একুশের ডায়েরি -বিপ্লব কুমার পাল -পর্ব ০৩

0
118

একুশের ডায়েরি

বিপ্লব কুমার পাল

পর্ব- ০৩

একুশে টিভিতে যোগদানের পর অনুষ্ঠান ও সংবাদে আরও ভালো করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেন পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়। গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান তিনিই উপস্থাপনা করেন। সেসব অনুষ্ঠান দর্শক মহলে বেশ প্রশংসিত হয়। একইভাবে সংবাদে ভালো কিছু করার চেষ্টা করেন। এজন্য ইটিভির কয়েকটি বড় পদবীতে পরিবর্তনের পরিকল্পনা করেন।

কয়েকজন বড় বড় পদধারীকে সরাতে চেয়েছিলেন পীযূষদা। এরমধ্যে ছিলেন- তখনকার বার্তা প্রধান মোহসিন আব্বাস, প্রধান বার্তা সম্পাদক রঞ্জন সেন, চিফ রিপোর্টার দীপু সরোয়ার, অনুষ্ঠান প্রধান জাহিদ হোসেন শোভন, হেড অব ব্রডকাস্ট সুজন দেবনাথ এবং প্রশাসন ও মানব সম্পদ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অবসরপ্রাপ্ত মেজর নাসিম হোসেন।

২০২১ সালের মে মাসে বার্তা প্রধান মোহসিন আব্বাসকে পদত্যাগ করতে বলেন পীযূষদা। কোনো কথা না বলে, মোহসিন ভাই পদত্যাগ করেন। একই ভাবে অনুষ্ঠান প্রধান জাহিদ হোসেন শোভনও নির্দ্বিধায় পদত্যাগ করেন। প্রধান বার্তা সম্পাদক রঞ্জন সেন ২০২১ সালের ৮ জুন কলকাতায় বাংলাদেশ উপ হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি প্রেস হিসেবে নিয়োগ পান।

একারণে রঞ্জনদা একুশে টিভি থেকে পদত্যাগ করেন। আর চিফ রিপোর্টার দীপু সরোয়ারকে পদত্যাগ করাতে বাধ্য করেন পীযূষদা। দীপু ভাইকে সরাতে গিয়ে বেশ চাপে পড়েছিলেন তিনি। সে যাত্রায় কোনো মতে সেই চাপ সামলে নিয়েছিলেন। তবে এরপর আর কাউকে পদ থেকে সরিয়ে দেয়ার আর চেষ্টা করেননি।

যদিও আরো দু’জনের ওপর খুব বিরক্ত ছিলেন পীযূষদা। একজন ডেপুটি হেড অফ নিউজ সাইফ ইসলাম দিলাল আরেকজন বিজনেস এডিটর আতিয়ার রহমান সবুজ। কারণ- দিলাল ভাই ইটিভির অনলাইনের রেজিস্ট্রেশন নিজের নামে করেছিলেন। অথচ এটি ব্যক্তির নামে করার কোনো সুযোগ নেই। এছাড়া বারবার নিষেধ করার পরও মদ্যপ অবস্থায় অফিসে এসে মাতলামি করায় তাকে অনলাইন থেকে এক প্রকার সরিয়েও দিয়েছিলেন।

যেখানে অলিখিতভাবে দায়িত্ব দিয়েছিলেন আব্দুল হালিম সুমনকে। আর বিজনেস এডিটর আতিয়ার রহমান সবুজের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল- তিনি ইটিভিতে বসে নিজের বিজনেস করেন। অর্থাৎ একুশে বিজনেস শো’র জন্য বড় প্রতিষ্ঠানের মালিক, চেয়ারম্যানরা গেস্ট হিসেবে আসেন। অনুষ্ঠান শেষে ওই অতিথিদের কাছ থেকে সবুজ তার নিজস্ব অনলাইন পত্রিকার জন্য বিজ্ঞাপন আদায় করে নেন।

অতিথিরা সুবুজের অনুরোধে বিজ্ঞাপন দেন। তাছাড়া এই দু’জন নিউজের কোনো কাজই করতেননা। তবে এই দু’জনের ওপর বিরক্ত হলেও তখনই চাকরি থেকে তাদের সরাতে চাননি পীযূষদা। এর অন্যতম কারণ- দিলাল ভাইয়ের বাড়ি চট্টগ্রামে আর সবুজের রক্ষাকবচ অখিল পোদ্দার।

হেড অব নিউজ মোহসিন ভাইকে সরিয়ে দেয়ার পর পীযূষদা একজন বার্তা প্রধান খুঁজছিলেন। কিন্তু পীযূষদাকে না জানিয়ে এস আলম কর্তৃপক্ষ ২০২১ সালের মে মাসে হেড অব নিউজ হিসেবে রাশেদ চৌধুরীকে নিয়োগ দেন। যিনি এর আগেও একুশে টিভির হেড অব নিউজ ছিলেন। তিনি ৫ বছর লন্ডন বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টারের দায়িত্ব পালন করেছেন। এঘটনার পর কিছুটা চুপসে যান পীযূষদা।

এরপর ঘটনাগুলো উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করে। যাদের তিনি একুশে টিভি থেকে সরাতে চেয়েছিলেন তারাই পীযূষদার ঘনিষ্ঠজন হয়ে যান। এরমধ্যে এক নম্বরে ছিলেন হেড অব ব্রডকাস্ট সুজন দেবনাথ। বিজনেস এডিটর আতিয়ার রহমান সবুজও প্রিয় হয়ে ওঠেন পীযূষদার কাছে। আর অখিল পোদ্দারকে ইনপুট থেকে আউটপুটে পদন্নতি দেন। হেড অব ইনপুট অখিল পোদ্দার পদোন্নতি পেয়ে হয়ে যান প্রধান বার্তা সম্পাদক (সিএনই)।

অথচ, সিএনই হিসেবে আমাকে নিয়োগ দেয়ার কথা বলেছিলেন পীযূসদা। কিন্তু সেই পোস্টটি দিয়ে দেন অখিল পোদ্দারকে। পরে পীযূষদা আমাকে বললেন, “অফিসের চাপ ছিল, সবাই চাচ্ছিলো বাইরের কাউকে না এনে, ইটিভির কাউকে যেন প্রধান বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়। সে কারণে অখিলকে ওই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।” তিনি আমাকে সিএনই’র পরিবর্তে প্ল্যানিং অ্যান্ড কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটরের দায়িত্ব দেয়ার কথা জানালেন। আমি বুঝতে পারছিলাম না, আমার কি করা উচিত। যদিও শেষ পর্যন্ত আমি প্ল্যানিং অ্যান্ড কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটরের দায়িত্ব নিতে রাজিও হয়ে গেলাম।

২০২১ সালের নভেম্বরে আমাদের একুশে টিভিতে যোগদানের কথা। আমার সাথে আরও ১০ জন সাংবাদিকের নিয়োগ হওয়ার কথা। বিভিন্ন চ্যানেলে দক্ষতার সাথে কাজ করা সাংবাদিকের তালিকা আমি দিয়েছিলাম। কিন্তু নিয়োগ তখনও চূড়ান্ত হয়নি। দাদা বললেন, ২০২১ সালের ১৩ ডিসেম্বর একুশে টিভির বোর্ড মিটিং হবে। তারপরই আমাদের নিয়োগপত্র চূড়ান্ত করবেন।

একুশে টিভির বোর্ড মিটিং নিয়ে পীযূষদা খুব চিন্তিত। জরুরিভাবে ডাকলেন আমাকে। বললেন, “বোর্ড মিটিং বানচাল করতে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। একুশে টিভির পরিচালক পরিচালক রবিউল হাসান অভি ঘনিষ্ঠদের দিয়ে খারাপ পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছেন।” দাদা আরও বললেন, “প্ল্যানিং ও নিউজ এডিটর দেবাশীষ রায়সহ কয়েকজন রিপোর্টার এর সঙ্গে জড়িত।

তারা ইটিভির ড্রাইভারদের ব্যবহার করছে। লাঠিসোটা নিয়ে তারা হামলাও করতে পারে।” ইটিভিতে যোগদানের কিছুদিন পর আমি দেবাশীষ রায়কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি পীযূষদার বিরুদ্ধে এমনটি কেন করেছিলেন। জবাবে দেবাশীষ বলেছিলেন, “এসব মিথ্যা অভিযোগ। পীযূষদা একুশে টিভিতে যোগদান করায়, অল্প কিছু মানুষ খুশি হয়েছিল তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। এসব ষড়যন্ত্রের গল্প অখিল-সুজন সিন্ডিকেটের বানানো অপপ্রচার।” এনিয়ে আরো বিস্তারিত বলবো ২০২২ সালের মার্চ মাসের ঘটনা প্রবাহে।

যাই হোক, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২১। বোর্ড মিটিং এর দিন একুশে টিভির পুরো বিল্ডিং পুলিশ দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে। প্রতিটি ফ্লোরে ফ্লোরে পুলিশ, এমনকি ছাদেও। জাহাঙ্গীর টাওয়ারের আশেপাশে কোনো গাড়ি পার্কিং করতে দেয়া হয়নি। রিকশা কিংবা হকারদেরও ভবনের পাশের রাস্তায় দাঁড়াতে দেয়া হয়নি। সময় মতো একুশে টিভির বোর্ড মিটিং হলো কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই। সেই সাথে পীযূষদার চাকরির চুক্তির মেয়াদও বাড়লো। মিটিং শেষে ফুরফুরে মেজাজে দাদা ফোন করে সুখবরটি দিলেন। …

চলবে

বাকি অংশ, পর্ব -৪ এ

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।

 

Advertisement
উৎসBiplob Kumar Paul
পূর্ববর্তী নিবন্ধনাটোরের বনলতা সেন
পরবর্তী নিবন্ধনাটোর-৪ আসনের এমপির বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের মানববন্ধন

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে