নিঃস্তব্ধ ফাঁসিমঞ্চে প্রাণবন্ত পরিবেশনায়  একটি অবাস্তব গল্প

0
26

বিশেষ প্রতিবেদ : কারা অভ্যন্তরের ফাঁসিমঞ্চ মৃত্যুদণ্ডে দন্ডিত মন্ডলকে ফাঁসি দেয়ার তোড়জোড় চলছে। বিপত্তি বাঁধলো কাঁচা লঙ্কা দিয়ে পান্তা খাওয়ার শেষ ইচ্ছে পূরণে। অন্তিম এ ইচ্ছে পূরণে সৃষ্ট হাস্যরস এক বিষাদে ভরা সমাপ্তির রুপ নিয়ে এগোলো।

দন্ডিত ক মন্ডল শেষমেষ জানালেন কি কারনে তাকে চড়তে হলো ফাঁসিকাষ্ঠে। নিঃস্তব্ধ এক ফাঁসিমঞ্চ এভাবেই জীবনবোধের গভীর বেদনার আশ্রয়ে বার্তা দিলো শোষকশ্রেণীর চরম নিষ্ঠুর পরিহাসে শ্রমিকশ্রেণীর দুঃসহ দিনযাপনের।

শনিবার(২৬ নভেম্বর) রাতে নাটোর শহরের শুকুলপট্টিস্থ সাকাম মিলনায়তনে মঞ্চস্থ হয় বিমল বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত নাটক ‘একটি অবাস্তব গল্প’। করোনা মহামারীর পর এটিই সাকামের প্রথম ও ৫৭১ তমপরিবেশনা।

এই পরিবেশনার মাধ্যমে দীর্ঘদিন পর মঞ্চে ফিরলেন শহরের প্রথিতযশা নাট্যজন, অভিনেতা ও কলাকুশলীরা। নাটকটির নির্দেশনায় ছিলেন আশীষ কুমার স্যান্যাল।

নাটকটিতে ক মন্ডল চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেন ক’মন্ডল চরিত্রে অধ্যাপক সুবীধ কুমার মৈত্র। এছাড়া জেলার চরিত্রে নুরুজ্জামান, ডাক্তার চরিত্রে পরিতোষ অধিকারী, অহীন চরিত্রে রফিকুল ইসলাম নান্টু, কমল চরিত্রে অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম, বাচস্পতি চরিত্রে অমল ব্যানার্জি,নকুল চরিত্রে শাহাদাত হোসেন, কেষ্ট চরিত্রে শংকর দাস, রামসিং চরিত্রে দেবাশীষ সরকার।

এছাড়া আবহ সংগীতে মাহবুব হোসেন, আলোক সম্পাতে এস এম পারভেজ ও সার্বিক সহযোগিতায় আতিকুল হক লিটন।

নাটকের দৃশ্যে স্ত্রীকে হত্যার দায়ে দিনমজুর ক মন্ডলকে ফাঁসিতে ঝুলানো পূর্বে শেষ ইচ্ছের কথা শুনতে চান জেলার। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি পান্তা ভাত ও লঙ্কা খেতে চান। পান্তা ও লংকা ভোর রাতে জোগাড় করা যেন প্রায় অসাধ্য ব্যাপারে পরিণত হয়।

ফাঁসির দড়িতে ঝুলানোর পর ডাক্তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখেন তিনি মারা যাননি। তাকে ফাঁসিকাষ্ঠ থেকে নামিয়ে পরিচয় জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু তিনি কিছুই বলতে পারেন না। ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির স্মৃতি শক্তি ফিরিয়ে আনতে নানা অপকৌশলের অবতারণা করা হয়। শুরু হয় নাটকের ভেতর নাটক।

স্মৃতি ফেরার নাটকে ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির স্ত্রী ও সন্তানের চরিত্রে কারা পুলিশেরা অভিনয় করতে থাকেন। এক পর্যায়ে অভিনয় করতে গিয়ে সত্যি সত্যি পুরোহিত বাচস্পতিকে খুন করে ফেলে জেলারের চরিত্রে অভিনয় করা জেলার নুরুজ্জামান। পরে দেখা যায় ছলনা করে জেলারকে ভয় পাইয়ে দেন বাচস্পতি। তখন স্মৃতি ফেরে ক মন্ডলের আর এগিয়ে যায় কাহিনী।

দিনমজুর কমন্ডলের সুখের জীবনে কালো ছায়া নেমে আসে হঠাৎ করে কারখানা বন্ধ হওয়ায়। চাকরি হারিয়ে দিনের পর দিন উপোস করা ক মন্ডলের স্ত্রী ও শিশুপুত্র ভাতের আশায় বসে থাকে। একরাতে চুপিচুপি বাড়িতে ঢুকে ক মন্ডল তার শিশুদের ভাত খেতে দেখে হতবাক হয়।

কারন জানতে চাইলে স্ত্রী বলে ক্ষুধার জ্বালায় কাতর সন্তানদের জীবন বাঁচাতে চাল চুরি করেছেন তিনি। এ কথা শুনে ক্ষুদ্ধ ক মন্ডল হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে গলা টিপে স্ত্রীকে মেরে ফেলেন।

দর্শক সারিতে বসে নাটক উপভোগ করেন নাটোরের জেলা প্রশাসক শামীম আহমেদ, পৌর মেয়র ও সাকাম সভাপতি উমা চৌধুরী, পুলিশ কর্মকর্তা কাজী জালাল উদ্দীন আহমেদসহ গণমান্য বাক্তিবর্গ।

নাটক দেখতে সপরিবারে সাকামে আসেন চিত্তরঞ্জন সাহা। তিনি বলেন, গভীর জীবনবোধের নির্মম উপলদ্ধি একটি অবাস্তব গল্পের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে।

পৌর মেয়র ও সাকাম সভাপতি উমা চৌধুরী বলেন, করোনা মহামারীর পর নাট্যায়োজন প্রায় ছিলোই না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবার পর নাটকের অভিনেতা ও কলাকুশলীরা নিজ নিজ পেশাগত কাজে নিয়োজিত হওয়ায় এখন শিল্পি সংকট।

এছাড়া কারিগরি নানা সীমাবদ্ধতা সত্বেও নাট্যচর্চার ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে এই পরিবেশনা সাকামের। আগামী দিনগুলোতে এই ধারাবাহিক অব্যাহত রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।

জেলা প্রশাসক শামীম আহমেদ নাটকের ভুয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, সাকাম নিয়মিত নাটক মঞ্চায়ন করলে নাটোরের মানুষ উপকৃত হবে। সামাজিক অসঙ্গতি, সমস্যা ও সম্ভাবনার নানা দিক উঠে আসে নাটকের মধ্য দিয়ে। ভবিষ্যতে নাট্যায়োজনে সাকামকে পৃষ্ঠপোষকতা করা হবে।

উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালের ৫ই মে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান সাকাম প্রতিষ্ঠিত হয়। জেলার তিনজন নাট্যব্যক্তিত্ব প্রয়াত সাদেক নবী, কালিদাস রায় ও মন্মথ প্রমাণিকের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে নামকরন করা হয় ‘সাকাম’।

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধনাটোরের লালপুরে গরু চুরি কান্ডে আ‘লীগ নেতা গ্রেপ্তার
পরবর্তী নিবন্ধনাটোরে এবারও কাদিরাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল শীর্ষে

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে