“ভ্যাঙ্কুভার সেন্ট্রাল পাবলিক লাইব্রেরি”- জাকির তালুকদার

0
603
জাকির-এনকে

“ভ্যাঙ্কুভার সেন্ট্রাল পাবলিক লাইব্রেরি”- জাকির তালুকদার 

লাইব্রেরিতে প্রথম ঢুকে যা শুনি তাতেই অবাক হই।
জানতে চাইলাম আমি সদস্য হলে একসাথে কয়টা বই ইস্যু করবেন আমাকে?
পাল্টা প্রশ্ন এল– আপনি কয়টা নিতে চান?
বললাম– ধরুন তিন বা চারটি।
তিনি হেসে বললেন– আপনি একসাথে ৫০টি বই ইস্যু করে নিয়ে যেতে পারবেন।

ভ্যাঙ্কুভারে থাকাকালে প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুইদিন ৮-১০ ঘণ্টা কাটাই এই লাইব্রেরিতে।
বাড়িতেই যখন বই নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে লাইব্রেরিতে বসে থাকা কেন?
কারণ– পরিবেশ।


৭টি ফ্লোর জুড়ে বিশাল লাইব্রেরি। লাখ লাখ বই। শত শত বা হাজার কমপিউটার। বই খোঁজার জন্য র‌্যাক ঘাঁটার দরকার নেই। প্রত্যেক ফ্লোরে রাখা কমপিউটারে বইটির নাম লিখে সার্চ দিলেই জানা যায় কোন তলার কোন র‌্যাকে কত নম্বর সিরিয়ালে বইটি আছে। তবু নিজে খুঁজে না পেলে ইন্টারকমের ডায়াল ঘুরালেই লাইব্রেরির স্টাফ বা ভলান্টিয়ার এসে হাজির। বইটা খুঁজে বের করে হাতে দিয়ে হাসিমুখে ফিশফিশ করে জানতে চাইবে– আর কোনো হেল্প?
ফিশফিশ করেই কথা বলে সবাই। চারপাশে পড়ছে মানুষ। কত রকমের যে সোফা, কত রকমের যে চেয়ার! বসে, কাত হয়ে, চিৎ হয়েও পড়া যায়।
শুধু বই না। লাখ লাখ গানের সিডি। মুভি। কেউ হেডফোন কানে লাগিয়ে গান শুনছে, কেউ মুভি দেখছে, কেউ ব্রাউজ করে চলেছে।
সেন্ট্রাল এসি। চূড়ান্ত আরামদায়ক পরিবেশ। এরা বলে, প্রার্থনার জন্য যেমন আরামদায়ক পরিবেশ দরকার, লাইব্রেরিতেও তেমনই পরিবেশ দরকার। লাইব্রেরি তো তপস্যারই জায়গা।

প্রশ্ন উঠতে পারে, বাড়িতেই যদি এত বই নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে আমি লাইব্রেরিতে এসে পড়ি কেন?
পরিবেশের জন্য। আর অসংখ্য বই নেড়ে-চেড়ে দেখার জন্য। শুধু কাফকাকে নিয়ে লেখাই কয়েক শো বই। আনন্দে পাগল হয়ে যাই। আমি নতুন দাঁত গজানো শিশুর মতো কামড়াই। একবার একটা হাতে নিই। তার কিছুক্ষণ পরেই আরেকটা। তারপর আরেকটা। হেমিংওয়ে, পুশকিন, ফিটজেরাল্ড, জেমস জয়েস– কার ওপরে বই নাই!
বই পড়ি। সাথে কফি বা চা নিয়ে গেলে সেখানে বসে বসেই খাওয়া যায়। আমি দুই-আড়াই ঘণ্টা পর পর নেমে আসি চত্বরে। সেখানে চা-কফি-বার্গারের ছোট ছোট পরিচ্ছন্ন দোকান। কফি খেয়ে গেটের বাইরের রোদে বসে একটা সিগারেট টানি। পাশে বেঞ্চে বসা কোনো পুরুষ বা নারীর সাথে টুকরো-টাকরা কথা হয়। আবার পাঠকক্ষে ঢুকে পড়ি।
বাংলাদেশের মতো কাঁধের ব্যাগ বা র‌্যাকস্যাক কাউন্টারে জমা দিয়ে ঢুকতে হয় না। সাথে নিয়েই ঢোকা যায়। কারণ ওরা মানুষকে বিশ্বাস করে। কেউ বই চুরি করে নিয়ে যাবে, তা ভাবতেই পারে না।

kanada
যদি কোনো বই খুঁজে না পাওয়া যায়, বলা হয় ইস্যু করা আছে। ই মেইল নম্বর দিয়ে রাখলে ঠিক জানানো হবে। জানায়ও বটে। ‘তোমার চাহিদামতো অমুক বইটি রেখে দেওয়া হয়েছে। চারদিন পর্যন্ত এটি অন্য কাউকে ইস্যু করা হবে না।’
বই বাড়িতে নিয়ে গেছি। সময় শেষ। ই মেইল করলে সময় বাড়িয়ে দেবে সাতদিন।
পড়ার পরে বই জমা দিতে যে সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতেই যেতে হবে এমন কোনো কথা নেই। গোটা শহরে পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরির শাখা। এয়ারপোর্ট পর্যন্ত। প্লেনে ওঠার আগে এয়ারপোর্টের কাছের শাখাতেও বই জমা দিয়ে এসেছি।
এক শহর থেকে অন্য শহরে গিয়েও বই জমা দেওয়া যায়। বই তোলাও যায়।
বছরের যে তিনটি বা চারটি মাস কানাডায় থাকি, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় কাটাই লাইব্রেরি, ইউনিভার্সিটি আর মিউজিয়ামগুলিতে।

একবার আসাদুজ্জামান নূরের কাছে মেইল করেছিলাম। তখন তিনি সংস্কৃতিমন্ত্রী। অনুরোধ জানিয়েছিলাম, পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে তো অনেকই যান। দয়া করে পাবলিক লাইব্রেরি দেখে আসুন। তাহলে অনুভব করতে পারবেন, লাইব্রেরি কেমন হওয়া উচিত। জানি না তিনি সেটি খুলে দেখেছিলেন কি না।

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধ“ছড়ার কথা- তিন”- কামাল খাঁ
পরবর্তী নিবন্ধ“ভরদুপুরে কবি নূরুল হকের সঙ্গে”-মাসউদ আহমাদ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে