বিজু – জাহিদ জগৎ-এর ছোটগল্প

0
1342
Jahid

বিজু- জাহিদ জগৎ-এর ছোটগল্প

২০১১ সালের এক পূর্ণ বিজুর গল্প বলি, শোনেন। তখন আমি আর আমার প্রাণপ্রিয় রানী থাকি বান্দরবনে। শহর থেকে খুব বেশি দূরে নয়। হাফেজঘোনা থেকে হাতিভাঙ্গায় ট্রান্সফার হয়েছি মাস খানেক আগেই। জায়গাটা নীলাচল পাহাড়ের গোড়ার দিকে। পাহাড়ের গায়ে ঝুলন্ত একটা কাঠের ঘর। বিছানা বালিশ নেই। আশেপাশে লোকালয় নেই। চারপাশে পাহাড় আর পাহাড়। তখন রাজমিস্ত্রীর কাজ করি। তিনশো টাকা থেকে চারশো টাকায় উন্নিত হয়ে রোজ। এমন দিনহীন সময়েও রানী সকালের নাস্তা করতো, পাউরুটি মধ্যে ভাজা গুজে দেওয়া বার্গার দিয়ে। আমার ভালো লাগতো। দিনশেষে, ৩০ টাকার এক পোয়া মদ আর শ’দেড়েক টাকা বাজার নিয়ে ঘরে ফিরে দুজনের একসাথে রান্না করা, পাহাড়ের গায়ে মোমবাত্তি জ্বালিয়ে দুজন মানুষের স্বপ্ন সেলাই,দৃশ্যটা সুন্দর না? বালিশ নেই বলে, রানী ঘুমাতো আমার হাতের উপর মাথা দিয়ে। আমার ছিলো গোটা পাঁচেক বই। রানীর ওড়না দিয়ে পেঁচিয়ে আমি মাথায় দিতাম। বিছানা বলতে কাঠের মেঝের উপর তাবু, তার উপর চটের বস্তা। বস্তার উপর একটা কাঁথা। কাঁথাটা দিয়েছিলো, শ্রীমঙ্গল থেকে আচমকা বান্দরবনে ছুটে এসে প্রথম যার কাছে আশ্রয় পেয়েছিলাম সেই খালার কাছ থেকে। সাকিরের মা। শ্রীমঙ্গল থেকে বান্দরবনে আসাটা বিরাট এক থ্রিলার গল্প। কোন একদিন বলা যাবে। যাইহোক, পাহাড়ে চৈত্র মাস মানে এক নারকীয় সুন্দর এসে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরা, আপনি সেটা খুব সহজে ধরতে পারবেন না। বেলা বাড়ার সাথে সাথে আগুন হয়ে উঠে মাটি। নদীর স্রোতের মতো এবং ঘন আঠার মতো বাতাস এসে জরিয়ে ধরে শরীর। বুনো ফুলের গন্ধ আর ঝিঝির ডাক নেশাগ্রস্থ করে ফেলে রাখবে আপনাকে। আপনার টিকে থাকার জন্য হাতের কাছে পানি নেই, খায়-খাদ্যের জোগান নেই, উত্তাপে পুড়ে যাবেন তবুও আপনি উঠে আসতে পারবেন না সেই মরণনেশা থেকে। এমন এক কড়া চৈত্র মাস পাড় হলো নিউ গুলশান পাড়ার এক ধনী লোকের ছাঁদ আর বাথরুমের কাজ করে। প্রতিদিন কাজ শেষে নগদ টাকা আর চা নাস্তা করে সন্ধ্যেবেলায় রাজার মাঠের কোনার দিকে এক মাসির মাচাং এ বসে একপোয়া মদ টেনে, বাজার নিয়ে ঘরে ফিরতে ফিরতে রাত আটটা বেজে যায়। এতো দীর্ঘ সময় একা থেকে থেকে পাহাড়ের বুনো ফুলের মতো রানী কেমন শুকিয়ে গেলো কয়েকদিনে। মাসের শেষ দিকে, কাজের চাপটা কমলো। চীত হয়ে শুইলে দুই চালার ফাক দিয়ে আসমানের চাঁদটা ভেসে ওঠে চোখে। চাল আর বেড়ার ফাক দিয়ে দেখা যায় দূরে আরও বড় বড় সব পাহাড়। এতো সব সুন্দর যে কি ভয়ানক লাগে, তা এতো সহজে আপনি ধারণ করতে পারবেন না। সেই রাতে আমি মোম জ্বালিয়ে পড়ছিলাম কাহলিল জিবরান। শহর ছেড়ে দেবার আগে, বন্ধু সঞ্জয় গুজে দিয়েছিলো ব্যাগে। পাশে আমার বইবালিশে মাথা দিয়ে পুতুলের মতো ঘুমাচ্ছিলো রানী। চালের ফাঁক দিয়ে চাঁদটা মাথা উপর এসে জুড়েছে। রাত তখন একটা হবে।
হঠাৎ চিৎকার করে লাফিয়ে উঠলো রানী। ঘুমন্ত মানুষের এমন চিৎকারে চমকে উঠলাম আমি। ভয় পেয়ে যাওয়ার মতো। সাথে সাথে আমি জড়িয়ে ধরলাম, “কি হয়েছে সোনা?”। আমার হাতের মধ্যে থর থর করে কাঁপছে রানী। কয়েক মিনিট লাগলো ধাতস্থ হতে। বুকের মধ্যে মাথা গুজে দিয়ে শুধু আঙ্গুল তুলে ইশারা করলো, ঐ’যে, ঐযে। “ঐ’যে”টা” যে আসলে কি আমি বুঝতে পারলাম না কিছুতেই। প্রায় আধ ঘন্টা পর সে আমার বুক থেকে মুখ তুললো। বেড়ার বড় ফাঁকটা দেখালো সে, যে ফাঁক দিয়ে দেখা যায় বহু দূরের পাহাড় সকল। সব’চে বড় পাহাড়ের মাথায় একা এক গাছ কেমন শুন্যের উপর দাঁড়িয়ে আছে, রাতে শুধু যার ছায়া থাকে। সেইদিকে আঙ্গুল তুলে রানি কেঁপে উঠলো আবার। বুকের মধ্যে মাথা গুজে দিয়ে সে বললো, “জানু, ঐযে, ঐখান থেকে মাথা কাটা একজন এই ফাঁক দিয়ে এসে, আমার এইখানে কামড় দিয়েছে। পাজামা গুটিয়ে রানের কাছে হাত দিয়ে দেখালো। দেখলাম সত্যি, সেইখানে কালচে দাগ। ছোপ ছোপ রক্ত জমে উঠেছে। সে বললো, আমি শুয়ে ছিলাম, আমার পায়ের উপর দিয়ে এসে বুকের উপর দাঁড়িয়ে হাত ধরে টান দিছে জানু। ভয়ে সে কাঁপছে। রক্তশুন্য হয়ে গেছে তার শরীর। কিছুতেই তাকে বোঝাতে পারলাম না যে, এসব কিছুই না, শুধু স্বপ্ন দেখেছে সে। এতে ভয়ের কিছু নেই। ঘন্টা খানেক পর সে একটু স্বাভাবিক হলো, গ্লাস ভরে পানি এনে দিলাম। সে পানির গ্লাস ধরতে গিয়ে লাফ দিয়ে উঠলো, চিৎকার করে ছিটকে পড়লো এক পাশের বেড়ার উপর। পানি গ্লাস ছিটকে পড়লো দূরে কোথাও। মোমবাতি কাত হয়ে পড়ে নিভে গেলো। মাথার উপর দো-চালের ফাঁক দিয়ে ঘর ভরে উঠলো জোছনার আলোয়। এইবার রানী আমার দিকে আঙ্গুল তুলে চিৎকার করছে, “ওমা, ও বাবা, তোমার চোখ লাল কেন? এই যে, তোমার চোখ দিয়ে রক্ত পড়তেছে, তাজা রক্ত, তুমি কি খাইছো? তোমার মুখে রক্ত কেন?”।

চুড়ান্ত সর্বনাশটা ঘটে গেলো তখন। যে মানুষটা জীবনের সমস্ত ধারণা, প্রাপ্তী মুছে ফেলে পাহাড়ী জঙ্গলে এসে পাড় ধরেছে আমার ভরসায়, এখন আমাকেই সে ভয় পাচ্ছে? রানী আমাকে ভয় পেয়ে সরে যাচ্ছে দূরে, অথচ আমি ছাড়া এই গহীন জঙ্গলে আর কেউ নেই, তার পাশে থাকবার, তাকে অভয় দেবার। এর চেয়ে ভয়ানক অসহায়ত্ব আর নেই পৃথিবী’তে। এই ভয়াবহতা লেখার ভাষা আমার আয়ত্বে নেই আজও। সম্পূর্ণ অচেনা এক গহীন প্রেমের পৃথিবীতে রানী ছাড়া যে আমারও আর কেউ নেই। অথচ সেই মানুষটাই যখন আমাকে ভয় পাচ্ছে তখন সেই রাত যে কি ভয়ানক অভিশাপ হয়ে উঠেছিলো তা আর কোনদিনই লিখে উঠতে পারবো না। শুধু দেখলাম, ঘন্টার পর ঘন্টা, রাত বড় হচ্ছে। প্রিয়তম সুন্দরের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাতটা পাড়ি দিয়ে যখন সকাল হলো, তখন একটু শান্ত হয়ে ঘুমালো রানী। আমিও অনেকখানি বিধ্বস্ত হয়ে ঘুমালাম। বেলা দশটার দিকে রানী ডেকে তুললো আমাকে। থর থর করে কাঁপছে শীতে। তড়িঘড়ি করে উঠে মাথাটা কোলে নিলাম। কপালে হাত দিয়ে দেখি জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে রানী। সর্বনাশ হয়ে গেছে আমার। গায়ে দেবার মতো কাঁথা নেই। ব্যাগ থেকে দুটো সার্ট বের করে জড়িয়ে দিলাম। তার উপর রানীর দুইটা ওড়না ভাজ করে টেনে দিলাম গায়ে। পাতিলে পান্তা ভাত ছিলো। চিংড়ি’র শুটকি দিয়ে শসা’র তরকারি। রানি সব’চে ভালো রান্না করতে পারে এই তরকারীটাই। প্লেটে পান্তা আর শসার তরকারী নিয়ে গেলাম খাওয়াতে। ভাবলাম, দুটো ভাত খেলে কিছুটা শক্ত হবে। এই ফাঁকে আমিও বাজার থেকে ওষুধ এনে দিতে পারবো। রাতের তান্ডবে ভুলেই গেছিলাম আজ বিজু, পূর্ণ বিজু। কথা ছিলো, সকাল সকাল উঠে খেয়ে দেয়ে দুইজন সারাদিন পানি খেলবো। রাজার মাঠে বড় মেলা বসে। মেলায় ঘুরবো আর দুইজনে মদ খেয়ে মাতলামী করবো। জোছনা রাতে ঘরে থাকবো না, উঠে যাবো পাহাড়ে, উদোম খোলা আকেশের নিচে আমরা সেক্স করবো। আগেও আমরা দুজন একসাথে মাতাল হয়েছি, পাহাড়ে উঠেছি, ঝাড়ে জঙ্গলে, পাহাড়ের মাথায় সেক্স করেছি কিন্তু বিজু স্পেশাল। বিজু’তে আমরা দুনিয়াকে ভুলে যাবো, আমরা আর কাউ’কে কেয়ার করবো না। বিজুর কথা মনে পড়লো বাজারে এসে। কোন হোটেলেই গরুর গোস্ত আর রুটি পাওয়া গেলো না। যখন পান্তা ভাত খাওয়াতে গেছিলাম তখন সে গরুর গোস্ত আর রুটি খেতে চেয়েছে বলে ছুটে এসেছি বাজারের মধ্যে। ঘন্টাখানেকের পাহাড়ী হাটা পথ। এতো দূর এসে গরুর গোস্ত জোগাড় করতে পারবো না, ভাবতেই কান্না পাচ্ছিলো আমার। ট্রাফিক মোড় থেকে শুরু করে আদর্শ ভাত ঘর, হোটেল পাহারিকা, বিসমিল্লা হোটেল, সমস্ত শহর ছুটে বেড়ালাম। আমি জানি বিজুর সাত দিন আগে থেকে পুরো বান্দরজেলাতেই গরু’র মাংশ বিক্রি বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু কিছুতেই নিজেকে বোঝাতে পারছিলাম না। শেষ পর্যন্ত দুইহাতে দুই চোখ মুছে, শুধু ওষুধ নিয়ে দুপুর শেষ করে ফিরে এলাম ঘরে। একা একা বিছানায় পড়ে আছে রানী, কি করুণ সেই দৃশ্য! গায়ে হাত দিয়ে দেখলাম, ভাপ উঠছে শরীর থেকে। বিরবির করে কি যেন বলছে রানী। শব্দ নেই। ঠোঁট শুকনো। দ্রুত বালতি নিয়ে নিচে নেমে গেলাম। ঝিরি থেকে বালতি ভরে পানি নিয়ে আসতে মিনিট বিশেক সময় লেগে যায়। ফিরে এসে আমি আর রানীর মুখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না।
ঘরের বাইরে বালতিটা রেখে টেনে তুললাম, “জানু মাথায় পানি দিতে হবে, একটু কষ্ট করে ওঠো সোনা”। সে কোন রকমে আমার গলা জড়িয়ে ধরলো। কোলে করে তারে ঘরের বাইরে এনে একটা কাঠের তক্তার উপর বসিয়ে দিলাম। বেড়ার সাথে হেলান দিয়ে সে বসে থাকলো আর আমি মগ ভরে মাথায় পানি ঢালতে শুরু করলাম। দুই কি তিন মগ পানি দিয়েছি মাত্র। এর মধ্যেই ঘাড় কাত করে একদিকে ঢলে পড়লো রানী। আমি ওকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। চোখ ভিজে গেলো আমার। এদিক ওদিক তাকালাম। আশেপাশে কোন মানুষ জন নেই। কাছাকাছি যে পাড়াটা দেখা যায়, খুব কাছে কিন্তু যেতে হলে দুই পাহাড়ের যে খাদ পাড়ি দিতে হয়, তা দুই মাইলের কম না। প্রচন্ড খড়ায় পুড়ে গেছে সমস্ত পাহাড়। আগুনে পোড়া ন্যাড়া মাথা সবার। চিতার চাপা ছাই থেক চিৎকার করছে ঝিঁঝিঁ পোকার দল। আর কিছুতেই সহ্য করতে পারছি না এই ভয়ংকর সুন্দর। পায়ের কাছে কাদামাটিতে লুটিয়ে আছে রানী। মাঝে মাঝে দূর থেকে ভেসে আসছে বিজুর ধ্বনি। শঙ্খ, আর মাদলের আওয়াজ।

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধমানব সেবা বড় ধর্ম – রুদ্র অয়ন
পরবর্তী নিবন্ধবাগাতিপাড়ায় মাছ ব্যবসায়ীর উপর দূর্বৃত্তের হামলা, থানায় অভিযোগ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে