“বর্ণমালার অনন্ত সংগীত”-অনুপম সৌরিশ সরকারের কবিতা

0
356
অনুপম এনকে

বর্ণমালার অনন্ত সংগীত
=অনুপম সৌরিশ সরকার

ওরা জানত না,
মাতৃভাষা জড়িয়ে থাকে হৃদয় বন্ধনে
মাতৃভাষা পরায় আলো ওষ্ঠচুম্বনে
মাতৃভাষা ছড়িয়ে থাকে রক্ত সঞ্চালনে
মাতৃভাষার অপমানে আগুন জাগে প্রাণে ।
সেই মাতৃভাষাকে হত্যা করতে হুংকার দিল দানব,
“মুসলিম রাষ্ট্রের ভাষা হবে উর্দু,
বাংলা বললে গর্দান নেওয়া হবে,
চাবুক পড়বে পিঠে,উপড়ে নেব চোখ,
ছিঁড়ে নেব জিভ ।”
সেই মাতৃভাষাকে নির্মূল করতে গর্জালো গভর্নর জেনারেল,
“যারা উর্দুর বিরোধিতা করবে তারা দেশের শত্রু ।”

ওরা জানত না,
বাংলাভাষা ভরিয়ে রাখে আদরচন্দনে
বাংলাভাষা ছড়িয়ে থাকে অমৃতসন্ধানে
বাংলাভাষা চিরজাগ্রত মনুষ্যত্বের ধ্যানে
বাংলাভাষার অপমান হলে বাংলার সন্তান
রাস্তায় নামে রাজপথেতে রক্ত ঢালে বিপ্লব আন্দোলনে ।

অতএব বিদ্রোহে উত্তাল হল সন্তানের রক্ত,
অতএব সরকারের চাবুক হল ক্ষিপ্ত,
আগ্নেয়াস্ত্র হল হিংস্র উন্মাদ,
বারুদের সে কী রাগ !
ঘাতক গুলি ঢুকে পড়ল
জব্বার বরকত রফিকের শরীরে,
ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল,ভাষাপ্রেমিকের রক্ত,
সেই রক্তের রঙ মায়ের হৃৎপিণ্ডের মতো রাঙা ।

মাটি সেই রক্তকে ধারণ করল বুক তার পেতে দিয়ে,
ঘাস সেই রক্তে সেরে নিল গভীর পূণ্যস্নান,
বাতাস সেই রক্তের ঘ্রাণে ছুঁয়ে দিল শুদ্ধতা ।
সেই রক্ত রাজপথেতে এঁকে দিল বাংলা বর্ণমালা ,
সেই রক্ত মাটির বুকে ফুটিয়ে দিল ভাষাপ্রেমের ফুল,
সেই রক্ত লাখো মানুষের প্রাণে জাগালো প্রতিরোধের সাহস ।

বুকের রক্তে মাতৃভাষার চরণ ধুইয়ে সে কী গভীর সুখ !
ভাষার জন্য জীবন বলিদানের সে কী উল্লাস স্ফূর্তি !
আগ্নেয়াস্ত্রকে উপহাস করার সে কী প্রবল আনন্দ !
চাবুকের আঘাতে শরীরকে ক্ষতবিক্ষত করার
সে কী উচ্ছ্বাস উন্মাদনা !
পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ল স্বৈরাচারী সরকার,
ক্লান্ত হল পুলিশের উন্মাদ অত্যাচার,
নির্মম নির্লজ্জ চাবুক হল অবসন্ন শিথিল,
বর্বর অস্ত্র যত চাইল বিশ্রাম,
মুক্ত হল বাংলাভাষা জহ্লাদের হাত থেকে ।

ওরা জানত না,
এভাবেও মায়ের ভাষাকে ভালবাসা যায়,
এভাবেও শুধুমাত্র ভাষার জন্য
শরীরে ধারণ করা যায় গরম সীসা,
মাতৃভাষাকে মায়ের আসনে বসিয়ে
সেই মাকে বাঁচাবার জন্য
এভাবেও মৃত্যুকে উৎসব জ্ঞান করা যায় !!
আকাশ গ্রহ নক্ষত্র বলল, “যায়,যায়”,
ঘাস মাটি কলমীলতা বলল, “যায়,যায়”,
পদ্মা মেঘনা ইছামতী বলল, “যায়,যায়”,
প্রতিবাদী অত্যাচারিত ভাষাসৈনিকরা বলল, “যায়,যায়”,
মৃত্যুর চোখে চোখ করে তরুণ তরুণীরা বলল, “যায়,যায়”,
ঘুমের দেশে যেতে যেতে শহীদেরা বলল, “যায়,যায়” ।
এই “যায়,যায়” “যায়,যায়” “যায়,যায়”
ধ্বনি মন্ত্রধ্বনির মত সম্মিলিত উচ্চারণে
হয়ে উঠল “জয় জয়”, “জয় জয়”, “জয় জয়”,
“জয় বাংলাভাষার জয়” ,“জয় মাতৃভাষার জয়” ।

বেহেস্ত থেকে বরকত রফিক জব্বার সালাম
এবং আরো অসংখ্য ভাষাশহীদ
আলো হয়ে উড়িয়ে দিলো মাতৃভাষার রঙীন বৈভব,
জ্যোৎস্না হয়ে ছড়িয়ে দিলো সুকোমল স্নিগ্ধতা,
বৃষ্টি হয়ে ঝরিয়ে দিল অমৃতময় বাংলা বর্ণমালার
অনন্ত সংগীত ।
======

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধll চাঁদার হাট ও বারোভাজার কাহিনি ll-অমিতকুমার বিশ্বাস
পরবর্তী নিবন্ধবাংলাদেশের ভূমি আইন ও ব্যবস্থাপনা -আব্দুল খালেক

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে