মুর্শিদাবাদ ভ্রমনের ইতিবৃত্ত -বেণুবর্ণা অধিকারী -শেষ অধ্যায়

0
498
বেণুবর্ণা অধিকারী

বেণুবর্ণা অধিকারী : ধাবায় খেতে যাবার আগে দেখলাম একটা প্রাচীণ কবরস্থান, বিশাল জায়গা নিয়ে এবং সুন্দর সুন্দর কারুকাজ করা। এটা সিরাজ উদ দৌল্লার কবরস্থান নয়, মীরজাফর ও পারিষদের। নবাবের কবরস্থানে যাওয়া হবে না সময়াভাবে, কারণ সেটা হাজারদুয়ারী থেকে অনেকটা দূরে বললো।

বেণুবর্ণা অধিকারী

অগত্যা এই করবস্থানটাই দেখার জন্য ঢুকে গেলাম আমি, ম্যাডাম হোসনে আরা ঢুকলেন না। হয়তো বিশ্বাসঘাতকের প্রতি ঘৃণা থেকেই। আমি যেহেতু ভিন্ন মতাবলম্বী তাই আমার কাছে দুটাই একই মাহাত্ব্যই পায়, প্রাচীণ ঐতিহ্য হিসেবে। সেটা দেখে একটা ধাবা লেখা হোটেলে ঢুকলাম খেতে গাইডকে নিয়েই। ভালই লাগলো খেতে। আহামরি কিছু না তবে ঘরোয়া খাবার।

বেণুবর্ণা অধিকারী

এরপর গেলাম হাজারদুয়ারী প্রাসাদ দেখতে, গেট থেকে দেখেই মন ভরে যায় এর শুভ্র বিশালতায়। হাজারদুয়ারি প্রাসাদ এখন ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, এখানে দেশ বিদেশের ভ্রমণ পিপাসু মানুষদের জন্য একটি অন্যতম সেরা ঐতিহাসিক নিদর্শন এখানে মাসে অন্তত ৩০০০০ মানুষ এর অনুগমন হয়। ভাগীরথী নদীর তীরে ১২ বিঘা জমিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ৮০ ফুট উচ্চতার হাজারদুয়ারি প্যালেস।

বেণুবর্ণা অধিকারী

বর্তমানে ভারত সরকারের আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার তত্ত্বাবধানে রয়েছে এটি। এর বর্তমান নাম হাজারদুয়ারী প্যালেস মিউজিয়াম। যদিও একহাজার দরজা রয়েছে বলে এমন নামকরণ। প্রাসাদে ৯০০টি প্রকৃত দরজা আর বাকি ১০০টি আসলে নকল দরজা । এর কারণ হাজারদুয়ারি প্রাসাদ নবাব আর ব্রিটিশদের বিচারালয় হিসেবে ব্যবহার হতো।

বেণুবর্ণা অধিকারী

বিচারকার্য পরিচালনার সময় কেউ যেন পালিয়ে যেতে না পারে সেজন্য বিচারপ্রার্থীদের বোকা বানাতে ও শত্রুদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে একহাজার দরজার মধ্যে ১০০টি নকল রাখা হয়। মজার ব্যাপার হলো ৯০০ দরজাই একটি চাবি দিয়ে খোলা ও বন্ধ করা যায়।

বেণুবর্ণা অধিকারী

আমরা সেদিন এর ভেতরে ঢুকেছিলাম কিন্তু কোন ছবি তুলতে পারিনি। এই প্রাসাদটি তিনতলা। একতলায় অস্ত্রাগার, অফিস-কাছারি ও রেকর্ড রুম। অস্ত্রাগারে মোট ২ হাজার ৬০০টি অস্ত্র আছে। একতলা প্যালেসের সামনের বিশাল সিঁড়িটি দরবার পর্যন্ত উঠে গেছে। সামনে লম্বা গোলাকার স্তম্ভে সুন্দর নকশার কাজ রয়েছে। সিঁড়ির দু’পাশে দুটি সিংহ মূর্তি ও দুটি ছোট সেলামি কামান।

বেণুবর্ণা অধিকারী

তিনতলায় বেগম ও নবাবদের থাকার ঘর, দোতলায় দরবার হল, পাঠাগার, অতিথিশালা। দোতলা ও তৃতীয় তলায় আর্ট গ্যালারি ও লাইব্রেরি। হাজারদুয়ারির ঠিক মুখোমুখি রয়েছে বড়া ইমামবরা। হাজারদুয়ারি ও ইমামবরার মাঝখানে মদিনা মসজিদ। সিরাজউদ্দৌলার তৈরি করা স্থাপনার মধ্যে শুধু এই মসজিদ টিকে আছে। মদিনা মসজিদের সামনে বাঁধানো বেদীর ওপর রাখা আছে বাচ্চাওয়ালী কামান।

বেণুবর্ণা অধিকারী

হাজারদুয়ারির সামনের পূর্ব পাশে আকাশছোঁয়া ঘড়ি ঘর পশ্চিমমুখী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুর্শিদাবাদবাসী ও ভাগীরথী নদীতে চলাচলকারী যাত্রীবাহী নৌকা ও জলযানের মাঝি-মল্লার ও যাত্রীদের সুবিধার্থে ঘড়িটি নির্মাণ করা হয়। সময়াভাবে আরো অনেক কিছুই একদিনে দেখা সম্ভব হয়নি আর। আমরা সেদিন এগুলো দেখে রাত ৯টার সময় হোটেলে ফিরে আসি।

বেণুবর্ণা অধিকারী

পরেরদিন কলকাতায় ফেরার পথে প্রদীপদার বন্ধুর গাড়িতে আমাদের পলাশীর প্রান্তর আর ভাগিরথী নদী দেখিয়ে আমাদের বহরমপুর বাসস্ট্যান্ড নামিয়ে দেন। আমরা পরে একটা হোটেলে খেয়ে বাসে উঠি। সেই হোটেলে পরিচয় হয় যাদের সাথে তারা খুব আপ্যায়ন বাঙালি শুনে। মুর্শিদাবাদের আকর্ষণ হলো অনেক কিছু, কিন্তু দেখা হয়নি সবগুলো। আশা করি সবগুলো আগামিবারে গিয়ে দেখা হবে।

বেণুবর্ণা অধিকারী

হাজারদুয়ারি প্রাসাদ (মিউজিয়াম), বড়া ইমামবরা, বাচ্চাওয়ালী তোপ, ঘড়িঘর, চক মসজিদ, ত্রিপোলি গেট, খোশবাগ, কাটরা মসজিদ, মতিঝিল, নসিপুর প্রাসাদ, কাঠগোলা বাগানবাড়ি, কাশিমবাজার রাজবাড়ি, ওসেফ মঞ্জিল, জগৎ শেঠের বাড়ি, নশীপুর রাজবাড়ি, নশিপুর আখড়া, মীর জাফরের বাড়ির গেট, জাফরাগঞ্জ সমাধি, আজিমুন্নেসা বেগমের সমাধি, হলুদ মসজিদ, ফুটি মসজিদ, জাহান কোষা কামান, উনিচাঁদের মন্দির, রাধামাধব মন্দির, ইংরেজ সমাধি, সুজাউদ্দিনের সমাধি, মীরমদনের সমাধি পলাশী, আস্তাবল ইত্যাদি।

বেণুবর্ণা অধিকারী

যেভাবে যাবেন
বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ১৯৮ কিলোমিটার দক্ষিণে ও কলকাতা থেকে ২০৯ কিলোমিটার উত্তরে মুর্শিদাবাদ। সুতরাং বাংলাদেশ থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বর্ডার দিয়ে গেলে খরচ কম পড়বে অনেক। ট্রেনে চাঁপাইনবাবগঞ্জে নেমে অটো নিয়েই বর্ডারে যাওয়া যায়।

Advertisement
উৎসবেণুবর্ণা অধিকারী
পূর্ববর্তী নিবন্ধসিংড়ায় ঝড়ে চালের টিন উড়ে কাটলো কৃষকের মাথা
পরবর্তী নিবন্ধনাটোরে প্রথম করোনা সনাক্ত ১ জন

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে