বই মেলায় পলাশ মজুমদারের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘হরিশংকরের বাড়ি’ প্রকাশিত হলো

0
732
বইমেলা

পলাশ মজুমদারের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘হরিশংকরের বাড়ি’ প্রকাশিত হলো, দেশের স্বনামধন্য ও ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বিদ্যাপ্রকাশ থেকে। বইটি প্রকাশ করেছে জন্য বিদ্যাপ্রকাশ প্রকাশনী, এর সত্ত্বাধিকারী মজিবর রহমান খোকাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছেন লেখক। লেখক আজ বইটি হাতে পেয়ে লিখেছেন…..”আজ হাতে পেলাম বইটির সৌজন্য কপি। প্রথম কপি অর্পণ করলাম আমার বন্ধু কথাসাহিত্যিক স্বকৃত নোমানের হাতে যাঁর প্রেরণা ও উৎসাহে বইটি আলোর মুখ দেখল। বইটি উৎসর্গ করলাম তাঁকেই।”

নাটোরকন্ঠের পক্ষথেকে লেখকে শুভেচ্ছা ……..

লেখক বইটি সম্পর্কে তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন ….

এই গল্পগ্রন্থের প্রতিটি গল্পের প্রেক্ষাপট দেশবিভাগ এবং বিভাগোত্তর দুই দেশে বাঙালির সমাজ ও জীবন। দেশভাগের কারণে মানুষের বাস্তুচ্যুতি, সামাজিক অস্থিতিশীলতা ও মানবিক বিপর্যয়। সে হিসেবে গল্পগুলো দেশভাগ ও দাঙ্গার। এই বইয়ের প্রতিটি গল্পে রয়েছে সেই ঐতিহাসিক ঘটনার প্রতিফলন, যার প্রভাব সমকালেও স্পষ্ট। বলার অপেক্ষা রাখে না, অতীত ও বর্তমানের মধ্যকার যোগসূত্র স্থাপনের পদ্ধতি শ্রমলব্ধ ও গভীর চিন্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।

ওই কঠিন সময়কে গল্পের চরিত্র ও ঘটনাবিন্যাসের মধ্যে বিভিন্নভাবে প্রতিস্থাপন করতে চেয়েছি। এ সময়ে তার ধারাবাহিক পরিণতি রূপায়ণে আশ্রয় নিয়েছি বিভিন্ন কৌশল ও পন্থার। ঘটনা বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছি নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে। গল্পগুলো ধারণ করে আছে দেশভাগের পরিপ্রেক্ষিতে বাঙালির বিচ্ছেদ-বেদনা ও দীর্ঘশ্বাস। প্রসঙ্গক্রমে এসেছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। অবাঙালি চরিত্র। গল্পগুলোতে ঢাকা-কলকাতা-আগরতলা, পশ্চিম বাংলা-পূর্ব বাংলা (বাংলাদেশ)-আসাম-ত্রিপুরা—এককথায় বাংলাভাষী অঞ্চলের ভেদরেখা ঘুচে গেছে; যেন সবটুকু নিয়েই বাংলা—বাঙালির ভুবন। কেবল মাঝখানে রয়ে গেছে কাঁটাতারের বেড়া—র‌্যাডক্লিফ লাইন।

গল্প লেখার কথা ছিল না আমার; কখনো ভাবিওনি। এক সহকর্মীর সঙ্গে বাজির জেরে দৈনিক বণিক বার্তার সাহিত্য পাতা সিল্করুটে একটি গল্প পাঠাই; প্রেক্ষাপট দেশভাগ ও দাঙ্গা। গল্পটি ছাপা হয় যথাসময়ে। একই সঙ্গে আপ্লুত হই সম্পাদকের প্রশংসার বন্যায়। আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় কয়েকগুণ। অনুপ্রাণিত হই আরো লিখতে। হাতে নিই ‘দেশভাগ এবং দাঙ্গা’ সিরিজের গল্প লেখার পরিকল্পনা। এক বছরের কম সময়ের মধ্যে লেখা হয়ে যায় ১২টি গল্প—মহানগরী, সোনার মানুষ, হরিশংকরের বাড়ি, মঙ্গলদ্বীপ, সহোদর, উদ্বাস্তু, র‌্যাডক্লিফ লাইন, বিধর্মী, দ্বন্দ্ব, সহযোদ্ধা, যাযাবর ও চক্রান্ত।

লেখা শেষে গল্পগুলো পাঠিয়ে দিই বিভিন্ন পত্রিকার সাহিত্য বিভাগ, লিটল ম্যাগ ও সাহিত্য সাময়িকীতে। সম্পাদকরা ছাপান আগ্রহ ভরে। প্রকাশিত হয় বাংলা একাডেমির সাহিত্য সাময়িকী উত্তরাধিকারে, স্বনামধন্য লিটল ম্যাগ শালুকে, অনলাইন পত্রিকা বিডিনিউজ ২৪.কমের আর্টস বিভাগে, বাংলা দৈনিক পত্রিকা বাংলাদেশ প্রতিদিন, সমকাল (কালের খেয়া), বণিকবার্তা (সিল্করুট), সংবাদ, ভোরের কাগজ, সাম্প্রতিক দেশকাল ও সময়ের আলোর সাহিত্য পাতায়; এমনকি কলকাতার দ্য নিউজ এক্সপ্রেস পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায়।

এক বন্ধু প্রশ্ন করেছিল, শুধু দেশভাগ নিয়ে গল্প কেন? আর কি বিষয় নেই? উত্তরে তাকে বলেছিলাম, দেশভাগ আমার আগ্রহের বিষয়। ভাষার সূত্রে আমি বাঙালির ঐক্যে বিশ্বাসী, সে যে দেশে বা যে ধর্মের ছায়াতলে থাকুক না কেন। ১৯৪৭ সালে আমরা খণ্ডিত হয়েছি রাজনৈতিক কারণে, যার ফল ভোগ করছি এখনো। হয়তো করতে হবে আরো অনেক দিন পর্যন্ত।

ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও আমার অনেক প্রিয় মানুষ এ ঘটনার শিকার। দেশহীন এসব মানুষের বুকের ভেতরের হাহাকার, যন্ত্রণা ও কষ্ট আমি দেখেছি। বাস্তুচ্যুত এমন অনেক মানুষের দেখা পেয়েছি ত্রিপুরায়, আসামে, সিকিমে, মেঘালয়ে, দিল্লিতে ও পশ্চিমবঙ্গে, এমনকি ঢাকাতেও। তাদের হৃদয়ের কথা শুনেছি আমি। আর তাদের কথাগুলোই বিভিন্ন আঙ্গিকের গল্পে তুলে ধরতে অনুপ্রাণিত হয়েছি। আপন খেয়ালে আঁকতে চেয়েছি বিভিন্ন রকম ক্যানভাস।

ইতিহাসের এ অংশটি আমাকে প্রথম ভাবায় ১৭ বছর বয়সে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘পূর্ব-পশ্চিম’ পড়ার পর। আমার ভাবনার বিস্তারে ভূমিকা রেখেছেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, হাসান আজিজুল হক ও অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রভাবিত হয়েছি সাদত হাসান মান্টোর দেশভাগের গল্প দ্বারা, যদিও সেই গল্পগুলো পাঞ্জাবের প্রেক্ষাপটে।

তারও আগে চারপাশের হিন্দু-মুসলমানের মধ্যকার ব্যবধান ও বৈষম্য, বাংলাদেশের হিন্দুধর্মাবলম্বীদের দেশত্যাগ আমার বুকে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে বহুবার। বন্ধুকে ভারতে চলে যেতে দেখেছি নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়। দাদা ও বৌদির কাছে। তার দাদাকে আগেই পাঠানো হয়েছিল কাকার বাড়িতে; কাকা সেখানে স্থায়ী হয়েছেন দেশভাগের পরপর। তাদের বাড়ির অন্য সদস্যরাও দেশ ছেড়েছিল বিভিন্ন সময়ে। যে বাড়িটিতে একসময় মানুষ গমগম করত, তা ধীরে ধীরে জনশূন্য হতে থাকে। পনেরোটি থেকে পরিবার এসে ঠেকে একটিতে। সবশেষে ওই পরিবারটিও চলে যায় এক মুসলমান ব্যবসায়ীর কাছে বিশাল বাড়িটি স্বল্প দামে বিক্রি করে। আমি জানি, এই নীরব প্রস্থানের কারণ সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাবোধ, আর কিছু নয়।
এমন অসংখ্য ঘটনা আমি জানি। শুনেছি ভুক্তভোগীদের মুখে। ইতিহাসের এই ভুলকে কখনো আমি মেনে নিতে পারব না। ক্ষমা করতে পারব না দেশভাগের কুশীলবদের।

সর্বোপরি এটি ইতিহাসের নয়, গল্পের বই। ইতিহাসকে ছুঁয়ে যাওয়া কিছু মানুষের জীবন ও তাদের জীবনের ঘটনাকে উপজীব্য করে গল্পগুলো লিখতে আমি সচেষ্ট হয়েছি। আর দেশভাগের শিকার এসব মানুষের কথা বলতে চেয়েছি এ বইয়ের বিভিন্ন গল্পে।
.
ভূমিকা
.
গল্পগ্রন্থ : হরিশংকরের বাড়ি
প্রকাশনা : বিদ্যাপ্রকাশ
প্রচ্ছদ: মোস্তাফিজ কারিগর
প্রকাশিতব্য-কাল : অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধকবি আলফ্রেড খোকন ৫০ জন্মদিন উদযাপন
পরবর্তী নিবন্ধপ্রসঙ্গ একুশে বইমেলা- স্বকৃত নোমান 

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে