মনির জামান এর একগুচ্ছ কবিতা

0
600
মনির জামান

আসামি
—————-


আমাদের আকাঙ্খা জুড়ে ছিলো
সূর্য্যের মতো অবিসংবিদিত নেতা
আর জল কিংবা আলোর মতোন তন্ত্র!
কলাপাতায় লেখা শিশুশিক্ষার নীতি-জ্ঞান
মুছে গেছে সেই কবে!

অতীতের দিনলিপিজুড়ে ধূলোর আস্তরণ
আদি আগুন জ্বেলে দেখি
পিঠে পিঠে চাবুকের ঘা
শিকলের শব্দ; মূর্খের শাসন।

ভেড়ার লোমে শরীর মুড়িয়েছি
কবি ডেকো না, বলো আসামি!

বাঘা জ্যোতির্বিজ্ঞানী গ্রহ-নক্ষত্র ছেনে
রাষ্ট্রনায়কের সিংহাসনটি বানিয়েছেন!
তোমরা বন্ধুহীন থাকো
কথারা যেনো তিন কানে না যায় !

গুজব
—————


পাশবিকতার এমন দিনে
রসাল মহুয়ামনে ভ্রম জাগে
পশু ও সন্তের মুখে যে ধ্বণি বাঁজে
একলা এককোণে তবু- সে নাম সে নেয় না মুখে।

মেঘ হোতে অশ্রু আর
রাজপথ হোতে রক্তের ধারণা নিয়ে
ফিরে গেছে চাতক।

যখন সে দেখেছিলো জলপিপি নিয়ে
দাঁড়িয়ে আছে টনটনে শিশ্ন;
তখন জল পিপাসা তাকে আর প্রতীক্ষিত করেনি!

হরিণচরা মাঠে কেন্দ্র থেকে ছিটকে আসা বলবীর্জ্য ছড়িয়ে পড়লে খানখান আকাশ ভেঙে পড়ে কিশোরী ঘাসে।

এখানে কী কোন বাঘ এসেছিলো?
পাখিদের এরূপ প্রশ্নে
মিথ্যেবাদী রাখালের বালখিল্য হাসি
বাতাসে ছড়িয়ে দেয় গুজব!
সেইথেকে শক্তির অনুগত দূর্বল! তবু..
গোপন অশ্রুতে ডুবে মরে শক্তিধর।

উদার আকাশ ছাড়ো
——————————–


কে টাঙিয়েছে মুখ বরাবর রঙ-বেরঙের প্যানা?
পাওনিকো টের? প্যাঁচাচ্ছে যে উন্নয়নের ত্যানা!
ছাও খাওয়া সব কুমির এবার উদার আকাশ ছাড়ো
ঐ যে ঘুমায় পথশিশু পতাকাটা তারও।।
.
কে খেয়েছে? কি খায়নি? যদি খুঁজো ভেদ
জাগতেই পারে তোমার মনেও গুম হওয়া এক খেদ,
তরপায় কেন আঙুল তবে ছাপ মেরেছে দানো?
মানুষ কিন্তু ঘুমেও জাগে এই কথাটা মানো।।
.
অন্যথাচরণ_ গুজব বলে ঠেলছো যারা পিছে
এই মানুষ-ই সেই দিনটাকে আনতে পারে কাছে,
হুট বলে কেউ পার পাবে কি? টনটনে সেই দাগ
হঠাৎ ক’রে আসবে যেদিন সত্যিকারের বাঘ।।

#মাতাল
——————-


পৃথিবীর অস্তিত্বময় পথ-ঘাটে প্রতিদিন
ফেলে আসি অদৃশ্য হাতের কারুকাজ,
বাইরের কথা এসে কানে ঢোকে
ভেতর ভেতরে বাড়তে থাকে
ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র তৃষ্ণার বীজ।

নৈমিত্তিক পছন্দ-অপছন্দ কিংবা
অনায়ত্ব কিছু স্পৃহার মৃত্যুতে আত্মহারা হই
অনির্বচনীয় ব্যঞ্জনের ঘ্রাণ নিতে
আলোর রথে ছুটে আসে মহাকাল!

গহীন দেহে মন্থনে মত্ত একঝাঁক ইঁদুর
ফল ভারাক্রান্ত গাছেরা
বরঞ্চ ঝুঁকতেই পারে যে কোনো দিক

একটুখানি সত্যের সন্ধানে_
তবে, আমিও কী অসুখী মাতাল আছি_ দীর্ঘদিন!

#সময়_সহজ_নয়
—————————-


পাখিগুলো দেখা দেয় না
অথচ অহরহ বাতাসে ভাসিয়ে দেয়
চটুল গানের আবহ

কী দিন এলো!
কেউ জিজ্ঞাসা করলে
এখন আর বলতেও পারি না
কেমন আছে প্রিয়তমা অরণ্যানী!

ধানফুলে মড়ক,
ডানাভাঙা প্রজাপতির সারা শরীরে মৃত্যুর যন্ত্রণা!
অধিক আঁধারের স্বত্বে
কে তুমি শোনাও অব্যর্থ চিকিৎসার বিজ্ঞাপন?

এখানে যারা ব্যক্তিগত পবিত্রতা নিয়ে ব’সে আছে
কামনার হাল ভেঙে গেলে
তাঁরাও তোমার হীন প্রশ্নে হাসাহাসি করবে

সব সময় সহজ নয়
কপট চোখের পাতা কচলিয়ে দ্যাখো
বেড়াল কখন গাছে ওঠে!

#যোগ_বিয়োগের_রীতি
————————————–


হাওয়া এসে দোল দিয়ে যায় ধানে
পাখিরা সব উঠল মেতে গানে
পাতায় পাতায় হলুদ প্রজাপতি
জল ঝরে যায় অধিক উত্তেজনায়
তোমার ধ্যানে উথলে মনের মতি।

এই অবেলায় বাজায় ও কে বেণু
উঠল উড়ে সকল ফুলের রেণু
আকাশ মেঘে এ কোন আলোর দ্যুতি
ডাক দিয়ে যায় কোন সুদূরের পানে
বুক পেতে নিই আমার সকল ক্ষতি!

সবার গোলায় ধান দিয়েছো, কাঁকড় আমার পাতে
তবু_ তোমায় জপছি আমার সকল ইবাদতে
শুক্তিরও যে খোলশ পরিণতি
যতির ফাঁদে তোমারও কী লাভ আছে
যোগ বিয়োগের এমনতর রীতি!

প্রান্তরে আজ অনুরাগের আগুন জ্বলে
দীর্ঘ হিজল ছায়ার তলে
পোড়ে বিস্মরণের স্মৃতি
কুহক জাগে শূন্য মাঝে
চাঁদ-তারার ঐ স্তুতির ভেতর আছে অন্তর্ঘাতী!

#পাঠমগ্ন_এক_জীবন
—————————————


পাহাড়ের মতো দু’টো পদ্য
পড়ে আছে বিছানায়
চুলসমগ্র থেকে পাঠ শুরু করি
এই হেমন্তেও কী এক বিশীর্ণ ঝড়
উঠে আসে নিঃসঙ্গ নাভীদেশে!

কমলা অধর হ’য়ে চিরায়ত চিবুক
অন্তহীন তাঁর দেহপুস্তক
পড়ে যাই মনযোগী ছাত্রের মতন
থাকা যায় না খুব বেশিক্ষণ
দ্রুতপঠন ঠেকাতে পারে না দ্রুতপতন
নক্ষত্রের ঝিলিক এসে চোখে লাগে!

নির্বোধ নাবিকের ফের যাত্রা
দশ আঙুলে থির
যাপিত জীবনের সমস্ত যাতনা দেখে দেখে ঘুমিয়ে পড়ি
কী এক মহাকবি’র রচিত মহাকাব্যে পাঠমগ্ন এক জীবন
পাঠ যেন শেষ-ই হয় না
মেঘলা মন মেঘলা মুখ, ছিটেফোঁটা বৃষ্টিতে
খুব কাছের মেহগনি বাগান হ’তে
ভেসে আসে পাতা ঝরার গান!

#শিকার_শেষের_গান
————————————–


এই শীতে কুহেলিকার চাতুরী পথে ও প্রান্তরে
হাওয়ার দুরভিসন্ধি_ নষ্ট রোষ, খলের পীড়ন
এভাবেই নৈঃশব্দের চাকু আর কতকাল করবে হনন?
নিঃস্বার্থ নির্বেদে ঘুণ, রূপ, রস, ব্রত ঘিরে!

বিগত শতাব্দীর শোকে দুলে যায় পেণ্ডুলাম
মানুষ ব’সে ব’সে চুল চেরে মর্যাদার কুড়োলে
ফুলের বুকে বিষাক্ত পদচ্ছাপ, পাপড়ি খসে অন্তরালে
অভিমান বুকে বধির বিছানা ঝরায় ঘাম।

উন্মাদ শৃগালের জিভ চেঁটে খায় জোছনা
হাতের পায়রা উড়ে যায় শান্তি আসে না
দুগ্ধপোষ্য আচার্য হুমকি দিয়ে যায়
এখানে তন্ত্রের নোঙর পোঁতা মানা
শিকার শেষের গান শোনাও কে?
মগ্ন মাস্তুলে_
আমাদের কোলের সন্তান বার বার
মার খায় উদ্ধত আঙুলে!
যেদিন ভাসবে তরী চোখের জলে
ভৈরবী ঝরে ভেসে যাবে কিনার পাবে না।

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধকামাল খাঁ’র একগুচ্ছ ছড়া
পরবর্তী নিবন্ধরিংকু’র কয়েকটি কবিতা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে