ll কাঁকড়াগাছ ও দুই গাছপাগল ll- অমিত কুমার বিশ্বাস

0
667
অমিত

ll কাঁকড়াগাছ ও দুই গাছপাগল ll- অমিত কুমার বিশ্বাস

ll ২৯ জানুয়ারি বনগ্রামের ‘পথের পাঁচালী’-তে রাহুলগাছ-কে অপ্রত্যাশিত ভাবে পেয়েছিলাম। বিভাসগাছের জন্মদিন যে! মানুষ মানুষকে ভুলে যায়, কিন্তু মানুষ যখন গাছ হয়ে যায়, তখন সে তো আর নিজের জন্য কেবল প্রাণবায়ু সৃষ্টি করে না, করে এই মহাবিশ্বের প্রতিটি প্রাণের জন্য। অগত্যা স্মরণেও রাখে অন্য গাছকে। এবং হৃদয়েও। তাঁদের ভিতর গর্ভের শিশুর মতো প্রশ্ন নড়ে ওঠে, “পৃথিবী কি শুধু একা মানুষের?” এর সরল উত্তর মানুষকে সহজ করে, বিস্তারিত করে, উদার করে। সে তখন এই উত্তরটিতে চোখ রেখে টেলিস্কোপের মতো বিশ্বচরাচরকে দেখতে পায়। মানুষের এই উত্তরণের উপাখ্যান যথেষ্ট সাধনার। গাছেদের জন্য রাহুলগাছ টাইগার হিল থেকে সাগর পর্যন্ত হেঁটেছেন পঁয়ত্রিশ দিনে। তাঁকে বারাসত থেকে বনগ্রামে হেঁটে আসতে দেখেছি। দেখেছি গলায় সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে শতাব্দী-প্রাচীন যশোর রোডের গাছ বাঁচানোর জন্য চিৎকার করতে। বিভাসগাছও হেঁটেছেন রাহুলগাছের পাশে, যশোর রোডের গাছ বাঁচানোর জন্য। এমনকি তিনি নাটক নিয়ে নেমে পড়েছেন পথে পথে। লিখেছেন গান, “হে মানুষ, মাফিয়া মানুষ, তুমিও নিশ্চিহ্ন হবে…”।

কেন হাঁটছেন?
বিভাসগাছকে প্রশ্ন ছুঁড়েছিল জনৈক পথিক, হাবড়ার কাছে, এক চাঁদিফাঁটা এপ্রিল-মে দুপুরে। বিভাসগাছ বলেছেন, ‘ব্যথায়!’ এই ব্যথাটা অনুভব করা সহজ নয়। সেও বোধহয় এক সাধনার বিষয়। রাহুলগাছ বলেছিলেন, বিভাসগাছের সামান্য এই উত্তর তাঁর সারাজীবনের দর্শন পালটে দিয়েছে।

এদিন রাহুলগাছ একটি কাঁকড়াগাছ ( এক প্রকার ম্যানগ্রোভ) উপহার দিলেন বিভাসগাছ-কে। তিনি গাছটিকে সুন্দরবন থেকে নিয়ে এসেছেন। তাঁর কথায়, বনগ্রামের জলমাটিতেও কাঁকড়াগাছ বেড়ে উঠবে।

কাঁকড়া কেন?
উত্তরে রাহুলগাছ জানিয়েছেন, এর কাঁকড়ার দাঁড়ার মতো ছোট ছোট শিকড় মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখে, ফলে ভূমিক্ষয় রোধ হয়। সুন্দরবন অঞ্চলে নদীভাঙন রুখতে সেপাই রূপে কাজ করে এই গাছ। সেখানের ম্যানগ্রোভ কেটে আম-জাম-কাঁঠাল ইত্যাদি গাছ লাগানো হচ্ছিল খুব। কিন্তু গ্রামে গ্রামে নোনাজল ঢোকার বেশ আগেই (প্রায় পাঁচশো মিটার দূর থেকেই) এই গাছগুলো মরে যাচ্ছিল পটাপট। প্রকৃতির বিরুদ্ধে গেলে যা হয় আর কী! সব কিছুই কি মানুষের মর্জিমাফিক হবে নাকি রে বাবা! এখানেও তাই, হয়নি। এই যে আমরা বন্যা কিংবা নদীভাঙন রোখার জন্য নদীর দু-পাশে পাঁচিল দিয়ে থাকি, এটা সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক। নদীর নিজস্ব চলন আছে। তাতে বাধা দিলে হিতে বিপরীত হবেই। এতে নদী মরার যেমন প্রবল সম্ভাবনা আছে, তেমনই আছে অপ্রত্যাশিত বন্যার। সেখানে বরং গাছ লাগানো উচিত——- নোনাজল হলে সেটা হবে ম্যানগ্রোভ, অন্যথায় মিঠাজলের গাছ। মনে রাখতে হবে, নদী আর নর্দমা এক নয়। তবে নদীকে নর্দমা ভাবলে অন্য কথা।

এই যে আমরা গাছের চারিদিকটা ইট-সিমেন্ট দিয়ে বাঁধিয়ে ভাবি গাছের কী উপকারটাই-না করলাম! আসলে এ তো গাছের মৃত্যুদণ্ড দিলাম! যে-কোনও মুহূর্তে সেই গাছ উপড়ে যেতে পারে। এবং যায়ও।

রাহুল সুন্দরবন এলাকায় কাঁকড়াগাছ লাগানোর প্রকল্পে জোরকদমে নেমে পড়েছেন। স্থানীয় মানুষজনের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করছেন। এমনকি, সেখানে কাঁকড়াগাছের চারা তৈরি করে এই নোনাদেশের বিভিন্ন ভাঙন-প্রবণ স্থানে পাঠানোর প্রকল্পও গ্রহণ করেছেন। সেই উদ্দেশে এই ‘জুনিয়ার ডাক্তার’ মাঝে মাঝেই কল্যাণী থেকে ছুটে যান সুন্দরবনে।

কাঁকড়াগাছের বীজ বেশ বড়। মাকু আকারের। তা বিঘেত-খানিক তো হবেই। বীজ একসময় গাছে ঝুনো হয়। নোনামাটিতে টুক করে খসে পড়ে। অমনি নীচের সূচালো দিকটা মাটিতে গেঁথে যায়। সেখানেই কাঁকড়ার দাঁড়ার মতো শিকড় ছাড়তে থাকে বীজটি। আর উপরে স্বপ্ন দেখায় জীবনের কচিপাতা। আমরা এই স্বপ্নেই বাঁচতে চাই। গোপন হিংসার জ্বরে আক্রান্ত পুরোনো পৃথিবীতে স্বপ্ন দেখানো এই দুই গাছপাগলের প্রতি রইল আমার পরম শ্রদ্ধা ll
(কাঁকড়াগাছের বৈজ্ঞানিক নাম: Bruguiera gymnorhiza)

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধ“সময়ের চিঠি”- দেবাশিস সরকারের কবিতা
পরবর্তী নিবন্ধ“অন্ধকার ভালোবাসি”- চন্দ্রশিলা ছন্দার কবিতা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে