“সাম্প্রদায়িকতা নিপাত যাক, জয় হোক মানুষের” – স্বকৃত নোমান

0
525
নোমান এনকে

সাম্প্রদায়িকতা নিপাত যাক, জয় হোক মানুষের —স্বকৃত নোমান

দিল্লিতে যে সাম্প্রদায়িক রক্তপাত শুরু হয়েছে তার প্রভাব কি পশ্চিম বাংলায় কিংবা বাংলাদেশে পড়বে? হয়ত। কিন্তু আমরা আশাবাদী হতে চাই, পড়বে না। পড়তে আমরা দেব না। এই ক্রান্তিকালে আমরা স্মরণ করতে পারি আমাদের অতীতকে। বাঙালি মানুষ নিশ্চয়ই ভুলে যায়নি বিশ শতকের কথা। ভুলে যায়নি বিশ শতকের ভয়াবহ দাঙ্গার কথা। ছেচল্লিশের দাঙ্গায় যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল তা কুরুক্ষেত্রে হয়েছে কিনা সন্দেহ। কলকাতায় এক মুসলমানকে মেরে তার ছিন্নমুণ্ড উল্লাসে দেখিয়ে বেড়াচ্ছে হিন্দু মহাসভার দুই পাণ্ড। যবন হত্যা করেছে বলে তাদের আশীর্বাদ করছে এক ব্রাহ্মণ। বাচ্চাদের পা ধরে শূন্যে ঘুরিয়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে মুসলিম লীগের পাণ্ডারা। নোয়াখালীর চিত্ত রায় মুসলিম দাঙ্গাকারীদের বাধা দেয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের মাকে নিজ হাতে হত্যা করে তারপর আত্মহত্যা করেন। কী জঘন্য! কী ভীবৎস্য!

দাঙ্গাটা আসলে অনিবার্য হয়ে উঠেছিল তখন। দাঙ্গার নেপথ্যে শুধু ধর্ম ছিল না, শুধু বৃটিশের স্বার্থ ছিল না; ছিল দেশীয় কায়েমী স্বার্থ, ছিল রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি আর আধিপত্য। হিন্দুরা মনে করেছিল ‘বিজাতীয়’ মুসলিম স্পর্শে কলুষিত হয়েছে ভারতভূমি। এই ভূমির সম্মান রক্ষার্থে ব্রতী হতে হবে হিন্দুদের। মসজিদের সামনে বাজনা বাজাতে দেয়নি মুসলমানরা, তাতে হিন্দুরা মনে করেছিল কোনো একদিন হয়ত নিষিদ্ধ করে দেয়া হবে প্রতিমা নিরঞ্জনের শোভাযাত্রাও। হিন্দুরা কি সহ্য করবে এই নিপীড়ন? হিন্দু মহাসভার এসব প্রচার স্বভাবতই স্পর্শ করেছিল হিন্দুদের মন। বিশেষত বাংলায়, যেখানে তখন চলছিল মুসলিম লীগের শাসন, হিন্দুদের ধারণা হয়, এই ‘বিজাতীয়’ শাসনে নষ্ট হতে চলছে তাদের শিক্ষাদীক্ষা-ধর্ম-সংস্কৃতি। তাই ডাক দেয়া হয়, ‘হিন্দু জাগো, হিন্দুকে রক্ষা করো।’ এই ডাকে উদ্দীপিত হয়ে হিন্দু যুবকরা নিজেদের সব্যসাচী অর্জুন ভাবতে শুরু করে এবং ভ্রাতৃহত্যা তাদের কাছে হয়ে ওঠে ধর্মের স্বার্থেই কর্তব্য।

অপরদিকে মুসলমানদের বোঝানো হয়েছিল মুসলিম লীগের জয় মানে ইসলামের জয়, মুসলমানদের মুক্তি। লীগ ক্ষমতায় থাকলে জমিদারি উচ্ছেদ হবে, গ্রামে স্কুল হবে―এই প্রচার সাধারণ মুসলমান চাষীকেও উদ্দীপিত করেছিল। কারণ জন্মাবধি মুসলমানরা সহ্য করেছে হিন্দু জমিদারের অত্যাচার। আত্মগর্বী হিন্দু এক স্পর্ধিত উন্নাসিকতা নিয়ে ঘৃণা করেছিল মুসলমান সমাজকে। তাই লীগের প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক যখন আসে, তার জবাব মুসলমানরা দেয় এক পাশব হিংসা প্রয়োগ করে। যে জাত নিয়ে হিন্দুদের এত বড়াই, সে জাত নষ্ট করে দেয়ার বাসনাই তখন প্রবল হয়ে ওঠে মুসলমানদের মনে। তাই তারা একেকজন হয়ে ওঠে সুলতান মাহমুদ, বখতিয়ার খিলজি, আওরঙ্গজেব। সেই দাঙ্গার ইতিহাস বড় ভয়ানক, বড় কঠিন। এত রক্ত, এত লাশ! অমৃতসর থেকে লাহোর বা লাহোর থেকে অমৃতসর―কখনো কখনো পুরো একটা ট্রেনই এসছিল মৃতদেহ বোঝাই হয়ে। এসব দেখেই বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়েছিলেন করুণ ডাঙার কবি জীবনানন্দ দাশ। লিখেছিলেন :

সৃষ্টির মনের কথা মনে হয়― দ্বেষ।
সৃষ্টির মনের কথা : আমাদেরি আন্তরিকতাতে
আমাদেরি সন্দেহের ছায়াপাত টেনে এনে ব্যথা
খুঁজে আনা। প্রকৃতির পাহাড়ে পাথরে সমুচ্ছল
ঝর্ণার জল দেখে তারপর হৃদয়ে তাকিয়ে
দেখেছি প্রথম জল নিহত প্রাণীর রক্তে লাল
হ’য়ে আছে ব’লে বাঘ হরিণের পিছু আজো ধায়;
মানুষ মেরেছি আমি― তার রক্তে আমার শরীর
ভ’রে গেছে; পৃথিবীর পথে এই নিহত ভ্রাতার
ভাই আমি; আমাকে সে কনিষ্ঠের মতো জেনে তবু
হৃদয়ে কঠিন হ’য়ে বধ ক’রে গেল, আমি রক্তাক্ত নদীর
কল্লোলের কাছে শুয়ে অগ্রজপ্রতিম বিমূঢ়কে
বধ ক’রে ঘুমাতেছি― তাহার অপরিসর বুকের ভিতরে
মুখ রেখে মনে হয় জীবনের স্নেহশীল ব্রতী
সকলকে আলো দেবে মনে ক’রে অগ্রসর হ’য়ে
তবুও কোথাও কোনো আলো নেই ব’লে ঘুমাতেছে।

বিশ শতকের সেই ভয়াবহ দাঙ্গা জীবনানন্দকে যেভাবে রক্তাক্ত করেছিল, একইভাবে রক্তাক্ত করেছিল প্রতিটি বাঙালি মানুষের হৃদয়। বাঙালি এখনো সেই রক্তস্মৃতি ভোলেনি, ভুলতে পারে না। নিশ্চয়ই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেব আমরা। ভারতবর্ষের এই ক্রান্তিকালে বড়ু চণ্ডীদাস আমদের আশ্রয়, লালন সাঁই আমাদের আশ্রয়, রবীন্দ্রনাথ আমাদের আশ্রয়, নজরুল আমাদের আশ্রয়, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আমাদের আশ্রয়, আউল-বাউল-পির-ফকির-সন্ন্যাসী আমাদের আশ্রয়, লক্ষ-কোটি সংবেদি হিন্দু-মুসলমান আমাদের আশ্রয়। তাঁদেরকে আশ্রয় করে আমরা ঠেকিয়ে দেব সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প।

ঠেকাতে ঠেকাতে উচ্চারণ করব বড়ু চণ্ডীদাসের মন্ত্র : ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ ঠেকাতে ঠেকাতে আমরা উচ্চারণ করব লালন সাঁইর মন্ত্র : ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি/ মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি।’ ঠেকাতে ঠেকাতে আমরা শরণ নেব রবীন্দ্রনাথের বাণীর : ‘উত্তরে হিমাচলের পাদমূল হইতে দক্ষিণে তরঙ্গমুখর সমুদ্রকূল পর্যন্ত, নদীজালজড়িত পূর্বসীমান্ত হইতে শৈলমালাবন্ধুর পশ্চিমপ্রান্ত পর্যন্ত চিত্তকে প্রসারিত করো। যে চাষি চাষ করিয়া এতক্ষণে ঘরে ফিরিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো, যে রাখাল ধেনুদলকে গোষ্ঠগৃহে এতক্ষণ ফিরাইয়া আনিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো, শঙ্খমুখরিত দেবালয়ে যে পূজার্থী আগত হইয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো, অস্তসূর্যের দিকে মুখ ফিরাইয়া যে মুসলমান নমাজ পড়িয়া উঠিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো।’ ঠেকাতে ঠেকাতে আমরা উচ্চারণ করব কাজী নজরুলের মন্ত্র : ‘মোরা এক বৃত্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান/ মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।’ ঠেকাতে ঠেকাতে উচ্চস্বরে ঘোষণা দেব ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর বাণী : ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙ্গালী।’

সাম্প্রদায়িকতা নিপাত যাক, মানুষের জয় হোক।
সর্বমানবের সম্মিলিত সংগীত উৎসবে মুখরিত হোক পৃথিবী।

মহাকালে রেখাপাত
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধদিল্লির দাঙ্গা নিয়ে একটি বিশ্লেষণ প্রয়াস—সৌরাংশু সিংহ
পরবর্তী নিবন্ধ“তোমার শহরে” – আহসান হাবীবের কবিতা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে