ড্রিমস -স্বপ্না ইসলাম ছোঁয়া

0
13
আরিফ নজরুল

স্বপ্না ইসলাম ছোঁয়া : – হ্যালো ভিউয়ার্স! আমি তুরিন। আবারও লাইভে এসেছি ড্রিমস এর দুর্দান্ত সব কালেকশন নিয়ে।এখানের সব গুলা আইটেমই খুব মানসম্মত এবং চিপ রেইটে তোমরা পাবে। একে একে সব আইটেম দেখাচ্ছি, যাঁর যেটা ভালো লাগবে, অর্ডার করতে প্লিজ, ঝটপট স্ক্রিনশট নিয়ে আমাকে ইনবক্স করো। লাইভ শেষ করেই আমি ইনবক্সের রিপ্লাই দেবো।

একঘণ্টার লাইভ শেষ করে অফলাইনে চলে এলো তুরিন।লাইভে থাকা অবস্থায় ক্রেতার চাইতে আজাইরা কিছু ছেলেপুলে এতো ডিস্টার্ব করে,এতো নোংরা কথাবার্তা লিখে কমেন্টে এসে,মাথাটা পুরো হ্যাং হয়ে যায়।এঁদের আবার কিছু বলাও যায় না, রীতিমতো ক্ষেপে গিয়ে নোংরা নোংরা মেসেজ পাঠায়।

প্রথম প্রথম খুব ক্ষেপে যেতো তুরিন, পরে রিয়্যালাইজ করেছে, সব জায়গায় যেমন ভালো মনের মানুষ আছে, তেমনই নোংরা মনের মানুষও আছে।এঁদেরকে রেসপন্স না করলেই আস্তে আস্তে এঁরা থেমে যাবে। এসব এভয়েড করেই সে সাফল্যের চূড়ায় উঠতে শুরু করেছে।

দেখতে দেখতে প্রায় চার বছর হয়ে গেল অনলাইনের শপ ড্রিমস- এর। বেশ প্রসার পেয়েছে বিজনেসটা। এককাপ ব্ল্যাক কফি বানিয়ে ভাবনার চোরাবালিতে ডুবতে লাগলো। আজ থেকে ঠিক চার বছর আগেও তুরিন বেকার বসেছিল, ইকনোমিকস এ মাস্টার্স করা তুরিন।

বিয়ে হয়েছিল ঢাকার একটা স্কুলের ইংরেজি শিক্ষকের সাথে। সংসারের বড় ছেলে, দায়িত্বটাও আকাশ সমান ছিল।ছোট দুই ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ থেকে সমস্ত কিছুই নিহালকে সামলাতে হোতো। নিজের সংসারই ঠিকমতো চলতো না, তার ওপর দুইভাই। বাবা,মা কেউ বেঁচে নেই।

তুরিন মফঃস্বল শহরে থাকতো, ভালোবাসতো পাশের বাসারই একজন ছেলে’কে, তাঁর নাম ছিল শায়ন। বংশমর্যাদা, ভালো চাকরি, আর্থিক অবস্থা সবই ভালো ছিল, কিন্তু তুরিনদের রক্ষণশীল পরিবারের কেউ কোনওদিন প্রেম করে বিয়ে করেনি বলেই এই সম্পর্কটাও কেউই মেনে নেয়নি।

বাধ্য হয়ে বাবা,মায়ের পছন্দের ছেলেকেই বিয়ে করেছিল। বিয়ের পর বিলাসিতা কী জিনিস তুরিন দেখেনি। অভাব, অনটনের সংসার। নিজেও চাকরীর জন্য বহু দ্বারেদ্বারে ঘুরেছে, কাজ হয়নি। পরিশেষে তুরিনের বড় ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় এই বিজনেস শুরু করে।

মনে পড়ছে সেদিনের কথা, হুট করেই বড় ভাই চিটাগাং থেকে রাতে তুরিনের বাসায় আসে। চাকরি সূত্রে চিটাগাং থাকে। বোনকে একনজর দেখেই সকালে চলে যাবে। বাসায় প্রায় সময়ই বাজার থাকতো না, তুরিন অনেক কৌশলে সংসারটা’কে সামলাতো।

বাবা, মায়ের কাছেও কোনওদিন অভিযোগ করেনি। হয়তো অভিমান থেকেই এই আড়ালে থাকা। কী লাভ অভিযোগ করে? বাবা, মায়ের সব সিদ্ধান্ত যে সন্তানের জন্য মঙ্গল বয়ে আনে না, তুরিন তা’ হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল।

সেদিন তুরিন মসুর ডালের বড়া, আলুভর্তা, আর পাতলা করে মুগডাল রান্না করেছিল। বাসায় থাকার মধ্যে আলু আর দুই/তিন পদের ডাল সব সময়ই থাকে। মাছ,মাংস মাসে এক/দুইদিন আসে তুরিনদের বাসায়।

ভাই ফ্রেশ হয়ে এলে তুরিন খেতে দেয়। বোনকে কাছে পেয়ে ভাই যেন কথার ফোয়ারা ছুটিয়েছিল। কতোদিন পর বোনকে কাছে পেয়েছে, বড় আদরের বোন। প্লেটে আলুভর্তা, ডালের বড়া দিয়ে, সামনে একটা বাটিতে ডাল রেখে দিল। তারপর চেয়ার টেনে ভাইয়ের পাশে বসলো।

নিহাল টিউশান পড়াতে গেছে, ফিরতে ফিরতে রাত ১০টা বাজবে। বোনের বসা দেখেই বড় ভাই বুঝে গিয়েছিল, রাতের মেন্যু এই, এর বেশি কিছু নেই। সে মুখ ফুটে কিচ্ছু বলেনি। ভাত খেতে খেতে বলেছিল,

– কীরে বুড়ি? এতো ভালো রান্না শিখলি কবে? বড়াটা দারুণ সুস্বাদু হয়েছে রে! ধনেপাতা আর কাঁচামরিচ সেদ্ধ দেয়াতে ভর্তাটাও অসাধারণ হয়েছে। বহুদিন পর এতো স্বাদের আইটেম খেলাম।

বিয়ের আগে তো কুটোটি ছিঁড়ে দুইভাগও করতিস না, আর এখন এতো মজাদার খাবার রান্না করছিস? ভাবা যায়!

তুরিনের চোখদুটো সেদিন বড্ড বেশি উতলা হয়ে যাচ্ছিল, অনেকদিন কন্ট্রোলে রাখতে রাখতে চোখের পানি তো প্রায় আয়ত্বেই চলে এসেছিল, হঠাৎ কী হলো বেঈমান চোখ দুটোর? বাঁধ ভাঙার তোড়জোড় করেই চলেছে। এই অস্থিরতা এখনই থামাতে হবে, এটা ভেবেই তুরিন বলে উঠেছিল,

– খাবার সময় কথা বলতে নেই, ভাইয়া। চুপ করে খাও তো। নইলে বিষম খাবে। আরেকটু ভাত দেবো?

বড় ভাই ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, খুব সন্তর্পণে। পাছে বোন টের পেয়ে যায়। তারপর হাত নেড়ে না করলেন।

পরদিন ঘুম থেকে উঠেই তুরিন দেখলো, ভাই বাসায় নেই, এতো সকালে গেল কই? বাড়ি চলে গেলে তো তুরিনকেও বলে যাবার কথা!

নয়টার দিকে এতো এতো জিনিস নিয়ে বড় ভাই হাজির, প্রায় পনেরো দিনের বাজার ছিল ওখানে।
এসেই হাকডাক শুরু করে দিয়েছিল,

– তোর রান্নার হাত কতোটা পেকেছে,এটা প্রমাণ করতেই এসব নিয়ে এলাম। কইমাছ গুলো মুচমুচে করে ভেজে টমেটো দিয়ে ভুনা করবি, মুরগীর ঝোল,,সব্জী করবি হলুদ গুঁড়ো ছাড়া সাথে তোর হাতের বিখ্যাত মুগডাল।ঝটপট রান্নাটা সেরে ফেল তো। খেয়েই বাড়ি চলে যাব।

তুরিন সেদিন চোখের পানি আটকাতে পারেনি, অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে শান্ত থাকা যায় না, উত্তাল সমুদ্রের মতো আছড়ে পড়তে ইচ্ছে করে।

ভাই বাড়ি গিয়েই বাবার নামে যে ডিপোজিট ছিল সেটা ভাঙার ডিসিশন নেয়।ডিপোজিটটা ম্যাচিউরড হয়েছিল অনেক আগেই, দরকার পড়েনি, তাই ভাঙেনি।ব্যাংকেই অলস পড়েছিল টাকাগুলো। ভাঙার সময় বাবা’কে শুধু বলেছিল,

-বড়দের ভুল সিদ্ধান্তের জন্য পরিবারের অন্য মানুষগুলোর জীবনে মাঝেমধ্যে যে ঝড়গুলো আসে, তার মোকাবিলা বড়দেরই করা উচিৎ। নয়তো বড্ড পাপ হয় বাবা।

ডিপোজিটের সব টাকা তুরিনের হাতে দিয়ে বড়ভাই বলেছিল,

-তুই উচ্চ শিক্ষিত একজন মানুষ, চাকরি পাসনি তাতে কী? ছোটখাটো বিজনেস কর।এখন তো ডিজিটাল যুগ, অনেক সুযোগ সুবিধা সবখানেই।শুধু মেধা, শ্রম, সততা এই তিনটা জিনিস দরকার। নিজের বেস্ট পারফর্মেন্সটাই এখানে দিবি। স্টার্ট কর,আমার বোন পিছিয়ে থাকার জন্য জন্মায়নি। যেকোনো হেল্প লাগলে, আমিই তোকে হেল্প করবো।

সেই থেকে অনলাইন শপ “ড্রিমস” এর যাত্রা শুরু।

দেবর দুইজনই বিয়ে করে আলাদা ফ্ল্যাটে থাকে, ওয়েল সেটেল্ড। মাঝেমাঝে ফোন করে খোঁজ খবর নিয়ে দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করে। ভাবনার জালে দুম করে ঢিল ছুঁড়লো রোদ্দুর এসে। তুরিনের সাড়ে তিন বছরের ছেলে রোদ্দুর। দৌড়ে এসে হাত ধরে টানতে লাগলো, তারপরই বলল,

– মাম্মাম, এসো, এসো তাড়াতাড়ি এসো। তোমাকে টিভিতে দেখাচ্ছে।

কয়েকদিন আগে নারী উদ্যোক্তা’দের নিয়ে একটা সম্মেলন হয়েছিল তুরিনের প্রতিনিধিত্বে, সেটাই টিভিতে দেখাচ্ছে। একজন যোদ্ধা নারী ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বুকে চেপে ধরে বায়ান্ন ইঞ্চি পর্দায় নিজের সফলতার গল্প শুনছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে