“সেই আগুনের নাম নেতাজী”-অনুপম সৌরিশ সরকারের কবিতা

0
338
অনুপম এনকে

সেই আগুনের নাম নেতাজী
=অনুপম সৌরিশ সরকার

তারপর পরাধীন ভারতবর্ষের সেই নিদারুণ অন্ধকারে,
তারপর সেই বীভৎস নারকীয়তার রক্তলোলুপ সাম্রাজ্যে,
তারপর সেই নৃশংস বিভীষিকার চক্রবূহ্যে,
জন্ম নিল এক সুপবিত্র
তেজোদীপ্ত ক্রোধোক্ষিপ্ত দেশপ্রেমতৃপ্ত আগুন ।
সেই আগুনের নাম সুভাষ—নেতাজী সুভাষ বোস ।
সেই অগ্নি জাগরণে কেঁপে উঠেছিল অন্ধকারের রাজরাজত্ব,
চমকে উঠেছিল উদ্ধত বুটের আস্ফালন, অস্ত্রের হুংকার শাসন,
শিহরিত হয়েছিল আসমুদ্র হিমাচল,
কাশ্মীরি জাফরান থেকে ভাগীরথীর তরঙ্গ দেখেছিল সুদিনের স্বপ্ন ।

সেই আগুন অসহায় দেশটার কোনায় কোনায় আলো জ্বেলে দিয়েছিল,
সেই আগুন সংগ্রাম এঁকে দিয়েছিল বিপ্লবীর পঞ্জরে অস্থিতে রক্তে,
সেই আগুন শাসকের দম্ভে ছিটকে পড়েছিল প্রবল আক্রোশে,
সেই আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল শোষকের আরামদায়ক নিদ্রাবিলাস,
পুড়িয়ে দিয়েছিল বিদেশী বেনিয়ার লোভের অজস্র প্রাসাদ ।

সেই আগুনকে দমিয়ে রাখার জন্য
রচিত হয়েছিল কত না কৌশল,
কত না নির্যাতন,কত না চক্রান্ত,
কত না বার হাজতবাসের ফরমান ।
তবু তা অদম্য,অপ্রতিরোধ্য ।

সেই আগুনের অক্ষর জানিয়ে দিয়েছিল,
দেশকে কত গভীরভাবে ভালবাসা যায়,
সেই আগুনের অক্ষর জানিয়ে দিয়েছিল,
দেশের জন্য কিভাবে আত্মমগ্ন সর্বসুখ বিসর্জন দেওয়া যায়,
সেই আগুনের অক্ষর জানিয়ে দিয়েছিল,
দেশের জন্য সব বিপদকে বিদ্রূপ করা যায়,তুচ্ছ করা যায়,
সেই আগুনের অক্ষর জানিয়ে দিয়েছিল,
দেশ মানে মানুষ, দেশ মানে স্বাধীনতা,
দেশ মানে ধর্ম জাত পাতের অনেক উর্দ্ধে থাকা
এক সুবিস্তৃত মহিমান্বিত গৌরবের অনুভব ।

সেই আগুন রচনা করেছিল
সংগ্রামের অমোঘ আহ্বান,
“ভারত ডাকছে ।রক্ত ডাক দিয়েছে রক্তকে ।
উঠে দাঁড়াও,আমাদের নষ্ট করার মতো সময় নেই ।”
সেই আগুন উচ্চারণ করেছিল অভিযানের মন্ত্র,
“চলো দিল্লী”,
সেই আগুন অঙ্গীকার করেছিল,
“তোমরা আমায় রক্ত দাও,আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব ।”

সেই আগুনের শপথ সত্যি করে একদিন এসেছিল স্বাধীনতা,
আলো জ্বলেছিল,ফুল ফুটেছিল,গান জেগেছিল,প্রাণ নেচেছিল,
উদ্ভাসিত হয়েছিল আকাশ দিগন্ত চরাচর,
শোনা গিয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ ।

কিন্তু চক্রান্ত থেমে রইল না ।
অতএব অচিরেই নিভে গেল আলো
দেশজুড়ে আবার প্রকট হলো ভয়ংকর অন্ধকারের তাণ্ডব ।
ভোটের রাজনীতি
দেশপ্রেমকে বানালো প্রহসন আর নিদারুণ জালিয়াতি,
দেশদ্রোহী ভণ্ডের দল
দেশপ্রেমকে পরে নিল রঙচঙে মুখোশের মতো ।

সেই ভ্রষ্টাচারের পথ ধরেই দেশের আনাচে কানাচে
আজ যখন গাঢ় হচ্ছে চক্রান্তের অন্ধকার,
আজ যখন স্বাধীন দেশের মুষ্টিমেয় মানুষ
বাস করে গগনচুম্বী প্রাসাদে,
তাদের জীবন ভরে যায় ফুলে ফলে সম্পদে ঐশ্বর্যে ।
আর কোটি কোটি মানুষ পড়ে থাকে পশুর মত রাস্তায়,
দারিদ্র তাদের জঠরে জ্বালা হয়ে জেগে থাকে প্রতিক্ষণ ,
তখন যে আগুনের সামনে আজো থমকে দাঁড়ায় সব নোংরামি,
তখন যে আগুন আজো আলোর অভ্রান্ত নিশানা,
তখন যে আগুনকে কখনো নিঃশেষ করা যায় না,
দমন করা যায় না,ধ্বংস করা যায় না,
তখন যে আগুনের ছবি বুকে ধারণ করে
সেই আগুনের সামনে বসে থাকে কোটি কোটি মানুষ
আর সব অন্ধকার পেরিয়ে যাবার স্বপ্নে বিভোর হয়ে
২৩ শে জানুয়ারীর প্রভাতে উচ্চারণ করে
“জয় হিন্দ”—-
সেই আগুনের নাম সকাল,
সেই আগুনের নাম সংগ্রাম,
সেই আগুনের নাম দেশপ্রেম
সেই আগুনের নাম নেতাজী ।
সেই আগুনকে আমি বক্ষে ধরি,
সেই আগুনকে আমি চক্ষে পরি,
সেই আগুন দিয়ে আমি নিজেকে গড়ি,
সেই পরম শুদ্ধ আগুনকে আমি প্রণাম করি ।
=====

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধ“ফিরে আসে যুদ্ধপুরাণ”-সালেহীন বিপ্লবের কবিতা
পরবর্তী নিবন্ধ“হাওয়াদের মর্মকথা”- কামাল খাঁ’র কবিতা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে