একজন সামিন ও বুলিং

0
11
nATORE KANTHO

সাফিয়া খন্দকার রেখা : সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের মতে, বুলিং হলো অপ্রত্যাশিত এবং আক্রমণাত্মক আচরণ, যা স্কুলে যাওয়া বাচ্চাদের মধ্যে সাধারণত দেখা যায়।

এই আচরণ আক্রান্ত শিশু বা কিশোরের ওপর ক্রমাগত চলতে থাকে। তবে এ আচরণ সাধারণত স্কুলে যাওয়া শিশু-কিশোরদের মধ্যে দেখা গেলেও যেকোনো বয়সের ব্যক্তির মধ্যেও দেখা যেতে পারে।

গত কয়েকদিন বিষয়টি হৃদয়কে এতোটাই রক্তাক্ত করেছে যা বলতে চাই বলতে পারছিলাম না, তোমার কষ্ট আমরা কেউ বুঝতে পারিনি তাই এনোরেক্সিয়ার মতো মারাত্মক এক রোগে তুমি আক্রান্ত হয়ে গেলে শেষ পর্যন্ত তোমাকে আমরা হারিয়ে ফেললাম গত ২৬শে জুন, রাত এগারোটায় ইউনাইটেড হাসপাতালে।

সামিন আইডিয়াল স্কুল, বনশ্রী শাখায় পড়তো। সে ছোট বেলা থেকেই অত্যন্ত অমায়িক আর ভীষণ অনুভূতি প্রবণ আন্তরিক ছেলে। কাউকে কষ্ট দেওয়ার কথা সে ভাবতেই পারতো না

অথচ, তার এই স্বভাবই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল। স্কুলে তাকে অনেক বুলিং এর শিকার হতে হয়েছে সে বরাবর নাদুসনুদুস সুদর্শন দেখতে ছিল। প্রমিত ভাষায় বাংলা বলতো। পড়াশোনায় ভালো ছিল।

আর যায় কোথায়! সহপাঠীদের বুলিং এর টার্গেটে পরিণত হল এই নিরীহ, নরম সরম সামিন। কাউকেই সে প্রতিবাদ করে কিছু বলতে পারতো না স্কুলের শিক্ষিকা পর্যন্ত উপহাস করতে ছাড়েননি।

একবার ক্লাসে ফুটবল টিম গঠনের জন্য ছাত্রদের আহবান করা হল সামিনও নাম দিতে গেল শিক্ষিকা এমনভাবে তাকে অপমান করলেন পুরো ক্লাসের ছাত্ররা হো হো করে হেসে উঠলো। তিনি একবারও ভেবে দেখলেন না, কচি মনের ছেলেটা কতটা লজ্জায় কুঁকড়ে গেল।

মা’কে সে বলেছিল তার মরে যেতে ইচ্ছে করছে। তাই প্রায়ই সে স্কুলে অনিয়মিত হয়ে গেল। এক পর্যায়ে সে ওজন কমাবার জন্য হন্যে হয়ে উঠে পড়ে লাগলো। ইন্টারনেট ঘাটাঘাটি করে কিটো ডায়েট করা শুরু করে দিল।

অতি অল্প সময়ে ৪০ কেজি ওজনে নেমে এল। ততদিনে তার eating disorder শুরু হয়ে গেছে। সারাক্ষণ ভয়ে থাকে তার ওজন বেড়ে যাবে। জোর করে খেলে তার বমি হয়ে যায়। অনেক ডাক্তার দেখানো হলো। ডায়াগনোসিস হলো anorexia nervosa – এক অদ্ভুত রোগ। আমাদের দেশের জন্য বিরল রোগ।

বাবা মায়ের পাগল পারা অবস্থা। কেউ বললো ভারতের বেঙ্গলোরে চিকিৎসা আছে। হায়! ভারতে যাওয়ার উপায় নাই। লক ডাউন চলছে, সেখানে চলছে মৃত্যুর মিছিল। এখানেই চিকিৎসা চলছিলো।কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো না। সামিন সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেল।

এবার আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলি…আমার ছেলে লালন স্কুল জীবনে বুলিং এর স্বীকার হয়েছিল এবং সেটি সহপাঠীদের থেকে নয় সহপাঠীদের মায়েদের কছে।
লালন প্রিম্যাচ্যুরিট বাচ্চা ছিলো সাত মাসে সে জন্মেছিলো,

শিশু বয়সে তার শরীরে প্রচুর এন্টিবায়োটিক ঔষধের ব্যবহার এর ফলে সে শারীরিক ভাবে গ্রোথ অর্থাৎ হরমোন ব্যালেন্স করার জন্য উচ্চতা এবং নাদুস নুদুস টাইপ শিশুতে পরিণত হয়। সে যখন স্কুলে ভর্তি হয় বয়সে ক্লাসে সবার জুনিয়র হয়েও সে উচ্চতায় সবার চেয়ে বেশি ছিলো।

লালন ছবি আঁকা, গান, আবৃত্তি এবং সুন্দর হাতের লেখা প্রতিযোগিতায় একসঙ্গে যখন চারটি শাখায় প্রথম হয় তখন সে অভিভাবকদের এতোটাই বুলিং এর স্বীকার হয়েছিল যে পরবর্তী বছর সে স্কুলের কোন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চায়নি।

অভিভাবকরা ওকে শুনিয়ে বলতো ” বুড়ো ছেলেকে স্কুলে দিয়েছে ম্যাচুরিটি বেশি তাই ক্লাসে প্রথম হয় আবার সংস্কৃতির সব শাখায় প্রথম হয়” আমি চাকরিজীবী মা স্কুলে বসে থাকতে পারতাম না।

ছেলের মুখে এসব শুনে আমি ওর সাথে কাউন্সিলিং করতাম, ওকে বোঝাতাম, আমি ওকে বুঝিয়ে সফল হয়েছি আমার ছেলে পরবর্তীতে এসব বুলিং কেয়ার করার জন্য যে মানুষিক শক্তির প্রয়োজন তা তৈরি করতে পেরেছিলো।

মা বাবা আপনি আপনার সন্তানের বন্ধু, শিক্ষক, ডাক্তার সবকিছু , সন্তানকে এ সমাজের খারাপ দিকগুলোকে মোকাবেলা করার জন্য মানুষিক ভাবে শক্তিশালী করে তৈরী করুন। একজন সামিন মরে গিয়ে প্রমাণ করে গেছে আমরা ভালোবাসতে জানিনা।

সাফিয়া খন্দকার রেখা
লেখক ও সংস্কৃতি কর্মী
মিরপুর, ঢাকা
১০.০৭.২০২১

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে