জোসেফ ক্যাম্পবেল বললেন -স্বকৃত নোমান

0
453
নোমান এনকে

জোসেফ ক্যাম্পবেল বললেন
-স্বকৃত নোমান

প্রকৃতির কী নিপুণ সৃষ্টি মানুষ! শুধু মানুষ কেন, প্রকৃতির প্রতিটি সন্তানই নিপুণভাবে সৃষ্ট। এই যে মানবশরীর, এই শরীরের কোথাও একটা বাড়তি অঙ্গ নেই। সবই প্রয়োজনীয়। প্রয়োজনীয় অঙ্গের মধ্যে বাড়তি একটা ফোস্কা উঠলেই বিপত্তি। মাস ছয় আগে আমার মাথায় একটা আঁচিল উঠেছিল। বাড়তি এই একটুখানি মাংস খুবই বিরক্ত করছিল। শ্যাম্পু করার সময় হাতে লাগে, চুল আঁচড়ানোর সময় হাতে লাগে; মাঝেমধ্যে ব্যাথাও করে। তার উৎপীড়নটা ছিল নিদারুণ বিরক্তিকর। বিএসএমএমইউ’র অধ্যাপক কবি সাইফুল ভুঁইয়াকে বলালাম এই বিরক্তির কথা। তিনি বললেন, হাসপাতালে আসুন, ফেলে দেব। জানতে চাইলাম, কীভাবে? বললেন, সার্জারির মাধ্যমে কেটে ফেলব। বললাম, ছোট্ট একটা আঁচিলের জন্য রক্তপাতে আমি রাজি না। থাক ওটা। তিনি বললেন, তাহলে লেজারের সাহায্যে ফেলে দেব, আপনি টেরই পাবেন না। আমার খানিকটা ভয় লাগল। ক্যান্সার রোগীদের এই ধরনের রেডিয়েশন বা রস্মির মাধ্যমে থেরাপি দেয়া হয়। থাক বাবা, মশা মারতে কামান দাগানোর দরকার নেই।

আঁচিলটার উৎপীড়ন থামে না। হাতটা কেবলই আঁচিলটার ওপর চলে যায়। কী করি এই ভাইরাসটাকে নিয়ে? কবি চঞ্চল আশরাফ একদিন পরামর্শ দিলেন, এক কাজ করো, তুমি ওটাতে ভিনেগার লাগাও। চেইনশপগুলোতে অ্যাপল ভিনেগার পাওয়া যায়। এক বোতল কিনে লাগাতে শুরু করো। তাঁর কথামতো ছয় শ টাকায় এক বোতল ভিনেগার কিনে লাগাতে শুরু করলাম। লাগাচ্ছি তো লাগাচ্ছিই, কিন্তু মরার আঁচিল যায় না। টানা তিন মাস লাগালাম, সে যায় না। খুঁটি গেঁড়ে বসেছে তো বসেছেই। যাবে না বলে যেন পণ করেছে। বিরক্ত হয়ে ভিনেগার দেওয়াও বন্ধ করে দিলাম।

বহু বছর পর গত মাসে গ্রামের বাড়ি বিলোনিয়ায় গেলাম। ‘ভাটিয়াল’ সম্পাদক আলমগীর মাসুদ সন্ধান দিল এক লোকচিকিৎসকের। নাম তাঁর বজল মিয়া। আমরা বলি বজলকাকা। আঁচিলের চিকিৎসা দেন। ওই ওষুধ তিনি স্বপ্নযোগে পেয়েছেন। শুনে আমি হাসলাম। চিকিৎসা-বিজ্ঞানের এই উৎকর্ষের যুগে মানুষ কিনা স্বপ্নযোগেও ওষুধ পায়! মানুষ এখনো এসব বিশ্বাস করে! যতসব কুসংস্কার! কিন্তু তখন আমার মনে পড়ে গেল লোকমান হাকিমের কথা। গাছগাছড়ার ভাষা বুঝতেন তিনি। গাছগাছড়া লতাপাতা দিয়ে তিনি রোগের চিকিৎসা দিতেন। আর মনে পড়ল জোসেফ ক্যাম্পবেলের ‘পাওয়ার অব মিথ’-এর কথা। ক্যাম্পবেল যেন কানে কানে বললেন, যা তুমি কুসংস্কার ভাবছ, তা সত্যি কুসংস্কার কিনা একবার পরীক্ষা করেই দেখো না কেন। সঙ্গে সঙ্গে মাসুদকে বললাম, ঠিক আছে, তুমি বজলকাকার সাথে যোগাযোগ কর, আমি তাঁর চিকিৎসা নেব।

এক সন্ধ্যায় গ্রামের এক চা-দোকানে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছি। বজলকাকা এলেন। এক শ টাকার একটা নোট বাড়িয়ে ধরলাম তাঁর দিকে। তিনি বললেন, এত টাকা কেন? বললাম, রাখুন না, আপনি কষ্ট করে চিকিৎসা দেবেন, টাকা নেবেন না? বললেন, না, টাকা নিলে আমার চিকিৎসায় কাজ হবে না। এই চিকিৎসা দিতে হয় ফ্রি। তুমি বরং পাঁচটা টাকা দাও। একটা কলা কিনবো। আমি তাঁকে পাঁচ টাকা দিলাম। কতক্ষণ পর একটা চাপাকলা নিয়ে তিনি ফিরলেন। চাপাকলায় আঁচিল সারবে? আমি গোপনে হাসলাম। তিনি বললেন, কলার ভেতরে ওষুধ আছে। জানতে চাইলাম, কী ওষুধ? জানালেন, কোনো কোনো আমপাতা জট বেঁধে যায়। ওই পাতাগুলোর মধ্যে ছোট ছোট গোটা হয়। কলাটা ছিদ্র করে কয়েকটা গোটা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটাই ওষুধ।

বজলকাকা বললেন, এক নিশ্বাসে কলাটা সাতবার আঁচিলটার ওপর বুলিয়ে নাও। নিশ্বাস বন্ধ করে আমি বুলিয়ে নিলাম। বজল কাকা বললেন, এবার খাও। আমি খেলাম। তিনি বললেন, এক মাসের মধ্যে আঁচিলটা চলে যাবে। আমি তাঁর চোখের দিকে তাকালাম। তাঁর চোখে আত্মবিশ্বাসের দৃঢ় ছাপ। আমি তো চিরকালের অবিশ্বাসী। আমার ভেতরে সংশয়ের দোলাচল। এক মন বলে, আঁচিলটা চলে যেতেও পারে। বজলকাকার এই কলা খেয়ে অনেকের আঁচিলই তো ভালো হয়েছে। আমারও নিশ্চয়ই হবে। আরেক মন বলে, অসম্ভব। যে আঁচিল ভিনেগারে যায়নি, যে আঁচিলের জন্য আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি রয়েছে, আমপাতা ও চাপাকলার এই আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় আঁচিল যাবে বলে মনে হয় না।

ঢাকায় ফিরে এলাম। অপেক্ষা করতে লাগলাম। আমি দেখতে চাইলাম লোকচিকিৎসা কতটা কার্যকর। আঁচিলটা মাঝেমধ্যে হাত দিয়ে দেখি। দেখি আর হতাশ হই। না, মনে হয় না এই জীবনে এটা আমাকে ছেড়ে যাবে। সারাজীবনের জন্যই আসন নিয়ে বসেছে। বজলকাকার স্বপ্নে পাওয়া চিকিৎসা বৃথা যাবে। তবু আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম। কেটে গেল এক মাস আট দিন। গতরাতে আঁচিলটা খুব ব্যাথা করছিল। ভাবছিলাম সাইফুল ভাইর কাছে যাব। লেজার রস্মির সাহায্যে ফেলে দেওয়ার কথা বলব। সকালে কানটুপিটা মাথায় দিয়ে অফিসে চলে গেলাম। রুমে ঢুকে চেয়ারে বসে টুপিটা খুললাম। অভ্যাসবশত আঁচিলটায় হাত দিলাম। কিন্তু আঁচিলটা নেই! অন্ধের যষ্টির মতো হাতড়াতে লাগলাম। কোথাও নেই। আমার অলক্ষে খসে পড়েছে কোথাও!

আমার মধ্যে প্রশ্ন জাগল, আঁচিলটা কি এমনি এমনি খসে পড়ল? মৃত নক্ষত্রের মতো? আঁচিলেরও কি জন্ম-মৃত্যু আছে? সে কি এক ছয় মাসের আয়ু নিয়ে আমার মাথায় জন্মেছিল? আয়ু ফুরাবার পর মরে গেল? নাকি ভিনেগারের কারণে সে খসে পড়ল? তা তো হওয়ার কথা নয়। তিন মাস তো ভিনেগার দিলাম, তখন তো খসেনি। তবে কি বজলকাকার স্বপ্নে পাওয়া আমপাতা ও চাপাকলার আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় খসে পড়ল? ওই কলা খাওয়ার পর কি আমার শরীরে ঘুমিয়ে থাকা শুভ ভাইরাসগুলো জেগে উঠেছিল। তারা জেগে উঠে কি কাতারে কাতারে ছুটে গিয়েছিল অশুভ ভাইরাস আঁচিলটার দিকে? তারাই কি আঁচিলটাকে হত্যা করল?

সামনে এসে দাঁড়ালেন জোসেফ ক্যাম্পবেল। বললেন, ভাবো, ভাবতে থাকো।

মহাকালে রেখাপাত
১৯.০১.২০২০

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধ“মা “-সুমন দত্ত’র কবিতা
পরবর্তী নিবন্ধ“অপেক্ষা”-মুন রায় চৌধুরী’র কবিতা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে