লকডাউন – ছিন্ন ভাবনা ২ ও ৩-ফাল্গুণী মুখোপাধ্যায়

0
401
Falguni

লকডাউন – ছিন্ন ভাবনা ২- ফাল্গুণী মুখোপাধ্যায়

শৈশবে আলিপুর পশুশালায় ঢুকতেই দেখা যেত ঝিলের ধারে হাজার হাজার রঙ বেরঙের পাখির ঝাঁক । পরে জেনেছিলাম এদের বলে পরিযায়ী পাখি, সুদূর সাইবেরিয়া থেকে প্রতিবছর শীতে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে । পরে তাদের আসা বন্ধ হল বহুতল, হোটেল নির্মাণ আর শহরের কোলাহলে অতিষ্ঠ হয়ে । এখনও নাকি সাঁতরাগাছির ঝিলে বা কোনকোন যায়গায় পরিযায়ী পাখির দল আসে । এখন, ইদানিং আমরা অন্য একরকম পরিযায়ী প্রাণীর কথা শুনছি, অন্তত আগে তাদের কথা তেমনভাবে আলোচনায় আসেনি, এলেও আমাদের মধ্যবিত্ত মনে কোন আগ্রহের যায়গা তৈরি হয়নি । তারা পরিযায়ী শ্রমিক । পেটের টানে, রুজির তাগিদে দূর দূরান্তে, এক রাজ্য থেকে আর এক রাজ্যে পাড়ি দেয় । আমরা জানতামই না, জানার চেষ্টাই বা কজন করি ? একটা একটা করে ইট গেঁথে যে লোকগুলো সুবৃহৎ অট্টালিকা নির্মাণ করছে। বাঁশের মই বেয়ে যারা সেই বহুতলের সুদৃশ্য রঙ করছে, পলেস্তারা করছে, অলঙ্কারের ব্যবসাতে লক্ষ লক্ষ টাকার সোনার অলঙ্কারের পালিশ করছে, বহুজাতিক খাবারের বিপণি থেকে আমাকে যে সময়মত খাবারের যোগান দিচ্ছে তারা কারা ? কোথায় তাদের সাকিন ? লকডাউনের পরে দেশের মানুষ সচকিত হল এই সংবাদে, দেশের রাজধানী দিল্লি থেকে হাজার হাজার মানুষ – নারী,পুরুষ হাঁটছেন , শিশুপুত্রকে কাঁধে চাপিয়ে হাঁটছেন । রুজি বন্ধ, অনিশ্চিত জীবন, তারা বাড়ি ফিরতে চাইছে । তাই পাঁচশো বা তার বেশি কত মাইল দূরে তাদের ঘর সে হিসাব তাদের জানা নেই, তারা হেঁটেই ঘরে ফিরবে । ক্ষুধায়, তেষ্টায় অশক্ত শরীরে অনেকে পথেই মারা গেলেন । যেমন দিল্লির এক হোটেলের ডেলিভারি বয় রনধীর । এই হাটা, জীবনের জন্য, নিজ পরিবার ও প্রতিবেশীদের পাশে থাকার, পাশে পাওয়ার জন্য হাঁটা – এও তো লড়াই ! যে যুবকটি তিনশো কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে, যে শ্রমিকটি দিল্লি থেকে হাটা লাগিয়ে মধ্যপ্রদেশে তার গ্রামে ফিরতে পারলো, তাদের লড়াইকে কুর্নিশ জানাবো না ? এই লড়াইএর জোরেই তো প্রশাসনের কিছুটা টনক নড়েছে, অনেক স্বেচ্ছাসেবি সংগঠন, অনেক ব্যক্তি মানুষও এগিয়ে আসছে । দেশের মানুষকে নাড়া দেওয়া এই লড়াইয়ের জোরেই বিশ্বব্যাঙ্ক দেশের প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে, সতর্ক করেছে ।

এটা অন্ধকারের একটা দিক । আর একদিকে রয়েছে স্থায়ী ঠিকানাহীন ছোট বিক্রেতারা, যারা ফুটপাথে জামা-কাপড়, রোজকারের প্রয়োজনীয় জিনিস কিংবা খেলনার পসরা সাজিয়ে কিছু উপার্জন করেন । যারা মেলা, সমাবেশে বেলুন, টুকটাক জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসেন, যারা ট্রেনে হকারি করেন তারাই এই লকডাউনের করুণতম শিকার । বড় দোকানদার, ব্যবসায়ীরা এই চোট সামলে নেবেন স্বাভাবিক অবস্থা ফিরলে । কিন্তু ফুটপাথের দোকানদার, হকারদের কোমর যেভাবে ভেঙে দিল এই লকডাউন, স্বাভাবিক অবস্থা ফিরলে তারা সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবেন কি না কে জানে ! তাদের ভেঙে যাওয়া কোমর সোজা করার লড়াইতে আমরা কি কিছুই সহায়তা করতে পারি না । পারি তো আমাদের নিজের মত করে । আচ্ছা আমরা তো এটা পারি যে আগামী এক দেড় বছর নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক জিনিস যা পাড়ার ছোট দোকানে পাওয়া যায়, সেগুলি বড় বড় কর্পোরেট বিপণন কেন্দ্র থেকে না কিনে তাদের থেকে নিতে পারি, আমাদের প্যান্ট-জামা শাড়ি পাড়ার ছোট দোকান থেকে, শিয়ালদহ, হাতিবাগানের ফুটপাথ থেকে কিনতে পারি বড় কর্পোরেট বিপণিতে না গিয়ে । আমাজন, ফ্লিপকার্ট, গফার্স, স্পেন্সার্সের স্মরণ নেওয়া না হয় বন্ধ থাক কিছুদিন ।

লকডাউন – ছিন্ন ভাবনা ৩-ফাল্গুণী মুখোপাধ্যায়

“একে একে ওরা নিয়ে যাচ্ছে শৈশবের হাত পা চোখ মুখ বুলি
এই মুহুর্তে পুড়ে যাচ্ছে পায়ের পাতাজোড়া প্রণাম
…… ঠিক চার পূর্ণিমা আগে পুড়ে গেছে অন্যতম ভরসার আঁচল
খামছে ছিঁড়েছে কেউ কয়েক পাতা বয়ঃসন্ধির রহস্যোপন্যাস
এখন হা হা দরোজা অপেক্ষায় গোনে পরবর্তী রাহাজানি, ভবিতব্য”

স্নেহসষ্পদ কবি শর্মিষ্ঠা ঘোষের ছয়বছর আগে লেখা একটি কবিতার কয়েকটি পংক্তি এই লকডাউনক্লান্ত সময়ে খুব প্রাসঙ্গিক মনে হল । সত্যিই তো গত একমাসে আমাদের কত কীই যে রাহাজানি হয়ে গেল । এখন অপেক্ষায় গুনছি পরবর্তী রাহাজানিকাল !

তালাবন্দীর অবসান আজ নয় তো কাল, কিংবা আরো পরে হবে । কিন্তু জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে পাবো কি ? আমাদের সামাজিক সম্পর্কগুলি, পারষ্পরিক সৌহার্দ ও ভালোবাসার সম্পর্কগুলি আগের মতই সন্দেহমুক্ত, অটুট থাকবে কি ? সংশয় হয় । তালাবন্দীর অবসান হলেও আমাদের চারপাসটা, আমাদের চেনা সামাজিক বন্দোবস্তগুলি যে আগের মত থাকবেনা তার সংকেত এখন থেকেই পেতে শুরু করেছি । ভাইরাস ধনি-দরিদ্র, জাত-ধর্ম মানে না । সে যেন এক সাম্যের বন্ধনে তামাম ভারতবাসীকে বেঁধে দিয়েছে আপাত দৃষ্টিতে আমরা এমনই ভাবছি, তাতে সত্যতাও আছে । আবার এর বিপ্রতীপে এটাও সত্য – এই মারণ ভাইরাস বা তার সংক্রমণ মানুষে মানুষে কিংবা সমাজের অসাম্যের অস্তিত্বকে আরো চওড়া, আরো ব্যাপক করেছে । বিশেষ বিমান পাঠিয়ে বিদেশ ঢুঁরে অভিবাসীদের ফিরিয়ে আনা হল, আর এত বড় ভারতের নানান রাজ্যে লকডাউনজনিত কর্মহীন, খাদ্যহীন অসহায় শ্রমিকদের ঘরে ফিরে যাবার কোন বন্দোবস্ত করতে পারলো না রাষ্ট্র । বিলম্ব হলেও প্রশাসন, অনেক স্বেচ্ছাসেবি সংগঠন, ব্যক্তিমানুষ তাদের প্রাণ ধারণের জন্য কিছু খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন ঠিকই, কিন্তু লকডাউন উঠে গেলে কপর্দকহীন এই সব পরিযায়ী শ্রমিকরা আবার কাজ ফিরে পাবেন ? নাকি তাদের পৃথিবীটা বদলে যাবে । শুধু তারাই বা কেন ? আমরা যারা মাস মাইনার সুখী সুখী মানুষ তারাও হাজারে হাজারে কর্মহীন হবে । ইতি মধ্যেই কর্পোরেট হাউসগুলো গাওনা শুরু করেছে তাদের কাজের ধরন পালটাবে, কর্মীসংখ্যা কমবে । অনিশ্চিত ভবিষ্যতের একটা ভয়ঙ্কর ছবি আমরা যেন এখনই দেখতে পাচ্ছি ।

মারণ ভাইরাস সংক্রমণের শৃংখল ভাঙতে সামাজিক দূরত্বের নিদান আমাদের মেনে নিতে হয়েছে । দৈহিক দূরত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের যুক্তি আছে কিন্তু মিডিয়া আর রাজিনীতিকদের তারস্বর চিৎকার এটাকেই বানিয়ে দিল সামাজিক দূরত্ব (সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং) । ফলে অনিবার্য দেখা দিল পারষ্পরিক সন্দেহ আর অবিশ্বাস । করোনা চিকিৎসক কিংবা স্বাস্থকর্মী তার বাসা থেকে উচ্ছেদ হচ্ছেন, করোনা আক্রান্ত নয় এমন রোগীকেও অচ্ছুৎ মনে করছি, করোনা আক্রান্ত এমন পাড়ায় বসবাসের অপরাধে সরকারি হাসপাতাল ফিরিয়ে দিচ্ছে প্রসুতিকে, ফিরে এসে শৌচালয়ে প্রসব করছেন মৃত শিশূ । সুস্থ আপন প্রিয়জনের নিশ্বাসেও বিষের ভয় করছি ।

করোনার মারণ সংক্রমণ শেষ হবে নিশ্চিত, মিডিয়ার সন্ত্রাসও স্তিমিত হয়ে যাবে, তারা নতুন কোন বিষয় খুঁজে নেবে । কিন্তু আমরা নিশ্চিত নয় আমাদের চারপাসটা, আমাদের সমাজটা সুস্থ্য থাকবে কি না, পারষ্পরিক সন্দেহমুক্ত স্বাভাবিক সম্পর্কগুলো ফিরে আসবে কি না । হয়তো সমাজের ভারসাম্যটাই হয়ে যাবে ।

আবার কবে শিশিরমঞ্চ, আকাডেমিতে থিয়েটার দেখতে যাবো, নন্দন আকাডেমি চত্বরে সাংস্কৃতিক আড্ডায় মাতবো ? আবার কবে বাংলা একাডেমিতে কবিতা পাঠের আসর বসবে ? উত্তর অনিশ্চিত সময়ের গর্ভে । সুস্থ্য জীবনবোধ, বিশ্বাস ও সৌহার্দের যেটুকু অবশেষ তাও বোধয় রাহাজানি করে নেবে এই সন্ত্রস্ত ঘরবন্দী সময় ।

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধকবিতার ছন্দ আলোচনা-  রুদ্র অয়ন 
পরবর্তী নিবন্ধনাটোরের সিংড়ায় ত্রাণ বিতরণ করলেন ভোলা চেয়ারম্যান

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে