“নামটা জানা গেল না”-রত্না চক্রবর্তী’র অনুগল্প

0
340
রত্না চক্রবর্তী

অনুগল্প
গল্প- নামটা জানা গেল না
– রত্না চক্রবর্তী

ছোড়দি মারা গেছে আজ আঠারো বছর হয়ে গেল। ওপরের ঘরে থাকতো ও।পোলিওতে ওর পাটাই শুধু নয় শরীরটাও কেমন শুকিয়ে গিয়েছিল। খুব দুর্বল ছিল। শারীরিক বিকৃতি ছিল বলে বিয়ে হয়নি। বাঁচল না বেশিদিন খুব অল্প বয়সেই মারা যায়। নিচের একটা ঘরে বাবা আর অন্য ঘরটায় দাদা-বৌদি থাকত।বাবা নিজে খুব নিষ্ঠাবান পুরোহিত ছিলেন। পয়সা তার তেমন ছিল না কিন্তু যজমানরা খুব শ্রদ্ধা ভক্তি করে গুরুর আসনে বসিয়ে রেখেছিল। এটাই বাবার খুব গর্ব ছিল। খুব গোঁড়া ও জেদি, রাগী ছিলেন।
আজ আমি ফিরে এসেছি এই বাড়িতে। স্বামী মারা গেছে, একা মানুষ,সন্তান নেই তাই চলে এসেছি দাদার কাছে। বাবা আর নেই। তিন বোনের আমি ছোট আর শৈশবে মাতৃহীন বলে বৌদি খুব ভালোবাসে। আমি ছোড়দির সেই ছাদের ছোট্ট ঘরটাই নিলাম। ভাইপো বড় হয়েছে বাবার ঘরটা তার লাগবে।
ঘরটা পরিষ্কারই আছে। ঝাড়ামোছা করিয়ে রাখে বৌদি। খুব পরিষ্কার মানুষ। শুধু কিছু বাড়তি বাতিল জিনিস রয়ে গাছে ওগুলো একটু না সরালে আমার জিনিসপত্র রাখার অসুবিধা হবে। একটা মস্ত কাঠের চেয়ার, একটা বাচ্চাদের দোলনা,ভাইপোর ছিল। আমাদের আর কি কাজে লাগবে, ওটা কাজের দিদিকে দিয়ে দিল বৌদি। চেয়ারটা ওই ছোট্ট ছাদেই রাখলাম মাঝে মাঝে বসা যাবে। কিছু বড় বড় বাসনকোসন ছিল, চৌকির তলায় রাখলাম। মায়ের আমলের কাঠের আলমারিটা রয়ে গেছে, আগের জিনিস খুব মজবুত। ওতেই আমার শীতের জামাগুলো রাখব ভাবলাম। কতদিন হয়ে গেল তবু আলমারি খুলতেই যেন ছোড়দির গন্ধ পেলাম। ও কান্তা সেন্ট ব্যবহার করত, শেষে হাঁফানির মতো হয়েছিল। বেশি স্নান করত না, গা মুছে সেন্ট লাগাত। মনটা কেমন হয়ে গেল। ছোড়দির জামাকাপড় অবশ্য নেই, ও বাড়িতে লম্বা ঝুলের জামা পরত, বৌদি বানিয়ে দিত। অক্ষম শরীর শাড়ির ঝামেলা নিতে পারবে না বলে। বাবার আপত্তি ছিল কিন্তু এই একটা ব্যাপারে বৌদি নিরবে প্রতিবাদ করেছিল। পুরনো জিনিস ঘাটতে ঘাটতে ছোড়দির কবিতার বই গুলো পেলাম। ও বড় কবিতা ভালোবাসত। সঞ্চয়িতাটা হাতে নিয়ে অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। বড় প্রিয় ছিল ওর। যখনই দেখতাম তখনই হাতে, ঘুমিয়ে থাকলে বুকের উপর উপুড় করা থাকত। বইটা মুছে তুলতে গিয়েই চিঠি আমার সামনে যেন ঝ’রে পড়ল। বিবর্ণ হয়ে গেছে খাম, কোন নাম নেই, ছোড়দির হাতের লেখা!! কার জন্য লেখা চিঠি? পাঠাই নি কেন….
খুললাম চিঠিটার সম্বোধন “আমার তুমি “শেষটা ” তোমার আমি “! ছোড়দি লিখেছে
“আমার তুমি
পরশু থেকে আর তোমায় দেখতে পাব না, আমার এই বন্ধ জীবনের একটা জানলা তাও বন্ধ হয়ে যাবে। আমি বাঁচব কি নিয়ে? আমার তো চাওয়ার বা পাওয়ার কিছু ছিল না। আমি পঙ্গু আর তুমি অন্য জাতের…. বাবার ভাষায় নিচু জাতের। তোমার বাড়ি আমার বাড়ি কেউই অন্য কোন সম্বন্ধ তো দূরের কথা বন্ধুত্বটুকুও মেনে নেবে না। বাবা বলেন নারী পুরুষে বন্ধুত্ব হয় না। কিন্তু তবুও তো শুধু চোখের দেখায় শুধু চিঠিতে আমরা এত কাছাকাছি এসেছিলাম। আমি জানি তোমার ভালোবাসা খাঁটি। শুধু ছাদে বসে থেকে কত রাত কেটে গেছে, দূরে তুমিও বিনিদ্রিত, দাঁড়িয়ে আছ কিন্তু মনে হত কত্ত কাছে একই খোলা আকাশের তলায়। একই বাতাস তোমায় ছুঁয়ে আমায় ছুঁয়ে যেত। কিন্তু এটুকুও তো আর রইল না, তুমি বিদেশে চলে যাবে আর তো তোমায় দেখতে পাব না, একই সময় একই বৃষ্টি তো আর আমাদের আদর করে ভেজাবে না।বিশাখাও তো আমাদের ছেড়ে কোন সুদূর লোকে চলে গেল মাত্র দুদিনের জ্বরে। আর আমাদের চিঠি দেওয়া নেওয়াই বা কে করবে? আর আমার বাড়ি পোষ্টে আমার নামে চিঠি আসা এক অসম্ভব দুর্ঘটনা আর আমি তো তোমায় আর চিঠি পাঠাতে পারব না….এ চিঠিও পাঠানো যাবে না তা জানি। তবু লিখছি এ চিঠি থাকুক আমার সঞ্চয়িতার সঞ্চয়ে। আমার মনের সব সুখ, দুঃখ আনন্দ তো তুমি আপনিই বুঝতে পারতে, এ না পাঠানো চিঠিও নিশ্চয়ই তুমি বুঝতে পারবে। তোমার সঞ্চয়িতাটা খুললে ওর কোন না কোন পাতায় ছত্রে আমার কথা তুমি পাবে।
তোমার আমি ”
স্তব্দ হয়ে বসে রইলাম। কাকে লেখা এই কান্না ঝরানো চিঠি। আশপাশের কোন বাড়ির কেউ কিন্তু কে হতে পারে। আমাদের জাত নয়, বিদেশে চলে গিয়েছিল…. বুঝতে পারলাম না। ছোড়দির কি কল্পনার প্রেমিক। কিন্তু তাহলে বিশাখাদির কথা বলত না। বিশাখাদিই তো একমাত্র রোজই আসত ছোড়দির কাছে। বুকভরা ভালোবাসা আর ব্যথা নিয়ে সে চলে গেছে। হতভাগীর জন্য এত বছর বাদে আবার ঝরঝর করে কেঁদে ফেললাম। দুফোঁটা জল ঝরল নাম না লেখা সেই চিঠির বুকে। সযত্নে রাখলাম আমার ছোড়দির বুকের মাঝে….সেই সঞ্চয়িতার ভাঁজে।।

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধকামরুল ইসলামের দুইটি কবিতা
পরবর্তী নিবন্ধ“একুশের বইমেলা নিয়ে জলঘোলা- ২”-জাকির তালুকদার

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে