বাপের কঙ্কাল বিক্রি – তন্ময় ইমরানের দুর্দান্ত ছোটগল্প

0
256
তন্ময়

বাপের কঙ্কাল বিক্রি – তন্ময় ইমরানের দুর্দান্ত ছোটগল্প

কবর থেকে বাপের কঙ্কাল চুরির প্রস্তাবে বদি কিছুটা থমকে গিয়েছিল। কিন্তু চেয়ারম্যান যখন বললো- ১০ হাজার ট্যাকা দিবনি। আমার লোকও দিবনি, তুই খালি কঙ্কালটা হাপিশ করে নিয়ে আসবি। পারবি নে?

তখন বদি একটু থমকে গেল। ১০ হাজার টাকা এই সময়ে তার জন্য অনেক। মহামারীর এই সময়ে অবস্থা প্রায় লেজেগোবরে। কয়েকদিন আগে বউ অসুস্থ ছিল। তার পেছনে টাকা খরচ করতে করতে শেষ। ধার দেনার জায়গা ফুরিয়েছে। দোকান থেকে বাকি দেওয়াও বন্ধ। তার উপর এই মরার ভাইরাসে কাজ-কাম-দেশ সব বন্ধ। উপায় না দেখে চেয়ারম্যানের কাছে গিয়েছিল। নাহ, রিলিফ আসেনি। এই চেয়ারম্যানের চোর বলে বদনাম আছে। তাই রিলিফ কর্মকর্তারা এবার তাকে তালিকার বাইরে রেখেছে। গ্রামের আর দশটা লোকও এ কথা জানে যে গ্রামে এবার চোরটার জন্য সরকার ত্রাণ দিবে না।

এমন না যে বদি ও তার পরিবার বেশ কয়েকদিন না খেয়ে আছে, তবে এমন হয়তো আগামী কালকেই হবে। গত এক সপ্তাহ থেকে একবেলা খেয়ে কাটিয়েছে। কাল আর বিশেষ কিছু রান্নার থাকবে না। তিন মেয়ের চেহারা চোখে ভাসে, বুড়ি মায়ের কথা ভেবেও বদির খারাপ লাগে। আর তাছাড়া বউটা… কিছুদিন আগেই তো রোগ-শোক থেকে উঠলো। নাহ, ১০ হাজার টাকা হলে তার সমস্যা মিটে যায়। মাস খানেক চলবে। তারপর না হয় অন্য ব্যবস্থা করা যাবে।

চেয়ারম্যানকে তাৎক্ষণিক কোনও উত্তর না দিয়ে বাড়িতে চলে এসেছিল বদি। বাপের কবরের দিকে তাকিয়ে পুরো বিকালটা পার করে দেয়।

দুদিন আগে ২০ কিলোমিটার দূরে এক জায়গায় ত্রাণ দিচ্ছে শুনে ছুটে গিয়েছিল। মার খেয়ে এসেছে। স্থানীয়রা তাকে ধরে পিটুনি দিয়েছিল, আর পুলিশ রক্ষা করতে এগিয়ে আসলে তারা বলেছিল- ব্যাটা সব জায়গা থেকে ত্রাণ নেয়, পরে বিক্রি করে দেয়। পুলিশও কিছুক্ষণ আটকে রেখেছিল।

বাড়ি ফেরার পর আঘাতের চিহ্ন দেখে বউ-বাচ্চা-মায়ের প্রশ্নের উত্তরে তাকে বিরাট গল্প ফাঁদতে হয়েছিল। গল্প সে ফাঁদতে পারে। কেননা সে শহরের দোকানে নাপিতের কাজ করে। যদিও গ্রাম থেকেই যেত রোজ। ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তেই সেলুনটা বন্ধ হয়ে গেল। মাস দুই প্রায় হতে চললো!

কিন্তু এতোকিছু থাকতে চেয়ারম্যান বদির বাপের কঙ্কাল চাইলো কেন? অন্য লোকের কঙ্কালও তো চাইতে পারতো!
বাপের কবরের দিকে তাকিয়েই বদি কারণ বের করলো- ১৫ বছর আগে তার বাপের মৃত্যু হয়েছিল ঠাডা পড়ে। তখন শুনেছিল- বজ্রপাতে মারা পড়া মানুষের কঙ্কালের নাকি অনেক দাম! কি যেন চুম্বক-টুম্বক থাকে।

বদির বাপের সাথে চেয়ারম্যানের বেশ রেষারেষিও ছিল। চেয়ারম্যানের দল তখন ছিল বিরোধীদলে। আর তার এতো টাকাপয়সাও ছিল না। বদির বাপ ছিল সরকারী দলে। আর কিছুদিন বাঁচলে হয়তো চেয়ারম্যান এখন যে ক্ষমতা ও সম্পদের মালিক, তা বদির বাপের হতে পারতো। কিন্তু দল ক্ষমতায় আসার অল্প কয়েকদিনের মাথাতেই দুর্ঘটনা ঘটে- বজ্রপাত। আচ্ছা বাপের উপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য চেয়াম্যান এমন করে নাই তো! তারপর নিজেই মাথা নাড়ে, নাহ এমন কিছু না। চেয়ারম্যান খুব শেয়ান মাল। নিশ্চয়ই কঙ্কাল বিক্রির বড় কাস্টমার পেয়েছে।

বাপ যখন মারা যায় বদির তখন বয়স কম, রক্ত গরম। সামান্য যা সঞ্চয় ছিল তা উড়িয়ে দিয়েছিল- নেশা-ভাং করেই। তারপর বউ এসে তাকে বাঁচালো, জোর করে সেলুনের কাজের ট্রেনিং করালো। সেই বউটাকে বদি ঠিক মতো খেতে দিতে পারছে না!

সন্ধ্যা হয়ে আসার আগেই সিদ্ধান্ত নেয় বাপের কঙ্কাল উঠিয়ে চেয়ারম্যানকে দিয়ে দিবে। যা সে করবেই- বা করতে বাধ্য হবেই- তা আজ করাও যা, কাল করাও তা। বাড়ির পেছন দিকে খুব ছোট একটা বাঁশঝাড়। সেটার ভেতরেই বাবার আধপাকা কবর।

কাজটা রাতে করতে হবে। মা বেঁচে আছে, বাচ্চারা কষ্ট পাবে, লোকে লজ্জা দিবে। অন্ধকার নামতেই বদি উঠে আবার চেয়ারম্যানের বাড়ির দিকে রওনা হয়।

***
রাত গভীর হয়। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে চেয়ারম্যানের পাঠানো দুজন লোক নিয়ে বদি তার বাপের কঙ্কাল তোলে। তারপর আবার কবরটা ঠিকঠাক করে। মা প্রতিদিন ফজরের নামাজের সময় কবরে আসে দোয়া করতে। ভাগ্যিস চোখে দেখে না ঠিকমতো! ছানি পড়েছে। নইলে ঠিকই টের পেত কবরের মাটি খোড়ার ব্যাপারটা।

রাত দুটোয় কবর থেকে কঙ্কাল বের করে পুকুরের পানিতে সাবধানে সাবান-সোডা দিয়ে ধোয় বদি ও চেয়ারম্যানের দুই চ্যালা। জ্যোৎস্নায় কঙ্কালের কিছু অংশ চিকচিক করে। বদির মনে হয় তার বাপের কঙ্কাল নয়, হাতে ধরা রয়েছে হীরের মানব অবয়ব।

তারপর পরিশ্রান্ত দেহে চেয়ারম্যানের বাড়িতে যায় কঙ্কাল দিয়ে টাকা আনতে৷ ফেরার সময় চেয়ারম্যান সদয় হয়ে বলেন- বদি বাপের কঙ্কালের সাথে একটা ছবি তুলে যা, স্মৃতি থাকলো। আর পাঁচ হাজার টাকা বাড়তি নিয়ে যা।

নিজের মোবাইলে ছবি তোলে চেয়ারম্যান। বলে, অবস্থা ভালো হোক তোকে এটা প্রিন্ট করে দিবোনি।

বদি ১৫ হাজার টাকা পকেটে নিয়ে বাড়ি ফেরে। সারারাস্তা তাকে সঙ্গ দেয় ভুতূড়ে জ্যোৎস্না আর চোখের পানি। সে কি পাপ করলো? তার হাতে আর কোনো উপায় কি ছিল না! আহ বাপকে বিক্রি করে দিল!

***
দুদিন পর বদিদের গ্রামে একগাদা সরকারী লোক আসে। বদির বাড়িতে আসে পুলিশ। গত দুইদিন ভালো খাবার পেটে পড়ায় সেদিন বদি সকালের ঘুমটা একটু জাঁকিয়ে দিচ্ছিল। পুলিশই তার ঘুম ভাঙালো। সে অবশ্য দীর্ঘক্ষণ বোঝেনি কেন তাকে পুলিশ ধরছে।

পুলিশ বদিকে ধরে চেয়ারম্যানের বাড়িতে নিয়ে গেল। চেয়ারম্যান তখন জেলা সদর থেকে আসা সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে খোশগল্প করছেন- “… তা আমি বললাম, তুই টাকা নিবি, নে- বাপের কঙ্কাল বিক্রি করবি কেনরে!”

“তারপর ভাইবা দেখলাম, অভাবে পড়ছে, এ এলাকায় তো সরকার ত্রাণও দিতেছে না। ও হয়তো অন্য কাউরে কঙ্কালটা খুব কম দামে দিয়ে দেবেনে। তাছাড়া আমি টাকা দেয়ার পরও যদি কঙ্কাল বিক্রি করে দেয়! তারচেয়ে বরং আমি রাইখা দেই। পরে আবার গোর দিয়া দিমুনে। তাই সাংবাদিক সাহেবকে ফোন দিছিলাম। ছবি দিছিলাম আর কি…! ও তো একা গরীব না। আরও লোকজন আছে। সবাই যদি এমুন ভাবে সরকারের ইজ্জত কই যায় ভাবেন তো!”

বদি ঠিক তখনো বোঝেনি তাকে কেন পুলিশ নিয়ে এলো। আসলে তার মত গরীবের বোঝার কথাও না- অভাবে পড়ে বাপের কঙ্কাল বিক্রি করেছে, এটা সরকারের প্রেস্টিজের ব্যাপার, ভাবমূর্তির ব্যাপার! সরকার এটাকে ষড়যন্ত্র ভাবছে, বিশেষত বদির বাপ তো বিরোধীদলের সক্রিয় কর্মী ছিলই।

বদির অবশ্যই বোঝার কথা না চেয়ারম্যান তার অভাবকে বিক্রি করেছে গ্রামে ত্রাণ আনবে বলে, আর সেই ত্রাণ লুটপাট করবে বলে।

তাই পুলিশ যখন বদিকে থানায় নিতে উদ্যত হলো- তখন চেয়ারম্যানই সরকারি কর্মকর্তার হাতেপায়ে ধরে বদিকে রক্ষা করলো। তবে পুলিশের তো কাজ দেখাতেই হয়। তাই তারা মামলা করলো- সাংবাদিকের নামে, যিনি সংবাদ পাঠিয়েছিলেন। সেই সংবাদের শিরোনাম ছিল- “ত্রাণ না পেয়ে বাবার কঙ্কাল বিক্রি করলেন নাপিত”।

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধলকডাউন – ছিন্ন ভাবনা ৫-ফাল্গুণী মুখোপাধ্যায়
পরবর্তী নিবন্ধদেখে নিও -কবি শাহিনা খাতুন‘এর কবিতা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে