পৃথিবী হোক মানুষের বাসা -পলি শাহীনা

0
473
Poly Shahina

পলি শাহীনা : দীপক কাকার সাথে আমার পরিচয় বেশ দীর্ঘ দিনের। তাঁর পুরো নাম দীপক চন্দ্র সাহা। জানাশোনার শুরু থেকেই তাঁকে আমি কাকা বলে সম্বোধন করি। তিনি আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করেন, মা বলে ডাকেন। দীপক কাকা গীটার বাজান। গীটার বাজিয়ে চমৎকার গান করেন। গানের সুর আমার কানে প্রার্থনার মতো বাজে। তাঁর সুরের মূর্ছনায় চোখ বুঁজে আমি অন্য কোন আলোর ভুবনে হারিয়ে যাই।

আমি তাঁর গানের ভক্ত। তাঁর স্ত্রী অনামিকা সাহা ও আমাকে খুব ভালোবাসেন। পূজার সময় কাকী আমাকে ফোন করে নিমন্ত্রণ জানান। তাঁদের যে কোন বিশেষ উৎসবে আমি অতিথি হিসেবে যাই বাসায়। কাকা-কাকীর আতিথেয়তা যারপরনাই মুগ্ধ হই। নারিকেলের চিঁড়া, গুড়ের সন্দেশ আমার প্রিয় খাবার- কাকী এ কথা জানেন। কাকী যত্ন করে খাবারগুলো তৈরি করেন, কাকা নিজ হাতে আমাকে সেগুলো পরিবেশন করেন, খেতে দেন।

তাঁদের বাসায় যাওয়ার পর টেবিল ভর্তি নানান পদের খাবারের সামনে যখন উনারা আমাকে বসিয়ে দেন, পাশে দাঁড়িয়ে থেকে খাওয়ার তদারকি করেন, আমার উপস্থিতিতে তাঁদের চোখে যে আনন্দের ঢেউ খেলে যায়, এসব দেখে তখন এই পরবাসে আমার চোখ ঝাপ্সা হয়ে আসে। বাবা-মা হীন আমি, তাঁদের স্নেহ, ভালোবাসা নিংড়ে নিংড়ে অনুভব করি। যেন উৎসবে আমি তাঁদের বাড়ীতে বেড়াতে এসেছি, যেমন করে দেশে মেয়েরা বাবার বাড়ীতে যায়। নিজেকে তখন ভাগ্যবতী মনে হয়।

বাংলাদেশ ছেড়ে হাজার হাজার মাইল দূরের এই নিউইয়র্ক শহরে, দীপক কাকার বাসায় গেলেই আমি শৈশবে হারিয়ে যাই। যে বাড়ীতে আমি জন্মগ্রহণ করেছিলাম, তার পাশেই ছিল বিরাট বড় হিন্দু বাড়ী। ভোর রাতে মুয়াজ্জিনের মিষ্টি আজানের ধ্বনি শুনে যেভাবে শান্ত শীতলতায় মন প্রাণ ছুঁয়ে যেত, একইভাবে সন্ধ্যা বেলায় হিন্দু বাড়ীর উলু ধ্বনির শব্দে, ভালো লাগার পরশে আমার চোখ বুঁজে আসতো। শীতের সকালে আরবী শিখতে মক্তবে হুজুরের কাছে যাওয়ার আগে, রিংকু দিদি আমার প্রিয় শিউলি ফুল দিতেন আঁজলা ভরে।

মক্তবে বসে আরবী বর্ণমালা শিখতাম আর সুযোগ পেলেই হিন্দু বাড়ির শিউলি ফুল নিয়ে খেলতাম, ঘ্রাণ নিতাম। যতদূর মনে পড়ে স্কুলের স্লেটে আমার জীবনের প্রথম বর্ণমালা অ আ ক খ শিখেছিলাম যোগিন্দ্র স্যারের কাছে। আজো তিনি আমার অনুভূতির আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে জ্বলছেন স্ব মহিমায়। যতদিন নিঃশ্বাস নেবো, বাংলায় কথা বলবো, লিখবো -তাঁর কথা মনে উঁকি দিবেই।

আমাদের বাজারের সবচেয়ে ভালো দর্জি দোকান ছিল চিতই কাকার। তাঁর সেলাইয়ের সুনাম ছিল, তাঁর কাছে কাপড়-চোপড় সেলাইয়ের জন্য দূর-দূরান্ত থেকে মানুষজন আসতো। তিনি নতুন নতুন ডিজাইনের জামা সেলাই করতেন। মনে আছে ঈদের সময় তাঁর দোকানে মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের লম্বা লাইন পড়ে যেত। ঈদ যত ঘনিয়ে আসতো দাদার ব্যস্ততা পাল্লা দিয়ে দ্বিগুণ হারে বেড়ে যেত। ঈদের সময় দাদার নাওয়া -খাওয়া ঠিকমতো হতো না। রাতদিন কাজ করে দাদা সবার জন্য ঈদের জামাকাপড় সেলাই করতেন।

দোকানের কোন কর্মীর হাতে নয়, ঈদের সময় সবাই চাইতো তাঁদের বহুল আকাংকিত জামা টি যেন দাদা নিজ হাতে সেলাই করে দেন। ঈদের দিন সবার মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে দাদা গভীর রাত অবধি কাজ করে যেতেন। ঈদের দিন ভোরবেলা আমরা সবাই যখন আনন্দে আত্মহারা, তখন চিতই কাকা কে দেখতাম ক্লান্ত শরীরে ঝুঁকে ঝুঁকে বাড়ীর দিকে যাচ্ছেন। আমার মা কে দেখতাম দাদা কে ঘরে ডেকে এনে সেমাই খেতে দিতেন। আমরা সবাই মিলে দাদার সঙ্গে সেমাই খেতাম।

মা কিছু সেমাই দাদার বাড়ীর জন্য দিয়ে দিতেন। একইভাবে পূজার সময় দাদা চিঁড়া, গুড়, মুড়ি, নারিকেল, সন্দেশ আমাদের বাড়ীতে পাঠাতেন। পূজার সময় হিন্দু বাড়ীতে গিয়ে দিনভর থাকতাম, খেতাম, বাড়ীতে আসার সময় খাবার নিয়ে আসতাম। হিন্দু বাড়ীর সঙ্গে আমাদের বাড়ীর আদান-প্রদান ছিল সবসময়। ঈদের সময় হিন্দু বাড়ীর কারো কারো কাছ থেকে, ঈদ সেলামিও পেতাম।

আমার মায়ের মারাত্মক বেক পেইন ছিল। বাবা বিদেশে থেকে মায়ের জন্য বিশেষ ধরনের ইনজেকশন পাঠান, সে ইনজেকশন দূরের হাসপাতালে গিয়ে, মা মহিলা নার্স দিয়ে দিতেন। একবার মায়ের বেক পেইন বেড়ে তিনি বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। এদিকে গ্রামে কোন মহিলা নার্স পাওয়া যাচ্ছিলো না। মা ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন। অরুণ দাদা মা কে দিদি বলে ডাকতেন। মায়ের কষ্ট দেখে দাদা মা কে গিয়ে বললেন, ‘ বড় বোন তো মায়ের মতো হয়। আমাকে অনুমতি দিন, আমি আপনাকে ইনজেকশন দিয়ে দিই।

‘মা সাধারণত মহিলা ডাক্তার, মহিলা নার্স ছাড়া কারো কাছে যেতে চাইতেন না। সেদিন আমার মা কে দেখেছিলাম, অরুণ দাদার হাতে তাঁর পিঠে ইনজেকশন নিতে। আল্লাহর রহমতে অরুণ দাদার উছিলায় আমার মা আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। আম্মা কে সাংসারিক সব রকমের কাজে সাহায্য করতেন বিধবা কালুর মা। কালু কে কোনদিন দেখি নি, কালু সম্পর্কে কখনো জানতেও চাই নি, আদৌ কালু নামে তাঁর কোন সন্তান ছিল কিনা তাও জানিনা।

তাঁর সম্পর্কে যতদূর জানি, যুদ্ধের সময় তাঁর পুরো পরিবার ভারতে চলে যায়। তিনি ঘর ভিটা ছেড়ে যান নি। কালুর মা প্রায়শই বলতেন, ‘ আপন ঘর ফেলে কই যাব? যে মাটি লেগে আছে আমার শরীরে সে মাটি ফেলে কোথাও যাব না।’

তাঁর স্বামীর কি হয়েছে তাও সঠিক জানি না, কিংবা আজ বলতে পারবো না। তবে সবসময় তাঁকে সাদা শাড়ী পরা দেখতাম। বিশাল হিন্দু বাড়ীর এক কোণে সুপারি পাতার ছাউনির ঘেরা, ছোট্ট একটা ঘরে তাঁকে একা থাকতে দেখেছি। মুসলমান বাড়ীতে কাজ করে তাঁকে জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করতে দেখতাম। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া কালুর মা কে মুসলমান বাড়ীর প্রতিটি মানুষ সম্মান করতো, ভালোবাসতো। সবার বাড়ীতে তিনি খেতেন।

কালুর মায়ের যত্নে নিকানো উঠোনে আমি প্রজাপতির মত উড়ে উড়ে খেলাধুলা করতাম ছোটবেলায়। দূরন্ত শৈশবের দুপুর বেলাগুলোতে, কালুর মায়ের হাতে বানানো কাঁচা আমের ভর্তার স্বাদ, আজো জিভে লেগে আছে।
আসলে হিন্দু আমার আজন্মকালের পড়শী ছিল; কিংবা আমি ছিলাম হিন্দুর পড়শী।

দীপক কাকা নিউইয়র্ক শহরে গাড়ী চালান। মাঝেমধ্যে কাজ শেষে ছেলেমেয়ের জন্য ম্যাকডোনাল্ড বা ডানকিন ডোনাটসে খাবার কিনতে গেলে, দীপক কাকার সঙ্গে আমার দেখা হতো। তিনি সে সময় কফি কিনতে আসতেন। আমার মুখের দিকে পিতৃ সুলভ মমতায় তাকাতেন। প্রায় দিন ছেলেমেয়ের জন্য কেনা খাবারের দাম তিনি পরিশোধ করে দিতেন। কয়েক ব্লক হাঁটতে হবে বলে আমাকে তাঁর ট্যাক্সি করে বাসায় নামিয়ে দিতেন। তাঁর সারল্যে আমার মাথা নত হয়ে আসতো শ্রদ্ধায়।

হিন্দু কিংবা মুসলমান নয় ; তাঁকে আমার মানুষ মনে হতো। কয়েকদিন আগের কথা। প্রযুক্তির কল্যাণে আমি সাধারণত ঘুম ভেঙেই মোবাইল স্ক্রিনে চোখ রাখি, পথিবীর নানান প্রান্তের খবরাখবর পড়ি। মোবাইলে খবর পড়তে গিয়ে প্রথমেই ভেসে আসে, সদ্য ঘটা দিল্লির সহিংসতার খবর। ধর্ম যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে মুসলমান ও হিন্দু ধর্মাবলম্বী রা। আমি আৎকে উঠি। বিষন্ন মনে অন্য সব দিনের মত ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ি কাজের উদ্দেশ্যে।

কাজে ঢোকার আগে কফি হাউজের লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছি কফির জন্য। ভাবনার অতলে ডুবে যাই৷ আমার আজন্ম কালের পড়শী, হিন্দুদের মনে মুসলমানদের জন্য এত বিষ জমলো কেমন করে? মোবাইলে পড়া খবর আমার চোখের সামনে জীবন্ত দৃশ্য হয়ে ভাসতে থাকে। আমি যেন অতল ভয়ের সমুদ্র সাঁতরে যাচ্ছি।

অন্ধকারাচ্ছন্ন এক ভয়ংকর নীরবতা আমাকে পেয়ে বসে আষ্টেপৃষ্টে। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি আগুন, লাশ, মানুষের আর্তচিৎকার, রোদন, আহাজারি। দীপক কাকার ডাকে সম্ভিত ফিরে পাই। এত দিনের চেনা স্বজন, দীপক কাকা কে দেখে ভয়ে নুয়ে পড়ি। তাঁকে আমার হঠাৎ অচেনা মনে হয়। কেন এমন মনে হচ্ছে, তাও জানিনা।

দিল্লির সহিংসতার কথা ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর নানান প্রান্তে। আমি এবং দীপক কাকা, দু’জনেই জানি কি ঘটেছে দিল্লি তে। আমাদের মুখে কোন কথা নেই। বোধ জ্ঞান হবার পর থেকে জেনেছি, হিন্দু – মুসলমান একই বৃন্তে ফোটা দুটি কুসুম। আমরা একসঙ্গে মিলেমিশে থেকেছি, সাম্যের গান গেয়েছি, একের বিপদে অন্যে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছি। মহাত্মা গান্ধীর ভারতবর্ষে তাহলে আজ এত বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে কোথা হতে? দীপক কাকার শীতল মুখের দিকে আমি নির্বাক চেয়ে থাকি। আমার মাথা ঝিমঝিম করছে।

সবার উপরে মানুষ সত্য – এই কথায় আজন্ম বিশ্বাসী আমি কফি না নিয়ে লাইন থেকে বেরিয়ে, পাশের চেয়ারে বসে পড়ি। কাচের গ্লাসের ভেতর থেকে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। একদল পাখী মুক্ত আকাশে উড়ছে ; ভাবছি এদের ধর্ম কি? এরা কোথায় থাকে? মসজিদ, মন্দির নাকি গীর্জায়? পাখীর ডাক, নদীর গান, বাতাসের শব্দ, ফুল, সবুজ প্রকৃতি -এরা কোন ধর্মের? এরমধ্যে দীপক কাকা আমার এবং তাঁর জন্য, কফি আর ডোনাট নিয়ে পাশে এসে বসেন। আমরা একসাথে বসে মুগ্ধ সকালের সজীবতা মেখে সকালের নাশতা করছি।

এ সময় ধর্ম, জাত, ক্যামেরা, সাংবাদিক, মিডিয়া কিছুই ছিল না! ছিল শুধুই মানুষ, মানবতা আর ভালোবাসা!
আজ আবার মোবাইলের স্ক্রিনে খবরে পড়লাম- দিল্লি তে এক মুসলমান ব্যবসায়ীর গুলি লেগেছে, তাঁর জন্য হন্যে হয়ে রক্ত খুঁজছে হিন্দু গোপাল। অন্য দিকে হিন্দু প্রেমকান্ত বাঘেল মুসলমান প্রতিবেশী কে বাঁচাতে গিয়ে শরীরের ৭০ ভাগ পুড়ে হাসপাতালে রয়েছেন। বিষাদ গ্রস্ত মন ভালো হয়ে যায় খবরগুলো পড়তে পড়তে। চারদিকের বিষ বাষ্পের মধ্যে আলোর রেখা দেখতে পাই।

মুসলমান – হিন্দুর মধ্যকার সম্প্রীতি, আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব, বন্ধন কোন কিছুই শেষ হয়ে যায় নি। যেমন শেষ হয়ে যায় নি দাবানলে দগ্ধ অষ্ট্রেলিয়ার বনভূমি। পোড়া গাছ, ঝলসে যাওয়া বাকল থেকে উঁকি দিচ্ছে সুবুজ কিশলয়। রুক্ষ গাছে ফুটছে ফুল। ঠিক তেমনি সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন ধর্ম, জাতের এই বিষ বাষ্প উড়ে গিয়ে, পৃথিবী নামক এই গ্রহ টি হবে শুধুই মানুষের বাসা। পাখী, ফুল, প্রকৃতি, নদীর মতো মানুষগুলোও মিলেমিশে বসবাস করবে এই পৃথিবীতে।

( লেখাটি নিউইয়র্ক থেকে ‘ সাপ্তাহিক বাঙালী ‘ তে প্রকাশিত হয়েছে )।

Advertisement
উৎসPoly Shahina
পূর্ববর্তী নিবন্ধনাটোরে আজ একদিনে সবোর্চ্চ ২৬ জনের করোনার নমুনা সংগ্রহ
পরবর্তী নিবন্ধজাগো বাহে কোনঠে সবায় সংগঠন, বিনামূল্যে সবজি দিলেন কর্মহীন মানুষের বাড়িতে

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে