“নৃপতি ঘুঙুর হয় কবিদের পায়ে ও একজন আত্মনিমগ্ন কবি বান্দা হাফিজ”-চন্দ্রশিলা ছন্দা’র পাঠ প্রতিক্রিয়া

0
474
sila

পাঠ প্রতিক্রিয়া

নৃপতি ঘুঙুর হয় কবিদের পায়ে ও একজন আত্মনিমগ্ন কবি বান্দা হাফিজ-চন্দ্রশিলা ছন্দা

শব্দের মহাসাগর সেঁচে হারিয়ে যাওয়া শৈশবের চিত্রাবলী একটি একটি করে তুলে এনে কবি বান্দা হাফিজ যেভাবে কাব্যের সুর্নিমল আকাশ এঁকেছেন,সেই আকাশে হারিয়ে যেতে যেতে ভাবছিলাম- এই কবিকে প্রেমের কবি বলবো, নাকি বলবো দ্রোহের কবি? কারণ তিনি “কলার মঞ্জরি চিরে শৈশবের চাঁইচুঁই কাটাকাটি খেলা” দিয়ে শুরু করলেও নৃপতির পায়ে ঘুঙুর পরাতে সার্থক হয়েছেন। পাগলা নদীর কোল ঘেঁষে বেড়ে ওঠা কবি নদীটিকে “স্রোতের শাবলে” ধসে যেতে দেখেছেন বলেই হয়তো তিনি কবি হতে পেরেছেন। ধ্যানমগ্নতায় কবি অনুভব করেছেন ভাঙনের ব্যথা। হারানোর হাহাকার। হয়তো সেখান থেকেই কবি জ্বলে উঠেছেন দ্রোহের আলোয়। শিখেছেন,”ভাল থাকা বাধ্যতমূলক।” তিনি দেখেছেন ” রাষ্ট্র? -সে তো ফাঁকা গ্লোব। পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি। যেখানে অংশীদার অনেক… -ভূখণ্ড তো নিজেই মৃত, মানচিত্রে ঝাপসা পড়ে থাকা,এদিক ওদিক থেকে অপরের চাপ খেয়ে টিকে থাকা… -সার্বভৌমত্ব? তাকেই পাহারা দিতে প্রাণ যায় অগণিত দেশপ্রেমিকের। -সংবিধান হয়েছে স্বার্থের জোড়াতালিতে নাসিরুদ্দিন হোজ্জার ছাতা। -সরকার! উলঙ্গ শিশুর গায়ে লেপ্টে যাওয়া মৌমাছি। আহ্! কী দুঃসাহস কবির! কবিকে এখানে স্যালুট না করে এড়িয়ে যাওয়া যে কোন সচেতন পাঠকের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। কী নিখুঁত উপলব্ধিতে তিনি রাষ্ট্রের প্রতিটি ধাপকে তুলে ধরেছেন! এই রাষ্ট্রে জনগন ঢোঁরা সাপ কিম্বা অসহায় উলঙ্গ শিশু।

যারা যন্ত্রণায় কাতর অথচ চাকরবাকরের মত অবনত হয়ে পেতে দেন পিঠের সিঁড়ি। নৃপতিদের জন্য মনোযোগ দিয়ে গেয়ে যান “নুনের কোরাস।” এখানে একটু উদ্ধৃতি না দিলেই নয়, ” মহারাজা বললেন, লালগালিচা গোটাও চাকর বাকর যতো হও অবনত পিঠের সিঁড়িতে হেঁটে যেতে চাই ঘুমের নগরে যদি খুশি হই বিনিময়ে পাবে নগদ এনাম। আমরা গর্বিত চাকরের দল, শীতলপাটি হলাম।” এটা সমাজের খুবই রূঢ় একটা দিক। দেশে দেশে কালে কালে ক্ষমতার হাতে শাসকদলের নিষ্পেষণ অক্ষমদের প্রতি। তবুও শাসকদলের মন পাওয়া যায় না। সে কথাও কবি তুলে ধরছেন পরের পঙক্তিতে ” চাকর-নফর সব অপবিত্র পিঠে ছুঁয়ে নবাবের পদদ্বয় নোংরা করেছি বলে দণ্ডাদেশ দিয়ে যান দাঁড়িয়ে সেখানে – বললেন, কেটে নাও বজ্জাত ঘোড়াগুলোর আহারের অর্ধেক ছোলা আর জল।” কবি ইতিহাস ছুঁয়ে দারুণ মুন্সিয়ানায় নিপুণ চিত্র এঁকেছেন বর্তমান সমাজের। যিনি অতীত এবং বর্তমানকে একই সুতোয় বেঁধে চমৎকার দৃশ্যপট পাঠকের চোখের সামনে তুলে ধরতে পারেন সেই কবি মৃত্যুঞ্জয়। আমাদের কবি বান্দা হাফিজ ও সেই সারিতেই হেঁটে চলছেন বলে আমার ধারণা।

কবির আরও একটি অসাধারণ কবিতার কিছু লাইন আমাকে নাড়া দিয়েছে। কবিতার শিরোনাম, “এখান রাজনীতির গন্ধ খোঁজা নিষেধ” বলে ধরি মাছ না ছুঁই পানির মজা নিয়েছেন। যেমন “আমার ইচ্ছের টিয়াপাখি হয়ে থাকো আমার কথার ধ্বনি বাজুক তোমার মুখে যখন একটি পাখি থালাবাটি কম্বল চায় ….. …… ….. অ্যালবাট্রস হয়ে গভীর সমুদ্রে ওড়ো, আমার সকল কাজে সমর্থন দাও। আমার ইশারা পেলে পোশাকী পিঁপড়ের দল… …. অন্য দিকে নির্বাচন চলে ফাঁকা মাঠে।” একজন যোদ্ধার মত নির্ভিক এবং সকল কপটতার উর্ধ্বে যেতে পেরেছেন “এখান রাজনীতির গন্ধ খোঁজা নিষেধ” কবিতায়। তবে রাজনীতির গন্ধ খোঁজা নিষেধ বললেও আপাতত তিনি ফুলের বদলে খোঁপার কাঁটা খুলে হাতে ধরার পক্ষপাতি। তিনি এই অকাল বৈশাখে ওলকপির মত গ্রেনেড আর বাদামের মত বুলেট উৎপন্নকারী কৃষককেই বেশি ভালোবাসেন। তিনি অনিয়মের ট্রেন থামাতে চান। পুরুষদেরকে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াতে বলেন। কিশোর তরুণ যুবা বালক, মাতা, কন্যা সকলকে আহবান করেন মানবঢাল তৈরি করার জন্য। তার মানে এই নয় যে, যার যা খুশি সে তাই করুক। কিম্বা উৎসাহিত করা হচ্ছে বিশৃঙ্খলায়। বরং কবির কলম প্রায় সব কবিতায় বলে উঠেছে “শত্রু প্রেমিক বিচার্য নয়।

অন্যায় দেখে মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে প্রতিবাদের আগুনে জালিমদেবতার ছবি যিনি দাহ করতে পারেন, তিনিই প্রকৃত কবি। আদতে আমাদের সাহসী কবি বান্দা হাফিজ আসলে সময়ের সাথে সাথে সবাইকে জেগে ওঠার কথা বলেছেন। শক্ত পদক্ষেপ নেয়ার কথাই বলেছেন। তাতে যদি রাষ্ট্রযন্ত্রের উদ্ধত তলোয়ার কবিকে তাড়া করে তো করুক। কবি যেন বিচলিত হয়ে না পড়েন। কবি বান্দা হাফিজকে পড়তে গিয়ে আমি পড়ে গেছি মহাসাগরে! সীমিত জ্ঞানে অসীমের চর্চা হয়তো ধৃষ্টতা হয়ে গেছে। কিন্তু দুঃসাহসী কবির কবিতা পাঠ করে মনেহয় আমিও সাহসী হয়ে উঠেছি। আর তাই আমাকে আলোড়িত করা কিছু কবিতা, কবিতার পঙক্তি নিয়ে দু’চার কথা না বলে পারলাম না। কিছু আঞ্চলিক শব্দের এতো নিখুঁত ব্যবহার, এতো মমতায় বেঁধেছে সেই সব শব্দের গাঁথুনি যে, তাকে কিছুতেই এড়ানো যায় না। এড়ানো যায় না মাটির এই কবিকে। শুরুতেই নিজেকে নিজে প্রশ্ন করেছিলাম, কবি বান্দা হাফিজকে প্রেমের কবি বলবো, নাকি দ্রোহের কবি? কবিকে পড়তে পড়তে সে উত্তর আমি নিজেই পেয়ে গেছি। বিচ্ছেদকে আমি প্রেমই মনে করি।

দ্রোহী হয়ে ওঠাও প্রেম। প্রচন্ড প্রেম। দ্রোহের প্রেমটা তিতুমীর, সুভাষ চন্দ্রের মত। দ্রোহের প্রেমটা মওলানা ভাসানী এবং বঙ্গবন্ধুর জ্বলে ওঠার মত প্রেম। এই প্রেম বুকে নিয়ে “হাঁড়ি ভাঙা খেলা” অাসলে বান্দা হাফিজকেই মানায়। তাঁর উর্দ্ধমুখী লাদনা হাঁড়ির গন্তব্য ঠাওর করতে পারুক না পারুক স্বপ্ন দেখতেই হবে। হাঁড়ি ভাঙার স্বপ্ন। অর্থাৎ অনিয়ম অনাচার ভাঙার স্বপ্ন। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যদি স্বপ্ন দেখতে না শেখে, জেগে উঠতে না পারে তবে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে পুরো জাতি। তাই সব শেষে আমিও চাইবো, নৃপতিগণ কবিদের পায়ে ঘুঙুর হয়েই বাজুক। আর সেই বাজনায় জেগে উঠুক সবাই। জেগে উঠুক দশদিক। প্রচলিত পদকের প্রথা বিরোধী, যশ খ্যাতির ব্যাধিমুক্ত এই কবি চান একটু নির্জনতা। চান কবিতায় ধ্যানমগ্ন হতে। নিজেকে জানতে। প্রকৃতির মাঝে ডুবে তুলে আনতে চান কাব্য সুধা। তাই কবি বলে ওঠেন ” কবিকে পদক নয়-ভালোবাসা দিও। আর দিও যেটা তার বেশি প্রয়োজন। কবি বড় খুশি হয় যদি পায় নির্জন। এতেকাফে বসার আসন। ” এখানেই কবি সকল কবির হতে পেরেছেন। পেরেছেন সার্বজনীন হয়ে উঠতে। এই এতেকাফই হলো নিজের ভেতর নিমগ্নতা। সৃষ্টির মাঝে নিমগ্নতা। একজন সফল এবং সার্থক কবি বা একজন সফল এবং সার্থক কবি বান্দা হাফিজের কলম চলুক লাঙলের ফলা হয়ে। চাষ হোক শত শত দ্রোহ এবং প্রেমের কবিতা। আর এই প্রেম দিয়েই আমি ইতি টানছি আজকের লেখা।

“প্রেম তোমার সাথে পরিচয় মহাকালের,

এটাই এখন বুকের ভেতর নাচে

মনে কেবল একটি শব্দ ঘোরে প্রেম! সেতো জনম জনম বাঁচে।”

কবি বেঁচে থাকুক প্রেমে এবং কবিতায়।

চমন প্রকাশ থেকে প্রকাশিত “নৃপতি ঘুঙুর হয় কবিদের পায়ে” ২০১৯। প্রচ্ছদের কবি মোমিন উদ্দীন খালেদ। বইটির মূল্য ১৯০ টাকা।

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধবইমেলায় মুরসালিন হক জুনায়েদ-এর কবিতার বই-“লালবাগ ও ক্যামেরায় রেখেছি চোখ”
পরবর্তী নিবন্ধ“শিক্ষকদের সবাই পদানত করে রাখতে চায় “- সৈয়দ আনোয়ার সাদাৎ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে