হে অনাদিকালের কবি-তুমিও ক্ষমা করো!- স্বপন চক্রবর্তী

0
686
Robi, রবীন্দ্রনাথ, ঠাকুর

হে অনাদিকালের কবি-তুমিও ক্ষমা করো!- স্বপন চক্রবর্তী, নিউইয়র্ক থেকে

জানলার কাঁচ ছুঁয়ে যে গাছটির শাখা প্রায়ই আমাকে ছুঁতে চায় রাতে বিরাতে, যে গাছটির মাঝকোটরে বাস করে একটি দুধসাদা পেঁচা, সেই গাছটি একদিন প্রচন্ড হতাশায় হয়তো বা বিশাল একখানা ডাল নামিয়ে দিলো সেদিন বাড়ির বারান্দার ছাদের উপরে । পুরো কাঁচের জানলাটি জুড়ে ভাঙা ডালের শাখায় পাতায় বিপুল মেঘ বানিয়ে নাছোড়বান্দা কিশোরীর মতো গাঁট ধরে পড়েই থাকলো !

কি মুশকিল, কোন ঝড় নেই, বেগবান হাওয়া নেই, তুমুল বৃষ্টি নেই । ঝকঝকে আকাশের এমন রোদ ঝাঁ ঝাঁ দুপুরে এমন করে কেউ গা এলিয়ে দেয় কারও গায়ে ! এতো শুধু গা এলিয়ে দেয়া নয়, একেবারে ভেঙে গড়িয়ে পড়া । কি অভিমান এতো, যার শিরার ক্ষীণতম অনুরণন পারিনি ছুঁতে ! কে জানে ! গাছের ভাষা যদি মানুষ বুঝতে পারতো! পরিশেষে, পার্ক ডিপার্টমেন্টকে ডেকেই সরিয়ে নিতে হলো এই অবুঝ গাছের ডালটি! একটা বিশাল ক্ষত নিয়ে অবশিষ্ট ডাল নিয়ে কি নিদারুন বেদনাবোধের পাহাড় শরীরে বয়ে গাছটি যে দাঁড়িয়ে আছে, তা’ একটুখানি তাকালেই টের পাই ।

কিন্তু মানুষ শুধু প্রকৃতি থেকে, গাছ লতা থেকে, নদী সমুদ্র থেকে, চন্দ্র সূর্য থেকে, পাহাড় অরণ্য থেকে অকাতরে নিয়েই চলেছে অনন্তকাল, নিষ্ঠুর ডাকাতের মত, লজ্জাহীন চোরের মত নিয়েই চলেছে সৃষ্টির আদি থেকে আজ অবধি! বিনিময়ে ওদের কাছে কৃতজ্ঞতার প্রতিদান কিই বা দিয়েছে মানুষ। প্রকৃতির সন্তান হয়েও প্রকৃতির প্রতি এত রূঢ়তা মানুষের – তা’ কি আসলে বলে শেষ করা যায় ! বৈশাখী পূর্ণিমাও চলে গেলো আজ – কি রূদ্ধ অভিমানে এখনও গাছটিতে সবুজ পাতারা জেগে ওঠেনি শীতের জড়তা ছাপিয়ে, যদি জানতে পারতাম ! না, জানবার কোন উপায় নেই ! এমন অভিমানের শিশিরকেই কি আলখাল্লা বুড়ো ধরে রেখেছিলেন তাঁর সোনার কলমে -,

‘কিছু আমি করি নি গোপন।
যাহা আছে সব আছে
তোমার আঁখির কাছে
প্রসারিত অবারিত মন।
দিয়েছি সমস্ত মোর করিতে ধারণা,
তাই মোরে বুঝিতে পার না?’

যতই ডালপালা ছড়িয়ে অবারিত হয়ে থাকুক চোখের সামনে, চাইলেই কি সেই অভিমানকে ছোঁয়া যায় কখনও ! সমস্ত কে পায় আসলে, সমস্তকিছুকে কে পারে সম্যক আত্মস্থ করতে ! সমস্ত দিতেই বা পারে কে – অমন করে নির্ভার হয়ে ! শুধু প্রকৃতিই পারে হয়তো বা, মানুষ তো পারে না কখনও । কথার ফানুসে, ভাবনার দোলাচলে নিত্য দোলায়িত মানুষের মন সমস্ত দেবার কথাও কি ভাবতে পারে কখনও ! না, পারে না ! যদি পারতো – মানুষের অতি সামান্য দেবার জন্যেও অমন অহঙ্কার হতো না, দিয়ে ফেলার অলীক শূন্যতায় হাহাকারও করতো না !

‘কোথা জল, কোথা কূল,
দিক হয়ে যায় ভুল,
অন্তহীন রহস্যনিলয়।’

সেই অন্তবিহীন রহস্যের জালে চিরকাল মানুষ আসলে বোকার মত মাথা খুঁড়েই মরেছে, সেই দূর্ভেদ্য, দূর্বোধ্য রহস্যের ছায়াতলে বসে কেঁদেছে শুধু, পায়নি তার অন্তরের সন্ধান, বোঝেনি তার গভীরের অন্তর্লীন সত্যটুকুকে ! তবুও তো মানুষের অহঙ্কারের শেষ নেই ।

তেমনই এক আকাশচুম্বী অহঙ্কারে পৃথিবীর এই প্রান্তের মানুষেরা ভাবতো – এই অহর্নিশ না ঘুমানো শহরটিকে পৃথিবীর রাজধানী বলে ! আহা, কি অহংকার । সেই শহর এখন নির্জীব, নিরাভরণ এক অন্ধকার বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে আছে – এই প্রখর দিনের বেলাতেও ! এ যেন এক অনাদিকালের গা ছম্ ছম্ করা মহাশ্মশান ! উন্মাতাল শিবের উর্দন্ড নৃত্যের তালতরঙ্গ কান পাতলেই শোনা যাবে যেন ! ওই আধভাঙা গাছটিরই মতো পুরো শহরটিই যেন কি এক প্রচন্ড রাগে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে চাইছে – এইটুকু তোদের মনে ছিল -তোরা এই !

‘নব নব ব্যাকুলতা জাগে দিবারাতে,
তাই আমি না পারি বুঝাতে।
নাই বা বুঝিলে তুমি মোরে!
চিরকাল চোখে চোখে
নূতন নূতনালোকে
পাঠ করো রাত্রি দিন ধরে ।’

আজন্ম, আমৃত্যু পাঠ করেও মানুষের সাধ্য নেই এই অনুভবকে ছোঁয় – এই অনন্তকে অনুধাবন করতে পারে ! পারে না বলেই মানুষের অকারণ অহঙ্কার – আপন অজ্ঞতার দানে ! ক্ষমা করে দিও তোমরা সকলেই আমাদের- হে ডাল ভাঙা বৃক্ষ, হে পাহাড়, হে অরণ্য, হে চন্দ্র, হে সূর্য্য, হে আকাশ, হে সমুদ্র, হে অবারিত, অনন্ত প্রকৃতি – ক্ষমা করে দিও তোমাদের মূঢ় সন্তানে, ক্ষমা করে দিও !

[পৃথিবী নামক এই মহাশ্মশানের অন্ধকারে বসে আজ প্রথম বারের মতো তোমার জন্মদিন পালন করতে পারলাম না – হে অনাদিকালের কবি-তুমিও ক্ষমা করো! ]

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধনাটোরের সিংড়ার করোনা রুগী সাগরের করোনা জয় !
পরবর্তী নিবন্ধকরোনা সময়; অতঃপর!- কাজী আতীকের কবিতা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে