“ধর্ষণ বন্ধ হয় না কেন?”-আমীন আল রশীদ

0
513
আমীন আল রশীদ

ধর্ষণ বন্ধ হয় না কেন?-

-আমীন আল রশীদ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে ধর্ষণ মামলার আসামি মজনু যেদিন (বৃহস্পতিবার) আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেন, দুঃখজনকভাবে সেদিনই ঢাকার কেরাণীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ এবং কিশোরগঞ্জের ভৈরবে তিনজনের ধর্ষণের শিকার হওয়ার খবর গণমাধ্যমে আসে।

কেরাণীগঞ্জে পাশবিকতার শিকার ৮ বছরের শিশু। ঘটনাটি জানাজানি হয় তিনদিন পরে। কেননা অভিযুক্ত স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী বলে ভুক্তভোগীর পরিবার বিষয়টি গোপন রেখে মেয়েটির চিকিৎসা করাচ্ছিলো। কিন্তু স্বাস্থ্য খারাপ হলে তাকে বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করা হয়। মূলত এরপরেই ঢাকা মেডিকেল কর্মরত সাংবাদিকরা বিষয়টি জানতে পারেন।

ভৈরব রেলস্টেশনের কাছে একটি নির্জন স্থানে গণধর্ষণের শিকার হন এক কিশোরী—যিনি টঙ্গী থেকে সুনামগঞ্জ যাওয়ার জন্য ভৈরবে নেমে বাসের সন্ধান করছিলেন। আর মানিকগঞ্জের সিংগাইরে সিঁধ কেটে ঘরে ঢুকে স্বামীর হাত-পা বেঁধে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণ করা হয়। এর কয়েকদিন আগে শুধু রাজধানীতেই পরপর তিনটি শিশুকে ধর্ষণের খবর আসে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশিত হবার পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে যখন ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে শিক্ষার্থীরা সোচ্চার হয়ে ওঠেন, ঠিক সেই সময়ে পরপর অনেকগুলো ধর্ষণের ঘটনা গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়। তার মানে কি এই যে, একটি ধর্ষণের ঘটনায় সারা দেশে তোলপাড় শুরু হলেও কিংবা ধর্ষকের বিচার দাবিতে সারা দেশে আন্দোলন শুরু হলেও সেই বার্তাটি ধর্ষকদের কাছে পৌঁছাচ্ছেন না এবং সুযোগ পেলেই একজন পুরুষের ভেতর থেকে ধর্ষকের চেহারাটি বেরিয়ে আসছে? তার মানে কি এই যে, সকল পুরুষের ভেতরেই একজন ধর্ষক বাস করে এবং সুযোগ পেলেই সেই ধর্ষকের বীভৎস মুখোশটি উন্মোচিত হয়?
…..

ধর্ষণ কেন বন্ধ হয় না (২)
…….
ধর্ষণ বন্ধ না হওয়ার পেছনে একটা বড় কারণ, যারা এসব ঘটনার পেছনে থাকে, অনেক সময়ই স্থানীয়ভাবে তারা প্রভাবশালী। ফলে ভুক্তভোগী পরিবার আইনের আশ্রয় নিতে ভয় পায়। তাদের মনে এই শঙ্কাও কাজ করে যে, পুলিশ ও আদালতের কাছে গেলে তারা আদৌ ন্যায়বিচার পাবেন কি না নাকি নতুন করে সংকটের জালে পেচিয়ে যাবেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব মতে, ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার মাত্র ২০ ভাগ ঘটনায় থানায় মামলায় হয়। বাকি প্রায় ৮০ ভাগ থেকে যায় বিচারের বাইরে। ফলে আইন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের এই ভরসাহীনতা, বিচার পাওয়ার সহজ পথ না থাকা, প্রভাবশালীদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললে নিজের ও পরিবারের জন্য আরও বড় হুমকি তৈরির যে শঙ্কা, তাও সমাজ থেকে ধর্ষণের মতো ব্যাধি নির্মূলের একটি বড় অন্তরায়।

এর সঙ্গে আছে ঘৃণা ও বিভেদের সংস্কৃতি। সব ঘটনার পেছনেই এখন যেহেতু ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় খোঁজা হয়, সে কারণে অনেক সময় ধর্ষণ বা এরকম অন্যায়ের শিকার হওয়া ব্যক্তিটি যদি ক্ষমতাসীন দলের বিরোধী মতের অনুসারী হন, তাহলে তার পক্ষে ন্যায়বিচার পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সমাজে এখন এই ধারণাটি বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে, বিরোধী মতের লোককে খুন করা এমনকি ধর্ষণ করাও জায়েজ। সবকিছুরে এভাবে জায়েজীকরণ বন্ধ না হলে ধর্ষণ বন্ধ হবে না।

সব ঘটনার প্রতিক্রিয়া, সেটি গণমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া এবং রাষ্ট্রের তরফে একইরকম না হওয়ায় সমাজের বিস্তীর্ণ পরিসরে এই বার্তা এখনও পোঁছেনি যে, ধর্ষণ একটি ভয়াবহ অপরাধ এবং এটি করলে তিনি যেই হোন না কেন, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে তিনি যত প্রভাবশালীই হোন না কেন, তার ক্ষমা নেই।

ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে প্রতিক্রিয়া এসেছে, কুমিল্লার তনুর ক্ষেত্রে তা একেবারেই অনুপস্থিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীর ক্ষেত্রে যা হয়েছে, কেরাণীগঞ্জ-ভৈরব-মানিকগঞ্জ অথবা দেশের অন্য কোনো প্রান্তের অন্য কোনো ঘটনায় সে ধরনের প্রতিক্রিয়া আসেনি। যদি সব ঘটনার ক্ষেত্রে একইরকম প্রতিক্রিয়া আসতো, যদি সবগুলো ঘটনায় তাৎক্ষণিক ও দ্রুত বিচার করে সারা দেশের মানুষের সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা যেতো, সত্যিকারেই ন্যায়বিচার ও সুবিচার নিশ্চিত করা যেতো, তাহলে ধর্ষণ শূন্যের কোঠায় না হলেও অন্তত বহুলাংশে কমিয়ে আনা যেতো।

একসময় সারা দেশে এসিড সন্ত্রাসের ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়েছিল। আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সারা দেশে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ফলে এখন এসিড সন্ত্রাস প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম, বিশেষ করে প্রথম আলোর বিশাল ভূমিকার কথাও অস্বীকার করা যাবে না।

শিশু ধর্ষণ প্রমাণ করা কঠিন। কারণ ঘটনার শিকার শিশু অনেক সময়ই সঠিকভাবে বলতে পারে না। তার মধ্যে ভয়াবহ আতঙ্ক কাজ করে। সে অনেক সময় বোঝাতেও ব্যর্থ হয়। আবার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিশুরা ধর্ষণ বা এরকম শারীরিক নিপীড়নের শিকার হয় পরিবারের লোকদের দ্বারাই। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব নিয়ে কোনো আলোচনা হয় না বা পাশের বাড়ির লোকেরাও জানে না।

তার মানে যে সমস্যাটি বছরের পর বছর শুধু নয়, বলা যায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সমাজে বিরাজমান, হুট করে বা একটি ঘটনার পরে গড়ে ওঠা আন্দোলনেই সেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই। এক্ষেত্রে পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘ পথ। প্রথম প্রয়াজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তির পরিচয় নয়, বরং সব ঘটনাকে সমানভাবে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন—সেটি গণমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া এবং রাষ্ট্রের শীর্ষ মহল থেকে। ফেনীর নুসরাত কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর ঘটনায় রাষ্ট্র নড়েচড়ে বসবে অথব কুমিল্লার তনুকে রাষ্ট্র ভুলেই যাবে—এই স্ববিরোধিতা বন্ধ করা না গেলে ধর্ষণও বন্ধ হবে না।

১৭ জানুয়ারি ২০২০

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধশ্রদ্ধেয় মুক্তার হোসেন‘এর জন্মদিনে “নাটোর কণ্ঠ’ পরিবারের শুভেচ্ছা
পরবর্তী নিবন্ধ“মধ্যরাতের চিঠি “- সৌমিক ডি.মজুমদারের কবিতা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে