রুদ্র অয়ন -এর নববর্ষের নতুন গল্প- পথ চলার সাথী

0
638
rudro

পথ চলার সাথী-    রুদ্র অয়ন

আজ নববর্ষ। আল্পনাদের কলেজে বর্ষবরণ উপলক্ষে নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। আল্পনা এবং তার বান্ধবীরা মিলে একটি স্টল দিয়েছে। সাদা লাল তাত পাড়ের শাড়ি পড়েছে আল্পনা। খুব সুন্দরী দেখাচ্ছে তাকে। আগত লোকজনদের উল্কি এঁকে দিচ্ছিলো সে । অনেকদিন পরে দেখা আল্পনার সাথে চয়নের। এক ফাঁকে চয়ন আল্পনাকে বললো, ‘একটু সময় হবে? কিছু বলার ছিল!’
আল্পনা সাড়া দিলো। দু’জনে এসে কলেজের পুকুরের সিঁড়িতে বসলো।
আল্পনা প্রথম বলা শুরু করলো, ‘পহেলা বৈশাখের ইতিহাস তুমি জানো তো!’
চয়ন বলে, ‘তা জানি একটু আধটু।’
আল্পনা বলে, ‘বাঙালি ঘরের ছেলে হয়ে বাংলা নববর্ষের ইতিহাস একটু আধটু কেন? সবটাই জানতে হবে।’
একটুক্ষণ নিরব থেকে আবার বললো আল্পনা, ‘বলছি শোন, কৃষকদের নিকট থেকে খাজনা আদায় করতে গিয়ে মোঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তখনকার সময়ে এই কাজটি সম্পাদন করার দায়িত্ব পান সম্রাট আকবরের অন্যতম আমির ফতেহ উল্লাহ সিরাজি। তিনি ছিলেন তৎকালীন সময়ের বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও জ্যোতির্বিদ। ফসল ঘরে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে এই বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয়। যা বর্তমানে বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে।’
চয়ন বলে, ‘জানিতো। এতদিন পর দেখা । কোথায় একটু মন খুলে মনের কথা বলবে তা না, ধান ভানতে গিয়ে শিবের গীত গাইতে শুরু করলে।’
চয়নের কথা আল্পনা হেসে উড়িয়ে দিয়ে বললো, ‘বছরের প্রথম দিনে ভালবাসার কোন কথা নয়। শুধু দেশের কথা, দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্যের কথা বল।’
বিরক্ত হয়ে চয়ন বলে, ‘কিসের মাঝে কি, পান্তা ভাতে ঘি!’
জবাবে আল্পনা বলে, ‘কে বলেছে তুমি জানো না! এই যে, পান্তা ভাতের কথা বললে! জানো, এরও একটা ইতিহাস আছে।’
নিরুপায় হয়ে চয়ন বললো, ‘হুম।’
আল্পনা বললো, ‘পুকুরের সিঁড়িতে এখন আর বসবেনা।’
‘কোথায় যাবে?’ বললো চয়ন।
আল্পনা বলে, ‘তুমি না আমাকে ভালবাসো? যদি বলি, নরকে যাবো, তুমি যেতে পারবেনা?
বোকার মতো চয়ন বললো, ‘তাতো পারতেই হবে। পড়েছি মোঘলের হাতে, খানা খেতে হবে একসাথে।’
‘ইয়ার্কি করছো!’
‘মোটেই না!’
‘আমাকে নিয়ে পুরো শহর ঘুরবে?’
চয়ন মনে মনে তাই চেয়েছিলো।  দু’জনে সুখ দুঃখের কথা শেয়ার করবে; পাশাপাশি হাটবে। অন্যরা দেখে ঈর্ষান্বিত হবে!
আল্পনার কলেজে নববর্ষ উপলক্ষে যে সমস্ত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, দেখালো এবং বললো, ‘যে নিজের দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য জানে না, তার চেয়ে অধম কেউ হতে পারে না।’
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আল্পনা আবার বললো, ‘বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাসে বর্ষবরণ নতুন কিছু নয়। যুগ যুগ ধরে এটি পালিত হয়ে আসছে বরং আগেকার তুলনায় বর্তমানে দিনকে দিন এটির বিস্তৃতি ঘটছে। নববর্ষের প্রথম দিনটি একেক জনের একেক রকম হয়ে থাকে। যেমন ধর, আমার কাছে এক রকম, তোমার কাছে অন্য রকম। তোমার কথাই ধরো না, কোথায় তুমি নতুন বছরকে স্বাগত জানাবে, তা না, আমার কাছে আসছো ভালবাসার গল্প করতে!’
চয়ন বলে, ‘নববর্ষ বলে কি ভালবাসার কথা বলতে নেই?’
আল্পনা বললো, ‘অবশ্যই নেই।’
‘কেন?’ বললো চয়ন।
আল্পনা বলে, ‘আসলে দিন দিন তুমি বোকা হয়ে যাচ্ছ!’
চয়ন বললো, ‘প্রেমে পড়লে মানুষ বোকা হয়ে যায় বৈকি।’
আল্পনা বলে, ‘প্রেমে পড়েছো। কার?’
‘কেন তোমার !’
‘এই তো ভুল করে বসলে। আমার প্রেমের প্রেমে পড়বে কেন তুমি?’
‘ভাললাগে তাই ভালবাসি মনের টানে।’
‘দেখো, ভালবাসার কথা বলার জন্য ভালবাসা দিবস আছে। যা ক’দিন আগে গত হয়েছে। কই সে সময় তো তুমি ভালবাসার কথা বলোনি!’
একটুক্ষণ নিরব থেকে আবারও বলতে লাগলো আল্পনা, ‘শোন, আগে দেশকে ভালবাসো, দেশকে জানো। তাতে সুন্দর মানুষ হওয়া যায়!’
চয়ন বললো, ‘আমি কি খুব খারাপ!’
আল্পনা বলে, ‘তুমি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলো! অবশ্যই দেশের চেয়ে বড় বা ভাল তুমি বা  অন্য কিছু হতে পারেনা।’
 প্রসঙ্গ অন্যদিকে ঘুরিয়ে আল্পনা আবারও বললো, ‘আমাকে নাগরদোলা দেখাবে? প্রতিবছর এই দিনে সবাই ষোল আনা বাঙালি হয়ে যায়! তার কারণ কি বলতে পারো?’
চয়ন বলে, ‘কি?’
উত্তরে আল্পনা বললো, ‘এক সময় কৃষকেরা মাঠ থেকে পাকা ধান কেটে বাড়ি নিয়ে এলে শুরু হতো উৎসব। যাকে বলা হতো নবান্ন উৎসব। বাড়ির বউ-ঝিরা মিলে ধানগুলোকে ঝাড়তেন, সিদ্ধ দিতেন, তারপর গোলায় তুলতেন। এক মাস আগ থেকেই এর আগমন টের পাওয়া যেত। গায়ের বউ দিদিরা নতুন ধানের ভাত, পিঠা, পায়েস রান্না করতেন। তাদের চোখে মুখে দেখা যেতো তৃপ্তির হাসি। হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন পূজা-পার্বণ একে আরো দ্বিগুণ করে তুলতো।’
আল্পনা কলেজ থেকে চয়নকে নিয়ে বের হয়ে গেলো নাগরদোলায় চড়বে বলে। দুজন রিক্সায় পাশাপাশি বসেছিলো। রিক্সা চালককে বললো, ‘মেলা’র মাঠে নিয়ে যেতে। সেখানে নাগরদোলাসহ হারিয়ে যেতে বসা অনেক কিছুরই আয়োজন করা হয়েছে!
 রিক্সা এগিয়ে চলছে মেলার মাঠের দিকে, আল্পনা কথা থামালোনা। বলতে থাকলো, ‘বৈশাখের প্রথম দিন শুরু হতো দোল পূজা। পহেলা বৈশাখ আসার দু-একদিন আগে থেকেই ঢাকের বাজনায় মুখরিত হতো গ্রামগুলো। নববর্ষের দিন দোল পূজা হওয়ায় ছেলে-বউরা ভোর সকালে পুকুরে স্নান করতে যেতেন। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা এই দিনটিকে পবিত্র দিন মনে করতেন। এখনো অনেকে করেন। স্নান শেষে একে অন্যের বাড়িতে বেড়াতে যেতেন। মেলা বসত গ্রামগুলোতে। মেলার জন্য অপেক্ষা করতেন সবাই। মেলায় নানান জাতের খেলনা, গহনা, শাড়ি, বাসন-কোসন, এমনকি আসবাবপত্রও পাওয়া যেতো। নাগরদোলা পালা, যাত্রাগানও হতো। দেশের বিভিন্নস্থান থেকে নানারকম জিনিস নিয়ে মেলাতে হাজির হতো দোকানিরা। সাজাতো নানা রকম পসরা। বছরে একবার মেলা হতো বলে গ্রামের বউ-ঝিরা মাটির ব্যাংক অথবা ঘরে খুঁটি দেয়া বাঁশের মধ্যে ছোট গর্ত করে টাকা পয়সা জমাতেন। যাতে মেলা থেকে তারা শাড়ি, গহনাসহ বিভিন্ন পণ্য কিনতে পারেন।
পহেলা বৈশাখ নববর্ষ মানেই বাধ ভাঙ্গা উল্লাস আর নতুন কাপড় পড়ার ধুম। হালখাতার সাদা-লাল রং এখন নাকি বৈশাখের রং হয়ে গেছে । সাদা-লালের সঙ্গে নারী পুরুষ সকলে নাকি মিশে যায়। নারীরা পরে সাদা-লাল তাঁতপাড়ের শাড়ি। ছেলেরা পরে পাঞ্জাবি।’
এদিক দিয়ে আল্পনার দৃষ্টিতে চয়নই নাকি ব্যতিক্রম! নববর্ষের দিনেও শার্ট, প্যান্ট পড়ে আল্পনার কাছে এসেছে! অথচ এই দিনে শার্ট-প্যান্ট, সু্ট বুট ছেড়ে, শাড়ি, ব্লাউজ আর পায়জামা পাঞ্জাবিতে একদিনের জন্য হলেও যেখানে লোকজন হয়ে উঠে বাঙালি। সেখানে কেবল, চয়মই নাকি অবাঙালি রয়ে গেলো!’
নববর্ষের দিনে মেয়েরা মাথার খোলা বেণীতে ফুল দেয়। আল্পনার দিকে চয়নকে তাকাতে বললো। আল্পনা চুলের খোপায় ফুল দিয়েছে! গ্যাঁদা ফুল। এতে করে সে নাকি ষোলআনা বাঙালি মেয়ে হয়ে গেছ !
চয়ন বললো, ‘তাতো একদিনের জন্য। একদিনের বাঙালি হয়ে লাভ কি?’
আল্পনা বলে, ‘আবারও লাভের কথা!’
 প্রসঙ্গ অন্য দিকে নিতে চাইছিলো চয়ন কিন্তু কোনভাবেই আল্পনা শুনছিলোনা। বাধ্য হয়ে আল্পনার কাছে হার মানতে হলো চয়নকে। ইতোমধ্যে রিক্সাটি মেলার মাঠে এসে গেছে।
 রিক্সা চালককে ভাড়া মিটিয়ে মেলার মাঠে প্রবেশ করলো ওরা। মেলা প্রাঙ্গণে হাটতে হাটতে আল্পনা বলতে থাকে, ‘শুধু সাজগোজই নয়, তার পাশাপাশি দেশীয় বাংলা খাবারের আয়োজন করা হয় বর্তমান সময়ে। একদিনের জন্য হলেও মানুষ ফিরে যায় পুরনো পান্তা ইলিশের কাছে। পান্তা আর ইলিশ না হলে যেন নববর্ষ জমেই ওঠেনা।’
‘তুমি পান্তা- ইলিশ খেয়েছো?’ প্রশ্ন করে আল্পনা।
‘আমি এসব খাইনা!’ উত্তরে বলে চয়ন।
চয়নকে পান্তা আর ইলিশ খাওয়াবে বলে জোর করে একটা স্টলে নিয়ে গেলো আল্পনা।
চয়ন বলে, ‘এই ভর দুপুরে পান্তা ইলিশ! তুমি খাও! আমি খাবোনা। ‘
আল্পনা বায়না ধরে বলে, ‘তুমি  না খেলে আমিও খাবেনা!’
আল্পনাকে চয়ন ভালবাসতে পারে অথচ পান্তা খেতে পারেনা!  এটা কেমন কথা!
আল্পনা জেদ ধরলে মন রাখতে পান্তা আর ইলিশ খেতে হলো চয়নকে। পান্তা ইলিশ খেতে খেতে আল্পনা বললো, ‘পহেলা বৈশাখ তারুণ্যের এক মহামিলন। পাশাপাশি হাঁটা আর এসো হে বৈশাখ এসো এসো, বলে বৈশাখকে আমন্ত্রণ জানানো ; সব মিলিয়ে এক অপরূপ দৃশ্যের সূচনা হয়।’
 পান্তা ইলিশ খাওয়ার পর্ব শেষে করে পাশাপাশি দু’জনে হাঁটছিলো। চয়নকে আল্পনা তার গাল দেখিয়ে বললো, সবার মতো সেও নববর্ষের উল্কি এঁকেছে । এই উল্কি ছাড়া নাকি তারুণ্যের উচ্ছলতা প্রকাশই পায়না। ভালবাসার কথা না বলে, ইতিহাস ঐতিহ্যের কথা বলায় চয়ন বললো, ‘নাগরদোলায় চড়ানোর কথা বলে, পান্তা-ইলিশ খাওয়ালে!’
নাগরদোলার দিকে চয়নকে নিয়ে গেলো আল্পনা। মনে হল, ভয়ে কাঁপছে যেনো চয়ন! আগে কোন দিন চড়িনি বলেই হয়তো ভয় পাচ্ছে!
চয়ন বললো, ‘আমার ভয় করছে!’
আল্পনা বলে, ‘ভীতুর ডিম, ভয় কিসের?’
‘যদি পড়ে যাই!’
‘পড়বেনা। তোমাকে আঁকড়ে ধরে থাকবো আমি।’ বললো আল্পনা।
দু’জনে নাগরদোলায় উঠেছে। একটু একটু ভয় করছিলো চয়নের। এমনিতে ভরদুপুরে পান্ত-ইলিশ খেয়ে পেটটা কেমন করছিলো তারওপর আকাশে উল্টো ঘোরাঘুরি!’
চয়ন বললো, ‘আমার মাথা ঘুরাচ্ছে!’
চয়নকে জড়িয়ে ধরেছে আল্পনা। আল্পনার স্পর্শ চয়নের খুব ভাল লাগছে। বমি আর মাথাধরার ভাব মুহূর্তের জন্য কোথায় যেন উধাও হয়ে গিয়েছে!
চয়নকে আল্পনা ভালবাসে বলেই জড়িয়ে ধরেছে, নাকি ভিতু বলে। তা নিয়ে অবশ্য এখনও সংশয় রয়েছে।
আল্পনা বললো, ‘নববর্ষে মানুষের ঢল নামবে এটাই স্বাভাবিক। নামার পর হয়তো দেখবো, অন্য দৃশ্য।’
চয়ন বললো, ‘কি রকম?’
আল্পনা বলে, ‘নববর্ষ সবার জন্য আনন্দের উপলক্ষ হয়ে আসে। এ থেকে এক শ্রেণীর টিনেজরাও বাদ যায়না। দেখবে, তাদের যারা এখানে এসেছে, তাদের বেশির ভাগই ইতিহাস ঐতিহ্য জানার জন্য আসেনি।’
চয়ন বলে, ‘কি জন্য আসে?’
আল্পনা বললো, ‘তারা মেয়েদের ধাক্কা দিবে! টিজ করবে! খারাপ আচরণ করবে বলে এসেছে।
বছরের প্রথম দিনেই ওসব উটকো শয়তানদের উৎপাত সইতে হবে অসহায় মেয়েদেরকে! এসব উৎপাত রোধে আইন, প্রশাসনকে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া অতীত দরকার। কিন্তু আমাদের অভাগা এই দেশে তা হয়তো কখনই সম্ভব হয়ে ওঠবেনা!’
 নাগরদোলা থেকে ওরা দু’জন নেমে গেলো। চয়নকে আল্পনা নিয়ে গেলে ছোটদের খেলনার দোকানে।
চয়ন বললো, ‘পুতুল কিনবে নাকি?’
হাসতে হাসতে আল্পনা বললো, ‘সত্যি তুমি বোকা ! পুতুল খেলার বয়স কি এখনও আমার আছে নাকি!’
‘তা নেই। তাহলে এখানে আসলে কেন?’ বললো চয়ন।
‘তোমাকে দেখাতে।’ আল্পনা উত্তর দেয়।
‘সত্যি কথা বলতে কি জানো?’ বলে আল্পনা।
‘কি?’
‘আমরা এখনও পারিনি সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ও বাংলা সনের প্রবর্তন করতে। আর একটা আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, এক বাঙালি জাতির দুই ধরণের ক্যালেন্ডার! ইংরেজি বা আরবি হিজরি সনের বা কোথাও কি দুই ধরণের ক্যালেন্ডার দেখেছো! ভারতীয় বাঙালিরা আসল ঐতিহ্যে সেই ঐতিহাসিক ক্যালেন্ডারকেই ধরে রেখেছে। অথচ, আমাদের দেশে সৈরশাসক এরশাদ বাঙলা ক্যালেন্ডারকে আমুল পরিবর্তন করে বাঙালির ঐতিহ্যকেই সাংঘর্ষিক করে ছেড়েছে! আর পরবর্তী যে সকল শাসক এসেছে ঐ বিগড়ে যাওয়া ক্যালেন্ডার সংশোধনে কোনও পদক্ষেপ নেননি! এক জাতির দুই ধরণের ক্যালেন্ডার এটা যথেষ্ট বিব্রতকর। এটা সংশোধন  হওয়া অত্যাবশ্যক। অর্থাৎ বাঙালির ক্যালেন্ডার হবে এক ও অভিন্ন। আর রাষ্ট্রীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি অনুষ্ঠানে আমরা বাংলা সনের ব্যবহার নিশ্চিত করতে চাই।’
দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়ে গেছে। আল্পনা এবার যেতে চাইলো।
চয়ন বললো, ‘আমাকে আর কিছু দেখাবে?’
আল্পনা বললো, ‘নববর্ষ উপলক্ষে যা কিছুর আয়োজন করা হয়েছে তার সবই দেখা হয়ে গেছে! তবে যাত্রা ও পালাগান ছাড়া! তা হয়তো আগামীতে দেখা হতে পারে।’
কিছুক্ষণ নিরব থেকে আল্পনা বলতে লাগলো, ‘প্রত্যেকের উচিত তার দেশকে জানা, দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্যকে জানা। বিশেষ করে একদিনের জন্য হলেও প্রত্যেককে নিজের নিজের শেকড়ে ফিরে যাওয়া উচিত।’
আল্পনা এবার চলে যেতে চাইলো।
চয়ন বললো, ‘ভালবাসার কিছু কথা বলে যাও।’
আল্পনা বলে, ‘তুমি দেশপ্রেমিক নও। দেশের প্রতি মায়া, মমতা, প্রেম সবকিছু হারিয়ে গেছে তোমার! যেদিন দেশপ্রেমিক হতে পারবে সেদিন আবার তুমি আসবে। সেদিন তোমাকে ফিরিয়ে দেবোনা।’
চয়ন আল্পনার একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় টেনে নিয়ে বললো, ‘এতোক্ষণ শুনেই গেলাম কেবল। এবার তুমি একটু আমার কথা শোনো। পকেট থেকে সেলফোনটা বের করে গ্যালারী থেকে কিছু ছবি বের করে আল্পনার হাতে দিয়ে বললো, দেখোতো এই ছবিগুলো। এসব ছবি সামাজিক  যোগাযোগ কোনও মাধ্যমে পোষ্ট  করার উদ্দেশ্যে তোলা হয়নি। দেশে যখন দুর্যোগ, প্রাকৃতিক বিপর্যয় চলছিলো তখন আমি ও কয়েকজন বন্ধু মিলে ফান্ড গড়ে তুলেছিলাম। এখানে সেখানে ঘুরে ঘুরে অর্থ সংগ্রহ করে সেই অর্থ দিয়ে চাল ডাল আটা আলু তেল কিনে গোপনে গরীব দুস্থ মানুষদের মাঝে বিলিয়ে দিয়েছিলাম। অনেক ছবি আছে সেগুলোর সাথে আমার কথাগুলো মিলিয়ে দেখো। কোনও দুস্থ লোকের ছবি তোলা হয়নি। কারণ তাদের অসম্মান বা হেয় করার মানসিকতা আমার নেই। শুধু মাত্র আমরা যে শ্রম করেছি তারই কিছু ছবি ও ভিডিও করা হয়েছে। এসবও কিন্তু কোথাও পোষ্ট করা হয়নি। নিজেকে মহান সাজার ইচ্ছে কোনও কালেই আমার হয়নি। কিছু ছবি তোলা হয়েছে নিজের মনকে শান্তনা দেয়ার জন্যে যে, আমিও দেশের জন্যে দেশের মানুষের জন্যে ভাল কিছু করতে পারি। আরও কয়েকটি ছবি রয়েছে দেখো। এক মুখোশধারী ভন্ড নেতা গরীবের জন্যে বরাদ্দকৃত ত্রাণের চাল মেরে নিয়ে পিক-আপভ্যানে লোড করে পাচার করার সময় আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে তাকে হাতেনাতে ধরে ফেলি এবং পুলিশে সোপর্দ করি। পরে সেই ত্রাণ দুস্থদের মাঝে বিতরণ করা হয়।’ কথা বলতে বলতে এবার একটু থামলো চয়ন। তারপর আবার বলে, ‘এসব জানার পরেও কি তুমি বলবে,আমার ভেতরে সামান্যতমও দেশপ্রেমবোধ নেই?’
আল্পনা মুগ্ধ নয়নে ফোনের ছবিগুলো দেখছিলো আর চয়নের কথাগুলো শুনছিলো। এবার চয়নের হাতটা শক্ত করে ধরে বললো, ‘তোমার আল্পনাকে তুমি কখনও ছেড়োনা।’
চয়ন বলে, ‘ছেড়ে দেবার জন্যে ধরিনি হাত। দেশপ্রেমিক এই মেয়েটাকে সাথে নিয়েইতো পাড়ি দিতে চাই জীবনে চলার পথ।’
Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধএসো বৈশাখ -কবি রাজিব এক্কা রাজ‘এর কবিতা
পরবর্তী নিবন্ধমানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন বড়াইগ্রামের শেফালী

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে