বাংলাদেশের ভূমি আইন ও ব্যবস্থাপনা -আব্দুল খালেক

0
1947
www.natorekantho.com

আব্দুল খালেক : বাংলাদেশের মূল ভূমি আইন রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০। এই আইনে মোট ১৫২ ধারা রয়েছে, তার মধ্যে প্রয়োজন মত, অনেক ধারা বার বার সংশোধন করা হয়েছে। ফলে এই রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ আইনটির বেহাল অবস্থা হওয়ায়, মাঠ পর্যায়ে এই আইনে জনসেবার জন্য, যথাযথ ভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায়, ভূক্তভোগী জনসাধারণ তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

যেমন– রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০এর ৮৬ ধারাটি নদী সিকস্তি ও পয়স্তি বিষয়ক আইন। বাংলাদেশ একটি নদী মাতৃক দেশ। বাংলাদেশের ছোট বড় কমবেশি নদী প্রতিটি জেলায় প্রবাহিত হয়ে আসছে। হাজার বছর পুর্ব হতে চলছে এইসব নদী ভাঙ্গা গড়ার ইতিহাস।

প্রতি বছরেই নদী ভেঙ্গে বিলিন হচ্ছে বড় বড় শহর ও জনপদ। ফলে নদী ভাঙ্গনের কবলে বাড়ী ঘর জোত জমি হারিয়ে, নিঃস্ব হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ এবং নদী ভাঙ্গা মানুষকে পুনর্বাসনে সরকারের উপর চাপ বৃদ্ধিসহ, রাষ্ট আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০এর ৮৬ ধারাটি নদী সিকস্তি ও পয়স্তি বিষয়ক আইন। এই আইনের মূল ধারা হলো- একজন মালিকের নদীগর্ভে বিলীন হওয়া জমির উপর ২০ বছরের জন্য অধিকার ছিল। ২০ বছরের মধ্যে উক্ত জমি জেগে উঠলে মালিক ৪ বছরের খাজনা দিয়ে জমির দখল নিতে পারতো। এ ছাড়াও একজন ভূমি মালিকের জমি সংলগ্ন পয়স্তি জমি বন্দোবস্ত পাওয়ার অধিকার ছিল।

১৯৭২ সনে রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ১৩৫ বলে পয়স্তি জমির উপর প্রাক্তন মালিকের দাবী ও সকল অধিকার বাতিল করা হয় এবং এ সব জেগে ওঠা চর জমি ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে, বন্দোবস্ত দেয়ার জন্য সরকারি দখলে ন্যস্ত হয়েছে, গণ্য হবে মর্মে ঘোষনা দেয়া হয়।

পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে এ আইন সংশোধন করে বলা হয় যে, পয়স্তি জমি বন্দোবস্তের ব্যপারে প্রাক্তন মালিকগণ যদি ১০০ বিঘার নিম্ন জমির মালিক হয়, তবে প্রাক্তন জমির মালিকগণ বন্দোবস্ত পাওয়ার ব্যপারে, অগ্রাধিকার পাবেন তবে শর্ত থাকে যে, জমি সিকস্তি হওয়ার পর ২০ বছরের মধ্যে একই স্থানে পয়স্তি হলে এবং সরকারের উন্নয়নমূলক কাজে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাধ নির্মানে প্রয়োজন হলে পুর্ববর্তী মালিকের আর কোন দাবী থাকবে না।

পয়স্তি জমির চর্চা ম্যাপ ( স্কেচ ম্যাপ) তৈরী করে এ ভাবে বন্দোবস্ত কার্যক্রম চলতে থাকলে চরের জমি বন্দোবস্ত নিয়ে আইন শৃঙ্খলা অবনতি ও খুন- জখম ও দাংগা- হাঙ্গামা শুরু হলে ভূমি প্রশাসন ও ভূমি সংস্কার মন্ত্রণালয়ের ০২ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৭ তারিখে ৯০(১০৬০) নং সার্কুলার জারী করে,

বন্দোবস্ত প্রদান বন্ধ করা হয় এবং অবিলম্বে জেলা প্রশাসকগণ সেটেলমেন্ট ম্যানুয়াল ১৯৩৫ এর ২৯৯ ও ৩০০ অনুচ্ছেদ মোতাবেক জরীপের জন্য মহা-পরিচালক, ভূমি রেকর্ড ও জরীপ অধিদপ্তরের নিকট প্রস্তাব পেশ করবেন। এতে চরের পয়স্তি খাস জমির বন্দোবস্ত কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে যায়।

অতঃপর ১৯৯৪ সনের ১৫ নম্বর আইন দ্বারা রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০এর ৮৬ ধারাটি পুনরায় সংশোধন করা হয়। যা আজও বলবত আছে। উক্ত সংশোধনীর শিরোনাম এই যে, সিকস্তির কারণে খাজনা হ্রাস এবং পরিবৃদ্ধির কারণে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত জমিতে অধিকার নিশ্চয়তা।

ধারা- ১ যদি জোতের অন্তর্ভূক্ত জমি বা জমির অংশ বিশেষ নদীগর্ভে সিকস্তি হয়ে যায় তা হলে রাজস্ব অফিসারের নিকট প্রজা কর্তৃক নির্ধারিত ফরমে আবেদন করা হলে বা তাকে সংবাদ দেয়া হলে সিকস্তি জমির অংশ বিধিমালা অনুযায়ী খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন কর হ্রাস করে সিকস্তির বিষয় লিপিবদ্ধ করবেন যা পরবর্তীতে উক্ত জমি যথাস্থানে পয়স্তি হলে তখন উক্ত ভূমিতে স্বত্বের প্রমান হিসেবে গণ্য হয়।

ধারা- ২ সিকস্তি জমি ৩০ বছরের মধ্যে পুর্বস্থানে পয়স্তি হলে প্রজা বা তার উত্তরাধিকারীর ঐ জমি বা জমির অংশে স্বার্থ স্বর্ত বা অধিকার থাকবে।

ধারা– ৩ অধিকার, স্বত্ব এবং স্বার্থ সম্পর্কে দু্ই ধারায় যা বলা আছে তা থাকা স্বত্বেও পয়স্তি জমি তাৎক্ষনিক দখলকার হিসেবে কালেক্টর নিজের উদ্যোগে বা যার জমি অবলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল সে প্রজা বা তার উত্তরাধিকার কর্তৃক বা অন্য কারো মাধ্যমে লিখিতভাবে সংবাদ পাওয়ার পর প্রয়োগ করবেন।

ধারা– ৪ পয়স্তি জমি কালেক্টর অথবা রাজস্ব কর্মকর্তা এই ধরনের জমিতে দখল নেয়ার পর বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রজাদের অবহিত করবেন এবং উক্ত জমি জরীপের ব্যবস্থা নিবেন।

ধারা– ৫ কালেক্টর উপধারা চার অনুযায়ী সার্ভে জরীপ এবং ম্যাপ প্রস্তুত করার ৪৫ দিনের মধ্যে উত্তরাধিকারকে এই পরিমান জমি বন্দোবস্ত দিবেন যা বন্দোবস্ত জমি ও তার বর্তমান দখলীয় জমির পরিমান ৬০ বিঘার অতিরিক্ত না হয়। বন্দোবস্তের পর অতিরিক্ত জমি যদি থাকে তা সরকারের উপর ন্যাস্ত হবে।

ধারা– ৬ উপধারা পাঁচ অনুযায়ী বন্দোবস্তকৃত জমি সালামীমূক্ত হবে তবে শর্তসাপেক্ষ হবে যে রাজস্ব অফিসার কর্তৃক ন্যায় সংগত ধার্যকৃত ভূমি উন্নয়ন কর দিতে বাধ্য থাকবে।

ধারা– ৭ সরকারের উন্নয়ন কাজের কারণে কোন জমি পয়স্তি হলে এই জমির ক্ষেত্রে এই ধারার বিধান প্রযোজ্য হবেনা।

মন্তব্য– দুংখের বিষয় এই যে, এই আইনের ৮৬ ধারার সর্বশেষ সংশোধনী মাঠ পর্যায়ে যথাযথভাবে প্রতিপালন হচ্ছেনা যেমন এই ধারা সংশোধনের পর ১৩ জুলাই ১৯৯৪ তারিখ হতে প্রতি বছর নদী সিকস্তি বা পয়স্তির কোন রেকর্ড তৈরী হচ্ছে না।

জমির মালিকরা আইনটি সম্পর্কে অবহিত না থাকায় তাদের জমি সিকস্তি হওয়ায় তা আবেদনের মাধ্যমে সরকারকে অবহিত করছেনা বা উক্ত তারিখের পর সিকস্তি জমি পয়স্তি হলেও প্রজা/মালিক আইনটি না জানার কারণে বা কালেক্টর বা রাজস্ব কর্মকর্তা কর্তৃক ঐসব জমি সম্পর্কে সরেজমিনে মৌজা এলাকায় বিজ্ঞপ্তি জারী না করায় আইনটি প্রনয়নের সুফল থেকে নদী ভাঙ্গা অসহায় প্রজারা বঞ্চিত হচ্ছে।

এতে ক্ষতিগ্রস্তরা ভূমি হারিয়ে বস্তিতে বা রাস্তার ধারে মাথা গুজে আছে তারা, শহরমুখী হওয়ায় শহর জনসমুদ্রে পরিনত হয়ে যাচ্ছ সরকারকে এসকল প্রজাদের পুনর্বাসনের জন্য প্রতিবছর বাজেটে অর্থ সংকুলান রাখা হচ্ছে ।

সুপারিশ– নদী সিকস্তি প্রজাদের আশ্রয়ন প্রকল্প বা গুচ্ছ গ্রামে সরকারি অর্থ ব্যয়ে পুনর্বাসনের আগে তাদের পয়স্তি জমি বন্দোবস্ত দিয়ে পুনর্বাসনের জন্য

১. আইনটি জারীর পর প্রতিটি উপজেলায়, জেলায় বা দেশে কি পরিমান জমি সিকস্তি হয়েছে এবং বিগত প্রায় ২৬ বছরে কি পরিমান জমি পয়স্তি হয়ে তা যাচাই করা।

২. ঐ সময়ের মধ্যে পয়স্তি জমি ক্ষতিগ্রস্ত প্রজাদের বন্দোবস্ত দেয়া হয়েছে কিনা বা বন্দোবস্তযোগ্য জমির উদ্ভব হয়েছে কিনা তা যাচাই করে বন্দোবস্তের উদোাগ গ্রহণ করা।

৩. প্রতি বছর বর্ষা পরবর্তী শুষ্ক মৌসুমে সিকস্তি ও পয়স্তি জমির তালিকা করে সিকস্তি পয়স্তি রেজি- ৮ এ নিয়মিত লিপিবদ্ধ করা। যাতে পরবর্তীতে নদী ভাঙ্গা অসহায় প্রজারা ন্যায়তঃ তাদের জমি ফেরত পায়।

৪. প্রতিমাসে নদী সিকস্তি ও পয়স্তি জমি কৃষি খাস জমি বন্দোবস্ত ষ্টেটমেন্ট-এর মধ্যে মাস ভিত্তিক অগ্রগতির তালিকার অন্তরভূক্ত করা।
৫. এই আইন বাস্তবায়নে গাফিলতির ফলে নদী ভাঙ্গা অসহায় মানুষদের ন্যায়তঃ অধিকার বঞ্চিতকারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

 আইনটি জনস্বার্থে নদী ভাঙ্গা মানুষের জন্য প্রচারের অনুরোধ রইল

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধ“বর্ণমালার অনন্ত সংগীত”-অনুপম সৌরিশ সরকারের কবিতা
পরবর্তী নিবন্ধ“আগুনপাখির গল্প”… -কবি সুলেখা শামুক‘এর কবিতা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে