“বিশ্ব ভালোবাসা দিবস”- স্বকৃত নোমান

0
622
Swakrito Noman

ভাষার উন্মেষকাল থেকে আজ অবধি কবি-সাহিত্যিকরা নানাভাবে প্রেমের মাহাত্ম্য প্রচার করেছেন, করছেন। তাঁদের লেখা সেসব প্রেমের আখ্যান বহুল পঠিত, বহুবিশ্রুত। যেমন লাইলী-মজনু, রাধা-কৃষ্ণ, শিরি-ফরহাদ, ইউসুফ-জোলেখা, থিসবি-পিরামুস, শাহজাহান-মমতাজের কিংবদন্তী প্রেম জগতের তাবৎ প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। প্রেমিকার প্রতি প্রেমিকের কিংবা প্রেমিকের প্রতি প্রেমিকার এমনই আকর্ষণ, যার জন্য তারা পৃথিবীর সব কিছু ছাড়তেও রাজি; যেমন প্রেমিক ট্রোজান যুবরাজ প্যারিসের জন্য স্বামী মেনিলিয়াসকে ছেড়ে চলে এসেছিল সুন্দরী হেলেন। কখনো মৃত্যুকেও বরণ করে নেয় হাসিমুখে; যেমন নিয়েছিল থিসবি-পিরামুস। প্রেম মানে না জাত-পাত, গন্ধ, রূপ, বর্ণবৈষম্য। নইলে কি কৃষ্ণবর্ণ লাইলির জন্য মজনু পাগল হয়? প্রেম কখনো প্রেমিককে পৌঁছে দেয় সৃষ্টিশীলতার চূড়ান্তে; যেমন বিয়াত্রিচের প্রেমে মহাকবি দান্তে রচনা করলেন তাঁর অমর কাব্য ‘ডিভাইন কমেডিয়া’।

আর্যইরানি কবি ও দার্শনিক জালাল উদ্দিন রুমির তাঁর প্রেমতত্ত্বে প্রেমের বর্ণনা দিয়েছেন এইভাবে, প্রেম এক অদ্ভুত শক্তির নাম। প্রেমের চুম্বক টানে প্রেমিক যেমন আকৃষ্ট হয় প্রেমিকার প্রতি তেমনি জড়পরমাণুপুঞ্জও আকৃষ্ট হয় পরস্পরের প্রতি। শুধু তাই নয়, এই প্রেমশক্তির আকর্ষণে সৌরজগতের নক্ষত্ররাজিও পৃথিবীকে তাদের দিকে আকৃষ্ট করে স্বাগতিক আলিঙ্গনের ছলে। প্রেমের এই অতিজাগতিক টানের ফলেই পৃথিবী শূন্যে ঝুলে আছে একটি বাতির মতো, আর এর চারদিকে সব শক্তির সমান আকর্ষণের কারণেই তা ঝুঁকে পড়ছে না এদিক-ওদিক। প্রেমের এই অদ্ভুত বন্ধন পৃথিবীকে অধিষ্ঠিত রেখেছে শূন্যে। নীহারিকাপুঞ্জ থেকে যে প্রেম শক্তি সৃষ্টি করে নভোম-লের গ্রহ-তারকাকে, সেই শক্তি আরেকটু এগিয়ে গিয়ে সৃষ্টি করে প্রাণ।

রুমি প্রেমকে ব্যবহার করেছেন একটি অতিন্দ্রীয় আধ্যাত্মিক নীতি বা শক্তি হিসেবে। প্রেমকে তিনি কেবল মানব-মানবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, নিয়ে গেছেন একটা আধ্যাত্মিক ও বৈশ্বিক মাত্রায়। আমরা যদি প্রেমকে কেবল মানব-মানবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ করি, তবে দেখতে পাই, এই প্রেমশক্তির আকর্ষণ-বিকর্ষণের কারণেই মানুষ পৃথিবীতে এখনো অস্তিত্বমান। মানুষের ভেতর প্রেম-ভালোবাসা আছে বলেই মানব সৃষ্টিপ্রক্রিয়া এখনো চলমান। প্রেমের শক্তি বা আকর্ষণই প্রজননের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছে। মানুষের মধ্যে প্রেম-ভালোবাসার ঘাটতি দেখা দিলে পৃথিবীর শৃঙ্খলিত গতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।

বঙ্গ-ভারতের কবিদের কাব্য তো বলা যায় প্রেমেরই সৌন্দর্যখনি। কবিতার ছত্রে ছত্রে প্রেমের জয়গান। মহাকবি কালীদাস বলেন, প্রেমই চিরসত্য, প্রেমই চিরসৌন্দর্য। ‘মেঘদূতে’র প্রণয়-প্রমত্ত যক্ষ প্রেমের ঘোরে ভুলে যায় জগৎ-জীবনের সব কিছু। প্রভু কুবেরের ক্রুদ্ধতায় নির্বাসিত হয়ে আকাশের মেঘকে দূত করে প্রিয়ংবদার কাছে বার্তা পাঠায়। ‘শকুন্তলা’য় দুষ্মন্ত ও শকুন্তলার প্রেমে খানখান হয়ে ভেঙে গেল যত কিছু অস্থায়ী বিলাস বিভ্রম। ‘কুমারসম্ভবে’ উমা ও শঙ্কর মিলে পেতেছিল অনিন্দ্য প্রেমের অপরূপ যোগাসন। জয়দেব তাঁর ‘গীতগোবিন্দে’ রাধা ও কৃষ্ণের যে প্রেমের আখ্যান সৃষ্টি করেছেন তা সত্যিকারার্থেই বিরল। আলাওল অনূদিত ‘পদ্মাবতীতে’ রত্নসেন ও পদ্মাবতীর যে প্রেমের বর্ণনা দিয়েছেন, তা বাঙালির হৃদয়কে এখনো আকুল করে তোলে। ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’য় মালেক-নুরুন্নেহার প্রেম নিষ্ঠুর সামাজিকতা বাহ্যিকভাবে ভেঙে দিলেও সেই প্রেম শেষ পর্যন্ত অভগ্ন হয়ে ইহজাগতিকতায় পৌঁছে যায়। কিংবা ভেলুয়া-আমির সাধুর প্রেম, শত দুর্বিপাকেও তাদের প্রেমে সহজে ভাঙন ধরে না। নছরের প্রেম ভাগ হয়ে গেলেও শেষতক তার প্রেম আমিনাতে এসেই স্থির হয়।

শ্রীচৈতন্য এই বাংলায় পেতে দিলেন তাঁর অনিন্দ্য প্রেমের গালিচা। রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টি করলেন প্রেমের অনবদ্য সুর আর নজরুল বাজালেন প্রেমের বাঁশরী। মনের-মানুষের সন্ধানে মহাজন লালন সাঁই প্রেমেরই তো মাহাত্ম প্রচার করেছেন। হাছন, রাধারমণ কিংবা শাহ আবদুল করিমের এই বাংলার আকাশে-বাতাসে ভেসে ভেড়ায় প্রেমের আকুল আবেদন। সুদূর আরবের আইয়ুব-রহিমার প্রেমের আখ্যান অনুসারে বাঙালি যখন ‘প্রেম করেছেন আইয়ুব নবী/ তার প্রেমে রহিমা বিবি গো’ বলে সুর ধরে, তখন প্রতিটি হৃদয় এক অপ্রকাশ্য আবেগে হাহাকার করে ওঠে। কিংবা ‘নিশিথে যাইও ফুলবনে গো ভ্রমরা’ বলে যখন গান ধরেন শিল্পী, তখন অনাবিল প্রেমানন্দে চিত্ত মোহিত হয়। ‘চান্দের বাত্তি’ জ্বালিয়ে নিশি গুজরান করে বাঙালি প্রেমিক।

প্রেম বা ভালোবাসা আসলেই এক অনন্ত শক্তির নাম। এই ভালোবাসাকে স্বীকৃতি দিতে, সবার ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে বিশ্বজুড়ে এখন পালিত হয় ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে’ বা ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’। যে কারণেই এই দিবস পালনের সংস্কৃতি চালু হোক না কেন, দিবসটি এখন শুধু ওই কারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, ছড়িয়ে পড়েছে নানা মাত্রায়। পাশ্চাত্য-উদ্ভাবিত এই দিবসের অভিঘাত গত দেড় দশক ধরে আমাদের দেশে বেশ জোরেশোরেই পড়ছে। তবে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দিবসটির প্রভাব এখনো মধ্যবিত্ত তরুণ-তরুণীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। শুধু মধ্যবিত্ত বললে ভুল হবে, বলতে হবে নাগরিক মধ্যবিত্ত। কারণ, গ্রামীণ মধ্যবিত্ত তরুণ-তরুণীদের কাছে দিবসটির বিশেষ কোনো তাৎপর্য এখনো পর্যন্ত নেই। সামাজিক নানা বিধি-নিষেধের কারণে দিবসটির তাৎপর্য তাদের কাছে এখনো ঠিক সেভাবে পৌঁছেনি।

কিন্তু গ্রাম ক্রমেই নগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে কিংবা নগর গ্রামের দিকে। গ্রামীণ মানুষ ক্রমেই পুরনো ধ্যান-ধারণাকে পরিত্যাগ করে নতুন ধ্যান-ধারণার দিকে ধাবিত হচ্ছে। প্রতি বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি এলে আমাদের দেশের প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াগুলো যেভাবে ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে’র প্রচারণা চালায়, তাতে অদূর ভবিষ্যতে দিবসটি ছড়িয়ে পড়বে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের সতের কোটি নারী-পুরুষের মধ্যে। তখন খুব সহজে সবাই গ্রহণ করবে দিবস-কেন্দ্রিক ভালোবাসাবাসির এই সংস্কৃতিকে। এই সংস্কৃতি গ্রহণের মধ্যে আমি নেতিবাচক বা খারাপ কিছু দেখি না। অনেকে প্রশ্ন তোলেন, এটি বাঙালির সংস্কৃতি নয়, এটি বিদেশি সংস্কৃতি; আমরা এই সংস্কৃতিকে কেন গ্রহণ করব?

আমার প্রশ্ন, অখণ্ড বাঙালি সংস্কৃতি বলতে কি কিছু আছে? বাঙালি সংস্কৃতির মধ্যে তো যুক্ত হয়েছে নানা দেশের নানা সংস্কৃতি। বাঙালি সবসময় সুন্দরকে গ্রহণ করে, অসুন্দরকে বর্জন করে। ভালোবাসা দিবসের মধ্যে তো অসুন্দর কিছু নেই, এটিকে গ্রহণ করতে আপত্তির কোনো কারণ আমি দেখি না। আমি মনে করি, বাঙালি দিবসটিকে গ্রহণ করতে মোটেই আপত্তি তুলবে না। দিবসটিকে বিধর্মী, বিজাতীয়, অপসংস্কৃতি ইত্যাদি ‘দাগ’ লাগিয়ে এটিকে বর্জন করা আসলে যাবে না। এটির মধ্যে সৌন্দর্য আছে, মানবতা আছে, ভালোবাসা আছে। মানুষ সভ্য হয়ে ওঠার জন্য তো সৌন্দর্য, মানবতা আর ভালোবাসার বিকল্প নেই।

সেন্ট ভ্যালেন্টাইন’স ডে বা বিশ্ব ভালোবাসা দিবসটির মধ্যে আমি একধরনের আন্তর্জাতিকতা দেখতে পাই। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে এখন দিবসটি পালিত হচ্ছে। পৃথিবীর নানা দেশের, নানা ভাষার, নানা বর্ণের, নানা ধর্মের মানুষ একই দিনে ভালোবাসার উৎসবে মেতে উঠছে। এটাকে বলা যায় ভালোবাসার আন্তর্জাতিকতা। একটি দিবস সারা পৃথিবীর মানুষ এক সঙ্গে পালন করছে। তার মানে বিশ্বের সব মানুষকে দিবসটি একটা সুতোয় বেঁধে দিচ্ছে। রাষ্ট্রের নামে, ধর্মের নামে, বর্ণের নামে, জাতির নামে মানুষে মানুষে যে বিভক্তি, দিবসটি সেই বিভক্তিকে কিছুটা হলেও ঘুচিয়ে দিচ্ছে। এটা তো মানবতার জন্য খুব ভালো একটা ব্যাপার। এর চেয়ে ভালো সংস্কৃতি আর কী হতে পারে? এটাকে প্রত্যাখ্যান করার, বিদেশি, বিজাতীয় সংস্কৃতি বলে নাক সিটকানোর কোনো কারণ আমি দেখি না।

আজ বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। ভালোবাসার জয় হোক, ভালোবাসা দিবসের জয় হোক। ভালোবাসার মহিমায় উদ্ভাসিত হোক বিশ্ববাসী, ভালোবাসার বলে বলীয়ান হোক বিশ্বের সমস্ত নারী-পুরুষ। সর্বমানবের সম্মিলিত ভালোবাসার উৎসবে মুখরিত হোক সমস্ত পৃথিবী।

[বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে একটি বইয়ের হদিস দেয়া যাক। বইটির নাম ‘বানিয়াশান্তার মেয়ে’। প্রকাশ করেছে পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স। বইমেলায় পাঞ্জেরীর ২১ নম্বর প্যাভিলিয়নে বইটি পাওয়া যাচ্ছে।]

মহাকালে রেখাপাত
স্বকৃত নোমান
১৪ ফেব্রুয়ারি, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, ২০২০

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধ“মৃন্ময়ীর ভালবাসা”-আব্দুল মতিনের ছোট গল্প
পরবর্তী নিবন্ধ“তীব্র দাহ আর ফাল্গুন” কবি নাসিমা হক মুক্তা‘এর কবিতা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে