অনুষ্ঠিত হলো ‘সাহিত্য একাডেমি, নিউইয়র্কে’র ১১০ তম মাসিক সাহিত্য আসর

0
680
Poly-1

পলি শাহিনা,নিউইয়র্ক থেকে:

গত ৩১ জানুয়ারি শুক্রবার জ্যাকসন হাইটসের একটি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো ‘সাহিত্য একাডেমি, নিউইয়র্কে’র ১১০ তম মাসিক সাহিত্য আসর। পুরো অনুষ্ঠান পরিচালনায় ছিলেন একাডেমির পরিচালক মোশাররফ হোসেন। আসরের শুরুতেই তিনি সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানান।

এবারের আসরের আলোচ্য বিষয় ‘কবিতার শক্তি’ নিয়ে আলোচনা করেন লেখক হাসান ফেরদৌস। তিনি বলেন, সম্প্রতি কবিতা নিয়ে বিস্তার বিতর্ক হচ্ছে। আমরা যাঁরা কবিতা লিখি, পড়ি, শুনি, তাঁরা কি কখনো ভেবেছি, যে কবিতা লিখছি আমরা তার বাহিরে সে কবিতার কোন প্রভাব আছে কিনা? সামাজিক গুরুত্ব আছে কিনা? এই প্রসঙ্গে তিনি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের ‘হাম দেখেঙ্গে বা আমরা দেখবো ‘ কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, যে কবিতার কথা কিংবা গানের ভাষা প্রভাব ফেলেছিল ১৯৮৪ সালে ভারতের আন্দোলনে লক্ষ জনতার কন্ঠে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে। দুঃখের কথা, আনন্দের কথা, প্রেরণার কথা, বেদনার কথা- কবিতায় আমরা আমাদের ব্যক্তিগত কথা বলি। মোদ্দা কথা, ভেতর থেকে আমরা যা অনুভব করি তা সুন্দর শব্দ মালায় কবিতায় প্রকাশ করি। কবিতার শক্তি কিভাবে মানুষকে আন্দোলিত করে সে সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করেন। কমিক নাট্যকার আ্যরিস্টোফেনিস’র বিখ্যাত নাটক ‘দ্য ফ্রগস’ এর কথা উল্লেখ করে বলেন, যুদ্ধের সময় যখন নেতারা হেরে যাচ্ছিলেন তখন তাঁদের দরকার পড়েছিল সেনাপতির। যুদ্ধের একজন নায়ক গেলেন মর্ত্যলোকে দেবতার কাছে সেনাপতি আহবান করতে। দেবতা জানতে চাইলেন, কাকে চাই? সেনাপতির উত্তর ছিল, কবি কে চাই। দেবতা বললেন, কবি কেন? সেনাপতি উত্তরে বললেন, নগর রক্ষার জন্য কবি চাই , কবি আমাদেরকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। poly-2

কবিতার এমন-ই শক্তি যা মানুষকে একত্রিত করে, সম্মিলিত করে এবং অনুপ্রাণিত করে। যেমন, বাঙালী জাতি অনুপ্রাণিত হয়েছিল ১৯৭১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুন্দরতম কবিতায়, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’। যে অমর কবিতার শক্তি বাঙালী জাতি কে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শক্তি যুগিয়েছিল।

সাহিত্য একাডেমির এবারের আসরে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভয়েজ অব আমেরিকার সম্প্রচারক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক আনিস আহমেদ। তিনি সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, এখানে না আসলে ঠিক অনুভব করতাম না এত সাহিত্যপ্রেমী, সাহিত্য সমালোচক, আলোচক যোগ দেন এই আসরে। ওয়াশিংটনে সাহিত্য আসর বসে, কিন্তু ঠিক ব্যাপকভাবে এতখানি সম্প্রসারিত, এতখানি বড় আসর দেখি নি আজকের আগে। তিনি বলেন, পাঠকের সঙ্গে লেখকের যে সংযোগ সেটি হলো সাহিত্য। কবিতা যদি কয়েকজন পাঠকের মনেও একধরনের আন্দোলন সৃষ্টি করতে পারে বা হৃদয়ে দোলা জাগাতে পারে, তাহলে সেটাই হয় স্বার্থক কবিতা। এর সম্প্রচার যদি কবি থেকে পাঠক পর্যন্ত যায় এবং পাঠক যদি অনুধাবন করতে পারেন, সেটি সামাজিক, রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত যে কোন অনুভূতি হতে পারে। কবিতা এই কাজটি-ই করে আসছে বারবার। কবিতা একটি সাপেক্ষ শিল্প। নানান সীমাবদ্ধতায় যখন প্রবন্ধ লিখতে পারছিলাম না, তখন অনুভূতি প্রকাশের জন্য কবিতা লিখতে শুরু করি, বাংলাদেশ গণজাগরণ মঞ্চের উত্থান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পুনরুত্থানের সময় ২০১৩ সাল থেকে। এসময় কবিতার সাপেক্ষ দিকটি অনুভব করি। পদ্যে উপমা, উৎপ্রেক্ষার মাধ্যমে যেভাবে অনুভূতি প্রকাশ করা যায়, গদ্যে সেভাবে প্রকাশ করা যায় না। কবিতা একটি বিমূর্ত শিল্পের মত। কবি যে ভাবনা থেকে কবিতা লেখেন, দেখা গেছে পাঠক সম্পূর্ণ বিপরীত ভাবনা থেকে কবিতাটি অনুভব করছেন, ভাবছেন। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শতবর্ষ পরে আজো আমাদের মনে আলোড়ন সৃষ্টি করছেন। যদিও আমরা কোনভাবেই এখন রবীন্দ্রনাথের কালে বাস করছি না। এটাই হলো কবিতার সম্প্রসারণ বা কালোত্তীর্ণ হওয়া। হাসান ফেরদৌসের ‘কবিতার শক্তি ‘ নিয়ে উল্লেখিত ঘটনাগুলোর কথা পুনরায় মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, এগুলো ছিল কালোত্তীর্ণ সৃষ্টি। সাহিত্য একাডেমিতে যাঁরা নতুন লিখছেন তাঁদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, প্রভাব কি হবে বা প্রভাব যা ই হোক আপনারা লেখা চালিয়ে যাবেন। সবাই রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শামসুর রহমান, শহীদ কাদরী হবেন না, কিন্তু আপনারাও লিখবেন, অনুভূতি প্রকাশ করবেন। কবিতার সূত্র সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে বলেন, সাহিত্যের ছাত্র এবং শিক্ষক হয়েও কবিতা লিখতে গিয়ে সূত্রবদ্ধ হয়ে লিখি না। মনের ভেতর থেকে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে কবিতা লিখি। স্ব রচিত কবিতা ‘কবিতার কাঁচামাল ‘ পাঠের মধ্য দিয়ে তিনি আলোচনার সমাপ্তি টানেন।poly-6

প্রবীণ সাংবাদিক মোহাম্মদ উল্লাহ কয়েকজন প্রবাসীর ঘটনা তুলে ধরে বলেন, আমাদের আগে প্রবাসে কারা এসেছিলেন? কিভাবে এসেছিলেন? কেন এসেছিলেন? কোথায় এসেছিলেন? তাঁদের জীবন যাপনের ঘটনাগুলো লিখতে হবে, জানাতে হবে। এটাও সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত। আমরা এখন লিখে গেলে এটি ইতিহাস হয়ে থাকবে। পরবর্তী প্রজন্ম জানতে পারবে তাঁদেরকে। কবিতার ব্যাকরণ ও গল্প লেখার শৈলি জেনে সবাইকে লেখার অনুরোধ করেন তিনি আসরে। তিনি বলেন, লেখায় দেশের অনুভূতির সঙ্গে সঙ্গে বিদেশের অনুভূতিও যেন উঠে আসে।

কবি তমিজ উদদীন লোদী বলেন, আজ আসরে অভিভূত হয়ে কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ শুনলাম। কবিতার শক্তির কথা জানলাম আরো ভালোভাবে। জানার তো শেষ নেই। লেখক আবু সায়ীদ রতনের পঠিত গল্পের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গল্পটি হৃদয়কে স্পর্শ করেছে। গল্পের যে ব্যাকরণ, শিল্প, উপকরণ রয়েছে, সেদিক থেকে গল্পটি যথার্থভাবে মনে দাগ কেটেছে। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন, এডগার এলেন পো’র বিশ্ব সাহিত্যে অসাধারণ মূল্যবান রোমাঞ্চকর গল্পের মধ্যে তিনি এমন সব অসাধারণ গল্প রচনা করেছেন, যা পরে শুধু আর রোমাঞ্চকর গল্পের মধ্যে থাকে নি। তাঁকে আবিষ্কার করতে অনেক সময় লেগেছে আমাদের। লেখার জন্য কৌতুহল, বিস্ময় থাকা জরুরি। সাহিত্য একাডেমিতে এখন তরুণ যাঁরা লিখছেন, তাঁদের মধ্যে সম্ভাবনা ও বিস্মিত হবার ক্ষমতা আছে। তাঁরা পারবেন আমাদেরকে নতুন নতুন লেখা উপহার দিতে। সাহিত্য একাডেমিতে এসে অনেক লেখকেরা তাঁদের পথ খুঁজে পেয়েছেন। হাসান ফেরদৌস যে কবিতার শক্তির কথা বলেছেন, সে পথ অতিক্রম করার জন্য তাঁদেরকে নিষ্ঠা, পরিশ্রম ও অধ্যাবসায়ের সঙ্গে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ পড়তে গেলে একইরকম হবে না। কবিতায় ভিন্নতা আছে। সব লেখা একরকম হবে না। কবির জন্য নির্দিষ্ট কোন পাঠ নেই। তবে একটি ভালো লেখার জন্য নতুনদেরকে অনেক পাঠ করতে হবে, আত্মস্থ করতে হবে, তবেই তার কবিতা শক্তিশালী হবে।poly-3

ঠিকানা পত্রিকার সম্পাদক মোঃ ফজলুর রহমান বলেন, সাহিত্য একাডেমি সৌরভ ছড়াচ্ছে। যে সৌরভ ওয়াশিংটন পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ফলশ্রুতিতে, আজকের আসরে অতিথি হিসেবে অধ্যাপক আনিস আহমেদ কে পেলাম। কবিতার শক্তি নিয়ে যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হলো, সেটি থেকে নতুনরা অনেক উপকৃত হবেন বলে তিনি আশা করেন। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে যাঁদের নতুন বই আসছে এবার, সবাইকে তিনি অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, সাহিত্য একাডেমি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে সাহিত্য একাডেমি আমাদের জন্য যত জরুরি, সাহিত্য একাডেমির জন্য আমরা ততটা জরুরি নই।poly-4

লেখক এবিএম সালেহ উদ্দীন আলোচনার শুরুতেই কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, কথা সাহিত্যিক শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং প্রতিভাধর শিল্পি নায়ক রাজ্জাক কে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, সাহিত্য একাডেমি দশম বছরে পদার্পণ করেছে। সফলভাবে প্রতিটি আসর অনুষ্ঠিত হয়েছে। সাহিত্য একাডেমির আসন্ন সম্মেলনকেও সকলে মিলেমিশে সফল করে তুলবেন বলে তিনি আশাবাদী।

অধ্যাপিকা হুসনে আরা তাঁর জীবনের প্রথম প্রেম -প্রথম শিক্ষক, প্রথম শ্রেণী কক্ষ, প্রথম পাঠ্যবই, প্রথম শ্রেণী কক্ষের সহপাঠীদেরকে নিয়ে স্মৃতি চারণ করে বলেন, তাঁদের মত করে সাহিত্য একাডেমিকেও ভালোবাসি।

লেখক সুরীত বড়ুয়ার মতে, এপার বাংলা- ওপার বাংলায় যাঁরা লেখালেখি করেন, সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত আছেন, তাঁদের লেখা পড়লে আমরা সমৃদ্ধ হবো। এই কথার সূত্র ধরে তিনি উল্লেখ করেন আবু সাঈদ আইউবের কথা। যিনি একজন উর্দুভাষী ছিলেন। শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথ কে জানার জন্য তিনি বাংলা ভাষাকে আত্মস্থ করেন। আসরে উপস্থিত সবাইকে তিনি বইটি পড়ার পরামর্শ দেন।poly-4

আসরের সর্বশেষ আলোচক ফেরদৌস সাজেদীন সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, বসে বসে সবার কবিতা, গল্প, ছড়া, প্রবন্ধ শুনছিলাম আর মনে মনে ভাবছিলাম, সাহিত্য একাডেমির এই ঘর টি পবিত্র তর হয়ে উঠেছে। আজকের আসর টি নানান দিক হতে বৈচিত্র পূর্ণ হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছে এত বছর ধরে সাহিত্য একাডেমি যে উদ্দেশ্যে কাজ করে যাচ্ছে তা পূর্ণ হতে যাচ্ছে। সাহিত্য একাডেমির স্বপ্ন শেষ অবধি মুক্তি পেতে যাচ্ছে।
‘ সন্ধ্যা রাতের জানুয়ারি ও আসাদের শার্ট’ স্ব রচিত স্মৃতি গদ্যটি তিনি পাঠ করে শুনান।

এবারের আসরে যাঁরা কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, ছড়া পড়ে শুনান তাঁরা হলেন, নীরা কাদরী, কাজী আতীক, হোসাইন কবির, আবু সায়ীদ রতন, রাণু ফেরদৌস, সোনিয়া কাদের, সালেহীন সাজু, তাহমিনা খান, বেনজির শিকদার, লুৎফা শাহানা, মিশুক সেলিম, জেবুন্নেসা জ্যোৎস্না, শাহীন ইবনে দিলওয়ার, তাহমিনা শহীদ, মাসুম আহমেদ, রওশন হাসান, স্বপ্ন কুমার, আবদুস শহীদ, ফারহানা হোসেন, মোহাম্মদ নাসিরুল্লাহ, হাবীবুর হাবীব, কামরুন্নাহার রীতা, তামান্না আহমেদ শান্তি, আনোয়ার সেলিম, সেলিনা আক্তার, মুহাম্মদ আলী বাবুল, পলি শাহীনা প্রমুখ।

আসরে আবৃত্তি করেন, মুমু আনসারী, পারভীন সুলতানা, তাহরিনা প্রীতি ও তন্ময় মজুমদার।

আসরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন, উন্মে কুলসুম পপি, রাহাত কাজী শিউলি, এনামুল করিম দিপু, সাবিনা হাই উর্বি, মুজাহিদ আনসারী, শুক্লা রায়, এইচ বি রিতা, সাফওয়ান নাহিন, শেখ সোহেব সাজ্জাদ, পারভীন হোসেন, বীণা মজুমদার, সাহা পরিমল, ফাহাদ সোলায়মান, আবুল বাশার প্রমুখ।

সবাইকে ধন্যবাদ এবং আগামী আসরের আমন্ত্রণ জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানেন পরিচালক মোশাররফ হোসেন।

উল্লেখ্য, সাহিত্য একাডেমির নিয়মিত কর্মসূচি বই পড়া কার্যক্রমের অংশ হিসেবে যথারীতি এই মাসেও বই আদান-প্রদান হয়েছে। এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন বেনজির শিকদার।

আসর শেষে কবি হোসাইন কবিরের ‘ নিঃসঙ্গ পাতার বাঁশি ‘ কবিতার বই এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়, এবং তামান্না আহমেদ শান্তির জন্মদিনের কেক কাটা হয়।

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধরসুনের উপকারিতা -আব্দুল খালেক
পরবর্তী নিবন্ধ“প্রতিসম বিভ্রম” -কবি কাজী আতীক‘এর কবিতা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে