অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো ‘সাহিত্য একাডেমি, নিউইয়র্ক’র ১১১ তম মাসিক সাহিত্য আসর

0
912
America

পলি শাহিনা, নিউইয়র্ক থেকে, নাটোরকন্ঠ:

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার, জ্যাকসন হাইটসের একটি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে ‘সাহিত্য একাডেমি, নিউইয়র্ক’র ১১১ তম মাসিক সাহিত্য আসর। পুরো আসর পরিচালনায় ছিলেন একাডেমির পরিচালক মোশাররফ হোসেন। আসরের শুরুতেই ভাষা শহীদ ও ভাষা যোদ্ধাদের কে বিনম্র শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

এবারের আসরে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন, লেখক ফেরদৌস সাজেদীন, কবি তমিজ উদদীন লোদী, ঠিকানা পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মোঃ ফজলুর রহমান, কবি কাজী আতীক, অধ্যাপিকা হুসনে আরা, সাংবাদিক নিনি ওয়াহেদ, লেখক এবিএম সালেহ উদ্দীন, কবি মিশুক সেলিম, মমতাজ বেগম সুমী এবং লেখক আবু সাঈদ রতন।

America-

ফেরদৌস সাজেদীন বলেন, আজকের পুরো সন্ধ্যায় মনে হচ্ছিলো, বাংলা ভাষার গুচ্ছ গুচ্ছ সুষমা ছড়িয়ে পড়েছে সাহিত্য একাডেমির ঘরটি তে। সবার কবিতা, প্রবন্ধ, অণুগল্প, আবৃত্তি, আলোচনায় ভাষার মাসের উষ্ণতার সবটাই উঠে এসেছে যত্নে। সাহিত্য একাডেমির অবদানে এটি আমাদের জন্য পরম পাওয়া। সাহিত্য একাডেমি কাজের মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে, একদিন নিশ্চয়ই সাহিত্য একাডেমি কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছাবে। তিনি বলেন, প্রবাসে যেখানে তিন জন বাঙালী রয়েছে, সেখানেই একুশ উদযাপন করা হচ্ছে। যাঁরা প্রবাসী তাঁদের হৃদয়ে সবসময় উম্মুলতার একটা লেবাস লেগে থাকে। এ দুঃখ শুধু একজন প্রবাসী বয়ে বেড়ান। তাঁদের বাংলা ভাষা, বাংলা বোধ আলাদা। এক কোটি প্রবাসীর বাংলা কান্না, বাংলা ভাষার জন্য কাতরতা, দেশের ভাষার সঙ্গে মিশে গেছে। তিনি বলেন, সাহিত্য একাডেমি লেখক বানানোর জায়গা নয়। এখানে একজন লেখক কে, যার ভেতরে সৃষ্টি শীলিতা আছে, তাকে অনুপ্রাণিত করতে পারে। তিনি লেখক আব্দুল মান্নান সৈয়দের একটি লেখা পাঠ করেন।

তমিজ উদদীন লোদী বলেন, আমাদের ভাষা টি রক্তের সাগর সাঁতরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার আগে আমাদের সংস্কৃতি এবং জাতি সত্তার ভিত্তি টি তৈরি হয়েছিল পাল আমলে। সে সময়ের সংস্কৃতি ছিল বৌদ্ধিক সংস্কৃতি। বৌদ্ধ সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে তাঁরা প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন- গণতান্ত্রিক বোধ কে শ্রদ্ধা করা, মানুষে- মানুষে সাম্য এবং অসাম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। মানবতা এবং পরম সহিষ্ণুতা কে তাঁরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এটি ছিল আমাদের গোড়া পত্তনের ইতিহাস। কালে কালে সেটি বিকশিত হয়েছে, এবং একটি সময়ে এসে বাংলা ভাষা নিজস্বতায় উদ্ভাসিত হয়েছে।
বাংলা ভাষা টি যখন তুঙ্গে, বাংলা সাহিত্য প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যে পরিণত হয়েছে, ওপাড়ে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিম চন্দ্র এবং এপাড়ে আহসান হাবীব, ফররুখ আহমদ, সৈয়দ আলী আহসান, সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ, শাহেদ আলী প্রমুখ বাংলা সাহিত্যিক দের পেয়েছি, সে সময় দেশ ভাগের পর আমাদের উপর নেমে এলো অন্যায় অত্যাচার। বলা হলো, উর্দু- ই হবে একমাত্র ভাষা। ভাষা আন্দোলন -ই আমাদের কে স্বাধীকার আন্দোলনের দিকে নিয়ে যায়। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা রোপন করেছি, আমাদের সংস্কৃতি, ভবিষ্যৎ, অর্থনৈতিক মুক্তি ইত্যাদি। যার রুপ টি আমরা পেয়েছি মুক্তিযুদ্ধের সময়, স্বাধীকার আন্দোলনের সময়। স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা যা প্রতিষ্ঠিত করেছি। তিনি বলেন, তিরিশ কোটি বাঙালী বাংলায় কথা বলে। তবে আমাদের কে এখানে থেমে থাকলে চলবে না। নিজস্ব সংস্কৃতি কে লালন করে, জাতি সত্তার বিকাশ কে পরিশীলিত করে এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমাদের কে আরো অগ্রসর হতে হবে।

মোঃ ফজলুর রহমান উৎকন্ঠা প্রকাশ করে বলেন, বাংলা ভাষা অর্জনের মধ্য দিয়ে যে গৌরবের অধিকারী হয়েছিলাম, আমাদের অবহেলা ও অবজ্ঞায় এখন আমরা সে গৌরব হারাতে চলেছি।বাংলাদেশ যাঁরা পরিচালনা করেন এবং শিল্প, সাহিত্য করেন, তাঁরা বাংলা ভাষা কে অক্ষত রাখবেন বলে তিনি আশা করেন। যে বিপুলতায় একুশ উদযাপন করা হয়, বাস্তবেও যেন সে মর্যাদা দেয়া হয়। দিল্লির সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে তিনি অপরাধী দের শাস্তি কামনা করেন। তিনি বলেন, দাঙ্গাবাজ মানবতার শত্রু, সভ্যতা ও শান্তির শত্রু, এরা কারো মিত্র হতে পারে না। বঙ্গবন্ধুর ‘ আমি প্রথমে মানুষ, তারপর বাঙালী, তারপর মুসলমান ‘ এর উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, আমাদের কে প্রথমে মানুষ হতে হবে। এবার একুশের মাস প্রবাসী দের জন্য সম্ভাবনার মাস। এবার দু’জন প্রবাসী একুশের পুরুষ্কার পেয়েছেন। তিনি আশা করেন, সাহিত্য একাডেমিতে যারা সাহিত্য চর্চা করেন, তাদের মধ্যে কেউ হয়ত আগামী তে এমন পুরুষ্কারে ভূষিত হবেন।

কাজী আতীক আলোচনার শুরুতেই বাংলা এবং বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় অবদানের জন্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি বলেন, বাংলা ভাষা তার চরিত্র হারাচ্ছে এবং এজন্য আমরা দায়ী। কলকাতায় হিন্দি এসে বাংলা কে প্রভাবিত করেছে, একইভাবে ঢাকায় রেডিও, টেলিভিশনে আজগুবি কন্ঠে বাংলা ভাষা ব্যবহার হচ্ছে। তিনি আশা করেন ভাষা বিশারদরা এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিবেন। তিনি বলেন, প্রবাসের দ্বিতীয় প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষা টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের।

অধ্যাপিকা হুসনে আরা বলেন, একুশ আমাদের অহংকার, একুশ মানে বিনয়, একুশ মানে অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা, একুশ মানে প্রেম, একুশ মানে কন্ঠ সোচ্চার করা। আসলে একুশ শব্দ টি বললেই মনে হয় সব কথা বলা হয়ে যায়। যা কিছু অন্যায় সেটাই পরিত্যাগ করবো – এটিই হোক আমাদের একুশের অঙ্গীকার। তিনি সাহিত্য একাডেমির সব কাজের সঙ্গে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করে আলোচনার সমাপ্তি টানেন।

নিনি ওয়াহেদ বলেন, একুশের গর্বে আমাদের জন্ম হয়েছে। একুশ আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। একুশ আমাদের প্রতিটি আন্দোলনের প্রেরণা যুগিয়েছে। একুশ আমাদের শিখিয়েছে অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা। আমাদের পাশের রাষ্ট্রে ঘটে যাওয়া ঘটনার নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা অসাম্প্রদায়িক পড়শী চাই, বাংলাদেশ এবং মানবতা চাই। বাংলা সাহিত্য প্রতিবাদী এবং সমৃদ্ধ সাহিত্য। বাঙালী কোন অন্যায় মেনে নেয় না। ভাষার মাসে তিনি প্রত্যাশা করেন, মানুষ একটি বৈষম্য হীন পৃথিবী গড়ে তুলবে।

এবিএম সালেহ উদ্দীন বলেন, ফেব্রুয়ারী মাস আমাদের জন্য শোকের মাস, চেতনার মাস, বিদ্রোহের মাস। একুশের পর যে মাস আসছে, মার্চ মাস আমাদের জাগরণের মাস। বাংলা ভাষা রক্ষায় এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা অবদান রেখেছেন, সবাইকে তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

মিশুক সেলিম বলেন, একুশ বাঙালী জাতির জীবনে অপরিসীম শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার দিন। একুশ বাংলা ভাষা ব্যবহারকারী জনগণের গৌরবের ইতিহাস বহন করে। শহীদ দিবস এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এর পেছনে যে দু’জন বাঙালী অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, তাঁদের প্রতি তিনি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি বলেন, যুগে যুগে শব্দ জনেরা, বিশেষ করে কবি, সাহিত্যিকরা বাংলা ভাষা কে আরো প্রাণবন্ত করে তুলবেন। স্ব রচিত কবিতা পাঠের মাধ্যমে তিনি আলোচনা শেষ করেন।

মমতাজ বেগম সুমী আসরে শ্রদ্ধাভরে গীতিকার ও সুরকার আব্দুল লতিফ কে স্মরণ করেন। তাঁর লেখা এবং সুরে ‘ ও আমার বাংলা ভাষা, ও আমার দুঃখ ভুলানো বুক জুড়ানো লক্ষ মনের লক্ষ আশা, ও আমার বাংলা ভাষা ‘ গান টি আবৃত্তির করে তিনি বলেন, কি অদ্ভুত মায়া ছড়িয়ে আছে গানটি তে। যা বাঙালীর হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

আবু সাঈদ রতন বলেন, সাহিত্য একাডেমি এখন ব্যপক বিস্তৃতি তে কাজ করছে। শীঘ্রই সাহিত্য একাডেমির নিজস্ব ওয়েবসাইট দেখা যাবে, সেখানে সাহিত্য একাডেমির সমস্ত খবর পাওয়া যাবে। এছাড়াও তিনি জানান, প্রতি তিন মাস পর পর সাহিত্য একাডেমির নিজস্ব প্রকাশনাও বের হবে৷ সেখানেও সাহিত্য একাডেমির কার্যক্রম তুলে ধরা হবে। আসন্ন সাহিত্য একাডেমির সম্মেলন নির্ভর করবে সকলের সহযোগিতার উপরে। এই বিষয় গুলোতে তিনি সবার আন্তরিক সহযোগিতা ও পরামর্শ কামনা করেন।

তাঁর কথার ভিত্তিতে পরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, সাহিত্য একাডেমি এমন একটি প্লাটফর্ম, যেখানে লেখকদের কে সংঘবদ্ধ করা হচ্ছে, উৎসাহ দেয়া হচ্ছে। সৃষ্টির কর্ম টি যে যাঁর মত করবেন, কিন্তু সেটি যেন নিরবচ্ছিন্ন ভাবে উৎসাহের সঙ্গে করতে পারেন, সেজন্য সাহিত্য একাডেমি আমরা পরিচালনা করি। সাহিত্য বোদ্ধারা আশা করেন, প্রতি মাসেই যেন আমরা নিজেদেরকে উন্নত করি, সাহিত্য একাডেমিকে যেন নিরেট সাহিত্যের প্লাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলি।
এই কাজগুলো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আমরা পিছিয়ে পড়ি আর্থিক কারণে। প্রতি মাসে যে আসর হচ্ছে গত দশ বছর ধরে, এতেও অর্থ ব্যয় হয়, হয়েছে। গত বছর গুলোতে কারো কাছে অর্থ চাই নি। আমরা চাই নি এই লেখক প্লাটফর্ম কে অন্যরা শুধুমাত্র স্পন্সরের কারণে নিয়ন্ত্রণ করবে, দিক নির্দেশনা দিবে, তাঁদের ইচ্ছানুযায়ী কথা বলবে, চলতে হবে, দাবী করবে – আত্মসম্মান বোধ থেকে এগুলো চাই নি বলে, এত বছর ধরে নিজেরা অর্থ ব্যয় করে গেছি। এই সম্মান রক্ষার দায়িত্ব এখন সকল লেখক দের। কিন্তু ব্যপক পরিসরে কাজ করতে গেলে সবার সহযোগিতার হাত দরকার হয়ে পড়ে। তিনি আশা করেন, এত বছর ধরে রাখা সম্মান আমরা সবাই মিলেমিশে রক্ষা করতে পারবো।

এবারের আসরে যাঁরা কবিতা, প্রবন্ধ, অনুগল্প পাঠ করেছেন তাঁরা হলেন, নীরা কাদরী, সোনিয়া কাদের, শাম্মী আক্তার হ্যাপি, ফারহানা হোসেন, বেনজির শিকদার, লুৎফা শাহানা, তাহমিনা খান, সুরীত বড়ুয়া, আনোয়ারুল হক লাভলু, রাজিয়া নাজমী, হাবীবুর হাবীব, আবুল বাশার, সবিতা দাস, আশরাফ হাসান, শহীদ উদ্দীন, কামরুন নাহার রীতা, তামান্না আহমেদ, পলি শাহীনা প্রমুখ।

আসরে উপস্থিত ছিলেন, উম্মে কুলসুম পপি, রাহাত কাজী শিউলি, পারভীন সুলতানা, কামাল হোসেন মিঠু, আম্বিয়া অন্তরা, আখতার আহমেদ রাশা, শেখ সোহেব সাজ্জাদ, শওকত রিপন, ম্যারিষ্টলা শ্যামলী আহমেদ, এম.বি হোসাইন তুষার, সাহা পরিমল, বীণা মজুমদার, মনিরা মমতাজ, শিবলি ছাদেক শিবলু, শুভা রহমান, সাফওয়ান নাহিয়ান, সেলিনা আক্তার প্রমুখ।

আসরে আবৃত্তি করেন, মুমু আনসারী, তাহরীনা পারভীন প্রীতি, নাসিমা আক্তার ও তন্ময় মজুমদার।

সবাইকে আগামী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়ে আসরের সমাপ্তি টানেন পরিচালক মোশাররফ হোসেন।

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধ“ক্যাপ্টেন”- মোহাম্মদ সেলিমের কবিতা
পরবর্তী নিবন্ধ“প্রেমবিষ”- এম আসলাম লিটনের কবিতা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে