শ্রীচৈতন্যের কৃষ্ণপ্রেম – স্বকৃত নোমান

0
652
Noman

শ্রীচৈতন্যের কৃষ্ণপ্রেম- স্বকৃত নোমান

আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন বলেছিলেন, পৃথিবীতে প্রেম একবারমাত্র রূপ-পরিগ্রহ করেছিল এবং তা এই বাংলাদেশে। এ মন্তব্য আবেগপ্রসূত নয় মোটেই। প্রকৃতার্থেই শ্রীচৈতন্য এই দেশে প্রেমের একটা মহাজাগরণ ঘটাতে পেরেছিলেন। সেই প্রেম ছিল ব্রাহ্মণ সমাজের জাত-পাতের ভেদ-বিভেদের বিরুদ্ধে তীব্র লড়াই। যেসব হিন্দু বর্ণবাদের শিকার হয়ে মানবাধিকার বঞ্চিত হয়েছিল, চৈতন্যের প্রচারিত বৈষ্ণবধর্মের প্রসারে তাদের হীনম্মন্যতা ঘোচাতে খুবই সাহায্য করেছিল। চৈতন্যদেবের আবির্ভাব বাঙালীর ক্ষয়িষ্ণু ও আচারসর্বস্ব ধর্মীয় কৃত্যে এক নতুন সুর যোজনা করেছিল। তাঁর সর্বগ্রাসী কৃষ্ণচেতনা, জীবন ও জগতের মধ্যে যে ঐক্য ও ছন্দ আবিষ্কার করে, তা সনাতন ধ্রুপদী ধর্মচেতনার বিরুদ্ধে এক যুগজয়ী বিদ্রোহ।

কৃষ্ণ মানে ঈশ্বর। বিষ্ণুর উপাসনা বিষয়ে সবচেয়ে প্রাচীন প্রমাণ ঋগ্বেদ সংহিতা। তাতে বিষ্ণু আদি এবং যজ্ঞরূপে কল্পিত হয়েছে। নামকীর্তনের মাধ্যমে বিষ্ণুর দয়া লাভ, সার্বজনীন প্রীতি ও ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ―পুরুষের প্রয়োজনীয় এই চতুর্বর্গ লাভের উল্লেখ পাওয়া যায় বেদ বা বেদ-স্বীকৃত গ্রন্থগুলোতে। বিষ্ণুকে আশ্রয় করে বৈষ্ণব সাধনার এই প্রাচীনতম রূপই শ্রৌত বা বেদ-স্বীকৃত বৈষ্ণব ধর্ম। ঋগ্বেদ এবং আরণ্যক-ব্রাহ্মণের বিভিন্ন স্থানে বিষ্ণু এবং ভক্তিরসের উল্লেখ থাকলেও বিষ্ণুর সাথে সেই ভক্তির বিশেষ সম্পর্ক নেই। সেকারণে বেদ-স্বীকৃত বৈষ্ণব ধর্মের আলোচনায় ভক্তি কখনোই প্রধান বিষয় হয়ে ওঠেনি। মহাভারতের যুগে এসে শ্রৌত বৈষ্ণব ধর্ম পরিবর্তিত হয়ে পাঞ্চরাত্রিক সাত্ত্বত ধর্ম বা ভাগবত ধর্ম নাম ধারণ করে এবং শ্রৌত নাম ‘বিষ্ণু’র পরিবর্তে উপাস্য দেবতার নাম হয় ‘বাসুদেব কৃষ্ণ’। পৌরাণিক যুগে এই দেবতার উপাসনা, ধ্যান এবং তার উদ্দেশ্যে জপ, হোম ইত্যাদি কৃত্যের বিশেষ প্রচলন হয়।

পুরাণের মাধ্যমেই শ্রীকৃষ্ণ তৎকালীন বিভিন্ন ধর্মে প্রধান দেবতা রূপে আখ্যায়িত হন। এই কৃষ্ণকে বিষ্ণুর অংশাবতার বলা হয়। বিষ্ণু বৈদিক দেবতাদের মধ্যে প্রধান দেবতা হিসেবে গণ্য না হলেও বিষ্ণু-অবতার কৃষ্ণ পৌরাণিক যুগে এসে প্রধান দেবতায় পরিণত হন। ‘মহাভারত’ ও ‘গীতা’র বাসুদেব কৃষ্ণ বৃষ্ণিবংশে আবির্ভূত হয়েছেন এবং মানবী দেবকীর গর্ভে জন্ম নিয়েছেন বলে উল্লেখ রয়েছে। কালক্রমে এই মানবীরূপী কৃষ্ণ-বাসুদেব বৈদিক বিষ্ণু-কৃষ্ণের সঙ্গে অভিন্ন হয়ে যান। পরবর্তীকালে ভাগবত, বিষ্ণুপুরাণ, হরিবংশ এবং পদ্মপুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ প্রভৃতিতে উল্লেখিত কৃষ্ণলীলা এবং গোপীকৃষ্ণলীলা এর সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় শ্রীকৃষ্ণ প্রেম-ভক্তির দেবতায় পরিণত হন। সেই সময় রক্ষণশীল ব্রাহ্মণেরা নাথসিদ্ধ বৌদ্ধধর্ম প্রভাবিত শৈব-শাক্ত ধর্মকে অগ্রাহ্য করলেও বৈষ্ণবরা অহিংসা এবং সদাচার পালনের মাধ্যমে তথাকথিত উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণদের কাছে স্বীকৃতি লাভ করেন। ব্রাহ্মণদের দ্বারা বৈষ্ণব মত সমর্থিত হয় এবং দার্শনিক রামানুজের চেষ্টায় বেদান্তের বৈষ্ণবীয় ব্যাখ্যাও প্রচারিত হয়।

একই সময়ে বৈষ্ণব, শাক্ত ও শৈব পৌরাণিকগণ মিলিতভাবে রচনা করেন সমন্বয়ধর্মী ‘ব্রহ্মবেবর্তপুরাণ’ এবং পরে রচিত হয় ‘বৃহদ্ধর্মপুরাণ’। এসময়ে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের নিজস্ব পুরাণ ‘ভাগবতপুরাণ’ও রচিত হয়। পৌরাণিক বৈষ্ণব ধর্ম ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং শাস্ত্র দ্বারা অনুমোদিত হবার পর বৈষ্ণবাচার ও পূজাপদ্ধতি বৈষ্ণবদের উপ-পুরাণসমূহে তালিকাভুক্ত ও বর্ণিত হয়। কিন্তু যে সমস্ত বৈষ্ণব আচার-বিচার ও আনুষ্ঠানিকতা পছন্দ করতেন না, তারা একটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। সেই তত্ত্বটির নামই ভক্তিবাদ। এই মতের বৈষ্ণবেরা কৃষ্ণপ্রেমের ভক্তিমূলক ব্যাখ্যা দেন। খ্রীস্টীয় চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতকে বল্লভাচার্য ভক্তিকেন্দ্রিক আরেকটি দার্শনিক মত প্রচার করেন, যার নাম বিশুদ্ধাদ্বৈতবাদ। শ্রীচৈতন্যের কিছুকাল আগে বল্লভাচার্যের আবির্ভাব। তাঁর মতে, ব্রহ্ম ও জগৎ উভয়ই সত্য, কেউই মায়া নয় এবং জীবজগৎ ব্রহ্মময়। এর আগে রামানুজ ব্রহ্মকে বৈদিক বিষ্ণুর সঙ্গে অভিন্ন মনে করেছিলেন। কিন্তু ভল্লবাচার্যের মতে, পৌরাণিক কৃষ্ণই সেই ব্রহ্ম আর এই কৃষ্ণসাক্ষাৎই ভক্তিসাধনের চূড়ান্ত পরিণতি। এভাবেই গৌড়ীয় বৈষ্ণব ভক্তিবাদের তাত্ত্বিক পটভূমি তৈরি হয়। শ্রীচৈতন্য এই বৈষ্ণব ভক্তিকেই জনগণের মনে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।

শ্রীচৈতন্য যে ধর্ম প্রচার করেছিলেন, তা নতুন ছিল না। তার আগেও বৈষ্ণব ধর্ম বর্তমান ছিল। তিনি কেবল একটি সূত্রের মাধ্যমে এই বৈষ্ণববাদকে সামনে এগিয়ে নিলেন দারুণ শক্তিমত্তার সঙ্গে। মধ্যযুগের বাংলাদেশে হিন্দু ব্রাহ্মণদের কারণে যে সামাজিক বৈষম্য বিরাজ করছিল, শ্রীচৈতন্য ধর্মীয় আন্দোলনের মাধ্যমে ভক্তিকে ঈশ্বর-উপাসনার কেন্দ্রে রেখে এক ধরণের ধর্মীয় সামাজিক উদারনীতি প্রবর্তন করেছিলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, জীবের মুক্তির একমাত্র উপায় শ্রীকৃষ্ণনামসংকীর্তন। তাই তিনি প্রচার করলেন শুদ্ধ ভক্তিধর্মের। অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ ভজনই ভক্তি। ইহলোক ও পরলোকের সকল কামনা-বাসনা ত্যাগ করে ভগবানে চিত্ত স্থিত বা তন্ময়তাই হচ্ছে ভক্তির নাম। মানুষ এই পৃথিবীকে যে প্রেম-ভালোবাসা দিয়ে আচ্ছাদিত করে রাখে, তা ঈশ্বর তথা কৃষ্ণকে দেওয়ার নামই হচ্ছে ভক্তি।

শ্রীচৈতন্যের মতে, জীব ও জগতের সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্ক যুগপৎ ভেদ এবং অভেদের অর্থাৎ দ্বৈত এবং অদ্বৈতের। কৃষ্ণের অনন্ত শক্তির মধ্যে তিনটি শক্তি হচ্ছে প্রধান। যথাক্রমে, স্বরূপ, মায়া ও জীব। জীব-জগৎ কৃষ্ণের জীব-শক্তির অংশ। অতএব কৃষ্ণের সঙ্গে জীবের সম্মন্ধ শক্তিমান ও শক্তির। শক্তিমান ও শক্তির মধ্যে দ্বৈত ও অদ্বৈত একই সঙ্গে বর্তমান। জীব-জগৎ ব্রহ্মের বিকার নয়, পরিণাম। শ্রীচৈতন্য জীব এবং জগতকে সত্তা হিসেবে স্বীকার করেন। কারণ সত্তার এই দ্বৈততা ছাড়া ভক্তিপন্থা সম্ভব নয়।

এই ভেদ এবং অভেদের, দ্বৈত এবং অদ্বৈতের ভেদ ঘুচানোর জন্য হরিনাম বা শ্রীকৃষ্ণনামকীর্তনই একমাত্র মাধ্যম। কর্মযোগ বা জ্ঞানের অপেক্ষা রাখে না ভক্তি। ভক্তি স্বতন্ত্র এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ। বৈরাগ্যে, জ্ঞানে, ধ্যানে যা হবে, যা হবে তীর্থে-ব্রতে-দানে-পুণ্যে, তা একমাত্র ভক্তিতেই ফলনীয়। একমাত্র ভক্তিতেই কৃষ্ণকে পাওয়া সম্ভব। ভক্তির সাধনে কিছুই লাগে না। না জ্ঞান, না বৈরাগ্য, না অন্য কোনো অনুসঙ্গ। ভক্তি ছাড়া জ্ঞানযোগও অর্থহীন। যে শাস্ত্রজ্ঞ, সেও যদি সর্বেশ্বরে ভক্তিযুক্ত না হয়, সে পুরুষাধম ছাড়া কিছু নয়। জ্ঞানের দ্বারা ভগবান লাভ অতি কষ্টকর। কারণ জ্ঞানের কর্মই হলো সন্দেহের সৃষ্টি ও সন্দেহের বিনাশ। জ্ঞানীব্যক্তি যেরূপে ঈশ্বরকে দেখেন, তার সেই ভাবটি কেটে গেলেই মনে সন্দেহ উঁকি দেয়। মনে হয়, যা দেখলাম তা কি সত্যি! অতএব, ভক্তিই একমাত্র কৃষ্ণলাভের পথ। ভক্তিই শ্রেষ্ঠ জ্ঞান। জ্ঞানলাভ তখনই সফল হবে, যখন শ্রীকৃষ্ণপাদপদ্মে কায়মনোবাক্যে নিজেকে বিলীন করে দেওয়া যাবে।

চৈতন্যের সময়কালের ব্রাহ্মণরা হিন্দু ধর্মকে রক্ষাকল্পে যে বর্ণবাদের রীতিকে কঠিনতর করে তুলেছিল, তাতে বহুধা বিভক্ত নিম্নবর্ণের হিন্দুরা অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। অনেকে স্বজাতির কাছে বঞ্চনা ও অবহেলার স্বীকার হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ শুরু করেছিল। শ্রীচৈতন্যের বৈষ্ণব আন্দোলন তৎকালীন নিম্ন শ্রেণির হিন্দু সমাজের ওপর দারুণ প্রভাব বিস্তার করে। ফলে এ সমাজের লোকদের ইসলাম গ্রহণের গতি স্তিমিত হয়ে যায়। শ্রীচেতন্য যে কৃষ্ণভক্তির কথা বললেন, তাতে উঁচু-নিচু বর্ণ বা জাতকুলের ভেদাভেদ রাখলেন না। এই ভক্তি সব জাত, সব কুলের জন্য প্রযোজ্য। কিরাত, হুন, অন্ধ্র, পুলিন্দ, পুক্কস, আভীর, যবন―সবার জন্যই এই ভক্তির দুয়ার খোলা। শ্রীচৈতন্য ঘোষণা করলেন, নীচ জাতি কৃষ্ণভজনের অযোগ্য নয়। আবার উঁচু জাতিতে জন্ম নিলেই যে কৃষ্ণভজনের যোগ্যতা অর্জন করা যায় তাও কিন্তু নয়। যে ভজনা করে সেই শ্রেষ্ঠ। শুধু মানুষ কেন, কীটপতঙ্গ এবং পশুরাও শ্রীকৃষ্ণ নামকীর্তনে উর্ধ্বগতি লাভ করতে পারবে।

হিন্দুরা মন্দিরে গিয়ে, মুসলমানরা মসজিদে গিয়ে ঈশ্বরের আরাধনা করে। এ আরাধনা নির্দিষ্ট সময়ও রয়েছে। শ্রীচৈতন্য বললেন, ভক্তিতে স্থান-অস্থানের বালাই নেই। ভক্তির জন্য মসজিদ-মন্দির-প্যাগোডার প্রয়োজন হয় না। যখন যেখানে খুশি― হাটে-মাঠে-ঘাটে-গৃহে-শ্মশানে―যে কোনো একটা স্থানে ভজন করলেই হলো। যেখানে ভজন সেখানেই বৃন্দাবন। যে স্থানে কৃষ্ণনাম জপা হয় সেই স্থান হয়ে যায় কৃষ্ণের নিজধাম। এই ভজন হতে পারে যে কোনো সময়, যে কোনো অবস্থায়। ভজনের জন্য নির্দিষ্ট বয়সেরও দরকার নেই। মহাভারতপ্রোক্ত প্রহ্লাদ ভজন করেছিলেন মাতৃগর্ভে, ধ্রুব শৈশবে, অম্বরিষ যৌবনে, যযাতি বার্ধক্যে, অজামিল মৃত্যুকালে, চিত্রকেতু মরণান্তে। শ্রীচৈতন্য বললেন, যে কোনো বয়সে এই ভজন করা যায়। নরকে বসেও যদি হরিনাম করা যায়, তাতে নরকও স্বর্গে রূপান্তরিত হয়।

শ্রীচৈতন্য যে-কালে আবির্ভূত হন, মহাভারতীয় মতে সেই কালের নামে কলিকাল। ইতোপূর্বে সত্য, ত্রেতা ও দ্বাপর নামে তিনটি যুগ কেটে গেছে। বিভিন্ন কালে বিভিন্নভাবে কৃষ্ণসাধন চলেছে। সত্যযুগের সাধন ছিল ধ্যানের মাধ্যমে, ত্রেতার সাধন যাজ্ঞ-যজ্ঞে, দ্বাপরের সাধন পরিচর্যায়। চৈতন্য বললেন, কলিকালে হরিনামই একমাত্র সাধন। এই কালে ধ্যান নয়, যাগ-যজ্ঞ নয়, পরিচর্যা নয়, কেবলই হরিনাম। তিনি বললেন, সাধন ভক্তির পাঁচ অঙ্গ : সাধুসঙ্গ, নামকীর্তন, ভাগবতশ্রবণ, মথুরাবাস, শ্রীমূর্তি সেবন। কিন্তু যেভাবেই সাধন করা হোক না কেন, নামের আশ্রয় ছাড়া ফল নেই। তাই কৃষ্ণনামে আত্মহারা হতে বললেন তিনি। হাসি-কান্না, নৃত্য, গীত সবই করবে এই কৃৃষ্ণের নামেই। এ নামসংকীর্তনে মান-অপমানের জ্ঞান থাকলে হবে না, লজ্জা-শরমের ধার ধারলে হবে না, থাকবে না কারো জন্য অপেক্ষা। শ্রীকৃষ্ণ নাম-সংকীর্তনই শ্রেষ্ঠ ভজন। শ্রীকৃষ্ণ নাম সংকীর্তনে চিত্তদর্শন সম্পূর্ণরূপে মার্জিত হয়। সংসারের দুঃখ-দুর্দশা সম্পূর্ণভাবে দূর হয় হরিনাম জপে। এতে সর্বশ্রেষ্ঠ আত্মমঙ্গল পূর্ণ বিকশিত হয়। প্রেমানন্দকে সম্যকরূপে বৃদ্ধি করে পদে পদে পরিপূর্ণ অমৃতের আস্বাদন করায়। শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের প্রভাবে জীবগণ সুশীতল শ্রীকৃষ্ণপাদপদ্ম সেবায় সমুদ্রে অবগাহন করতে পারে। ভক্তিই প্রেমানন্দামৃতসিন্ধু। ভক্তিই পরম পুরুষার্থ। যতক্ষণ দেহে প্রাণ আছে ততক্ষণ শ্রীকৃষ্ণপাদপদ্মে ভক্তি রাখো। কৃষ্ণ বলো, কৃষ্ণ ভজ, করো কৃষ্ণ শিক্ষা।

শ্রীচৈতন্যের কৃষ্ণসাধন পদ্ধতি ছিল দুই ধরণের। তিনি সংকীর্তন ও নগরকীর্তনের প্রচলন করেছিলেন। বৈষ্ণবরা সংকীর্তনে ভাগাবেগে আপ্লুত হয়ে ঢাক-ঢোল-খোল-করতাল ও মৃদঙ্গ বাজিয়ে এবং পতাকা উড়িয়ে নগরকীর্তনে বের হতো। সে সময় আনন্দে উদ্বেল হয়ে নৃত্য-গীত করতে করতে শোভাযাত্রা সহকারে রাজপথসমূহ প্রদক্ষিণ করে সমস্ত শহর মুখর করে তুলতো। শুরুতে শিষ্য শ্রীবাসের বাড়িতে প্রতিদিন নামকীর্তন হতো। সারারাত খোল-করতাল-মৃদঙ্গ সহযোগে ভক্তবৃন্দসহ নেচে নেচে কীর্তন করতেন নিমাই। কীর্তন আরম্ভ হওয়ার সময় বাইরের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হতো, যাতে কেউ হঠাৎ ভেতরে এসে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে না পারে। কথিত আছে, শ্রীকৃষ্ণ নাম সংকীর্তনের সময় কখনো কখনো শ্রীচৈতন্যের বাহ্যজ্ঞান থাকত না। তন্ময়তার মধ্যে ডুবে গিয়ে তার চৈতন্য বিলোপ হতো। বৈষ্ণবরা একে ‘শ্রীভগবানভাব’ বলে অভিহিত করে থাকেন।

শ্রীচৈতন্যের ধর্মকে ভক্তি ও প্রেমের ধর্ম বলা হয়। রাধা ও কৃষ্ণের প্রেমলীলাই হচ্ছে তাদের ঈশ্বরপ্রেমের প্রতীক। কথিত আছে তিনি কখনো শ্রীরাধাকৃষ্ণ-ভাবে বিভোর হতেন। শ্রীকৃষ্ণকে দেখার আশায় যমুনায় যান জল আনতে। যাবার পথে চকিত নয়নে এদিক-সেদিক কৃষ্ণকে খোঁজেন। খুঁজতে খুঁজতে কিছুদূর গিয়ে যেন দেখতে পেলেন কদম গাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছেন কৃষ্ণ। চার চোখের মিলন হতে থমকে দাঁড়ালেন শ্রীরাধিকাভাবী চৈতন্য। অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে আনন্দে শিউরে উঠতে লাগলেন। তারপর লজ্জা পেয়ে ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে নিয়ে ধীরপায়ে ফিরে চললেন বাড়ির দিকে। যেতে যেতে ফিরে ফিরে দেখতে লাগলেন সজাগ দৃষ্টি নিয়ে। আবার কখনো শ্রীকৃষ্ণভাবে বিভোর হয়ে শ্রীরাধিকার অন্বেষণে পাগলের মতো ছুটোছুটি করতেন। চৈতন্যের এসব ভাবকেই বলা হয় তাঁর লীলা বা কৃষ্ণপ্রেম লীলা।

কীর্তনকালে বা কৃষ্ণে মতিরস্তুকালে চৈতন্য কেন অচেতন হয়ে পড়তেন, এই বিষয়ে ড. আহমদ শরীফ একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, নিমাই ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন। অসামান্য তার আঙ্গিকরূপ, অতুল্য ব্যক্তিত্ব, অনন্য মনীষা, অসীম সাহস এবং একাধারে বজ্রকঠিন ও কুসুম কোমল হৃদয় তার। সে হৃদয় ছিল প্রীতির প্রস্রবণ। তিনি ছিলেন অত্যন্ত আবেগপ্রবণ মানুষ। এ ধরণের মানুষরা সাধারণত কোনো অনভিপ্রেত আকস্মিক ঘটনার অভিঘাত সহ্য করে স্থির থাকতে পারে না। এছাড়া তার মৃগী রোগও ছিল বলে জানা যায়। কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘চৈতন্যচরিতামৃতে’ যেমন উল্লেখ আছে, ‘মৃগ ব্যাধিতে মুই কভু হই অচেতন।’ সেই হিসেবে নিমাইয়ের যে এরকম একটি রোগ ছিল, তাতে বিশেষ সন্দেহ নেই। যৌবনের শুরুতে একবার অল্প সময় এবং মৃত্যুর আগে বারো বছর তিনি মতিচ্ছন্ন ছিলেন। এই মতিচ্ছন্নতাকে বৈষ্ণবরা প্রেমোন্মাদ, দিব্যোন্মাদ বা আধ্যাত্মসিদ্ধিজাত মরমী মতিচ্ছন্ন বলে অভিহিত করে থাকেন। তাই চৈতন্যদেব মাত্র বারো বছরই (১৫১০-২১) সুস্থ ও স্বচ্ছ থেকে স্বীয় মতবাদ মুখে মুখে প্রকাশ ও প্রচার করতে পেরেছিলেন।

চৈতন্যের সময়কালে ফার্সি ছিল রাজভাষা। ফলে সর্বত্র এ ভাষা পঠিত ও ব্যবহৃত হতো। পারস্য কবি জালালউদ্দিন রুমির ‘মসনবি’ তখন এ দেশে একটি বহুল পঠিত ও আলোচিত গ্রন্থ ছিল। ব্রাহ্মণরাও এ গ্রন্থ সংগ্রহপূর্বক পাঠ করতেন বলে জানা যায়। জয়ানন্দের ‘চৈতন্যমঙ্গলে’র উদ্বৃতি অন্তত তাই প্রমাণ করে : ‘মসনবী আবৃত্তি করে থাকে নলবনে/ মহাপাপী জগাই মাধাই দুইজনে’। জালালউদ্দিন রুমি মৌলবি দরবেশমণ্ডলী ও নৃত্যশীল দরবেশ দল নামে অভিহিত একটি বিশিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ দরবেশ দল বিশেষ পোষাক পরিধান করে ঢোল, তাম্বুরা, বাঁশী প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র সহকারে গান, ভজন, নৃত্য করতেন। গবেষকদের কারো কারো অভিমত, শ্রীচৈতন্যের নামসংকীর্তন বা নগরকীর্তনের এ ধারা জালালুদ্দিন রুমির ধারায় প্রভাবিত। চৈতন্য ছিলেন তুখোড় পণ্ডিত। রুমির ‘মসনবি’ বা তার প্রেমতত্ত্ব নিমাইয়ের পড়া ছিল। ফলে রুমির প্রভাবে প্রভাবিত হওয়াটা বিচিত্র কিছু নয়।

এদিকে, বৈষ্ণবধর্মে মুসলমান সুফিদের প্রভাবকেও অস্বীকার করা যায় না। ইতিপূর্বে মুসলমান সুফি বায়েজিদ ও মনসুর হাল্লাজ ঈশ্বরের সঙ্গে এরূপ অদ্বৈতবোধে পৌঁছে নিজেদের ঈশ্বর বা ‘আনাল হক’ দাবি করার বিষয়টিও বহু বিশ্রুত। শ্রীচৈতন্যও শিষ্য গদাধরকে যেমন বলেন, ‘আমি সেই অন্তরবাসী অন্তরতম, যিনি তোমাদের হৃদয়ে বিরাজ করছেন। আমিই সেই পরমপুরুষ। জীবের দুঃখ নিবারণের জন্য আমি এসেছি। কিন্তু সাথে দণ্ড, অস্ত্র নেই, সৈন্য-সামন্ত নেই। শুধু প্রেম নিয়ে, ভক্তি নিয়ে এসেছি। শুধু প্রেম-ভক্তিতেই এবার সকলের পাপ ক্ষয় করবো, করবো দুঃখ জয়।’ তাঁর এ উক্তির সঙ্গে মনসুর কিংবা বায়েজিদের উক্তি মিলে যায়। কিংবা তাঁর ‘মুই সেই মুই সেই’ উক্তি দ্বারাও সেই অদ্বৈতবোধের আভাস পাওয়া যায়। কৃষ্ণদাস কবিরাজ চৈতন্যচরিতামৃতে যেমন বলেন―

মৃগমদ তার গন্ধ যৈছে অবিচ্ছেদ
অগ্নি জ্বালাতে যৈছে নাহি কভু ভেদ
রাধা কৃষ্ণ ঐছে সদা একই স্বরূপ
লীলারস আস্বাদিতে ধরে দুইরূপ
অনন্ত স্ফটিকে যৈছে এক সূর্য ভাসে
তৈছে জীবে গোবিন্দের অংশ প্রকাশে।

এছাড়া সুফিদের ‘হাল’, ‘জিকির’, ‘সামা’র মতো বৈষ্ণবদের মধ্যে ‘দশা’, ‘কৃষ্ণনাম’ ও ‘কীর্তনে’র প্রচলন ছিল। সুফিদের ‘এশকে’র মতো বৈষ্ণবদের ‘প্রেম’ এবং সুফিদের ‘সাকী’ ও ‘বুত’ বা ‘শামা’ ও ‘পরওয়ানা’র মতো বৈষ্ণবদের রাধাকৃষ্ণ একই কথা বলে। সুফিদের ‘ওয়াহদাতুল অজুদ’ ও বৈষ্ণবদের ‘অদ্বৈতবাদ’ আসলে একই বিষয়। চৈতন্যদেবের মধ্যে সুফি প্রভাব বিষয়ে ড. আহমদ শরীফের মন্তব্যেও এরকম ঈঙ্গিত পাওয়া যায়। ‘চৈতন্য মতবাদ ও ইসলাম’ প্রবন্ধে তিনি লেখেন, ‘সুফীদের আশেক-মাশুক তত্ত্বের প্রভাবে ভারতীয় ভক্তিমার্গের চৈতন্য-উদ্ভাবিত প্রেম-মার্গে উত্তরণ, চৈতন্যদেবের অসামান্য অবদান। ভক্ত-ভগবানে অধিকার-প্রশ্রয়ের সীমা আছে, আচরণে-ব্যবহারে থাকে সংকোচের শরমের সম্মানের বালাই। প্রেমই কেবল সর্বপ্রকার শাস্ত্রিক, সামাজিক, নৈতিক বাধা-ব্যবধান ঘুচিয়ে দেহে মনে, আত্মার-অনুভবে যুগল কিংবা অভেদ-অভিন্ন করে দেয়। কাজেই চৈতন্য প্রবর্তিত রাগাত্মিকা ও রাগানুভক্তি―দুটোই সুফীমতের প্রভাব।’

ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হকও শ্রীকৃষ্ণকীর্তন থেকেই বাংলা সাহিত্য ও গৌড়ীয় বৈষ্ণবতত্ত্বে সুফি প্রভাবের গভীরতর ও ব্যপকতা প্রভাব লক্ষ্য করেছেন। ডক্টর সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ও বৈষ্ণব মতবাদে সুফিমতেরও সাধন-প্রণালীর কম-বেশি প্রভাব স্বীকার করেন। কেউ কেউ বলেন, বৈষ্ণবদের এসব পদ্ধতি ও ভাবধারা ‘উপনিষদ’ ও ‘ভাগবত’ থেকে গৃহীত। আবার কারো অভিমত যে, উভয়ে উভয়ের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। কারণ সুফিদের ওপর বেদান্ত, জরথুষ্ট্র ও বৌদ্ধ দর্শনের প্রভাব রয়েছে। কাজেই সুফিদের সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল বৈষ্ণবদের এই পদ্ধতি ও ভাবধারার উৎস ‘উপনিষদ’ ও ‘ভাগবত’ হওয়া মোটেই বিচিত্র কিছু নয়।

স্বকৃত নোমান
১১.০৫.২০২০

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধজাগো বাহে কোনঠে সবায় সংগঠনের ইফতার বিতরণ অব্যাহত
পরবর্তী নিবন্ধটাউট কাকে বলে?- রেজাউল করিম খান

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে