রোদ্দুর রায়/ মহাকালে রেখাপাত-স্বকৃত নোমান

0
1638
নোমান এনকে

রোদ্দুর রায়/ মহাকালে রেখাপাত-স্বকৃত নোমান

ভাগ্যিস রোদ্দুর রায় পশ্চিম বাংলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বাংলাদেশে জন্ম হলে, এভাবে ‘বাড়া চাঁদ উঠেছিল গগনে’ গাইলে, কিংবা তার এই বিকৃত গান রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে বা মালদা স্কুলে যেভাবে ঢুকে পড়ল, তা বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা স্কুলে ঢুকে পড়লে, তিনি এতদিনে ৫৭ ধারা কিংবা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হয়ে জেলে থাকতেন। কারণ আমরা ধর্মে যেমন রক্ষণশীল, ধর্মহীনতায়ও তেমন রক্ষণশীল। আমরা সব কিছুতেই সিরিয়াস। এমনকি সঙ্গমেও।

কে এই রোদ্দুর রায়? রোদ্দুর রায় হলেন কলকাতার লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের পরিচিত এক মুখ। ‘মোকসা গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট’, ‘মোকসা রেডিয়ো’ ইত্যাদির সঙ্গেও জড়িত তিনি। বিকৃত করে রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে থাকেন। কবিতাও লেখেন। তার কবিতা বা কবিতার বইয়ের নামগুলো খানিকটা অদ্ভুত। শুনলেই হাসি পায় কিংবা ভ্রু কুঁচকে যায়। যেমন তার কবিতা : ‘গান্ডুরা কেন গাঁজা খায়।’ তার একটি কবিতার বইয়ের নাম ‘পরম ক্যাওড়া কাব্যগ্রন্থ।’ অজস্র খিস্তি-খেউড়-খিল্লিতে ভরা বই। তবু পড়তে গিয়ে কখনো কোনো পাঠকের মনে হতে পারে তিনি যেন কিছু একটা বলতে চাইছেন। বইটির উৎসর্গে লেখা :

‘সকল কেওড়া-প্রেমী মানুষ
ও মানুষ-সদৃশ প্রাণীদের
উচ্চাসনে বসায়ে
কাকভোরে
ধূপ-ধুনা-শঙ্খধ্বনি সহকারে
করজোড়ে
বেঁচেমরে
বিভৎস ও বিকট বিসদৃশভাবে
উচাটনময় উৎসর্গ
করা হইল।’

বইটির একটি কবিতা এমন :

‘এখনো আমার নিজের কবিতা-বই
আধো-ঘুমে দেয় হঠাৎ হঠাৎ দেখা
এখনো কখনো মিছিলের মেঘ দেখে
মনে পড়ে কোনো পূজা বা ইদের কথা।

আমিও সহিনু শতেক যাতনা কত
সহিতে হইল হাড়গোড়-ভাঙা ক্ষত
এখনো তোমার রাস্তা-বাড়ির নিচে
মোর কঙ্কাল মোড়া আছে কালো পিচে।

আবার, অন্য একটি কবিতায় তিনি লিখেছেন :

‘অনেক শরীর ঘেঁটে আজকাল
যৌনতা তেমন ভালো লাগে না, কেন কে জানে
ঝর্ণার জল আকণ্ঠ গিলে সেই জলে স্নান করতে
ইচ্ছে করে একা, খুব ভোরে উঠে, পাহাড়ে গিয়ে
সাথে থাকুক, আমার শান্তি শুধু।’

রোদ্দুর রায় নিজেকে ‘বিশ্যোকোবি’ বলে দাবি করেন। সম্প্রতি ইউটিউবে একটি ভিডিও ছেড়েছেন, যেখানে তিনি খিস্তিসহকারে বলছেন, ‘…তাপবিদ্যুত কেন্দ্র বানাবার আর জায়গা পাচ্ছিস না? তুই কি বাল? এই প্রধানমন্ত্রী, না মন্ত্রীগুলো…দেশের যত স্টেট লিডার, যত বাড়া আছিস, কেন? মানুষের গাঁড় মারবি কেন? জঙ্গলের গাঁড় মারবি কেন? তোরা কি জঙ্গলের…জঙ্গলের…জঙ্গলের ইম্পর্টেন্স বুঝিস নে? বুঝিস নে? বোকাচোদা! গোটা পৃথিবী বাঘ বাঁচানোর চেষ্টা করছে, আর তোরা বাঘের ঘাঁড়ে গিয়ে হুড়কো করছিস।’

ভিডিওটিতে খিস্তির এক পর্যায়ে তিনি রবীন্দ্রনাথের ‘ঘাসে ঘাসে পা ফেলেছি বনের পথে যেতে’ গানটি বিকৃত করে গাইলেন ‘ঘাসে ঘাসে বাল ফেলেছি বনের পথে যেতে…।’ তিনি যেভাবে খিস্তি করছিলেন, তাতে আমার খুব হাসি পাচ্ছিল এবং একই সঙ্গে মনে হচ্ছিল তার এই খিস্তি ক্ষমতার বিরুদ্ধে, ক্ষমতার অপপ্রয়োগের বিরুদ্ধে, রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে, অবিচারের বিরুদ্ধে। ভিডিওটি দেখতে দেখতে আমার কেবলই মনে হচ্ছিল, রোদ্দুর রায় যেন আমাকে প্রশ্ন করছেন, ‘তুমি কি ফ্রিডম অব স্পিচ মানো? তুমি কি ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন মানো?’

রোদ্দুর রায়কে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুই বাংলায় বিতর্ক চলছে। বিতর্কের কী কারণ? তিনি রবীন্দ্রনাথের গানকে বিকৃত করে প্যারোডি করেছেন। গেয়েছেন ‘বাড়া চাঁদ উঠেছিল গগনে, বাইঞ্চোদ চাঁদ উঠেছিল গগনে। তার এই বিকৃত গান শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাজানোর কারণে তীব্র বিতর্ক উঠেছিল। সম্প্রতি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় বসন্ত উৎসবে বাজল তার এই বিতর্কিত গান। কয়েকজন ছাত্র-ছাত্রী আবার নিজেদের পিঠে রং দিয়ে লিখেলেন রোদ্দুরের সেই গানের লাইন। আবার উঠল তুমুল বিতর্ক। বিতর্কের মুখে ক্ষমা চাইলেন সেই ছাত্র-ছাত্রীরা। তাতেই শেষ হলো না, পদত্যাগও করলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।

রোদ্দুর রায়ের ‘বিকৃতি’, তার এক্সপ্রেশন, তার খিস্তির কারণে তাকে কেউ কেউ পাগল বলছেন। কেউ কেউ বলছেন রোদ্দুর রায় অসুস্থ, বিকারগ্রস্ত। ফেসবুকে কেউ কেউ তার চৌদ্দগোষ্ঠী ধুয়ে দিচ্ছেন। কেউ কেউ রবীন্দ্রসংগীত বিকৃতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের দাবি তুলেছেন। আজ সকালে আমার এক ফেসবুক ফ্রেন্ড রবীন্দ্রভারতীতে পিঠে রং দিয়ে লেখা রোদ্দুরের বিতর্কিত গানের সেই ছবিটি পাঠিয়ে বললেন, ‘রোদ্দুর হারামজাদাকে কী করা উচিত?’

আমার মনে পড়ে গেল গত বইমেলার একটি ঘটনা। একটি স্টলে তল্লাশি চালিয়ে জনৈক লেখকের একটি বই উদ্ধার করল গোয়েন্দা অফিসার। বইটির একটি লাইন পড়ে অফিসার আমাদের একজন বিশিষ্ট কবিকে বলেছিলেন, ‘দেখেছেন কী লিখেছে? জবাই করে দিতে ইচ্ছে করে না বাইঞ্চোদকে?’ কবি পাল্টা বললেন, ‘এটা কেমন কথা! লেখাটি প্রচলিত আইনের বিরুদ্ধে হলে লেখককে এরেস্ট করেন, জেলে দেন, জবাই করবেন কেন?’

তো আমি সেই ফ্রেন্ডকে পাল্টা প্রশ্ন করলাম, ‘বাড়া রোদ্দুর রায়কে কী করা উচিত?’ তিনি বিস্ময়ে লিখলেন, ‘নোমান ভাই, আপনিও!’ আমি পাল্টা লিখলাম, ‘বাড়া আমি কী?’ এরপর তিনি কোনো উত্তর দিলেন না।

পৃথিবীতে কয়েকটি ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থ আছে, যেগুলো নিয়ে কোনো কথা বলা যায় না, কোনো সমালোচনা করা যায় না। করলে ধার্মিকদের ধর্মানুভূতি আহত হয়। বাংলাদেশে এমন একটি ধর্মের সমালোচনা করায় তসলিমা নাসরিনকে দেশছাড়া হতে হয়, অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা হয়, কয়েকজন ব্লগারকে চাপাতি দিয়ে খুন করা হয়। ওদিকে কলকাতার কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায় ‘অভিশাপ’ কবিতাটি লেখায় একটি ধর্মের অনুসারীরা ক্ষেপে উঠেছিল। তাদের ধর্মানুভূতি আহত হয়েছিল। কবিকে তারা প্রাণনাশের হুমকি এবং মামলাও দিয়েছিল। তার পক্ষে কথা বলায় আরেক কবিকে গণধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়েছিল।

রোদ্দুর রায় এখন রবীন্দ্রনাথের গান বিকৃত করায় একটা শ্রেণি সেই ‘ধার্মিকদের’ মতোই আচরণ করছেন। এঁরা নিজেদেরকে রবীন্দ্রভক্ত বলে দাবি করেন। তাঁদের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ যেন একজন অবতার, যাঁকে নিয়ে নেতিবাচক কথা বলা যাবে না, যাঁর সমালোচনা করা যাবে না; যেন তিনি যা লিখেছেন সবই প্রত্যাদেশ। এই পত্যাদেশ নিয়ে কথা বলা যাবে না, বিকৃত করা যাবে না, অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। অক্ষুণ্ন রাখার জন্য প্রয়োজনে বাংলাদেশের ‘হেফাজতে ইসলাম’ বা ‘ইসলাম রক্ষা’ আন্দোলনের মতো ‘রবীন্দ্র রক্ষা’ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ‘রবীন্দ্র প্রত্যাদেশ’ বিকৃতকারীদের উপযুক্ত শাস্তির বিধান করতে হবে। লেখা বাহুল্য, যাঁরা রবীন্দ্রনাথ বা রবীন্দ্রসাহিত্য নিয়ে এই রক্ষণশীলতার পরিচয় দিচ্ছেন তাঁরাও প্রকারান্তরে সেই ‘ধার্মিকদের’ মতো, কথায় কথায় যাদের ধর্মানুভূতি আহত হয়, কথায় কথায় যারা হুমকি-ধমকি দেয়, কথায় কথায় যারা গেল গেল রব তোলে।

আমার দিন শুরু হয় রবীন্দ্রসংগীত শুনে। কোনোদিন শুনতে না পারলে একটা শূন্যতা কাজ করে। চলতি মাসের শুরুতে ভারতের মেঘালয়ে গিয়েছিলাম। রাজনৈতিক গোলযোগের কারণে সেখানে নেট বন্ধ ছিল। ইউটিইউব থেকে আমি রবীন্দ্রসংগীত শুনতে পারছিলাম না। শোনার জন্য মন কেমন করছিল। একটা হাহাকার জেগেছিল। রবীন্দ্রনাথ আমার কাছে একটি ঝর্না, একটি সমুদ্র। এই ঝর্নায়, এই সমুদ্রে আমি অবগাহন করি। করে শান্তি পাই। জীবনের আনন্দ খুঁজে পাই। পরমানন্দ খুঁজে পাই।

তাই বলে কেউ রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা করলে, তাঁকে গালমন্দ করলে, তাঁর গান বিকৃত করলে, প্যারোডি করলে আমার কিছু যায়-আসে না। কারণ আমি রবীন্দ্ররক্ষণশীল নই। কারণ আমার ‘রবীন্দ্রানুভূতি’ নেই। আমি মুক্ত মানুষ। আমি মনে করি একমাত্র চন্দ্র-সূর্য আর এই বিশাল আকাশ ছাড়া জগতের কোনো কিছুই স্থির নয়, অপরিবর্তনীয় নয়। সবই পরিবর্তনশীল। নদীরা পরিবর্তনশীল, প্রাণেরা পরিবর্তনশীল, সমুদ্র পরিবর্তনশীল, নক্ষত্র পরিবর্তনশীল। রবীন্দ্রশিল্পের যে বিশাল ভুবন, আমরা এখনো যেভাবে এ ভুবনকে প্রণাম করছি, একদিন এই প্রণামেও পরিবর্তন আসতে পারে। একদিন হয়ত রবীন্দ্রসাহিত্য গুরুত্ব হারাবে। আসবেন তাঁর চেয়ে শক্তিশালী কোনো কবি। তাঁর চেয়ে উন্নত সাহিত্য রচনা করে তিনি বাঙালিকে ভাসিয়ে দেবেন সাহিত্যরসধারায়।

রবীন্দ্রনাথ হচ্ছেন সূর্যের মতো। শীতকালে মানুষ সূর্যের কাছ থেকে উত্তাপ নেয়। গ্রীষ্মকালে আবার উত্তাপ থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য ছাতা মাথায় দেয়। রোদে অতীষ্ঠ হয়ে কেউ কেউ আবার খিস্তিও করে ‘শালার সূর্য, শালার রোদ, শালার গরম’ বলে। তাতে সূর্যের কিছু যায়-আসে না। কিংবা রবীন্দ্রনাথ হচ্ছেন একজন বিশাল মহীরুহ। গ্রামবাংলায় বিশাল বিশাল বটবৃক্ষ দেখা যায়। এসব বৃক্ষের ছায়ায় মানুষ যেমন বিশ্রাম নেয় তেমনি পেশাবও করে। মানুষ এসব বৃক্ষের গায়ে কাস্তে গেঁথে রাখে, দা-ছেনি গেঁথে রাখে, কুড়াল গেঁথে রাখে। তাতে বৃক্ষটির কোনো ক্ষতি হয় না। সে এমনই বিশাল মহীরুহ, এই সামান্য আঘাতে তার কিছু যায়-আসে না।

রবীন্দ্রনাথও তাই। তিনি আমাদের সুখের সঙ্গে, দুঃখের সঙ্গী, আনন্দের সঙ্গী, বিষাদের সঙ্গী; একই সঙ্গে খিস্তিরও সঙ্গী। আমরা আনন্দে তাঁর শরণ নিই। গাই, ‘জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ, ধন্য হলো ধন্য হলো মানবজীবন।’ আমরা বিষাদে তাঁর শরণ নিই। গাই, ‘এই যে হিয়া থরোথরো কাঁপে আজি এমনতরো, এই বেদনা ক্ষমা করো, ক্ষমা করো, ক্ষমা করো প্রভু…।’ তেমনি জীবনযন্ত্রণায় জর্জরিত ও অতীষ্ঠ হয়েও আমরা তাঁর শরণ নিয়ে বলব, ‘বাড়ার জীবন! বাড়ার আকাশ ভরা সূর্য-তারা, বালের বিশ্বভরা প্রাণ।’

কেননা আমি সমস্ত রক্ষণশীলতা থেকে মুক্ত।
কেননা আমরা সমস্ত রক্ষণশীলতা থেকে মুক্ত।
কেননা আমি মনে করি শিল্প-সাহিত্য সমস্ত রক্ষণশীলতা থেকে মুক্ত।

মহাকালে রেখাপাত

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধ“ভুলে যাস”-আগমনী ধরের কবিতা
পরবর্তী নিবন্ধ“আদর ও অপমানের কবিতা”- সুবীর সরকারের কবিতা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে