রুমির জন্মদিনের স্মরণাঞ্জলি- স্বকৃত নোমান

0
66

এক মুদি দোকানির একটি তোতা পাখি ছিল। সে সুন্দর করে মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারত। দোকানের প্রহরী ও ক্রেতাদের সঙ্গে সে কথা বলতো। একদিন দোকানি বিশ্রামের জন্য বাসায় গেল। দোকানে তোতা পাখিটি ছিল একা। হঠাৎ একটা বিড়াল ইঁদুর ধরার জন্য দোকানের ভেতরে ঢুকল। বিড়াল দেখে পাখিটি ভীষণ ভয় পায়। সে একেবারে কোনায় গিয়ে পালাতে চাইলে তেলের বোতলগুলো নিচে পড়ে যায়। দোকানি ফিরে এসে দেখল সারা দোকানে তেল আর তেল। ভীষণ রেগে গেল সে। রাগের চোটে আঘাত করল তোতার মাথায়। সেই আঘাতে ন্যাড়া হয়ে যায় তোতার মাথাটি। ফলে পাখিটি চুপচাপ দোকানের এক কোণে গিয়ে বসে থাকে। পাখিটির এই নীরবতায় দোকানি ভীষণ কষ্ট পেল। সে তোতার কথা খুবই উপভোগ করত। পাখি এখন আর আগের মতো কথা বলে না দেখে সে অনুতপ্ত হলো। পাখির চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইল সে, কিন্তু পারল না। সে চুপ মেরে গেল। এমন সময় ন্যাড়া মাথার এক তাঁতের কারিগর দোকানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তাকে দেখেই তোতা পাখিটি বলে উঠল, ‘তুই কেন ন্যাড়া? তুইও কি তেলের বোতল ভেঙেছিস?’ মানুষজন তোতার এ রকম মজার কথা শুনে খুব হাসল।

গল্পটি জালাল উদ্দিন রুমির বিখ্যাত কাব্য ‘মসনবি’ থেকে নেওয়া। এমন অসংখ্য গল্প আছে ‘মসনবি’তে। মসনবি এমন এক অনন্য সাধারণ গ্রন্থ, যা আজও তার স্বাতন্ত্র্য নিয়ে টিকে আছে। পঠিত হচ্ছে পৃথিবীর দেশে দেশে। এই গ্রন্থে কল্পনাভিত্তিক গল্প, রূপকধর্মী গল্প, রহস্যময় গল্প, আধ্যাত্মিক গল্প, শিক্ষণীয় গল্প, নৈতিক বা চারিত্রিক গল্প রয়েছে। জালাল উদ্দিন রুমি ছিলেন কবি, আইনজ্ঞ, ধর্মতাত্ত্বিক, অতীন্দ্রিবাদী ও সুফি। তাঁর জন্ম ১২০৭ খ্রিষ্টাব্দে, আফগানিস্তানের বালখ্ নগরে। তাঁকে জালাল উদ্দিন বালখিও বলা হয়। বালখি ও রুমি দুটো তাঁর জাতিগত নাম। রুমির জীবনীকার ফ্রাঙ্কলিন লুইসের মতে, আনাতোলিয়া উপদ্বীপ ছিল বাইজেন্টাইন বা রুম সাম্রাজ্যের অন্তর্গত, যেটি পরবর্তীকালে তুর্কির মুসলিমদের দখলে আসে। এখন পর্যন্ত এটি আরব, পারস্য ও তুর্ক নামে পরিচিত। ‘রুমি’ শব্দটি মূলত আরবি, যার অর্থ রোমান। বালখ্ ছিল তখন ফার্সি সংস্কৃতি ও সুফি চর্চার মধ্যবিন্দু। রুমির পিতার নাম বাহাউদ্দিন ওয়ালিদ। তিনি ছিলেন বালখ্-এর একজন ধর্মতাত্ত্বিক, আইনজ্ঞ ও অতীন্দ্রিবাদী। রুমির অনুসারীদের কাছে তিনি ‘সুলতানুল উলামা’ নামে পরিচিত। রুমির মায়ের নাম মুইমিনা খাতুন।

১২১৫-১২২০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে মঙ্গোল যখন মধ্য এশিয়া দ্বারা আক্রান্ত হয় তখন বাহাউদ্দিন ওয়ালিদ পুরো পরিবার ও একদল শিষ্য নিয়ে পশ্চিম দিকে যাত্রা করেন। কারো কারো মতে, রুমির সঙ্গে তখন পারস্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় কবি ও সুফি-সাধক শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তারের দেখা হয় ইরানের নিশাপুরে। রুমিকে দেখেই তাঁর আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্য চিনতে পারেন শেখ ফরিদ। যখন দেখলেন রুমি তাঁর বাবার পিছনে হেঁটে যাচ্ছেন তখন তিনি বলে উঠলেন, ‘একটি হ্রদের পেছনে একটি সমুদ্র যাচ্ছে।’ রুমিকে তিনি দিলেন আসরারনামা নামে একটি বই। বইটি ছিল ইহজগতে আত্মাকে জড়িয়ে ফেলা বিষয়ে রচিত। শেখ ফরিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ আঠারো বছরের রুমির মনে গভীর প্রভাব পড়ে। পরবর্তীকালে তাঁর কাজের উৎসাহ হিসেবে কাজ করেছেন শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তার। আবার কোনো কোনো গবেষকের দাবি, শেখ ফরিদের সঙ্গে রুমির দেখা হওয়ার ঘটনাটি সত্যি নয়।

নিশাপুর থেকে বাহাউদ্দিন ও তাঁর লোকজন বাগদাদের দিকে রওনা হন এবং অনেক পণ্ডিত ও সুফির সঙ্গে সাক্ষাত করেন। বাগদাদ থেকে হজের উদ্দেশ্যে রওনা হন মক্কায়। হজ পালন করে তারা দামেস্ক, মালাত্যেয়া, এরজিকান, শিবাস, কায়সেরি এবং নিগদি পাড়ি দেন। এরপর তারা কারামানে সাত বছর থাকেন। রুমির মা ও ভাই দুজনেই এখানে মারা যায়। ১২২৫ খ্রিষ্টাব্দে কারামানে রুমি বিয়ে করেন গওহর খাতুনকে। তাঁদের দুই ছেলে : সুলতাম ওয়ালিদ ও আলাউদ্দিন চালাবি। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর আবার বিয়ে করেন রুমি। এই ঘরে জন্ম নেয় পুত্র আমির আলিম চালাবী ও কন্য মালাখী খাতুন।

১২২৮ খ্রিষ্টাব্দে ১ মে আনাতোলিয়া শাসক আলাউদ্দিন কায়কোবাদের আমন্ত্রণে বাহাউদ্দিন আনাতোলিয়ায় আসেন এবং কোনিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। কোনিয়া ছিল রুম সালাতানাতের পশ্চিমাঞ্চল। মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান বাহাউদ্দিন। তিনি যখন মারা যান রুমির বয়স তখন পঁচিশ বছর। উত্তরাধিকারসূত্রে রুমি পিতার পদে নিয়োগ পেলেন। বাহাউদ্দিনের ছাত্র সৈয়দ বুরহান উদ্দিন মোহাক্কিক তিরমিযি শরিয়ত ও তরিকত সম্পর্কে শিক্ষা দিতে থাকেন রুমিকে। নয় বছর ধরে তাঁর কাছে সুফিবাদের শিক্ষা নেন রুমি। ১২৪০ খ্রিষ্টাব্দে বুরহান উদ্দিন মারা গেলে শুরু হয় রুমির অন্য জীবন। তিনি একজন ইসলামি ‘ফকিহ্’ বা আইনজ্ঞ হন। ফতোয়া প্রকাশ করেন এবং কোনিয়ার মসজিদে নৈতিকতা বিষয়ে বক্তৃতা দিতে থাকেন। এই সময় দামেস্ক ভ্রমণ করেন তিনি। চার বছর অতিবাহিত করেন দামেস্কে।

দরবেশ শামসুদ্দিন তিবরু বা শামস তাবরেজির সঙ্গে রুমি সাক্ষাৎ হয় ১২৪৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ নভেম্বর। তাবরেজির সঙ্গে সাক্ষাতে বদলে যায় তাঁর জীবন। সুপ্রতিষ্ঠিত শিক্ষক ও আইনজ্ঞ থেকে তিনি রূপান্তরিত হন একজন সাধুতে। কথিত আছে, শামস তাবরেজি মধ্যপ্রাচ্যের সর্বত্র ভ্রমণ করে খুঁজছিলেন এমন কাউকে যে তাঁর সঙ্গী হবে। একদিন বলছিলেন, ‘কে আমার সঙ্গ সহ্য করবে?’ তখন একটি কণ্ঠ তাকে বলল, ‘বিনিময়ে তুমি কী দেবে?’ শামস উত্তর দিলেন, ‘আমার শির (মাথা)।’ কণ্ঠটি আবার বলল, ‘তাহলে তুমি যাকে খুঁজছ সে কোনিয়ার জালাল উদ্দিন।’
অন্য একটি বর্ণনা মতে, রুমি একদিন তাঁর পাঠকক্ষে বসে পড়ছিলেন। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে এক বুড়ো মজ্জুব (সন্ন্যাসী) হাঁক দিল, ‘কী করছ রুমি?’
রুমি নিরুত্তর।
‘কী করছ রুমি?’
রুমি তবু নিরুত্তর।
তৃতীয়বারের মতো মজ্জুব একই প্রশ্ন করলে রুমি বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘দেখতে পাচ্ছ না কী করছি?’
‘দেখতে তো পাচ্ছি। আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চাইছি।’
‘পড়ছি। বিরক্ত রুমির সংক্ষিপ্ত জবাব।’
‘এত পড়ে কী হবে?’
রুমির এবার রাগ উঠল। ধমকের সুরে বললেন, ‘তুমি তো রাস্তার পাগল, পড়ালেখার মর্ম তুমি কী বুঝবে? সেই যোগ্যতা তোমার নাই। কী চাও সেটা বলো?’
আহ! দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল মজ্জুব। সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে গেল পড়ার টেবিলের একটি পায়ায়।
‘এ কী করছেন?’ বললেন বিস্মিত রুমি।
‘কী করছি তা বুঝার যোগ্যতা তো তোমার নাই। বলো, কী চাও তুমি?’
‘আমার কেতাবপত্র তো সব পুড়ে যাবে, দয়া করে আগুনটা নিভিয়ে দিন।’
হেসে উঠল মজ্জুব। সঙ্গে সঙ্গে নিভে গেল আগুন। পায়ার দিকে তাকিয়ে থাকেন বিস্মিত রুমি। মজ্জুব ততক্ষণে গায়েব।

এই ঘটনা রুমির মনে সৃষ্টি করে তুমুল আলোড়ন। মজ্জুবের পরিচয় জানতে তিনি হয়ে ওঠেন ব্যাকুল। খুঁজতে খুঁজতে একদিন পেয়ে গেলেন মজ্জুবের দেখা। সেই মজ্জুব আর কেউ নয়, খোদ শামস তাবরেজি। তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে রুমি হয়ে ওঠেন বিশ্বখ্যাত মরমি কবি। রচনা করেন অমরকাব্য ‘মসনবি’। রুমি ও শামস তাবরেজির সাক্ষাতের এ ঘটনাটির সঠিক কোনো ভিত্তি নেই। আমি পাইনি। কাহিনিটি আমি আমার বাবার মুখে শুনেছি। রুমিকে নিয়ে লেখা নানা বইপুস্তকেও পড়েছি। এটি স্রেফ প্রচলিত কাহিনি। এর সত্য-মিথ্যা নির্ণয় করা কঠিন। মজ্জুবের দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে পড়ার টেবিলের পায়ায় আগুন ধরে যাওয়ার ব্যাপারটি যুক্তিতে টেকে না।

১২৪৮ খ্রিষ্টাব্দের এক রাতে রুমি ও শামস তাবরেজি একসঙ্গে বসে কথা বলছিলেন। তখন পেছনের দরজা দিয়ে কেউ তাবরেজিকে ডাক দেয়। তাবরেজি বেরিয়ে গেলেন। কিন্তু আর ফিরে এলেন না। তাঁকে হত্যা করা হয় বলে কথিত আছে। শামস তাবরেজির শূন্যতা রুমিকে প্রচণ্ডভাবে কষ্ট দেয়। তাবরেজির জন্য ভালোবাসা এবং তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন রুমি তার দেওয়ান-এ শামস-এ তাবরিজি কাব্যগ্রন্থে :

‘আমি কেন তাকে খুঁজব?
সে আর আমি তো একই
তাঁর অস্তিত্ব আমার মাঝে বিরাজ করে
আমি নিজেকেই খুঁজছি!’

পরবর্তীকালে রুমির সঙ্গী ছিলেন সালাউদ্দিন জারকুব। পেশায় একজন স্বর্ণকার ছিলেন তিনি। সালাউদ্দিনের মৃত্যুর পর রুমির লিপিকার ও তাঁর প্রিয় শিষ্য হুসাম চালাবি রুমিকে সঙ্গ দেন। একদিন দুজনে একটি আঙুর বাগানে হাঁটছিলেন। রুমিকে সানাইয়ের এলাহিনামা ও শেখ ফরিদ উদ্দিন আত্তারের মানতিক উত-তাইর গ্রন্থের আদলে একটি গ্রন্থ রচনা করতে বলেন হুসাম। রুমি মুচকি হাসলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে একটি কাগজে লিখলেন :
‘বাঁশের বাঁশি যখন বাজে, তখন তোমরা মন দিয়ে শোন, সে কী বলে,
সে তাহার বিরহ বেদনায় অনুতপ্ত হয়ে কাঁদছে।’

এভাবেই রুমির বিখ্যাত গ্রন্থ মসনবি রচনার কাজ শুরু হয়। রুমিকে আরো বেশি বেশি লিখতে উৎসাহ দিতে থাকেন হুসাম। রুমি পরবর্তী বারো বছর ধরে ছয় খণ্ডের ‘মসনবি’ রচনার কাজে নিয়োজিত থাকেন। গ্রন্থটি তিনি তাঁর প্রিয় শিষ্য হুসাম চালাবিকে উৎসর্গ করেন। মসনবি এমনি এক গ্রন্থ যেটিকে অভিহিত করা হয় একত্বের এমন এক বিপণি হিসেবে, যেখানে সমন্বিত হয়েছে জীবনের সব বৈচিত্র্য এবং সব আপাতবিরোধ হয়েছে এক সৃষ্টিশীল একত্ব দ্বারা।

এছাড়াও তিনি অসংখ্য রুবাই ও গজল লিখেছেন। কবিতার পাশাপাশি তাঁর বেশ কিছু বক্তব্য তাঁর সঙ্গী ও অনুসারীদের দ্বারা লিপিবদ্ধ আকারে প্রকাশ পেয়েছে। ‘ফি মা ফি’ গ্রন্থে নানা সময়ে দেওয়া তাঁর প্রায় একাত্তরটি বক্তব্য রয়েছে। ‘মজলিসে সভা’ গ্রন্থে রয়েছে বিভিন্ন সভায় রাখা রুমির সাতটি বক্তব্য। ‘মাকাতিব’-এ রয়েছে তাঁর ছাত্র, পরিবারের সদস্য, রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিবর্গ ও অন্য ব্যক্তিদের কাছে লেখা বেশ কিছু চিঠিপত্র।

শুরুতে মসনবির একটি গল্প বলেছি। আরেকটি গল্প শোনাই। লায়লার প্রতি প্রেমাসক্ত মজনু জীবনের সবকিছু ভুলে একদিন লায়লার বাড়ির দিকে চলল। পথিমধ্যে এক ধার্মিক রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করছিল। মজনু তার সামনে দিয়েই দ্রুতগতিতে হেঁটে গেল। লোকটি দ্রুত নামাজ শেষ করে পেছন থেকে মজনুকে ডাক দিল। মজনু কাছে এলে লোকটি বলল, ‘আমি যে নামাজ পড়ছিলাম তা তুমি দেখোনি? দেখেও আমার সামনে দিয়ে কিনা হেঁটে গেলে!’ মজনু বলল, ‘তুমি কেমন নামাজ পড়ো যে রাস্তা দিয়ে কে যাচ্ছে না যাচ্ছে তা দেখতে পাও? আমি তো লায়লার প্রেমে এমনই মশগুল যে তোমাকে দেখতেই পাইনি। তুমি খোদার প্রেমে মশগুল হয়ে কীভাবে আমাকে দেখলে?’

রুমির মরমিতত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত তাঁর প্রেমতত্ত্বের ওপর। প্রেমকে তিনি ব্যবহার করেছেন একটি অতিন্দ্রীয় আধ্যাত্মিক নীতি বা শক্তি হিসেবে। এই প্রেমের ধারণা তিনি একদিকে খুঁজে পেয়েছেন কোরানে এবং অন্যদিকে পাশ্চাত্য দর্শনে। কোরানে বর্ণিত প্রেমের ধারণাকে তিনি শুধু ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনের ভিত্তি হিসেবেই ব্যবহার করেননি, একইসঙ্গে দেখেছেন সব সত্তার মধ্যে অবস্থিত একটি সৃষ্টিশীল, সংস্কারধর্মী ও ক্রমবিকাশমান প্রবণতা হিসেবে। রুমি এক অনন্ত পরম সত্তার অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিলেন। জীবন ও ইতিহাসের গতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি শরণাপন্ন হয়েছেন এমন এক অতিজাগতিক প্রেমের, যাকে অভিহিত করা যায় আকর্ষণ সৃষ্টিকারী এক সর্বাত্মক আধ্যাত্মিক শক্তি হিসেবে। তাঁর মতে, এই প্রেমের চুম্বকটানে প্রেমিক যেমন আকৃষ্ট হয় প্রেমিকার প্রতি, তেমনি জড়পরমাণুপুঞ্জও আকৃষ্ট হয় পরস্পরের প্রতি। শুধু তাই নয়, এই প্রেম শক্তির আকর্ষণে সৌর জগতের নক্ষত্ররাজিও পৃথিবীকে তাদের দিকে আকৃষ্ট করে স্বাগতিক আলিঙ্গনের ছলে। প্রেমের এই অতিজাগতিক টানের ফলেই পৃথিবী শূন্যে ঝুলে আছে একটি বাতির মতো এবং তার চারদিকে সব শক্তির সমান আকর্ষণের কারণেই তা ঝুঁকে পড়ছে না এদিক-ওদিক। প্রেমের এই অদ্ভুত বন্ধন পৃথিবীকে অধিষ্ঠিত রেখেছে শূন্যে। নীহারিকাপুঞ্জ থেকে যে প্রেমশক্তি সৃষ্টি করে নভোমণ্ডলের গ্রহ তারকাকে, সেই শক্তি আরেকটু এগিয়ে গিয়ে সৃষ্টি করে প্রাণ। কারণ প্রেম বলতে বোঝায় এক সৃজনশক্তিকে।

দার্শনিক হেগেলের মতে, সৃষ্টি অগ্রসর হয় বিপরীত শক্তির সমন্বয়ের মাধ্যমে। রুমির মতে, যা বিপরীত বলে প্রতীয়মান হয় তা আসলে বিরুদ্ধ ভাবাপন্ন নয়, বরং প্রেমের স্পর্শ আগে থেকেই সদৃশ। পরমসত্তা খোদা এই প্রেমের স্রষ্টা। প্রেম যখন ধাপে ধাপে উপরের দিকে অগ্রসর হয়, তখনই সৃষ্টি প্রক্রিয়ায় স্তরে স্তরে উদ্ভুত হতে থাকে নতুন নতুন সত্তা। সব সত্তা ও সব অহমের উৎস খোদা এবং তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্যও খোদা। এই লক্ষ্য অর্জনের প্রক্রিয়াতেই প্রতি পর্যায়ে সৃষ্ট হয় নবতর পূর্ণতা। সর্বত্র প্রাণ বিদ্যমান। আর এই প্রাণ বলতে বোঝায় লক্ষ্যের সন্ধানে নিয়োজিত ক্রিয়াপরতাকে। নিম্নতম সত্তা নিয়ত মিলিত হয়েছে উচ্চতর সত্তার সঙ্গে। এ প্রক্রিয়া ধ্বংসের নয়, বরং ক্রমবর্ধমান অর্জন ও আত্তীকরণের প্রক্রিয়া। আর প্রেমই সজীব ও সচল রেখেছে এই প্রক্রিয়াকে। প্রেম যদি না থাকত, তবে নিষ্প্রাণ পদার্থ উদ্ভিদে মিলিত হতে, উদ্ভিদ জৈব প্রাণে উন্নীত হতে এবং প্রাণচেতনা ও চিদাত্মার লক্ষ্যে অগ্রসর হতে সক্ষমই হতো না। প্রেমের আকর্ষণেই সবকিছু অগ্রসর হচ্ছে নিত্যনতুন জীবনের লক্ষ্যে।

রুমি এই প্রেমের বর্ণনা দিতে গিয়েই মূলত প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন লায়লী-মজনুকে। মজনু লায়লীর প্রেমে এমনই মশগুল যে, সে পৃথিবীর সবকিছু ভুলে গেছে। যে ব্যক্তি খোদার প্রেমে নামাজ পড়ছে তার প্রেম দুর্বল, অগাঢ়। ধার্মিক ব্যক্তির প্রতি মজনুর এই প্রশ্নে এক গভীর প্রেমের সন্ধান পাওয়া যায়।

স্রষ্টার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কী? স্রষ্টাকে চেনা ও বোঝার উপায় কী? মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কী? ইহজগতে থেকে মানবাকৃতি বজায় রেখে মানুষ কীভাবে অস্তিত্বহীন হতে পারে? নিয়তি ও কর্মের সমস্যার সমাধান কী? নফ্স (প্রবৃত্তি) কী এবং নফ্সের প্রভাব থেকে মানুষের মুক্তি লাভের উপায় কী? এসব প্রশ্নেরই উত্তর দিয়েছেন জালাল উদ্দিন রুমি তাঁর ‘মসনবি’ ও ‘দেওয়ান-এ শামস-এ তাবরিজি’ গ্রন্থে। বাংলাভাষাসহ পৃথিবীর নানা ভাষায় মসনবি অনূদিত হয়েছে। পারস্যে কোরান ও হাদিসের পরই মসনবিকে যথাযথ পথপদর্শক গ্রন্থ বলে মনে করা হয়। দেওয়ান-এ শামস-এ তাবরিজিতে রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার শ্লোক, যার প্রায় সবই আধ্যাত্মিক গীতি।

আল্লাহকে চেনা ও বোঝার জন্য প্রেমকে সোপান হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন রুমি। তাঁর মতে, শুধু বুদ্ধি ও যুক্তি দিয়ে আল্লাহকে চেনা যায় না। বরং এর জন্য প্রয়োজন বিশ্বাস ও ভক্তি। ভক্তিই সোপান। আর ভক্তির উৎস হচ্ছে প্রেম ও আসক্তি। মানুষের জ্ঞান সসীম। সসীম জ্ঞান দ্বারা অসীমের অস্তিত্ব প্রমাণ করা কঠিন। তা সবার দ্বারা সম্ভব হয় না। যুক্তি ও বুদ্ধি দিয়ে তাঁর অস্তিত্ব প্রমাণ করতে কেউ কেউ পারে। কিন্তু তারা সংখ্যায় খুবই কম। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যুক্তি ও বুদ্ধি দ্বারা একক সত্তার অস্তিত্ব বিচার করার সময়-সুযোগ পায় না। তাদের নির্ভর করতে হয় প্রেম-ভক্তি তথা আসক্তির ওপর। মানুষ যখন মারেফাতের সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হয়ে নিজের ভেতর স্রষ্টার প্রকাশ অনুভব করে, তখন তার ব্যক্তিত্বের সীমা ভেসে যায়। সে তখন অসীমের ভেতর নিজেকে হারিয়ে ফেলে, কিংবা সে নিজের সীমার ভেতরই তখন অসীমের সন্ধান পায়। তখন সে আনন্দে বিভোর হয়ে স্রষ্টাকে তুচ্ছবোধ করে। মারেফাতের স্তরে উন্নীত হলে আত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে আর কোনো ভেদাভেদ থাকে না। কবি ও গবেষক আবদুল মান্নান সৈয়দের অনুবাদে রুমির একটি কবিতা পড়া যাক:

‘আমি তৈরি হয়েছি না মাটিতে
না বাতাসে, না আগুনে।
আলোয়ও না, ধূলায় না, অস্তিত্বে বা সত্তায় নয়।
আমি নই ভারতবর্ষের কি চীনের
কিংবা বুলগেরিয়ার বা সাক্সিন-এর।
ইরাকেরও নই, নই খোরাসানের।
নই এ পৃথিবীর নই পরলোকেরও
বেহেশতেরও না, দোযখেরও না
আদম বা হাওয়া থেকে উদ্ভুত হইনি আমি
না স্বর্গের, না রিজওয়ানের
আমার স্থান স্থানীনতায়, চিহ্ন আমার চিহ্ন শূন্যতায়
আমি নই শরীরী, আমি নই আত্মাময়
কেবল আমার প্রিয়তমের হৃদয়ে অধিবাস আমার।’

কে এই প্রিয়তম? সেই স্রষ্টা, যার মধ্যে রুমি বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন অধ্যাত্ম-সাধনার মাধ্যমে। রুমির মতে, স্রষ্টা এমন একটি সত্তা, যাকে ইন্দ্রিয় জগতের যে কোনো বস্তু ও ঘটনার চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব বলে প্রত্যক্ষ করা সম্ভব। ঈশ্বর ও মানুষের সম্বন্ধ কোনো বাহ্য দূরত্বের সম্বন্ধ নয়, বরং এমন এক নিবিড় সম্বন্ধ, যাকে যুক্তিতর্কের সাহায্যে বোঝা ও নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। অপরোক্ষভাবে অনুভব করতে হয় প্রত্যেকের আপন সত্তায়। মানব সত্তার এমন একটি প্রদেশ আছে, যেখানে আগ্রহী মানুষ স্বচ্ছন্দে খুঁজে পায় তার পরম ঈস্পিত স্বর্গীয় সত্তাকে এবং যেখানে খোদ অসীম আলিঙ্গন করে সসীমের সঙ্গে।

১২৭৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর ৬৬ বছর বয়সে কোনিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন জালাল উদ্দিন রুমি। মৃত্যুর আগে তিনি নিজের মৃত্যু সম্পর্কে লিখেছিলেন :
‘যেদিন আমি মরে যাব, আমার কফিন এগিয়ে যাবে
সেদিন ভেবো না, আমার অন্তর এই ধরাধামে রয়ে গেছে।
তোমরা অযথা অশ্রু বিসর্জন দিও না, হা-হুতাশ করো না
‘হায়রে লোকটা চলে গেল’―এই বলে বিলাপ করো না।
আমার সমাধিকে অশ্রুজলে কর্দমাক্ত করে দিও না।
আমি তো মহামিলনের মহাযাত্রার অভিযাত্রী।
আমায় কবরে শোয়ালে ‘বিদায়’ জানাবে না
কবর তো ইহকাল-পরকালের মাঝে একটা পর্দা মাত্র
অনন্ত আশীর্বাদের ফোয়ারা।
তোমরা অবতরণ দেখেছ―এবার চেয়ে দেখ আমার আরোহন।
চন্দ্র-সূর্যের অস্তাগমন কি বিপজ্জনক?
তোমাদের কাছে যেটা অস্তাগমন, আসলে সেটাই উদয়ন।’

রুমির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠান প্রায় এক মাসব্যাপী দীর্ঘ হয়েছিল এবং সেখানে মুসলমান, খ্রিষ্টান, ইহুদিসহ প্রায় সব ধর্মের মানুষ উপস্থিত ছিলেন। রুমির শবদেহের পাশে সবাই নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থ পাঠ করেন। বাবার কবরের পাশে সমাহিত করা হয় তাঁকে। কবরের এপিটাফে উজ্জ্বল হরফে লেখা রয়েছে : ‘যখন আমি মৃত, তখন আমাকে আমার সমাধিতে না খুঁজে মানুষের হৃদয়ে খুঁজে নাও।’ রুমির অন্যতম বন্ধু জর্জিয়ার রানি গুরসু খাতুনের তহবিলের দ্বারা রুমির সমাধিস্থলে ‘মাওলানা মিউজিয়াম’ নির্মাণ করা হয়। সেখানে মসজিদ, নৃত্যশালা, বিদ্যালয়, বিখ্যাত ব্যক্তিদের কবর ও দরবেশদের থাকার জায়গা রয়েছে। আজো বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে মুসলিম ও অমুসলিমরা রুমির স্মরণে তাঁর সমাধিস্থলে ছুটে যায়।

স্বকৃত নোমান
রুমির জন্মদিনের স্মরণাঞ্জলি

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে