণ বেড়ে যায় ছিনতাই। যদিও ঈদের তাৎপর্য এসব নয়। নিঃসন্দেহে এসব মানুষের ভেতর থেকে পারস্পরিক সহমর্মিতা বিনষ্টি এবং ধর্মের বিকৃতির ফল। আজকের ঈদসংস্কৃতি অনেকটা প্রতিযোগিতামুখর। সমাজের সর্বস্তরে চলে এই প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতা ব্যাক্তির সঙ্গে ব্যাক্তির, পরিবারের সঙ্গে পরিবারের এমনকি সমাজের গণ্ডি পেরিয়ে রাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত। ছাত্র, শিক্ষক, আমলা, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবিরাও এই প্রতিযোগিতার বাইরে নয়। প্রতিযোগিতার এই দৌড়ে টিকতে গিয়ে অধিকাংশই এখন আর সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় ও ভাল মন্দের বাছ-বিচার করে না।

মিডিয়া জগতেও লক্ষ্য করা যায় এই প্রতিযোগিতা। ঈদসংস্কৃতির পরিবর্তন হয়েছে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে। ঈদকে কেন্দ্র করে টিভি চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত হয় বিশেষ নাটক, টেলিফিল্ম, সিনেমাসহ বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। তাও এক-দুদিন নয়, টানা ছয়-সাত দিন ধরে প্রচারিত হয় এসব বিশেষ অনুষ্ঠান। ঈদের পনেরো দিন আগ থেকে শুরু হয় এসব অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্রচার। কে কত ভালো অনুষ্ঠান বানাতে পারে তা নিয়ে চলে প্রতিযোগিতা। আবার বিজ্ঞাপনদাতারাও নির্মাণ করে ঈদ-কেন্দ্রিক বিশেষ বিজ্ঞাপন। দর্শকরাও এই আয়োজনের সঙ্গে এখন সম্পৃক্ত হয়ে গেছে অনেকটা। সারা বছর যারা টিভি দেখার মতো সময় পায় না, ঈদ এলে তারা প্রাণভরে এসব অনুষ্ঠান উপভোগ করে।

প্রিন্ট মিয়িাতেও এসেছে ঈদসংস্কৃতির ব্যাপক পরিবর্তন। দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকাগুলো প্রকাশ করে ঈদ বিশেষ সংখ্যা। সেসব সংখ্যা তিন শ থেকে ছয় শ পৃষ্টা পর্যন্ত হয়ে থাকে। ছাপা হয় নবীন-প্রবীণ কবি-সাহিত্যিকদের নানা বিষয়ের লেখা, থাকে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নানা বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাদের ক্রেতা-গ্রাহকদের ঈদ শুভেচ্ছা জানানো হয়। এই বিশেষ সংখ্যাটি কার আগে কে বাজারে ছাড়বে, থাকে সেই প্রতিযোগিতাও। হালে প্রিন্ট মিডিয়ায় ঈদ উপলক্ষ্যে প্রকাশিত হয় ফ্যাশন পাতা বা ফ্যাশন ক্যাটালগও। শহরের বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজগুলো তাদের নতুন আদরার কাপড়গুলো জমা দেয় পত্রিকা অফিসে। মডেলদেরকে সেসব পোশাক পরিয়ে ফটোগ্রাফারকে দিয়ে ছবি তোলা হয়, আর সেই ছবি ছাপানো হয় পত্রিকার ফ্যাশন ক্যাটালগে। এ ছাড়া ঈদ উপলক্ষে পত্রিকার বিশেষ রান্না পাতা বা রান্না সংখ্যাও প্রকাশিত হচ্ছে বেশ ক’বছর ধরে। রন্ধনশিল্পীরা ঈদের বিভিন্ন রেসিপি দিয়ে থাকে এসব সংখ্যায়। ঈদ বিশেষ সংখ্যা ছাড়াও ঈদের ছুটির আগে দৈনিক পত্রিকাগুলো প্রকাশ করে পত্রিকার বর্ধিত পাতা। সেখানেও থাকে যথারীতি গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি। তাহলে দেখা যাচ্ছে, বিশ বছর আগের ঈদসংস্কৃতির সঙ্গে আজকের ঈদসংস্কৃতির অনেক ফারাক। ভবিষ্যতে যে এই ঈদসংস্কৃতির আরো পরিবর্তন ঘটবে, তাতে সন্দেহ নেই।

অবশ্য এ বছরের ঈদ-উৎসবের কথা আলাদা। করোনা দুর্যোগের মধ্যে এবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মুসলমানদের সর্বপ্রধান উৎসব ঈদুল ফিতর। এমন বিষণ্ণ উৎসবের মুখোমুখি স্মরণকালে হয়নি মুসলমান ধর্মসম্প্রদায়। সবার কল্যাণ হোক। ঈদ-উৎসব সবার জন্য কল্যাণ বয়ে আনুক।

স্বকৃত নোমান
২৪.০৫.২০২০

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধঅশ্বখুর – কবি জুনান নাশিত এর কবিতা
পরবর্তী নিবন্ধউৎসব সংস্কৃতি ও বাংলাদেশ – স্বকৃত নোমান

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে