“মরীচিকা” -শাপলা জাকিয়া‘র ভৌতিক গল্প -পর্ব-০২

0
479
Shapla-Zakia

শাপলা জাকিয়া : প্রবালের প্রশ্নে সব মনে পড়ে গেলো, আমি দ্রুত ওকে গতরাতের ঘটনাটা বলতে গেলাম কিন্তু দেখলাম বলতে পারছি না। ব্রেণ যেভাবে ঘটনাটা বলতে চাইছে জিহ্বা সেভাবে তাল মেলাচ্ছে না। তোতলাতে তোতলাতে শুধু বলতে পারলাম,
-আমি… মা.. মা..!

কথা বলতে পারছিলাম না বলে অস্থিরতায় আমার চোখে পানি এসে গেলো।
সেটা লক্ষ্য করে প্রবালের মুখটা বিষন্ন হলো। সে কিছুটা ধরা গলায় বললো,
– মা হওয়াটা কারও জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না মেঘলা। এভাবে রাত জেগে থাকা, তারপর ফ্লোরে ঘুমিয়ে থাকা, এসব বিষন্নতা উদযাপন করে কী লাভ হবে বলো তো?

প্রবাল ভুল বোঝায় আমি আর বোঝানোর চেষ্টায় না গিয়ে বললাম,
– পান..
আসলে বলতে চেয়েছিলাম পানি খাবো। প্রবল তৃষ্ণায় গলা বুক শুকিয়ে গেছে।
এবার প্রবাল ঠিকঠাক বুঝলো। দ্রুত পানি এনে খাওয়ালো। গেস্টরুমের বিছানায় শুইয়ে দিয়ে প্রেশার মেপে বললো,
– মাই গড! প্রেশার তো অনেক লো!

এরপর স্যালাইন ওয়াটার, দুধ, ডিমপোচ সব একে একে আমাকে খাওয়ালো ও ।
ছোট বেলায় মা- বাবাকে হারিয়ে প্রথমে চাচার বাসায় আর পরে হোস্টেলে আর মেসে দিন কেটেছে প্রবালের। তাই সাংসারিক কাজকর্ম কিছুটা জানে। তার ডিমপোচের কুসুম ভেঙ্গে যায় না।

প্রবালের যত্নে আমার ভালো লাগতে শুরু করেছে। কাল রাতে ভয় পেয়েছিলাম সত্যি কিন্তু সেটা নিশ্চয় স্বপ্ন ছিল। কিন্তু স্বপ্নই যদি হবে, তাহলে আমি বেডরুম থেকে গেস্টরুমে কিভাবে এলাম? ঘুমের মধ্যে হাঁটার অভ্যাস তো ছিল না, এবার কী সেটাও হয়ে গেলো! শুধু একটা অতৃপ্তি আমার মনোজগতে আর কতো প্রভাব ফেলবে?
বিয়ের পাঁচ বছর চলছে,

আমার বা প্রবালের কারও কোন সমস্যা নেই তবু একটি নতুন প্রাণ আমাদের সংসারে যোগ হলো না। এই কষ্ট থেকে আমি দিনদিন বদলে যাচ্ছি , অস্থির লাগে ভাবলে, এই অপেক্ষার শেষ কবে হবে?
প্রবাল এসে পাশে বসতেই আবার গতরাতের কথা ওকে বলার চেষ্টা করলাম।

এবার গুছিয়ে বলতে পারলাম। সব শুনে সে কোন কথা না বলে চলে গেলো, তারপর নিজের মোবাইলটা নিয়ে ফিরলো। মায়ের নাম্বারে রিং করে ফোনটা আমায় দিলো। মায়ের সাথে কিছুক্ষণ কথা বললাম।
মা ব্যস্ত আছেন তার নতুন নাতিকে নিয়ে,

মাস দুয়েক আগে বড় ভাবির ছেলে হয়েছে। আমরা গতমাসে রাজশাহীতে গিয়ে দেখে এসেছি। সুন্দর নাদুসনুদুস বাচ্চা, তাকালে তাকিয়েই থাকতেই ইচ্ছা করে। নাতিকে নিয়ে কথা বলার সময় মায়ের গলাটা সুখী সুখী হয়ে যায়। সেই সুখী কন্ঠ আমাকে প্রশান্তি দিলো।

ফোন রাখার পর প্রবাল বললো,
-এখন ভালো লাগছে না? তুমি আসলে মাকে মিস করছিলে তাই অমন স্বপ্ন দেখেছো। আমি এখন অফিসের জন্য তৈরি হই?
-হও।
-আজ রান্নাবান্নার ঝামেলায় যেও না। ফোন করে খাবার আনিয়ে নিও। রেস্টুরেন্টের ফোন নাম্বার আছে তো তোমার ফোনে?
-আছে, কিন্তু আমি রান্না করতে পারবো তো, শরীর অতোটা খারাপ নয়।

কিছুক্ষণ পর প্রবাল অফিসে চলে গেলো। আমাকে উঠে দরজা লাগাতে হলো না সে দরজা লক করে চাবি নিয়ে গেলো। মানুষটা খুব কেয়ারিং, ভাবতেই একটা সুখ সুখ অনুভূতি আমায় ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছিল। গেস্ট রুমের বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম প্রায় কিন্তু হঠাৎ চমকে উঠে ঘুমটা চটকে গেলো।

মনে হচ্ছিল ঘরে কেউ হাঁটছিল, কিন্তু বাসায় এই মুহূর্তে আমি ছাড়া কেউ নেই। কে হাঁটবে?
নিজের ওপর বিরক্ত লাগছে, এতো ভয় পাচ্ছি কেনো আমি! হ্যাঁ এটা ঠিক যে এতো বড় বাড়িতে একা আমি আগে কখনও থাকিনি কিন্তু তাই বলে এতো ভয় পাবো! একটা কাজের লোক খুব দ্রুত ঠিক করতে হবে, একা থাকতে আমার ভালো লাগছে না।

এখানে পাঁচ দিন হয় এসেছি, বিশ্বস্ত একজন কাজের লোক খুঁজছি, পাশের বাসার ভাবি খুঁজে দেবেন বলেছেন কিন্তু এখনও পাননি।
বিছানা থেকে নেমে বেডরুমের দিকে রওয়ানা হলাম। কারণ আমার মনে হচ্ছে দরজার আড়াল থেকে কেউ আমাকে উঁকি দিয়ে দেখছে। আমি তাকালেই সরে যাচ্ছে। জানি এটা সম্ভব নয়, তবু কেন যেন মনে হচ্ছে, সত্যি সত্যি কেউ লুকিয়ে দেখছে আমাকে।

গেস্টরুম থেকে বের হয়ে ডাইনিং তারপর লম্বা করিডোর, তারপর বেডরুম। বিশাল ফ্ল্যাট এটা। আগে আমরা একটা ছোট ফ্ল্যাটে থাকতাম কিন্তু সেখান থেকে প্রবালের অফিসের দূরত্ব অনেক ছিল। তাই অফিসের কাছে এই এলাকায় এসেছি। অভিজাত এলাকা। থ্রি বেডরুমের ফ্ল্যাট ছাড়া কোন বাড়ি নেই। অগত্যা আমাদের দুজনের জন্য এই বড় ফ্ল্যাট নিতে হয়েছে।

নয় তলা বাড়ির ছয় তলা এটা, দক্ষিণমুখী ফ্ল্যাট, সেই হিসাবে প্রচুর আলো বাতাস থাকার কথা কিন্তু তেমন নয়। মুখোমুখি একটা দশতলা বাড়ি দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে সব আলো বাতাস নিয়ে নেয়। প্রবাল অফিস যাওয়ার সময় সব লাইট নিভিয়ে দিয়ে যাওয়ায়, এই ফ্ল্যাটটা এখন তাই অন্ধকার না হলেও ছায়া ছায়া।

অল্প আলোতে আমি ভয় পাইনা কিন্তু আজ শরীর শিরশির করছে। ইচ্ছা করছে এক দৌড়ে ডাইনিং আর লম্বা করিডোর পেরিয়ে বেডরুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দেই।
ইচ্ছাটাকে শাসন করলাম। নিজেকে বোঝালাম, এতো ভয় পাওয়ার কিছু নেই। নিজেকে একরকম ঠেলে ডাইনিং রুমের লাগোয়া বারান্দার সামনে নিয়ে গেলাম।

একটানে সরিয়ে দিলাম ভারি পর্দাটা। ঘর এখন অনেকটা আলোকিত। কিন্তু কিচেনের দিকে আচমকা চোখ চলে গেলো। মনে হলো কেউ চট করে সরে গেলো!
আমি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না, উড়েপিষে দৌড় লাগালাম বেডরুম লক্ষ্য করে। তারপর সশব্দে দরজা বন্ধ করলাম। এক প্রচন্ড ভয়ের অনুভূতি আমাকে গ্রাস করে ফেলছে।

খুব নিশ্চিত করে মনে হচ্ছে এই ফ্ল্যাটে এখন আমি ছাড়াও অন্য কেউ আছে। আমি দরজা বন্ধ করায় সে হয়তো এখনই নক করবে।
খুব হাস্যকর জেনেও আমি কিছুক্ষণ কান খাড়া করে থাকলাম, দরজায় কেউ টোকা দেয় কিনা সেটা শোনার জন্য। আর কী আশ্চর্য দরজায় টোকা পড়লো,

-ঠক! ঠক!
আমি দরজার কাছ থেকে সরে এসে মোবাইলটা হাতে নিয়ে প্রবালকে ফোন করলাম। ও ফোন ধরতেই বললাম,
– প্রবাল! এই ফ্ল্যাটে এখন আমার সাথে কে যেন আছে। আমি বেডরুমের দরজা বন্ধ করে বসে আছি বলে সে এখন দরজায় নক করছে। তুমি বাসায় আসো, প্লিজ বাসায় আসো। আমি খুব ভয় পাচ্ছি।

– কী বলছো পাগলের মতো? বাসায় কে থাকবে? আমি দরজা লক করে এসেছি। কারও ঢোকার কথা না।
– সত্যি দরজায় টোকা দিচ্ছে। আমি স্পিকার অন করছি, শোন। শুনতে পাচ্ছো?
প্রবাল বললো,

– পাশের ফ্ল্যাটের শব্দ হবে। তুমি বেডরুমের দরজা খোল, দেখো কেউ নেই।
– আমি পারবো না।
-তোমাকে পারতে হবে মেঘলা। নিজের ভয়কে গুরুত্ব দিতে দিতে তুমি কোথায় পৌঁছে গেছো দেখেছো? যেটাকে ভয় পাবে সেটাকে সরাসরি ফেস করবে, দেখবে ভয় চলে যাবে। আমি লাইনে আছি। তুমি মোবাইল কানে রেখে বেডরুমের দরজাটা খোল, দেখো কেউ নেই।

– আমি পারবো না।
-প্লিজ মেঘলা, একবার খোল, দেখবে সব ভয় চলে যাবে। এতোবড় হয়ে গেছো, এখনও বোকা বাচ্চাদের মতো ভূতের ভয় পাও। ভূত বলে কিছু নেই, বিশ্বাস করো। প্রবালের গলায় কিছু ছিল, যা আমাকে সাহস দিল।

ও কথা কম বলেই হয়তো যখন বেশি বলে আমি প্রভাবিত হই। আমি ধীর পায়ে মোবাইলটা কানে ধরে বেডরুমের দরজা খুলে দিলাম।
কেউ নেই।
টেলিফোনের ও প্রান্তে প্রবাল বললো,
– কেউ আছে?
– না।

– এবার পুরো বাড়ি একা একা হাঁটো। কিচেন, সব ঘর, সব বারান্দায় যাবে।
– লাইট জ্বালাই। সব কেমন ছায়া ছায়া।
– না, তুৃমি এই ছায়া ছায়ার মধ্যেই হাঁটবে।
আমি সব ঘর – বারান্দা, কিচেন সব ঘুরলাম। অস্বাভাবিক কিছু নজরে পড়লো না। ভয়ের শিরশিরানি ভাবটাও চলে গেছে।

প্রবালকে কিছুটা লজ্জা লজ্জা গলায় বললাম,
-থ্যাংকস।
প্রবাল শব্দ করে হেসে বললো,
-আচ্ছা।

ফোন কেটে বেডরুমে আসতেই চোখে পড়লো বেডরুমের সাথে লাগোয়া ওয়াশরুমের ওপরে যে স্টোর, সেটার দরজাটা খোলা। অথচ ওটা আমরা এসে পর্যন্ত খুলি নাই। আমাদের অল্প জিনিসপত্র, ফ্ল্যাট খুব ফাঁকা লাগে দেখতে, স্টোরে রাখার মতো বাড়তি কিছু আমাদের নেই। স্টোরের দরজাটা খুললো কেনো?
আমি প্রবালের মতো করে ভাবার চেষ্টা করলাম।

হয়তো খুব জোরে বেডরুমের দরজা লাগানোতে ওটা খুলে গেছে। অনেক সময় মুখোমুখি দরজা থাকলে এমন হয়। একটা জোরে বন্ধ করলে অন্যটা খুলে যায়।
স্টোরের দরজাটা অনেক ওপরে, হাতের নাগাল পাওয়া যাবে না, তাই ঝুল ঝাড়ার লম্বা ঝাড়ুটা নিয়ে আসতে গেলাম কিচেনের পাশের বারান্দা থেকে।

কিন্তু ঝাড়ুটা নিয়ে বেডরুমের কাছাকাছি আসতেই একটা কটু গন্ধ নাকে এসে লাগলো। যেটা একটু আগেও ছিল না। বেডরুমে পৌঁছে গন্ধে আমার নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসার যোগাড় হলো । নাকমুখে কাপড় চেপে ড্রইং রুমে চলে এলাম। এই গন্ধের মধ্যে থাকা সম্ভব না। গন্ধটা আসছে স্টোর থেকে।

বাইরে যাবার দরজাটা চাবি দিয়ে খুলতে যাবো কিন্তু চাবিটা পেলাম না। প্রবাল একটা নিয়ে গেছে আরেকটা শুর্যাকের ওপর পুতুলটার হাতে ঝুলে থাকার কথা। কিন্তু সেটা নেই! প্রবালকে কি আবার ফোন করবো?
ফোন রেখে এসেছি বেডরুমে। অগত্যা আবার বেডরুমের দিকে রওয়ানা হলাম নাকে কাপড় চেপে।

কিন্তু আমার জন্য বিস্ময় অপেক্ষা করছিল, রুমে গিয়ে দেখি কোন গন্ধ নেই এবং স্টোরের দরজা নিজে নিজে বন্ধ হয়ে গেছে।
এতোক্ষণের সাহসে এবার ভাটা পড়লো, আমার আবার দৌড়ে পালাতে ইচ্ছা করছে কিন্তু কোথায় পালাবো? বাইরের গেটের চাবি তো নাই।

মরিয়া হয়ে প্রবালকে কল করতে যাবো ঠিক সেই মুহূর্তে আমার পায়ের কাছে সশব্দে চাবিটা ছুড়ে মারলো কেউ। চমকে যেদিক থেকে চাবিটা এসেছে সেদিকে তাকালাম।
একটা ছায়া বাতাসে কাঁপতে কাঁপতে আমার মুখোমুখি এসে দাঁড়ালো।
চলবে…

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধ“ফিরে এলাম” কবি রুমকি আনোয়ার‘এর কবিতা
পরবর্তী নিবন্ধব্যর্থতা, সফলতা, আবেগ এবং ভালোবাসা-জাহিদ হাসান

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে