মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর জন্মদিনে বিনম্র প্রণাম – ফাল্গুণী মুখোপাধ্যায়

0
359

মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় -ফাল্গুণী মুখোপাধ্যায়

তাঁর উপন্যাস, গল্পে সমাজ বাস্তবতার ছবি লিখলেন এক নতুনতর আঙ্গিকে । প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়কালে পৃথিবী জুড়ে মানবিকতা ও মূল্যবোধের চরম সংকট সময়ে বাংলা কথা সাহিত্যে নতুনতর ধারার সূচনা হয়েছিল যাঁদের লেখনিতে মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদেরই একজন । আজ মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১১৩ তম জন্মদিন ।

জন্ম এখনকার ঝাড়খন্ড রাজ্যের দুমকা শহরে । পৈত্রিক নিবাস ঢাকার বিক্রমপুরে । পিতা হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় ও মাতা নীরদাসুন্দরী । পিতা ঢাকার সেটলমেন্ট বিভাগে কর্মের সুবাদে বাংলা ও বিহারের নানা স্থানে বদলি হতে হত আর সেই সূত্রে মানিকের শৈশব, কৈশোর ও ছাত্রজীবন কেটেছে বাংলা ও বিহারের নানান স্থানে । কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশনে স্কুল শিক্ষা শুরু করে কয়েক বছর টাঙ্গাইলে স্কুলে ভর্তি হন , সেখান থেকে আবার কাঁথির মডেল স্কুল হয়ে শেষ পর্যন্ত মেদিনীপুর জিলা স্কুল থেকে মেট্রিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন । কলেজ শিক্ষা সম্পূর্ণ না করে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন পুরোপুরি সাহিত্যসেবায় ।

সাহিত্যজীবনের প্রথম পর্বে মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় ফ্রয়েডীয় দর্শনে প্রভাবিত হয়েছিলেন প্রথম পর্বের লেখাগুলিতে তার ছায়াপাত ঘটেছে । বাংলা ভাষাও সাহিত্যের প্রাজ্ঞ অধ্যাপক ভবতোষ দত্ত মন্তব্য করেছেন “ফ্রয়েডীয় মনস্তত্বকে তিনিই যথার্থ জীবনবোধের সঙ্গে যুক্ত করিয়া বাঙালি দরিদ্র, মধ্যবিত্ত এবং ধনী সমাজের নানা পরিপ্রেক্ষায় রূপদান করিয়াছেন । এই কারণে মাণিকের উপন্যাস বাস্তবশর্মী হইলেও সাময়িকতা দ্বারা খন্ডিত নয়” । (ভারতকোষ – ৫ম খন্ড) । পরবর্তী পর্যায়ে তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলে মার্কসবাদী জীবনদর্শনে ।

শ্রমজীবি নীচুতলার মানুষ ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন সংগ্রাম ছিল মার্ক্সীয় তত্বে গভীরভাবে প্রভাবিত এই কথাসাহিত্যিকের লেখার বিষয়বস্তু । মাত্র ৪৮বছরের জীবনকাল ছিল মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের । এই স্বল্পায়ু জীবনেই রচনা করেছেন বিয়াল্লিশটি উপন্যাস ও দুই শতাধিক ছোট গল্প । তাঁর উপন্যাস ‘ ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’’, ‘দিবারাত্রির কাব্য’, ‘পদ্মানদীর মাঝি’, ‘প্রাগৈতিহাসিক’ ‘স্বাধীনতার স্বাদ’, ছোট বকুলপুরের যাত্রী(গল্প)প্রভৃতি বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ । এবং একটি প্রবন্ধ সংকলন, একটি নাটক আর মৃত্যুর অনেক পরে প্রকাশিত হয় তার একটি কাব্য সংকল ন ‘মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা’ । মানব জীবনযন্ত্রণার গভীরতর অনুভব আর নিচুতলার মানুষের মধ্যে জীবনের সত্য-প্রতীতির অন্বেষণ তাঁর সাহিত্য পরিক্রমায় । রাজনৈতিক সচেতনতা যে শিল্পের উৎকর্ষ হ্রাস পায় না, মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপনাস ও গল্পগুলি তারই নিদর্শন

মাণিকের কবি পরিচয় আমরা জেনেছি তাঁর মৃত্যুর অনেক পরে । অথচ, কবি মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বয়স ঔপন্যাসিক মাণিক বন্দ্যোপাধায়ের মতই । জীবদ্দশায় কিছু কবিতা বিক্ষিপ্তভাবে প্রকাশিত হয়েছিল । বহু কবিতাই আবদ্ধ ছিল তার রেখে যাওয়া দুটি খাতায় । একটি ১৯২৪ থেকে ১৯২৯ পর্যন্ত সময়কালে রচিত, আর একটি খাতায় ১৯৪৩ থেকে ১৯৫৩ পর্যন্ত সময়কালে রচিত কবিতা । মৃত্যুর ১৪বছর পরে সেই দুটি খাতা উদ্ধার করে ৬৪টি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয় তাঁর কাব্য সংকলন ‘মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা’ । মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখে গিয়েছেন “ আমার বিজ্ঞানপ্রীতি, জাত-বৈজ্ঞানিকের কেন-ধর্মী জীবন জিজ্ঞাসা, ছাত্রবয়সেই লেখকের দায়িত্বকে অবিশ্বাস্য গুরুত্ব দিয়ে ছিনিমিনি লেখা থেকে বিরত থাকা প্রভৃতি কতগুলি লক্ষণে ছিল সুস্পষ্ট নির্দেশ যে সাধ করলে আমি কবি হতেও পারি ; কিন্তু ঔপন্যাসিক হওয়াটাই আমার পক্ষে হবে উচিত ও স্বাভাবিক |”

মার্কসবাদী জীবনদর্শনে বিশ্বাসী মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় পার্টির সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের সাংগঠনিক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন, যুক্ত হন ‘ফ্যাসি বিরোধী লেখক সঙ্ঘ’ ও প্রগতি লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘে’র সঙ্গে । ভারতীয় কম্যুনিস্ট পার্টির সদস্য পদ গ্রহণ করেন ১৯৪৪এ । দারিদ্র ও অনটন ছিল তাঁর নিত্য সঙ্গী, যা ১৯৫০এর দশকে চরম আকার নেয় । তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ আর্থিক সাহায্যের আবেদনে সাড়া দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় মাসিক ১০০টাকার পেনশন ভাতার ব্যবস্থা করেন ও চিকিৎসার জন্য এককালীন ১২০০টাকা মঞ্জুর করেন । ১৯৫৬র ৩রা ডিসেম্বর কলকাতার নীলরতন সরকার হাসপাতালে জীবনাবসান হয় রবীন্দ্রোত্তর কালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাত্র ৪৮ বছর বয়সে ।

স্বাধীনতা-উত্তর কালে বাংলাসাহিত্যের বিপুল বৈচিত্রে অনেক কালজয়ী উপন্যাসে বাঙালির সমাজ-জীবনের অনেক ওঠা-নামা, ভাঙ্গা-গড়ার ছবি লিখেছেন বনফুল, বিমল কর, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, সতীনাথ ভাদুড়ী, সমরেশ বসু প্রমুখ । তথাপি ১৯৫০এর দশকের শেষ পর্যন্ত বিভূতিভূষণ-তারাশঙ্কর-মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় এই ত্রয়ীর কাজই ছিল বাংলাসাহিত্যের প্রধান মুখ ।

অমর কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১১৩ তম জন্মদিনে আমার বিনম্র প্রণাম ।

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধসিংড়ায় গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের নারায়ণগঞ্জ মোকাম করার অভিযোগ, করোনা বিস্তারের শঙ্কা
পরবর্তী নিবন্ধবাউল রণেশ ঠাকুরের ঘরে অগ্নিসংযোগকারীদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচার চাই- স্বকৃত নোমান

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে