“শকুন্তলা “- অনুপম সৌরিশ সরকারের কবিতা

0
1011
অনুপম এনকে

শকুন্তলা
=অনুপম সৌরিশ সরকার

হে মহাপরাক্রমশালী সম্রাট,দুষ্মন্ত,
অবশেষে আপনি নতজানু হলেন,
না,কোনো শত্রুর নিকট নয়,
না,প্রণয় বা হৃদয়ের নিকটও নয় ।
আপনি আত্মসমর্পণ করলেন সত্যের কাছে,
যে সত্য অপেক্ষা বড় কিছু নেই
যে সত্য অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কিছু নেই
যে সত্য অপেক্ষা ধর্ম কিছু নেই ।

অবশ্য এর পূর্বে যথেচ্ছ মিথ্যাচার করেছেন কুণ্ঠাহীনভাবে ।
আমি অরণ্যকন্যা শকুন্তলা,
আজ যখন আপনার পুত্রের হাত ধরে
আপনার সম্মুখে এসে বললাম,
আপনার পুত্রকে অভিষিক্ত করুন যৌবরাজ্যে ।
তখন বলেছিলেন,আমাকে নাকি চিনতে পারছেন না,
আমি নাকি আপনার পত্নী নই,
আমাকে সম্ভাষণ করলেন
দুষ্ট তপস্বিনী বলে,স্বেচ্ছাচারিণী বলে,বহুবল্লভা বলে ।

যখন নয়বছর আপনার প্রতীক্ষায় থেকেও
আপনার প্রত্যাশিত আগমন ঘটে নি,
তখনও আমি হারাইনি ক্ষমাশীলতা,
কিন্তু অপেক্ষারও একদিন ক্লান্তি আসে,মহারাজ দুষ্মন্ত ।
ধৈর্যেরও একদিন ধৈর্যচ্যুতি ঘটে
ক্ষমাধর্ম একদিন হারিয়ে ফেলে তার কোমলতা ।
তবু সংযতভাবে আমি আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিলাম,
আমি শকুন্তলা,মহর্ষি কণ্ব আমার পালক পিতা,
অপ্সরাশ্রেষ্ঠা মেনকা আমার জননী,
আমার জন্মদাতা রাজর্ষি বিশ্বামিত্র ।
একদা আপনি আমার পাণিগ্রহণ করেছিলেন
গান্ধর্ব মতে,তপোবনে,মালিনী নদীর তীরে
মহর্ষি কণ্বের আশ্রমে ।
পাণিগ্রহণের প্রাক্কালে আমি বলেছিলাম,
“আগে আপনি শপথ করুন যে,
আমাদের পুত্র হবে হস্তিনাগরের পরবর্তী মহারাজ,
তবেই আপনার প্রস্তাবে আমি সম্মতি দেব ।”
আপনি তৎক্ষণাৎ বলেছিলেন,
“বেশ তাই হবে,
চতুরঙ্গিনী সেনা প্রেরণ করে তোমায়
রাজঅন্তঃপুরে নিয়ে যাব,
তোমায় দেব রাজমহিষীর সম্মান ।”
এইসব শোনার পর আপনি বললেন,
আপনার নাকি কিছুই মনে পড়ছে না ।
বললেন স্ত্রীজাতি নাকি প্রবঞ্চণাপটু ।
বললেন,বর্ষাকালীন নদী যেমন
তীরবর্তী বৃক্ষকে পতিত আর আপনস্রোতকে কর্দমাক্ত করে—
তেমনি আমি নাকি আপনাকে এবং আমার নিজ বংশকে
কলঙ্কিত করছি,
আরো বললেন,স্ত্রীলোকেরা সাধারণত মিথ্যা কথাই বলে,
বললেন,আমার কথা নাকি বিশ্বাসের অযোগ্য
কারণ আমার জন্ম নিকৃষ্ট,
কারণ আমার মাতা মেনকা একজন স্বৈরিণী ।

পৌরবরাজ,সহনশীলতার বৃক্ষও একদিন নিপতিত হয়,
সংযমের বাঁধও একদিন ভেঙ্গে যায় ।
অতএব এবার আমার চোখের জলকণায় জ্বলে উঠল হুতাশন,
আমার অন্তরের বেদনা হয়ে উঠল নিদারুণ ক্রোধ,
আমার ক্ষাত্ররক্তে জেগে উঠল অশ্বের হ্রেষা ।
আমি বললাম,
আপনি আমার সর্ষে-প্রমাণ ছিদ্র দেখে নিন্দামুখর,
অথচ আপনার ছিদ্রগুলি বেলফলসদৃশ ।
আমি বললাম,
আপনার মতো কুৎসিত লোকেরা
দর্পনে যতক্ষণ নিজের মুখ দর্শন না করে
ততক্ষণই আপনাকে সুন্দর বলে মনে করে ।
ঐশ্বর্যমোহে মত্ত হয়ে
আপনি হারিয়েছেন ধর্মাচার,সত্যজ্ঞান ।
তাই মনে পড়ছে না নয়,
আসলে মনে করতে চাইছেন না ।
তার কারণ,অন্যান্য রাজাদের মতই
আপনিও আমাদের মত অরণ্যতনয়াদের
বা দরিদ্রকন্যাদের বা নীচবর্ণাদের
খেলার সামগ্রীজ্ঞান করেন ।
আপনাদের সান্নিধ্য পাওয়াটাই সৌভাগ্যের,
এইভাবেই ভাবিত দরিদ্রকন্যাসকল ।
আপনাদের সম্মুখে উপস্থিত হয়ে
সন্তানের পিতৃত্ব দাবি করার কথা
কেউ কোনদিন ভাবেনি ।
তারা তাদের সন্তানকে হয় নদীতে ভাসিয়ে দেয়
বা ত্যাগ করে আসে কোনো নিভৃত অরণ্যে ।
তাই আমার আগমনে আপনি
রুষ্ট,ক্রুদ্ধ,বিভ্রান্ত এবং স্তম্ভিত ।
আপনাকে আমি জানিয়ে দিলাম,
আপনি থাকুন আপনার অসত্য নিয়ে,
আপনার মতো অধার্মিকের সঙ্গে
আমার সম্মেলন আমার সহবাস অসম্ভব ।
বিদায়ের সময় হলো আমার,
আমি অভিসম্পাত করলে আপনি ধ্বংস হবেন,
তবে অভিশাপ দেব না আপনাকে,
শুধু জানিয়ে যাই,আপনার সাহায্য ব্যতিরেকেই
আমার পুত্র শাসন করবে সসাগরা পৃথিবী ।

তবে বিদায় নেওয়া আমার হলো না,
কারণ আপনি স্বীকার করে নিলেন যে
আমার উচ্চারিত প্রতিটি বর্ণ সত্য,
আপনি স্বীকার করে নিলেন যে
আমি আপনার পত্নী ।
জানি না কী কারণ
অভিশাপের ভয় নাকি বিবেকবোধের জাগরণ ।
তবে এই যে আপনি অসত্যের মোহ চূর্ণ করে
আপন সন্তান ভরতের পিতৃত্ব স্বীকার করলেন সর্বসমক্ষে,
এ আমার সতীত্বের জয় নয়,
এ আমার মাতৃত্বের জয় নয়,
এ আমার পত্নীত্বেরও জয় নয়,
এ আমার নারীত্বের জয়,
এ আমার প্রতিবাদের জয়,
এ আমার সাহসের জয়,
এ আমার সত্য উচ্চারণের জয় ।

শেষকথা শুনুন আর্যপুত্র,
আজ আমার যে হেনস্থা হলো,
এইরকমই প্রকাশ্য রাজসভায়
এর চাইতেও হীনতর ব্যবহার
যথা বস্ত্রহরণের শিকার হয়তো হতে হবে
কোন নারীকে আগামী দিনে,
পুরুষতন্ত্রের হাতে,
সমকারণে বা ভিন্নতর কারণে ।
সেইদিনও এইভাবেই গর্জন করবে নারী
পুরুষের বিরুদ্ধে,
কারণ আমি আজ জ্বালিয়ে দিলাম যে অগ্নিশিখা,
এই শিখা নেভানোর ক্ষমতা কারো নেই,
সেই আগুন বহুগুণ হয়ে দহন করবে
হস্তিনানগরের মতো ক্ষমতার ক্ষেত্রকেও ।
তারও পরেও হয়তো চলতে থাকবে পৌরুষের জুলুম,
পৌরুষের দম্ভ,পৌরুষের অপব্যবহার ।
ছলনা করে বা ভীত করে বা ঐশ্বর্যের লোভ জাগিয়ে
এমনকি হত্যা করেও
নারীকে বশীভূত করতে চাইবে পুরুষ,
তবু এই পবিত্র আগুনকে পুরোপুরি
বশে আনতে তারা ব্যর্থ হবে,
সুযোগ পেলেই এই প্রতিবাদের আগুন সাহসী হবে
আর পোড়াবে পুরুষের সকল কৌশল
সকল নষ্টামি,
বিবস্ত্র হয়ে প্রকাশ পাবে
পুরুষের যত প্রতারণা,যত ধূর্তামি,যত ব্যভিচার ।
যুগযুগান্ত ধরে অপমানিত
নারীহৃদয়ের মধ্যে জমে থাকা পুঞ্জীভূত আগুন
আজ প্রকাশ্য রাজদরবারে
উন্মুক্ত হবার সুযোগ পেল আপনার সৌজন্যে ।
অতএব হে সসাগরা পৃথিবীর অধীশ্বর,দুষ্মন্ত,
আপনার নিকট কৃতজ্ঞ থাকবে
কেবলমাত্র এই শকুন্তলা নয়–
চিরকৃতজ্ঞ থাকবে এই সসাগরা ধরিত্রীর সমগ্র নারীকূল ।
=======অনুপম সৌরিশ সরকার

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধ“শিক্ষকদের সবাই পদানত করে রাখতে চায় “- সৈয়দ আনোয়ার সাদাৎ
পরবর্তী নিবন্ধ“এসব কোন কথা নয়”-কবি শাহিনা রঞ্জু’র কবিতা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে