মননে যারা অগ্রসর, তাদের জন্যই, সমাজের অন্ধকার আজ আলোর দিকে – স্বকৃত নোমান

0
54

মননে যারা অগ্রসর, প্রয়োজনে এরাই প্রতিবাদ করে, সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিতে – স্বকৃত নোমান

দেশে বড় ধরনের একটা পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। ধর্ষণের কারণ পোশাক―এই বক্তব্য এখন আর হালে পানি পাচ্ছে না। দুই বছর আগে চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের ‘জাগো বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠানে অভিনেতা মোশাররফ করিম বলেছিলেন, ‘একটা মেয়ে তাঁর পছন্দমতো পোশাক পরবে না? আচ্ছা পোশাক পরলেই যদি প্রবলেম হয়, তাহলে সাত বছরের মেয়েটির ক্ষেত্রে কী যুক্তি দেব, যে বোরকা পরেছিলেন তাঁর ক্ষেত্রে কী যুক্তি দেব? কোনো যুক্তি আছে?’

‘ধর্ষণের কারণ পোশাক নয়’―সামান্য এই কথার জন্য মোশাররফ করিম তখন ক্ষমা চেয়েছিলেন। এতে নাকি কারো কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছিল। দুর্বলচিত্তের মানুষ মোশাররফ, সামান্য সমালোচনাতেই ঘাবড়ে গেলেন। যদি রুটিরুজিতে আঘাত আসে! যদি জনপ্রিয়তা নষ্ট হয়ে যায়! তাই বক্তব্য সংশোধন করে বললেন, ‘আমি যা বলতে চেয়েছি তা হয়ত পরিষ্কার হয়নি। আমি পোশাকের শালীনতায় বিশ্বাসী এবং তার প্রয়োজন আছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা আমার অভিপ্রায় না। এ ভুল অনিচ্ছাকৃত। আমি দুঃখিত। দয়া করে সবাই ক্ষমা করবেন।’

সম্প্রতি আরেক ‘অভিনেতা’ অনন্ত জলিল পোশাক নিয়ে যা বলেছিলেন তার সংক্ষিপ্তসার হচ্ছে, ‘নারীদের অশালীন পোশাক দেখেই পুরুষদের মাথায় ধর্ষণের চিন্তা আসে।’ তার এই বক্তব্যে মননে অগ্রসর মহলে শুরু হলো নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড়। তীব্র সমালোচনার মুখে তিনি তার বক্তব্য থেকে সরে এলেন। বললেন, ‘ধর্ষণের জন্য নারীদের পোশাক না; পুরুষদের বিকৃত মানসিকতাই দায়ী।’ বক্তব্য সংশোধনের জন্য অনন্ত জলিলকে অভিনন্দন।

অপরদিকে খবরে দেখলাম, শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি জানিয়েছেন, ধর্ষণের অব্যাহত ঘটনার প্রেক্ষাপটে শৈশব থেকেই নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরিতে স্কুলের পাঠ্যক্রমে নারী নির্যাতন ও যৌন হয়রানির মতো বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এটা একটা বড় ধরনের অগ্রগতি। একটা বড় ধরনের পরিবর্তন। মধ্যযুগীয় শক্তির কথায় সরকার যেখানে পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন করে ফেলেছিল, সে জায়গা থেকে এই অন্তর্ভুক্তিকে বড় পরিবর্তন বলতে চাই। অগ্রগতি বলতে চাই।

অনন্ত জলিল তার বক্তব্য সংশোধন করতেন না, যদি না তার বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ হতো। স্কুলের পাঠ্যক্রমে নারী নির্যাতন ও যৌন হয়রানির বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হতো না, যদি না নারী নির্যাতন ও যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ হতো। তার মানে বোঝা গেল, মননে যারা অগ্রসর, যারা সমাজের মননকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে এগিয়ে নেয়, তাদেরকে বসে থাকা চলে না, চুপ করে থাকা চলে না; সময়ের প্রয়োজনে কথা বলতে হয়, প্রতিবাদে মুখর হতে হয়, প্রয়োজনে রাস্তায় নামতে হয়। নইলে অন্ধকারের শেয়াল-শকুনেরা মাথাচাড়া দেয়। শেয়াল-শকুনেরা থাকবেই। থাকাটা প্রকৃতির নিয়ম। কিন্তু তাদের থাকার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা আছে―বনজঙ্গল। জনারণ্যে এলে তাদেরকে সরিয়ে দিতে হয়।

সরিয়ে দেওয়ার কাজটা সরকারের। কিন্তু সরকার মানেই ক্ষমতা। সরকারের ক্ষমতা অশেষ। এই অশেষ ক্ষমতা নিঃশ্বেস হয়ে যাওয়ার ভয় তার মধ্যে কাজ করে সবসময়। এটাই তার একমাত্র দুর্বলতা, মহাবীর একিলিসের যেমন দুর্বলতা ছিল পায়ের গোড়ালি। সরকারও এই ‘গোড়ালি’ সুরক্ষার জন্য সদা তৎপর থাকে, সদা ভীতসন্ত্রস্ত থাকে। কিন্তু অগ্রসর মানুষেরা, যারা সমাজের মননকে এগিয়ে নেয়, তারা যখন শেয়াল-শকুনদের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন সরকারকেও নড়ে বসতে হয়। সে তখন বুঝতে পারে, যাদের ভয়ে সে সন্ত্রস্ত, তাদের আসলে কিচ্ছু করার ক্ষমতা নেই। জঙ্গলই তাদের ঠিকানা।

অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের কথাই ঠিক, ‘এই পৃথিবী কখনো খারাপ মানুষের খারাপ কর্মের জন্য ধ্বংস হবে না, ধ্বংস হবে তাদের জন্য, যারা খারাপ মানুষের খারাপ কর্ম দেখেও চুপ করে থাকে।’ আমাদের অনেক কবি-লেখক-শিল্পীর ভয়, কথা বললে যদি জনপ্রিয়তা নষ্ট হয়ে যায়! এই অনগ্রসর মানুষদের দেশে আবার জনপ্রিয়তা! এখানে তো তারাই জনপ্রিয় হবে, যারা মননে অনগ্রসর, যাদের মননে অন্ধকার। আলোকোজ্জ্বল অগ্রসর মননের অধিকারী কেউ তো এদেশে জনপ্রিয় হওয়ার কথা নয়। সুতরাং জনপ্রিয়তার গুল্লি মারাই কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীর অন্যতম প্রধান কাজ।

মহাকালে রেখাপাত
১২.১০.২০২০

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে