বিপন্ন বাঙালি/ পার্থ বসু

0
814
partho

বিপন্ন বাঙালি/ পার্থ বসু

১ ধান ভানতে শিবের গাজন

বিপন্ন বাঙালি।বিষয়টি নিয়ে স্যোসাল মিডিয়া এখন তোলপাড়।শুরুটা এই ভাবে করতে পারলে স্বস্তি পেতাম। ভাষা বিপন্ন।বাঙালির অধিকার বিপন্ন।বাঙালির অস্তিত্ব বিপন্ন।জাতি বিপন্ন।বারুদ আছে বাতাসে।কিন্তু কেমন যেন মিয়নো।অশান্ত আসাম।উৎখাত হচ্ছে ভূমিপুত্র বাঙালিরা।এন আর সি-র আতঙ্ক,ডিটেনশন ক্যাম্প আজ ওই রাজ্যে বাঙালির বিভীষিকা।প্রতিবেশীর চালার আগুন এ বাংলায় আসলো বলে।সেই মর্মে হুমকি আসছে।ভারতের মুক্তিসংগ্রামে যে বাঙালি জাতি সবচেয়ে বেশী রক্ত দিল,তারাই আজ নিজভূমে পরবাসী!এই কথাগুলি লিখতে লিখতে খবর পেলাম সুপ্রীম কোর্ট ইংরাজি ছাড়াও সাতটি ভারতীয় ভাষায় রায় দেবেন।অনুবাদে।বাংলা বাদ!তা নিয়ে প্রিন্ট মিডিয়া মায় বাংলার রাজনৈতিক দলগুলির তেমন হেলদোল নেই।বাঙালি এই উপেক্ষা, এই অপমান হজম করে নেবে? মিছিল কই প্রতিবাদের? এই ক্ষোভে হরতাল ডাকা যেত?বাঙালি কি শিরদাঁড়াও খুইয়ে বসে আছে? বিপদ এখনও বুঝছে না? এতোটাই বিপন্ন?

২ এই দাঙ্গা উপত্যকা আমার দেশ নয়

না।পরিস্থিতে তলে তলে অগ্নিগর্ভ।একটি স্ফুলিঙ্গ যদি—
সত্তরের দশকে লেখা নবারুণ ভট্টাচার্য একটি কবিতা লিখেছিলেন।ভিয়েতনাম।কবি লিখেছিলেন ভিয়েতনাম নিয়ে তিনি কিছুতেই কবিতাটি লিখতে অপারগ।কারণ ভিয়েতনাম কথাটি লেখার আগেই তার তালুর মধ্যে বোমার মতো ফেটে যাচ্ছে।বাঙালি কথাটিও বিপন্ন বাঙালি এই অভিধায় একই ভাবে বিস্ফোরক।লিখতেও বিপদ।
বিপদের লক্ষণগুলি চেনা ,কিন্তু সয়ে গেছে। গলায় বকলসের মতো।আরও রূড় করে বললে অদৃশ্য ফাঁসের মতো।বিপদের কথা বুঝতে গেলে,বলতে গেলে আগে বাঙালি জাতিসত্তার প্রশ্নে আসতে হয়।অমনি কিনা আঁতকে উঠবেন অনেকেই।সাতচল্লিশের দেশভাগের পরিণতি যে ভুল ভারতবর্ষ তাতে বাংলার পশ্চিম প্রতিস্থাপিত হয়েছিল। ভারতপ্রতিমায়।বাংলা ভাগ হয়েছিল।বলা ভালো বাংলাদেশ ভাগ হয়েছিল।দেশ।বাঙালির বিপন্নতার অনতিঅতীত পর্বটি ওই সাতচল্লিশের ক্ষতলাঞ্ছিত।পুব বাংলা ১৯৫১য় হ’ল পাকিস্তান।অবশিষ্ট বাংলাটি তখন একাই বাংলা।তারপরই রাজনীতি বাঁক নিল অন্য খাতে।বাহান্নয় বাংলা ভাষার অধিকার রক্ষায় ঢাকায় ছাত্র আন্দোলনে শহিদ হলেন বরকত,রফিক,সালামেরা।কালে কালে একাত্তরে স্বাধীন হ’ল বাঙালি।ওপারের বাঙালি।জন্ম নিল বাংলাদেশ।এপারের বাঙালির আত্মপরিচয় তাতে বিঘ্নিত হ’ল কি? কবির কলমে সে আমাদের বাংলাদেশ আর তেমন করে আমাদের রইল না।বাংলাদেশ শব্দটি অধিকার করে নিল বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় প্রপঞ্চ।ওপারে বাঙালি বঞ্চিত হ’ল।বঞ্চিত ,কারণ এই বাংলাদেশ কবি বন্দিত সমগ্র বাংলার প্রতিনিধি নয়।তবু খণ্ডিত হলেও বাংলার এই বৃহত্তর খণ্ডে বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ হ’ল । এপারে বিভ্রান্তি হ’ল গাঢ়তর। বিশ্বের দরবারে ওপার বাঙালির এই উত্থানে এপার গর্বিত।কিন্তু শরীক নয়।

৩ ওপারে যে বাংলাদেশ,এপারে সেই বাংলা

দেশ ভাগ হয়েছে।বাঙালির দূর্ভাগ্য।কিন্তু জাতি অবিভাজ্য।তাই টানাপোড়েন।তাই বিপন্নতা।দেশভাগের যা কিছু ক্ষয় ক্ষতি বাংলার।বাঙালির।পাঞ্জাবের কথায় আসছি না।পাঞ্জাবের ক্ষত নিরাময় না হোক, ক্ষতি পুষিয়ে দিয়েছিল ভারত রাষ্ট্র।ইউনিয়ন অব ইণ্ডিয়া।এই নিবন্ধে ভারতকে, বাস্তবে যা এবং সংবিধানেও যা,রাষ্ট্র বলব।এই রাষ্ট্র নানা দেশের, নানা ভাষার,নানা জাতিসত্তার সমাহার।তাই রাষ্ট্র ভারত একক কোন দেশ নয়।
ভারতবাসী এই পরিচয় একটি নাগরিক পরিচয়।জাতি গঠিত হয় ভাষার পরিচয়ে।তাই বহুভাষিক ভারতে,যেহেতু জাতিরাষ্ট্র নয়,ভারতীয় বলে কোন জাতি হয় না।নেই।ভারতীয় নাগরিক।কিন্তু জাতীয়তায় কেউ বাঙালি, কেউ গুজরাতি, কেউ তামিল,কেউ তেলেগু,কেউ কন্নড়,কেউ অসমীয়া,ওড়িয়া,কন্নড় ইত্যাদি ইত্যাদি।অথচ চক দে ইণ্ডিয়া প্রকল্প একটি আগ্রাসী নির্মান যার মালিক হিন্দিবলয়।হিন্দিস্তান।সংবিধানে ভারতীয় কোন ভাষাই জাতীয় ভাষার স্বীকৃতি পায় নি।না পাক, হিন্দি রাষ্ট্রভাষা,নিদেন পক্ষে রাজভাষা এই অসংবিধানিক না-পাক দাবিটি স্কুলপাঠ্য।রাষ্ট্রভাষা অনির্ণীত।কিন্তু দপ্তরী ভাষার প্রশ্নেও বিপন্ন বাঙালি ভোটে হারলো।একটি মাত্র ভোটে।১৯৫০য়। কৌশলের রাস্তা নিল হিন্দিবলয়। বাংলাবিরোধীরা। ইংরাজি রইল হিন্দির সঙ্গে পনেরো বছরের কড়ারে।তারপর একাই হিন্দি।স্বতই স্বরাট।বিপন্ন বাঙালি তখনও বিপদ বুঝেছিল?
না।নতুবা,পনেরো বছর পর ১৯৬৫তে লড়াই শুরু করল একা তামিল জনগণ।তখন বাঙালি ব্যস্ত অন্য মৌতাতে।পাকভারত যুদ্ধ বাধল।দুই রাষ্ট্রের স্বার্থ আর সীমানার যুদ্ধ।তামিলনাড়ু তাদের নাড়ুর তথা দেশের স্বার্থে,তামিল ভাষার স্বার্থে জীবন দিল প্রকাশ্য রাস্তায়।মাতৃভাষার জন্য তাদের এই হিন্দিআগ্রাসন প্রতিরোধের শুরু বৃটিশ জমানায়।১৯৩২য়ে।দু’জন প্রাণ দিয়েছিলেন পুলিশের হেফাজতে।আমরা যারা বাহান্নর ভাষা শহিদদের মাতৃভাষার সংগ্রামে পুরোধা মনে করি,মনে রাখতে হবে এই উপমহাদেশে এই গৌরব তামিলদের।বাঙালি বত্রিশে,এমনকি পঁয়ষট্টিতেও পাশে দাঁড়ায় নি।যদিও তামিল আত্মাহূতির ফল ভোগ করছে, করছি অহিন্দিভাষী সব জাতিই।ভাষা নিয়ে এই তীব্র আবেগ বাঙালির নেই বা ছিল না এমন নয়।নইলে পূব বাংলা পূব পাকিস্তান নামধেয় হওয়ামাত্র দেশভাগের মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই উর্দূ আগ্রাসন প্রাণের মধ্যে রুখল কি করে? এপার বাংলায় সেই আবেগের ছিটেফোঁটাও দেখা গেল না কেন? শিলচরে বাংলাভাষার জন্য একাদশ শহিদও তার প্রাণে আলোড়ন তুলল কই?
আসলে জান আর জবান ওতোপ্রোত।ওপার বাংলা এই অনুভবে জারিত হতে সময় নেয় নি।এপারে সদ্য হতমান বাংলা ভাষার জন্য বাংলা আফসোস করেছে বড় জোর।তারপর আপোষ করেছে।বিপন্ন বাঙালির ক্লেশ বহুগুণিত হয়েছে শিরদাঁড়াহীন, মেরুদণ্ডহীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের অপদার্থতায়।এবার সে প্রসঙ্গে আসব।

৪ তেলের শিশি ভাঙল বলে

আমি বাঙালি জাতির উন্মেষ বা অন্য ইতিহাসে যাচ্ছি না।চর্যাপদের ভুসুক আনন্দে বা বিপাকে বঙালি হলেন সে তর্কেও না।বাংলাদেশের লেখিকা সেলিনা হোসেনের একটি কল্প উপন্যাস আছে এ বিষয়ে।ইতিহাসে ও অনুমানে।আগ্রহী পাঠক পড়ে নিতে পারেন।এই উপন্যাসে রাজদরবারে উপেক্ষিত,অবহেলিত বাংলাভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার ছায়াটি বা কায়াটি বাংলাদেশের বাস্তবতায় বাংলাভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি অর্জনের যাত্রাটি সমান্তরাল।ভারতে তা হতে পারে নি।অবশিষ্ট বাংলা তখন উত্তর ভারতের মৃগয়াক্ষেত্র।এলোমেলো করে দে মা লুঠেপুটে খাই।পলাশীর যুদ্ধের আগের উত্তমর্ণ বাংলা,তথা পূর্ব ভারত বা পূর্বদেশ বৃটিশ লুণ্ঠনে অধমর্ণ কবেই।নতুন লুণ্ঠনে এবার সর্বস্বান্ত হ’ল আবারও।সেসব কাহিনী বিবৃত আছে রঞ্জিত রায়ের ‘এগনিজ অব ওয়েস্ট বেঙ্গল’য়ে।উপনিবেশবিরোধী ইতিহাস চর্চার পাতায় পাতায়।সুশীল চৌধুরী আর আরও নানাজনের লেখাপত্রে যাতে ঔপনিবেশিক মানসিক গঠনের গোড়ায় ঘা পড়েছে।এই নিবন্ধে তা বিস্তৃত বলার সুযোগ নেই।
দেশভাগ নিয়ে অন্নদাশঙ্কর রায়ের সেই বুক ভাঙা আর্তনাদের ছড়াটি,গানটি মনে পড়ছে?

তেলের শিশি ভাঙল বলে খুকুর পরে রাগ কর
তোমরা যে সব বুড়ো খোকা ভারত ভেঙে ভাগ কর
তার বেলা?
এই কবিতায় গানে ভারতের কোন দীর্ঘশ্বাস ধ্বণিত নয়।যা কিছু কান্নার গাথা তা মূলত এই বাংলার।এই বাংলাদেশের।বাকি ভারতের এই বাংলা ভাগে কিছু যায় আসে নি।মারওয়াড়ি ও গুজরাতি পুঁজির স্বার্থে বাংলা ভাগ হলই।ভিটেমাটি হারাল হিন্দুমুসলমান নির্বিশেষে বাঙালিই।অবাঙালি কারও চোখের জল পড়ে নি এটি আমার স্বোপার্জিত অভিজ্ঞতা।অনেকক্ষণ বকে যাচ্ছি।বরং একটু স্বাদ বদলাই।গল্প শোনাই।

৫ নেপোয় মারে দই

নব্বইয়ের দশকে আমি তখন ব্যাঙ্কের শাখায় বদলী হয়ে তিনসুকিয়ায়।বঙ্গালখেদা তখন সাময়িক ভাবে স্তিমিত।বাঙালি অচ্ছুৎ।তাই প্রশাসনে,সরকারি বেসরকারি সংস্থায়,অফিস আদালত, ব্যাঙ্কে তখন প্রতিবেশী উড়িষ্যা বা বিহার ক্যাডার সমাদৃত।আমার সহকর্মী তিনজন উড়িষ্যার।একজন উড়িষ্যার মাড়ওয়ারি।তিওয়ারি।বাংলাদেশের সন্দ্বীপে সে বছর,বিধ্বংসী বন্যা হ’ল। আমি হায় হায় করছি।তিওয়ারি বলল— বাসু সাব।আচ্ছাই হুয়া কি বাংলাদেশ আলাগ হো গিয়া।নহী তো ইস অবসরপর ভারত সরকার কা কিতনী এক্সচেকার বরবাদ হোতি! তিওয়ারির কণ্ঠে চিনে নিন বাকি ভারতের প্রতিক্রিয়া।কঠিন কণ্ঠে উত্তর দিলাম—আপলোগ তো রেগিস্তানকে রহনেওয়ালে।দেশমে দানাপানি নহি মিলতা তে ভারতকি কোণে কোণে মে সাহারা মাঙ্গা।তুমলোগকো ওয়াস্তে,রেগিস্তানকি পিছে সরকার কি কিতনে পয়সা বরবাদ হো রহা?
আবার বিষয়ে আসি।অন্নদাশঙ্কর এই কবিতায় সমৃদ্ধ পূর্বদেশ তথা বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীর প্রেক্ষিতে, বৃটিশ ভারতের প্রথম রাজধাণী কলকাতার প্রেক্ষায় অন্তত পূর্ব ভারতে বাঙালির স্বাভাবিক নেতৃত্বের আলোয় ভাগের যন্ত্রণা রাষ্ট্রের পরিসরে ব্যাপ্তি দিতেচেয়েছিলেন।বাঙালির যুদ্ধ ও যন্ত্রণাও তিনি মেশাতে চেয়েছেন ভারতীয়তায়।বাঙালি কবিই লিখতে পারেন সকল দেশের রাণী বাংলাদেশের কথা। আবার গেয়ে ওঠেন—উঠ গো ভারতলক্ষী,উঠ আদি জগতজনপূজ্যা।অন্নদাশংকর অন্যত্র লিখেছেন,স্মৃতি থেকে উদ্ধৃত করছি— বাংলার রাজধানী কলকাতা।বিহারের রাজধাণী কলকাতা।আসামের রাজধানী কলকাতা।উড়িষ্যার রাজধানী কলকাতা।—- মানে? শিল্পে,সাহিত্যে,বাণিজ্যে,শিক্ষায় কলকাতা এই সমগ্র অঞ্চলের অভিভাবক।এই পূর্বদেশ বৃটিশ আমলেই খণ্ডিত হয়েছে।বাঙালি পায়ের তলার মাটি হারিয়েছে।বাঙালি বিপন্নতার সূচনাপর্বে এবার তাকাই আসুন।

৬ যে বাংলাভাগ ভুলে গেলাম

১৯০৫ এ বঙ্গভঙ্গ এবং প্রতিরোধে প্রতিবাদে তা ১৯১১য় রদ হওয়ার কথাটি বহুল চর্চিত।যেটি চর্চায় আসে না তা হল ১৮৭৪ য়ে পূর্বদেশের আসাম প্রদেশ গঠন।তাও বাংলা ভেঙেই।নবগঠিত রাজ্যটি রাজস্বে স্বনির্ভর হোক এটাই আপাত লক্ষ্য।তৎকালীন বাংলার বৃহত্তম জেলা,শিক্ষায় সংস্কৃতিতে প্রাগ্রসর জেলা,চৈতণ্য মহাপ্রভূর পিতৃপুরুষের মাটি শ্রীহট্ট ও রংপুর বিভাগের বৃহদংশ গোয়ালপাড়া সমেত সমগ্র কাছাড়, সবখানেই বাঙালিই ভূমিপুত্র,আসামে জুড়ে দেওয়া হ’ল। বৃটিশের স্তোকবাক্যে বাঙালির আদালত কলকাতা আর বিশ্ববিদ্যালয়ও রইল কলকাতাই।কালে কালে বাঙালির আম গেল।ছালাও গেল।
শ্রীহট্ট তথা সিলেট সফরে কবিগুরু এক অনুরাগীর ডায়েরীর পাতায় কয়েক চরণ লিখে দিয়েছিলেন—কবি শ্রীহট্টের নাম দিয়েছিলেন শ্রীভূমি- সেটিও শুনুন—
মমতাবিহীন কালস্রোতে
বাঙ্গালার রাষ্ট্রসীমা হতে
নির্বাসিতা তুমি
সুন্দরী শ্রীভূমি।
কলকাতায় শ্রীভূমি পাবলিশার্সের নাম শুনেছেন তো। কবির এই নাম তারা শিরোধার্য করেছেন।সাতচল্লিশে শ্রীহট্ট তৎকালীন ডামাডোলে পাকিস্তান হয়ে এখন আবার বাংলাদেশে।ভাগ্যিস! ভাগ্যিস বলছি, কারণ, অসহিষ্ণু অসমীয়া জাতিবাদ ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের সম্ভাবনায় সিঁদূরে মেঘ দেখছিল।আসামে তারাই সংখ্যালঘু।সঠিক বিচারে আজও।তো গোপীনাথ বরদলৈ বরাকবাংলার বদরপুর থেকে বাঙালির ভোটে জিতে বাঙালির পিঠেই ছুরি বসালেন।মাটি ভাগাভাগির প্রশ্নে তখন তারা সমস্ত সিলেট পাকিস্তানে পাঠাতে ব্যগ্র।বাঙালি খেদানোর অঙ্কুরটি এখানেই নিহিত।গণভোট হ’ল। প্রশাসন বহু বাঙালির,বিশেষ করে চা-বাগানের কুলিবাঙালির ভোটাধিকার দিলই না।সেই জাতিবিদ্বেষ এখনও বিদ্যমান।আজকের এনআরসি বা নাগরিক পঞ্জীর গল্পটিও এই বিদ্বেষ জারিত।বাঙালি বিপন্ন।একষট্টির শিলচরে ভাষা আন্দোলন দূষিত হয়েছিল বস্তুত সরকারি মদতপুষ্ট দাঙ্গায়।হিন্দুমুসলমান বিভাজনে।অস্ত্রের মুখে প্রাণ বাঁচাতে গোয়ালপাড়া, কাছাড়,হোজাই, জোরহাটের মুসলমান বাঙালি দলে দলে অসমীয়া পরিচিতি স্বীকার করেন বাধ্য হয়ে।নেলীর গণহত্যা তাতে এড়ানো যায় নি।তবে এন আর সিতে বাদ পড়া একচল্লিশ লক্ষের মধ্যে আটত্রিশ লক্ষ বাঙালি হিন্দু বাঙালি।বাকিটা মুসলমান বাঙালি।এই বিপদ সমাসন্ন এই বাংলাতেও।
বিপন্ন বাঙালি জাতিসত্তাই শুধু নয়।বিপন্ন তার পূর্বদেশের পুরোধা নেতৃত্বের আসনটিও।এই নেতৃত্বের আসন বৃটিশের বিনির্মিত ভারতকাঠামোর অবদান নয়।বাংলার বহির্বাণিজ্য, মসলিন, রেশম, তাঁত, মশলা ও নৌশিল্প, কারিগরী উৎপাদন, তামা, লোহা সব মিলিয়ে বাংলা ছিল সমৃদ্ধির শীর্ষে। এমনকি শিক্ষায়। মেকলের ইউজফুল ইডিয়ট তৈরীর কারখানাগুলি তৈরী হবার আগে অ্যাডামকৃত শিক্ষাসমীক্ষাটি পাঠ করলে চোখ কপালে উঠবে।যতদূর মনে করতে পারছি বাংলায় পাঠশালাই ছিল আট হাজারের উপর।শিক্ষকের পেশায় ছিলেন শূদ্র এবং নারীরাও বিপুল সংখ্যায়।মেকলে পাত্তা দেন নি। চাপিয়ে দিলেন ইওরোপীয় মডেল। বৃটিশ শাসনের দুশ বছরে বাঙালি সমাজে পরগাছা তৈরি হ’ল। বিপন্ন হ’ল। অথচ এই অসুখ চেনার জন্য যে মানসিক গঠন তা তখন প্রভূর ভজনা শিখছে। শিক্ষিত অশিক্ষিতের বিভাজন করছে প্রভূর ইচ্ছায়।ইংরাজির নিরিখে।
দেশভাগের পর,আমি স্বাধীনতা শব্দটি সচেতন ভাবেই পরিহার করছি, সাদা হাতির কালো মাহুতরা তড়িঘড়ি ডোমিনিয়ন স্ট্যাটস পেয়েই তা স্বাধীনতার মোড়কে পেশ করলেন।একটি শিথিল কেন্দ্র আর শক্তিশালী রাজ্যের সমাহার উপেক্ষা করে সরাসরি বৃটিশ শাসন মডেলটিই গ্রহণ করলেন।অথচ দেশভাগের বিকল্প ছিল। বাংলা তথা পূর্বদেশের জন্য সি ইউনিটের প্রস্তাব ছিল।জিন্না বস্তুত ক্ষমতার স্বার্থে পাকিস্তানের দাবিটি রেখেছিলেন। তিনি জানতেন সারা ভারতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুসলিমরা ধর্মের জোয়ারে একটা পাক ভূখণ্ডে পুনস্থাপিত হবে তা বাস্তব নয়।তাই জিন্না মেনে নিয়েছিলেন সি ইউনিটের প্রস্তাব।বৃটিশ এমনকি ভারতের প্রত্যক্ষ দখল ছাড়তে আটচল্লিশের জুন অবধি সময় চেয়েছিল।এর মধ্যে গণভোটে নির্ধারিত হতে পারত স্বাধীন অখণ্ড বঙ্গের ভাগ্য।নেহেরু সি ইউনিট প্রথমে মেনে নিয়েও পিছু হটার সংকেত দেন।তার ফল বিড়লা গোয়েঙ্কা প্রযোজিত গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং।
বাংলা,অখণ্ড বাংলায় ছিল মুসলিম প্রাধান্য।বাংলা সংহত হয়েছিল সুলতানী শাসনে।বাংলা সেভাবে দিল্লির দখলে ছিল না কোনদিনই।হুসেন শাহর আমলে বাংলার সাহিত্য সংগীত সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে।কিন্তু ইওরোপীয় মানসগঠনের তথাকথিত রেনেঁসাসের বাঙালি ক্রুসেডের অন্ধকারে তার বহুকালের সম্প্রীতির দোসর,প্রতিবেশী মুসলমানকেই শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করল।জয়া চ্যাটার্জীর তথ্যনিষ্ঠ গবেষণায় ভদ্র বাঙালির, হিন্দু বাঙালির এই অধঃপতন চিত্রিত হয়েছে।বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে মুসলমানদের,মুসলমান বাঙালিদের সাথেও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ার লড়ার ক্ষেত্রটি প্রস্তুত হয় নি। বন্দেমাতরমের উদ্গাতা বঙ্কিমও আনন্দমঠে মুসলমান বা যবন শাসনের ইতি চেয়েছেন।অথচ শাসক রাজা হিন্দু না বৌদ্ধ এমনকি মুসলমান তা ভারতের প্রজাকূলের বিবেচ্য ছিল না কখনই।পাঠান আফগানরা এইসব ব্যতিক্রম ছাড়া মুঘল শাসনও ভারত বা বাংলাকে লুঠ করে সম্পদ দেশান্তরিত করে নি।বৃটিশপোষিত ঐতিহাসিকরা মুসলিম শাসনামলকেও ভারতের এমনকি বাংলার পরাধীনতা বলে চিহ্নিত করলেন।একই যুক্তিতে বৃটিশ আমল ধর্মের মোড়কে ব্যাখ্যা পেল না।বলা হ’ল না খ্রীষ্টান শাসন। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজের নামে স্বেচ্ছাচার আর উচ্ছৃঙ্খলতার অপবাদ দিয়ে এইসব ঐতিহাসিকরা ছলনায় পরাস্ত করে ষড়যন্ত্রী যে বণিকের মাণদণ্ড পোহালে শর্বরী দেখা দিল রাজদণ্ড রূপে তাকেই মান্যতা দিলেন।এই কলোনিয়াল হ্যাংওভার,নেশার ঘোর, কাটিয়ে উপনিবেশবিরোধী ইতিহাসচর্চার ধারায় ফিরে দেখা এখন জরুরী।

৭ উলটপুরাণ

১৬০০ খৃষ্টাব্দে লণ্ডনে বাংলার একটি কাঁথা নিলামে দর পেয়েছিল ২০ ডলার।আরও নির্দিষ্ট করে বললে সালটি ১৬১৮।তথ্যসূত্র Spinning World-Giorgio Riello n Prasannan Parthasarathi ২১৯ পাতা।তার মানে চারশ বছর আগে বিশ্ববাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল ভারতীয় উপমহাদেশ এবং শীর্ষে বাংলা।সেদিনের ২০ ডলার আজকের দরে হিসাব করুন।
বাঙালির বিপন্নতা তাহলে পলাশীর পরের কথা।পলাশীর প্রাকপর্বে বাংলার ব্যবসায়ী, বণিক, তাঁতী, কারিগর,কাঁসারী ও কামার স্বাধীনভাবে কোন রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ছাড়াই দরকষাকষি করতে পারতেন।তথ্যসূত্র How India Clothe The World Of South Asian Textiles—জর্জিও রিওলো ও তীর্থঙ্কর রায়।
উপনিবেশেপূর্ব রাষ্ট্র করপোরেট বন্ধু ছিল না।চাষী কারিগররা শাসককে পাশে পেতেন।
ইওরোপের চোখে এরপর যারা ভারতের তথা বাংলার ইতিহাস রচনা করেছেন তার বিপ্রতীপে যারা কলম ধরেছেন তাদের কিছু নাম উল্লেখ করি।আগ্রহী পাঠক খুঁজে পেতপ পড়বেন।বারবার সূত্র উল্লেখ করলে ব্যাপারটি একাডেমিক আদল পাবে।এবং গোড়ায় গেয়ে নিচ্ছি আমি একাডেমিক আলোচনার যোগ্য নই।আমার মতামত ব্যক্তিগত এবং যত না অধ্যয়ন তারও বেশী সাধুসঙ্গপ্রসূত।বাঙালির বিপন্নতার কালক্রম ও কায়াটি বুঝতে আমি হরপ্রসাদ শাস্ত্রী থেকে ওমপ্রকাশ,সুশীল চৌধূরী,প্রসন্নন পার্থসারথী,জর্জিও রিওলো,বিশ্বেন্দু নন্দ,জয়া চ্যাটার্জী,ফরিদা মজিদ,রাজু আহমেদ মামুন,সুভাষ মুখোপাধ্যায় এমন নানা গুণীজনের কাছে হাত পেতেছি।ভেবেছি।প্রভাবিত হয়েছি।আবার ভেবেছি।যা লিখছি এই সব কিছুর নির্যাস।এর পর আর রেফারেন্স দেব না।আলাপে তাল কেটে যায়।
পরের পর্বে যাওয়ার আগে বাঙালির বিপন্নতার সালতামামি দিয়ে রাখি।অনেকটাই আলোচনায় ইতিমধ্যে এসে গেছে।
১৭৫৭— পলাশীর তথাকথিত যুদ্ধ।এই বাংলায়,ডুবিয়াছে হায় ভারতের দিবাকর।
১৮৭৪—বেঙ্গল প্রভিন্স ভেঙে নআগঠিত আসামে গেল বাঙালির শ্রীহট্ট গোয়ালপাড়া।
১৯০৫—বঙ্গভঙ্গ।
১৯১১—বঙ্গভঙ্গ রদ।কিন্তু শ্রীহট্ট গোয়ালপাড়া রইল বাংলার রাষ্ট্রসীমা থেকে নির্বাসিত।
১৯১১ – রাজধানী গেল কলকাতা থেকে দিল্লি।
১৯৩৬—বিহার রাজ্য গঠন হ’ল। বাংলাভাষী মানভূম বাংলায় রইল না।
১৯৪৭—বাংলা ভাগ হ’ল।
১৯৫০—হিন্দি ভারতের দপ্তরী ভাষা হিসাবে গৃহীত হ’ল এক ভোটে বাংলাকে হারিয়ে।সাথে রইল ইংরাজি।
রাষ্ট্রভাষা বা জাতীয় ভাষার তকমা না পেয়ে একটি ১৫ বছরের সীমা টানা হ’ল। তারপর ইংরাজি থাকবে না।হিন্দি একাই স্বরাট।১৯৬৫ তে আগুনে আত্মাহূতি দিয়ে হিন্দিকে রুখল তামিল জনতা।
পাতা উলটোই?

৮ দুখিনী বর্ণমালা

সংবিধানে হিন্দি দপ্তরী ভাষার স্বীকৃতি পেল বটে, কিন্তু লিপি? হিন্দি সোল্লাসে রাষ্ট্রীয় মদতে খোলাখুলি পঞ্চাশটি ভাষাকে গিলে খেল।এরা নাকি হিন্দির উপভাষা।এই তালিকায় সবচেয়ে যে রাজ্যটির জনতা বিপন্ন হ’ল সেটি কিন্তু বিহার।যা একদা বেঙ্গল প্রভিন্সের অঙ্গ ছিল।আমি সমগ্র বেঙ্গল প্রভিন্সকে পূর্বদেশ বলব।বিহার দেশভাগের পর অবশিষ্ট ভারতে,ভুল ভারতে ভাষার ভিত্তিতে পুনর্গঠিত হলে আমরা মিথিলা,ভোজপুর প্রভৃতি ভাষাভিত্তিক রাজ্যগুলি পেতে পারতাম।বিহারের ভাষাগুলির মধ্যে মৈথিলির লিপি ছিল বাংলার সাথে প্রায় অভিন্ন।এখনও নেপালে মৈথিলির লিপি বাংলা।ভোজপুরীর নিজস্ব লিপি ছিল কৈথী।সহজ ও সুন্দর।ওদিকে রাজস্থানীও হিন্দির খপ্পরে পড়ে নিজস্বতা হারালো বা হেঁসেলে কোণঠাসা হ’ল ।রাজস্থানের কথা ছেড়েই দিচ্ছি লিপির সাযুজ্যে যে স্বাভাবিক মৈত্রীর পরিসর সংবিধানে এক কলমের খোঁচায় রক্তাক্ত হল।হিন্দির বা অনুরূপ হিন্দিসমগ্রের লিপি সাব্যস্ত হল দেবনাগরী।মনে রাখতে হবে এমনকি ধ্রুপদী ভাষা সংস্কৃতেরও নিজস্ব লিপি ছিল না।সারা ভারতে অন্তত চারটি প্রধান লিপিতে সংস্কৃতের চর্চা হতো। বাংলাতে বাংলায়। দেবনাগরী চাপিয়ে দেওয়া লিপি।এতে নানা জাতিসত্তার বিকাশ ধ্বংস হয়েছে বা অবরুদ্ধ।বাঙালির মাথাব্যথা এখানেই, বাঙালি অবস্থানগত কারণেই পূর্বদেশের স্বাভাবিক নেতৃত্বে ছিল।বাঙালি কবি স্বাধীনতা সকল দেশের রাণী বাংলার কথা যেমন গেয়েছেন, জননী ভারতবর্ষেরও বন্দনা করেছেন।যে ভারত কল্পনাটি হিন্দুত্ব আর হিন্দির মোড়কে আড়ালে আবডালে এবং এখন প্রকাশ্যেই বর্বরের দখলে।বাঙালি একা বিপন্ন নয়।বিপন্ন পূর্বদেশ। পূর্বভারত। তার পাট,চা,খণিজের নিয়ন্ত্রণ আর দখল আজ দিল্লির হাতে।তার লবন শিল্পও তা নয়।এই বিষয়ে পূর্বদেশ যাতে একজোট না হতে পারে তার সার্বিক প্রয়াস এখনও অব্যাহত দিল্লির তরফে।বিপন্ন বাঙালি চর্চায় এই তথ্যগুলি প্রাসঙ্গিক।
পূর্বদেশে বাংলা লিপি ব্যবহার করেন বা করতেন কারা কারা? কোন কোন জাতি?
তালিকায় চোখ রাখুন।বাংলা,অসমীয়া,ডিমাসা,ককবরক,বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী,মণিপুরী মৈতৈ।এর মধ্যে মেঘালয়,নাগাল্যাণ্ড রোমান লিপি গ্রহণ করেছে।ডিমাসাভাষীরা বাংলা লিপির প্রতি অধুনা বিরূপ।সাঁওতালি ভাষার কথা ভুললাম কি করে? সাঁওতালি এখনও বাংলা লিপিতেও লেখা হয়।তবে রাজ্যভেদে যেমন ঝাড়খন্ডে তারা দেবনাগরীতে অভ্যস্ত হচ্ছে বা হচ্ছিল।তারা একটি নিজস্ব লিপি উদ্ভাবনে সক্ষম হয়েছেন।অলচিকি। এটি সরকারি স্বীকৃতিও পেয়েছে।
বিপন্ন বাঙালির কথা বলতে গিয়ে সাঁওতালির কথাও কেন বলছি? বাঙালিকে তার শিকড়বিচ্ছিন্ন করেছিল মেকলীয় শিক্ষা।অ্যাডাম সাহেব বাংলার শিক্ষাপরিকাঠামো নিয়ে একটি আলাদা,সমীক্ষা করেছিলেন।১৮৩৫ য়ে।মেকলে এই সমীক্ষা উপেক্ষা করেন।অ্যাডাম সাহেব একেবারে ক্ষেত্রসমীক্ষা করে যা জেনেছিলেন ও জানিয়েছিলেন,সেই মর্মে রিপোর্টও পেশ করেছিলেন তা শিহরিত হওয়ার মতো।অ্যাডামের সমীক্ষায়,তাঁর করা মোট ছয়টি জেলা—রাজশাহী,বীরভূম,মুর্শিদাবাদ, দক্ষিণ বিহার,বর্ধমান আর ত্রিহূত—তিনি একটিও গ্রাম পান নি যেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই।অবশ্য স্কুল বলতে আজ আমাদের চোখে যে কাঠামো ও পরিকাঠামো ভেসে ওঠে তেমন নয়।পথের পাঁচালির অপুর গ্রাম্য পাঠশালাটির কথা মনে পড়ছে?
ঘরোয়া শিক্ষার এই নিয়মিত পরিসরটিও অ্যাডাম স্কুল বলে স্বীকার করেছেন।একেবারে ঘরোয়া পরিসরে এমনকি ১৯টি মেয়েদের পাঠশালার কথাও বলেছেন।গণপরিসরে বাংলা বিহারের চার কোটি লোকের জন্য এক লক্ষ স্কুলের সন্ধান পেয়েছিলেন।অ্যাডাম শিক্ষাসংস্কারের এই গণপরিসরটি বজায় রাখতে চেয়েছিলেন।এইসব স্কুলগুলি ছিল সবার জন্য অবাধ।জাতপাতের ভেদাভেদ ছিল না।শিক্ষক ছাত্রের মাত্র ১৫ শতাংশ ছিল ব্রাহ্মণ কায়স্থ।অ্যাডাম সিলেবাস রচনায় ভারতীয় আর ইওরোপীয় যৌথ উদ্যোগ চেয়েছিলেন।গ্রামের ঘরোয়া স্কুলগুলির জন্য গৃহ বাবদ অনুদান প্রস্তাবকরেছিলেন।আরও বিস্তারিত লিখলে মহাভারত হয়ে যাবে। মেকলে এই সেযুগের সর্বোৎকৃষ্ট প্রস্তাবটি নানা অজুহাতে বাতিল করলেন।তার প্রয়োজন ছিল কিছু স্কুলপ্রত্যায়িত দরকারি গর্দভ।useful idiots.অ্যাডামের প্রস্তাব অনর্থক ব্যয়বহুল বিবেচিত হল।এবং শিক্ষা হয়ে দাঁড়াল ভদ্রবিত্তের পণ্য যা কিনতে হয়।
লাটাই গুটোই।এই প্রসঙ্গে।মেকলীয় শিক্ষা পূর্বদেশের গ্রাম সমাজে নেতিবাচক যে প্রভাবটি ফেলল তা টের পেলাম বহু পরে।অভিন্ন লিপির দৌলতে যে পারস্পরিকতাই ছিল গ্রামীন অর্থনীতির কলজের জোর তাতে ক্ষয়রোগ বাসা বাঁধল।বৃটিশ পোষিত সুবিধাভোগী বাঙালি,আরও স্পষ্ট করে বললে হিন্দু বাঙালি বাকিদের ঈর্ষার,কারণ হলেন।বঞ্চনা প্রকট হওয়ায় জাতিবাদ মাথা চাড়া দিল।ধর্মীয় উন্মাদনা তলে তলে দানা পাকাল।গোটা পূর্বদেশের সম্প্রীতির ভারসাম্য টলে গেল।এর ক্ষীর ক্ষেয়েছে একদা বৃটিশ।আজ দিল্লি এবং হিন্দিস্তান।
ভাবছি সংক্ষেপে বলতে গিয়ে কিছু ফাঁক থেকে গেল না তো? তবে ১৮৩৫ বাঙালির বিপন্নতার সালতামামিতে উল্লেখ করতে ভুলে গেছিলাম।এই ফাঁকটি বুজলো।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কোন বছরে?১৭৯৩।বাংলা ১৩৫০য়ের কুখ্যাত মনুষ্যসৃষ্ট,বৃটিশসৃষ্ট মণ্বন্তর,ইংরাজি সাল ১৯৪৩।এই দুটিও বিপন্নতা বছর বলে উল্লেখের দাবি রাখে।এগুকির কথাও কথার পিঠে কথায় কথায় এসে গেল।
১৯৩৬ য়ে বিহার রাজ্যও আত্মসাৎ করেছে বাংলার ভূমি।কালে কালে বাংলার ভাষাও।মানভূম ভাষা আন্দোলনে দেশভাগের পর সেই হৃতভূমি আংশিক উদ্ধার হয়েছে মাত্র।কিন্তু গড় রক্ষা করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।দেশভাগের পর বাংলা নামটিই মুছে দিতে তৎপর হয়েছিলেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায়।বিহার বাংলা মিশিয়ে দিয়ে।আজ বাংলা নতুন করে টুকরো হয়ে অবশিষ্ট ভূমিতেও তাকে পরবাসী করে তুলবে এই আশঙ্কা ঘণ হচ্ছে।বাঙালি ভয় হচ্ছে তার শিরদাঁড়া খুইয়ে বসেছে।
সংবিধান বলছে ভারত বা ইন্ডিয়া,হিন্দুস্তান শব্দটি কোথাও নেই,একটি রাজ্যসমূহের সমাহার।union of states.নানা ভাষা তথা নানা জাতির সমাহার।জাতির একক ভাষা।ভারত তাই বহুজাতিক।তাহলে ভারতবাসী কি জাতিতে ভারতীয়? স্পষ্ট উত্তর – না।ভারতে আমরা সকলেই ভারতীয় নাগরিক।কিন্তু জাতির প্রশ্নে, জাতীয়তার প্রশ্নে কেউ গুজরাতি,কেউ মারাঠী,কেউ তামিল ইত্যাদি ইত্যাদি।বাঙালি কিন্তু বাঙালি হতে ভয় পায়।সে কিনা বিশ্বমানব।শিকড়চ্যূত।তাই বিপন্ন।

৯ আপনি বইছন জলর তলত

অনেক বিতর্কের বারুদ ঠেসে দিলাম। এবার আবার ভাষার গল্পে।
অখণ্ড বাংলার রাজধানী কোলকাতায় আসতো চাটগাঁ থেকে দার্জিলিং, সুরমা ভ্যালি থেকে সুন্দরবন সব জেলার মানুষ। কোলকাতায় তাঁরা যে যার মাটির ভাষায় কথা বলতেন নিশ্চয়। বাজার তার নিজের প্রয়োজনেই বুঝে নিত। কোলকাতার বাতাস সেই নানা শব্দে ম ম করত। জারিত হত। বেচাকেনায় দু পক্ষই পরস্পরকে যে যার গরজে বুঝে নিতেন। বাংলা ভাষার আঞ্চলিক শব্দের আর উচ্চারণের যে বিপুল বৈচিত্র আর বিশিষ্টতা কোলকাতার কান তাতে অভ্যস্ত ছিল। হয়তো জিহ্বা সড়গড় ছিল না।
ব্যাপারটা এভাবেও ভাবা যায় বাংলাভাষা জেলায় জেলায় নানা স্রোতে প্রবাহিত। একসময় সেই নানা স্রোত নানা ঢেউয়ে আছড়ে পড়ত কোলকাতায়। দেশভাগের পর দিন বদলেছে।
কোলকাতা নিজেই তার লব্জ হারিয়েছে কবেই। শান্তিপুর কেস্টনগরের বুলি কপচে তবু তার নাক উঁচামির সীমা নেই। শুধু পূব বাংলার বুলি নয় সে মেদিনীপুর বাঁকুড়া পুরুলিয়ার বুলিতেও হাসে। অবশ্য আঞ্চলিক ভাষার কবতে আবৃত্তিকারের গলায় শুনে হাততালিও দেয়। কারণ ? কোলকাতা কি প্রমিত বাংলার মনসবদার ?
পায়ের তলার মাটি কবেই সরে গেছে। বাংলা তাড়ানোর পৃষ্ঠপোষক সরকার নিজেই। সরকারী কাজ বাংলায় করার উদ্যোগ নেই। বাংলা ভাষার কোন ভবিষ্যৎ নেই। ভারতে পশ্চিমবঙ্গ একমাত্র রাজ্য যেখানে স্কুলে বাংলা শেখা অবাঙ্গালী দূর কথা বাঙালীর জন্যই আবশ্যিক নয়। বাংলা না শিখলেও কারও কিছু যায় আসে না। আগে অন্তত বেচুদার চাকরিতে গ্রাম গঞ্জের বাজার ধরতে বাংলা জানা লোকের কদর ছিল। এখন হিন্দি জানলেই হল। মোবাইল সেট বানান আর বিক্রি করেন যে মাইক্রোমাক্স কোম্পানি তারা বাজারে নতুন সেট এনেছে। মেসেজ করে যে কোন দশটি ভাষায় তা ঝটপট অনুবাদ করে দিচ্ছে। এই দশ ভাষার মধ্যে হিন্দি আছে, তামিল আছে, মালায়লম আছে, গুজরাতি আছে – নেই শুধু বাংলা। সেটটি বিক্রি হবে বাংলায় , পশ্চিমবঙ্গেই !
তোমার খড়্গ ধুলায় পড়ে– এখানে খড়্গ কি ভাবে উচ্চারণ করি ? খড়গো এভাবেই তো ? অথচ খড়গপুর খড়গোপুর এভাবে বলার জন্য এক কালে কোলকাতার মেয়েটির কাছে খুব ঠ্যাটা হতে হয়েছিল। মেয়েটি যুবতী ছিল এবং সুন্দরী। সে বয়সে আত্মসম্মানে লাগলেও আকর্ষণ উপেক্ষা করতে পারি নি। শহর কোলকাতাই এক বিপুল আকর্ষণ। দূরের গ্রামটিও আজ তাকেই নকল করে।
ওপার বাংলা কবেই আঞ্চলিক শব্দের অভিধান সংকলন করেছে। আমরা এপারে পারি নি।
একটা গল্প বলি। গল্প নয় সত্য।
ফাঁসীর মঞ্চে প্রাণ দিলেন উনিশের ক্ষুদিরাম। জন্ম আমি যে জেলায় থাকি তার পাশের জেলায়। মেদিনীপুরে। পীতাম্বর দাস তাই নিয়ে গান বাঁধলেন — একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি। তখন না ছিল টেলিভিশন , না ছিল কি রেডিও। শুধু মুখে মুখে গানটি ছড়িয়ে পড়ে অখণ্ড বাংলার কোণে কোণে , এমন কি ভারতের অন্য রাজ্যেও। ফলত গানটি জেলা থেকে জেলায় আঞ্চলিক শব্দে জারিত হয়। ভাব ঠিক থাকলেও ভাষায় প্রকারভেদ আসে। ক্ষুদিরামকে নিয়ে যে কাজ হয়তো আমাদের করার ছিল, ক্ষুদিরাম ঘরের ছেলে, বাংলাদেশ তা করে দেখিয়েছে। বাংলা একাডেমী ঢাকা ‘একবার বিদায় দে মা’ র রূপান্তর সমগ্র প্রকাশ করেছেন।
কোলকাতা ভাষাগত ভাবেই ছুঁতমার্গী। কোলকাতা সেই কুয়ো যার বাসিন্দা ভেকসমূহ সবজান্তার ভেক ধরেন। কিন্তু ভিতর ফাঁপা। বাংলা ভাষাকে ভালোবাসা মানে তার সমগ্রতাকেই ভালোবাসা। তার আঞ্চলিক প্রকারভেদকেও সম্মান করা।

ফেসবুকের কল্যাণে এই বয়সে আমি বাংলা ভাষার নানা স্রোতে অবগাহনের সুযোগ পাচ্ছি। আমার বন্ধু তালিকায় সিলেট থেকে সুন্দরবন, রংপুর থেকে খুলনা, পঞ্চগড় থেকে পাবনা , রাজশাহী থেকে যশোর– নানা এলাকার মানুষ। তাঁদের টাইমলাইনে আনন্দে সফর করি। সমৃদ্ধ হই। কান সম্পন্ন হয়। প্রাণ তৃ্প্ত।কিছুদিন আগে আমার যৌবন কালের বন্ধু গৌরীশঙ্কর দত্তের বাড়ি গেছিলাম। ভালো কবিতা লিখতেন। ভালো প্রাবন্ধিক। নানা বিষয়ে পড়াশুনা আছে। বয়স এখন একাশি। এখনও আড্ডা ভালবাসেন। শরীর সঙ্গ দেয় না। প্রাণ উচ্ছল মানুষটিকে দু এক আঁচড়ে পেশ করি।
ঢাকা বিক্রমপুরের মানুষ। চেহারায় আপাত রুক্ষ। কিন্তু মিশতেন শিং ভেঙে আমাদের মত বাছুরের সাথে। খালাসীটোলায় নয় কোলাঘাটে নদীর ধারে আমরা কজন গৌরীদার সঙ্গে মহীনের ঘোড়া। গৌরীদা মস্তিতে ছিলেন। শখ হল সিনেমা দেখবেন। সিনেমা দেখতে গৌরীদা শলা করতেন রিক্সাচালকদের সাথে। আঁতেল সমালোচনায় কান দিতেন না। কিন্তু বেলা প্রায় দুটো। খটখটে রোদ। হাতের নাগালে রিক্সাওয়ালা কেউ পাওয়া গেল না। ফিরতি ট্রেনে যাওয়া হল বাউড়িয়া। ওখানে মুঘলে আজম চলছে। কাগজে রিভিউ পড়েছি। ধ্রুপদী।
গৌরীদা নিমরাজি হয়ে টিকিট কাটলেন। আমরা দোতলার ব্যালকনিতে। মুগ্ধ হয়ে দেখছি। হাফ টাইম। হল ফাটিয়ে গৌরীদা হাঁক দিলেন– চল। এ বই দেখা যায় না। হাফ টাইম হইয়া গেল একটাও সিটি পড়ে নাই। এটা হিন্দি বই !

সাহিত্য সভায় নতুন ছেলেটি স্বরচিত কবিতা পড়ছে। গৌরীদা এসব আসরে আসতেন নিয়মিত। শুনতেন মন দিয়ে। আলোচনাও করতেন। একদিন ক্ষেপে গেলেন। সদ্য পড়া শেষ করেছে নবীন কবি। গৌরীদা অগ্নিশর্মা– এটা কি হইছে ?
কবিতা ? বয়স কত হে ? সুকান্তর নাম শুনছ ? আঠারো বছরে সুকান্ত যা ল্যাখছে আগে সেই মান স্পর্শ কর। তারপর আগাবার কথা, ল্যাখার কথা ভাববে। বাংলা সাহিত্য বর কঠিন ঠাই। অযোগ্যের জায়গা নাই। যাও , বারাইয়া যাও।
ছেলেটি কাঁদো কাঁদো। গৌরীদাকে চাপা স্বরে বললাম– কি হচ্ছে গৌরীদা? ছেলেটি ভয় পাচ্ছে তো !
অমনি খ্যাঁক খ্যাঁক করে সরবে হেসে ফেললেন– ভয় না পাইলেই টিকব।

গৌরীদার কথা বিশদে আবার লিখব। কালকের আড্ডা থেকে দুটি গল্প শেয়ার করছি। গৌরীদার বলা।
একটি গল্প নোয়াখালীর। নোয়াখালী প বলতে ফ কয়। এটুকু মনে রাখুন। চাষি চলেছে আলপথে। গ্রামে ঢুকে সে তখন ক্ষুধায় তেষ্টায় কাতর। সাথে চিঁড়া আছে। সামনে টলটলে পুকুর। চিঁড়া ভিজাতে জলে নামতে গিয়ে বিষম খেল। জলে ওগুলি কি ? কুমীরের বাচ্চার মত। চাষি বাণ জাতীয় মাছ দেখেছিল। কিন্তু ভয়ে তার মাথা তখন কাজ করছে না। অদৃশ্য কুমীরকে শুনিয়ে বলল
আফনি বইছন জলর তলত
সন্তানগণ ফাটিয়ে দিছু
মুইঠ্যা চিঁড়া ভিজাইবাম
তবু জলত না নামবাম।
কিছু বুঝছ কোলকাতা?

এ গল্পটা চট্টগ্রামের। গৌরীদা শুনেছিলেন তাঁর কাকার মুখে। কাকা শৈলেন ঘোষ ছিলেন নাটক পাগল। গ্রামে নাটক হবে। রামায়নের গল্প। মুসলমান প্রধান গ্রাম। নাটকের বেশীর ভাগ কুশীলব তারাই। রাবনের চরিত্রে অভিনয় করছে দশাসই ইয়াসিন। শৈলেন পরিচালক। শেষ দৃশ্যে রাবনের বাণ খাওয়া , পতন ও মৃত্যু। কিন্তু ইয়াসিন বাণ খেয়েও পড়ছে না। রাম ফিসফিস করে বলল – ফরি যাও। কে শোনে কার কথা ! ইয়াসিন ওরফে রাবণ সদম্ভে বলল– ইয়াসিন এমন বেটা ন দুই চাইরটা না মারি ফরি যাইত !
শুরু হল ধুন্ধুমার। দর্শক সমর্থন ইয়াসিনের দিকেই। ঠিকই তো কইছে। মারপিট হউক। দেখি কে জিতে !
শৈলেন চেঁচালেন– ইয়াসিন শুইয়া ফর। ফরি যাও।
বটে ! গ্রামবাসী তা মানবে কেন। একযোগে চড়াও হল তাঁর উপর। ওই শালাই নষ্টের মূল।

শৈলেন পিঠ বাঁচাতে দৌড় দিলেন। সে আর এক রামায়ণ।
নটে গাছ তো মুড়লো।কথা ফুরোয় নি তবু।সুযোগ পেলে বারান্তরে।

বিপন্ন বাঙালী/২

নটে গাছটি মুড়িয়েছি লেখাটি শেষ করার তাগিদে।কিন্তু কথা তো ফুরোয় নি।তাই আরও দুচার কথা।
আমি,এবং অনেকেই যারা বিপন্ন বাঙালির বিপদের সংকেতগুলি চিহ্নিত করেই দায়মুক্ত নই মনে করি আমাদের মতো করে সমাধানও খুঁজব।
পূর্বদেশ তত্ত্বটির উদ্গাতা বাংলাদেশের চিন্তাবিদ, প্রকৌশলী এবং নদীবিশারদ মহম্মদ ইমানুল হক।ভিত্তি দেশভাগের আগে বৃটিশ প্রস্তাবিত সি ইউনিট।যা বাস্তবায়িত হয় নি।অবৈজ্ঞানিক বিভাজন যে সমস্যার মুখে একটি অভিন্ন লিপিনির্ভর বাঙালি ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীকে বিপন্ন করেছে সমস্যার সমাধানে সেই বৃহত্তর ক্যানভাসেই ভবিষ্যতের ছবিটি আঁকতে হবে।
ভারত রাষ্ট্র অভিন্ন লিপির তাৎপর্য বুঝেই তার আগ্রাসনের স্বার্থে নানা ভাষার লিপি হিমঘরে পাঠিয়ে ভাষাগুলিকে আত্মসাৎ করেছে।পূর্বদেশের রাজ্যগুলিকে আগ্রাসন প্রতিরোধ করতে হলে আত্মরক্ষার স্বার্থে অভিন্ন লিপির হৃতগৌরব ফিরে পেতে হবে।
এ জন্য কোন নতুন রাষ্ট্রবিপ্লবের প্রয়োজন নেই।নতুন সামরিক সংঘাতের গল্পও নেই।পূর্বদেশের শরীক স্বাধীন বাংলাদেশ এবং ভারতীয় রাষ্ট্রের অন্তর্গত রাজ্যগুলিও যে যার সীমানায় থেকেই মৈত্রী ও সহযোগিতার চর্চা করতে পারেন।
আন্তর্জাল আবিশ্ব বাঙালিকে কাছে আসার একটি সুযোগ দিয়েছে। ভাষার দিক থেকে বাংলা ভাষা মাতৃভাষার নিরিখে ষষ্ঠ।
বাংলা একটি আন্তর্জাতিক ভাষা যা ভারতের বাংলাবলয় শুধু নয়, প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের ও আফ্রিকার সিওরা লিয়েনের রাষ্ট্রভাষা।এ ভাষায় কথা বলেন ২৩০ মিলিয়ন বা ২৩ কোটি , সঠিক হিসাবে ৩০০ মিলিয়ন বা ৩০ কোটি মানুষ।ভারতে বাংলা বলয় মানে পশ্চিমবঙ্গ,ত্রিপুরা আর আন্দামান ছাড়াও রাজ্যের সীমানা উপছে কাছাড়,কোচবিহার সন্নিহিত গোয়ালপাড়া,এবং ঝাড়খণ্ডের মানভূমের ঘাটশিলা,দুমকা ইত্যাদিকেও বুঝব।বাঙালি ওই সব জায়গায় প্রবাসী নয়।ভূমিপুত্র।বাংলাবলয়ে সগৌরবে আসীন স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশও।
বাঙালি ছড়িয়ে আছে ভারতের উত্তর, দক্ষিণ,পূর্ব, পশ্চিম সর্বত্র।
নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন সারা ভারতের বাঙালিকে সমন্বিত করার একটি প্রয়াস ছিল মনে করি।
আজ ডিজিটাল যুগের প্রযুক্তি আবিশ্ব বাঙালিকে আলিঙ্গনে বেঁধেছে।অন্তত নিবিড় সান্নিধ্যে আসার সুযোগ দিয়েছে।এ সুযোগ হেলায় না হারাই!

বাংলা একটি প্রাদেশিক ভাষা এই বুলি বহুদিন কানের কাছে বাজানো হচ্ছে।ভারতে কোন প্যান ইন্ডিয়ান ভাষা নেই।ভারতের কোন জাতীয় ভাষাই নেই।রাষ্ট্রভাষা নেই।
অথচ হিন্দি ব্যতীত বাকি ভারতীয় ভাষাগুলি আঞ্চলিক এই বাজনা গত সত্তর বছর ধরে বাজিয়ে যাচ্ছে আমাদের প্রভূভক্ত মিডিয়া ও সরকারী প্রশাসন।

প্রত্যয়ের সঙ্গে বলুন আমি বাঙালি।আমার মাতৃভাষা বাংলা।আন্তর্জাতিক ভাষা।ভারতে যে গৌরবে ভূষিত আর একটিমাত্র ভাষা— তামিল।তামিল শ্রীলঙ্কারও সরকারী ভাষা। বাংলাভাষা বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বাধিক পঠনপাঠনের মান্যতাপ্রাপ্ত।জার্মানী,লন্ডন নিউইয়র্ক টোকিওর কথা সুবিদিত।

মাথায় গেঁথে যাক— বাংলা একটি প্রাদেশিক বা আঞ্চলিক ভাষা নয়।আন্তর্জাতিক ভাষা।

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধ“লিখেছি বালুর পটে”-একুশে বইমেলায় আশীক রহমানের ৩য় কাব্য গ্রন্থ
পরবর্তী নিবন্ধ“অধুরা প্রেম”-শর্মিষ্ঠা চ্যাটার্জী বড়ালের কবিতা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে