মোহিত কামালের জন্মদিনের অনুষ্ঠান থেকে পালিয়ে…মাসউদ আহমাদ

0
568
মাসুদ

মোহিত কামালের জন্মদিনের অনুষ্ঠান থেকে পালিয়ে..

.মাসউদ আহমাদ

জন্মদিনে সচেতনভাবেই একটু উদাসীন থাকি আমি এবং পালিয়ে বেড়াই। কেন, তা বলতে পারি না। কিন্তু জন্মদিনে নিজের মতো করে একা ও আলাদা থাকতে ভালোলাগে। আবার এটাও বাস্তব যে, নগরজীবনের মায়া ও মোহ এড়িয়ে পালিয়ে থাকা খুব একটা সহজ নয়।

সাপ্তাহিক বিরতি ছিল আমার। সেই অবকাশে ভরদুপুরে বেশ কদিন পর শাহবাগে যাওয়া হলো। সেখান থেকে আজিজ মার্কেট-বাংলা একাডেমি-সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হয়ে বইয়ের ঠিকানা পাঠক সমাবেশে। আজ কথাসাহিত্যিক ও মনোচিকিৎক মোহিত কামালের জন্মদিন। সেই উপলক্ষে তাঁকে নিয়ে অনুষ্ঠান পাঠক সমাবেশে। লেখক নিজেই আমাকে ইনবক্সে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, সেটা বাড়তি পাওনা; তবে একটু অবসর বের করে অনুষ্ঠানে যাব; সে কথা আগেই ভেবে রেখেছিলাম। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার কথা বিকেল ৫.৩০-এ। কিন্তু কবি, প্রাবন্ধিক ও চিন্তক সৈকত হাবিবের উপস্থাপনায় যখন অনুষ্ঠান শুরু হলা, তখন প্রায় সন্ধ্যা ৬টা।

সৈকত ভাই শুরু করার আগেই সংস্কৃতি অঙ্গনের প্রিয় মুখ রামেন্দু মজুমদার, যিনি গত আগস্টে ৭৮ বছরে পদার্পণ করেছেন, তিনি মোহিত কামালকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালেন। তাঁর কথা সামনাসামনি শোনার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত মুগ্ধকর।

এরপর সৈকত ভাই ধীরে ধীরে তাঁর নিজস্ব ভঙিতে এক এক করে অনুষ্ঠানে আগত অতিথি ও শুভাকাঙ্ক্ষীর নাম ধরে ডাকতে শুরু করলেন।

তরুণ কথাশিল্পী শামস সাইদ আমার পাশেই বসেছিলেন। তিনি আমার নামটা ঘোষণার জন্য সৈকত ভাইকে বার দুয়েক বলেই ফেললেন। তখন, অনিচ্ছুকভাবেও কিছু কথা মনে মনে সাজালাম, যদি আমাকে ডেকেই বসে, কিছু তো বলতে হবে বা এমন অনুষ্ঠানে কী বলা যায়। আর তখনই মনে হলো, কাজের বাহানায় আমাকে এখনই উঠে যেতে হবে [ইনফ্যাক্ট, আমি ভালো কথা বলতে পারি না, হয়ত সে কারণেও হতে পারে]। এবং সত্যি সত্যি পালিয়ে এলাম।

কথাসাহিত্যিক মোহিত কামালের ৬১তম জন্মদিন উপলক্ষে তাঁর নতুন একটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশ করেছে বিদ্যাপ্রকাশ। আজকের আয়োজনটি করেছেন তাঁরাই। বিদ্যাপ্রকাশের প্রিয় খোকা ভাই দেশের বাইরে থাকলেও তাঁর উত্তরসুরী সরাসরি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

এত ভনিতা করে যে কথাটি বলবার, তা এই :

আমাদের প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মধ্যে নানা ধরনের অদ্ভুৎ রকম সংঘ, মতবাদ ও বৈশিষ্ট্য আছে। তাঁদের বেশিরভাগই একে অপরের সুখ ও সমৃদ্ধিতে খুশী হয়। আনন্দ পায়। নিজের ভাবনা ও কর্ম যেমনই হোক, অন্যদের সাফল্য ও ব্যর্থতায় সমানভাবে সুখ পায়, দুঃখও পায়; গর্ব অনুভব করে এবং ব্যথিতও হয়। এতে কোনো ধরনের ভান ও ফাঁদ থাকে না। টিটকারি ও অপমান তো নয়ই। কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক, শিল্পীসমাজের মানুষের মধ্যে নানা ধরনের কথা-উপকথা ও তীব্র ফোঁড়ন দেখতে পাই। এই ফোঁড়ন বিষফোঁড়ার চেয়েও বেশি বেদনাদায়ক। আর বেশিরভাগ সময় একজনের সাফল্যে আরেকজন আনন্দ পায় না। কারো আনন্দে কেউ কেউ ব্যথিতও হয়। কেউ ভালো কাজ করে এগিয়ে যাচ্ছে, কেউ পুরস্কার ও প্রশংসা পেয়েছে, তাকে সহজভাবে গ্রহণ করার প্রবণতা আমাদের কম। চিন্তার বিষয় এই যে, এই চর্চা দিনদিন বাড়ছে।

মোহিত কামাল বাংলাদেশের সফল ও নামি মানুষদের একজন। তাঁর সৃজনশীল কাজ ও সাফল্যের সৌরভ নিয়ে এখানে কোনো কথা বলব না। কিন্তু এসবের বাইরে তাঁর মধ্যে আমি অন্য একটা জিনিস দেখতে পাই। সেটা আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান মনে হয়।

ঢাকা শহরে হাতে গোনা যে অল্প কজন মানুষ আমি পেয়েছি, তাঁদের মধ্যে মোহিত কামাল এমন একজন মানুষ, যিনি অন্যের সুন্দর ও সাফল্যের খবর পেলে আনন্দিত হন। আনন্দের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই মানুষটিকে তিনি কীভাবে শুভেচ্ছা জানাবেন, কী উপহার দেবেন আর কী খাওয়াবেন; তা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এবং বলাই বাহুল্য, তাতে তাঁর কোনো ভান নেই। হৃদয়ের গভীর প্রদেশ থেকে উঠে আসে সেই মানুষটির জন্য তাঁর শুভকামনা। তাঁর সঙ্গে যতদিন দেখা ও আলাপ বা সামান্য কথা হয়েছে, তিনি যতই ব্যস্ত থাকুন বা গুরুত্বপূর্ণ মানুষ নিয়ে পরিবেষ্টিত থাকুন, ঠিকই তিনি নাম ধরে ডাকবেন এবং কুশল জানবেন। নিজের হাতখানা বাড়িয়ে দিয়ে এমনভাবে চাপ দেবেন, মনের উষ্ণ আন্তরিকতা যেন তাতে চালান হয়ে যায় কোনো ধরনের চেকিং ছাড়াই।

তিনি যেহেতু মনের ডাক্তার, কাজেই মুখ ভার দেখলেই তিনি হয়ত আঁচ করে ফেলেন, তাঁর কাছে আগত মানুষটির কোনো কারণে মন ভালো নেই (ঢাকা শহরে যে কজন বিখ্যাত ও জেনুইন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আছেন, তিনি তাঁদের অন্যতম); বন্ধুর মতো তিনি তাঁর সঙ্গে মিশে যান এবং পরামর্শও দেন। কোনো লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক, চিকিৎসক বা সাধারণ কোনো মানুষকে নিয়ে কোনো ধরনের নেতিবাচক বা খারাপ মন্তব্য তাঁর মুখে কখনো শুনেছি, এমনটা মনে পড়ে না। কারো লেখা ও শিল্পকর্ম তাঁর ভালো লেগেছে, তিনি আনন্দিত মন নিয়ে তাকে শুভেেচ্ছা জানান। ভালোলাগেনি, সেটাও এমনভাবে তিনি প্রকাশ করেন, যেন সে দুঃখ না পায়, বরং অনুপ্রাণিত হয়। আর এত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পৌঁছেও তিনি কথা ও আচরণে তিনি দূরত্ব রেখে চলেন না। একধরনের মানবিক, বন্ধুমনোভাবাপন্ন ও উপকারী মানুষের পরিচয় পাই তাঁর মধ্যে। প্রতিদিন মোহিত কামাল অফিসে, টেলিভিশনের টকশোতে, পথের বাঁকে এবং অনুষ্ঠানে কত মানুষ এবং কত ধরনের চরিত্রের সঙ্গে মেশেন, তিনি নিজেও হয়ত বলতে পারবেন না; কিন্তু বিস্মিত হই, কাউকে দুঃখ দেওয়া কোনো কথা ও মন্তব্য, পরচর্চা ও কঠিন মনোভাবাপন্ন বক্তৃতা তাঁর মুখে কখনো শুনতে পাই না। এ ধরনের মানুষ ঢাকা শহরে কমই দেখতে পাওয়া যায়; এবং বলা যায়, ক্রমশ কমে আসছে।

মোহিত কামাল নিজে লেখক; তিনি একটি মাসিক সাহিত্য পত্রিকাও সম্পাদনা করেন, ‘শব্দঘর’; কোনো একজন তরুণ ভালো লিখছে, তিনি চেনেন না; তবুও সেটা শুনলেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলেন, ‘আমার ফোন নম্বর দিয়ে দাও। তাকে শব্দঘরে লেখা পাঠাতে বলো। আমরা তার লেখা গুরুত্ব দিয়ে ছাপতে চাই।’ এই ধরনের উদার মানসিকতা ও প্রেরণাসঞ্চারী কথা বলার মানুষ ঢাকা শহরে খুব একটা দেখি না।

এই মানুষটি, মোহিত কামাল; তাঁর জন্মদিনে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা জানাই। তাঁর সুন্দর, আনন্দময় ও সৃজনশীল দীর্ঘ জীবন প্রত্যাশা করি। ভালো থাকুন, নিরাপদে থাকুন; প্রতিদিন।

… মাসউদ আহমাদ মগবাজার, ঢাকা।

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধনাগেশ্বর
পরবর্তী নিবন্ধ“মুখোমুখি শেষ বিকেলে” কবি শাহানা আকতার মহুয়া‘ এর কবিতা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে