ll চাঁদার হাট ও বারোভাজার কাহিনি ll-অমিতকুমার বিশ্বাস

0
757
amit

ll চাঁদার হাট ও বারোভাজার কাহিনি ll-অমিতকুমার বিশ্বাস

চাঁদা! আহা, কী সুন্দর তার নাম! হয়তো একদিন সেখানে চাঁদামাছ পাওয়া যেত খুব। নইলে এ-নাম কেন? কোথায় যেন পড়েছিলাম, স্থান-নামের ভিতরই লুকিয়ে থাকে লোকসংস্কৃতি, লোক-ইতিহাস। চাঁদা তো মাছেরই দেশ। প্রকাণ্ড পাঞ্চিতাবাঁওড়ের ধারে বনগ্রাম-বাগদা রোডের এপার-ওপারে ডানামেলে আছে ছোট্ট এই চাঁদা গ্রামটি। এ গ্রাম চাঁদামাছের মতোই ছোট্ট ও সুন্দর।

বাঁওড়ের দক্ষিণে সভাইপুর। তার পরে মণিগ্রাম-মাধবপুর-ইছামতী-চালকি-বারাকপুর-শ্রীপল্লি। চাঁদা থেকে একটু দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে হেঁটে গেলেই নকফুল-ইছামতী ঘাট। ঘাট পেরোলেই ঐতিহাসিক মোল্লাহাটি। নীলকর সাহেবদের অতৃপ্ত শ্যামাচাঁদ আর নীলচাষাদের দীর্ঘ বিলাপ সেখানের বাতাসে মিশে।

অর্থাৎ সবটা মিলে প্রাণের বিভূতিদেশ।

মানুষ এখন ভীষণ ব্যস্ত—–শ্রমিক মৌমাছির থেকেও দেড়শো গুন! ব্যস্ততার নিটফল?

ব্যস্ততা আর তৃপ্তি ব্যস্তানুপাতিক। ব্যস্ততা যত বাড়বে ততই কমে আসবে জীবনের তৃপ্তি। তৃপ্তি সময়খোর! ‘প্রেমিকার’ মতো তারও ‘খিদে বড় বেশি’!

হাতে কঞ্চি নিয়ে বিভূতিভূষণ হেঁটে-হেঁটে ঘুরে বেড়াতেন এইসব জনপথে, বনপথে। অনুভব করতেন বুনো ঝোপঝাড়, পাখিদের হল্লা, নদীর ভাসান। অনুভব করতেন মাটির কান্না ও মানুষের হাহাকার। স্পর্শ করতেন জীবন ও জীবনের স্পন্দন, জীবনগাছের মতোই ব্যস্ত জীবনের সংজ্ঞায় যা মূল্যহীন।

চাঁদায় রাত কাটিয়েছি একদা। বাঁওড়ের পাশে সে-এক সুদীর্ঘ রাত। জল আর ঝিঁঝিদের জলসারাত। অজস্র তারায়-ভরা অমবস্যার রাত। গাছপালা-বিচুলিপালা-পাটখড়িগাদার ভিতর সে-এক আধ্যাত্মিক অন্ধকার ছুঁয়েছি এ-চোখে, যেন চাঁদামাছ লুকিয়ে আছে জলের অন্ধকারে, জাল টানলেই জল কিংবা আকাশ থেকে বেরিয়ে আসবে লক্ষ্মীচাঁদ! শুক্ল পঞ্চমী থেকেও মধুর সে-রাত।

পরদিন বাঁওড়ের জলে নেমেছি। সাঁতরে ঘোলা জল পেরিয়ে ভেসে গেছি সভাইপুরের দিকে, স্বচ্ছ জলের কাছে। তখন চৈত্র সবে। চাঁড়ালরোদের ভিতরও শীতল বাতাস থাকে প্রেমের। বিকেলে নৌকো চড়ে ওপারে, কিংবা হাঁটতে-হাঁটতে নকফুল যাওয়া।

নকফুল! আহা, এই নামটাও কী সুন্দর! নারীর নখের মতোই ফুল ছিল কি সেখানে একদিন? বনফুল? জগৎমাদন? বিস্তারিত শৈশবে উড়িধানের খইয়ের মতো যেসব ফুল থেকে মধু খেয়েছি ঢের?

বাঁওড়ের পাশেই কয়েক বিঘে জুড়ে অমর সাহার পরিত্যক্ত টিনের বাড়ি। ফরিদপুর-গোপালগঞ্জের ঘরামিদের স্পর্শ আছে সে-বাড়িতে। বাড়িটা জঙ্গলে ঘেরা। ভূতুড়ে। পাশেই কবরস্থান। একা দাঁড়িয়ে থাকলে পরে দিনের বেলাতেও পিঠে কে যেন হাঁচড় দিয়ে যায়! কিংবা কানের ছ্যাঁদায় ঢুকে পড়ে গোল চামচিকি! বাঁওড়ের পাড় ববাবর পশ্চিমদিকের ইটখোয়ার রাস্তা ধরে এগোলে দেখা যাবে কুমিরের মতো রোদ পোহাচ্ছে গাদা গাদা ওলটানো নৌকো। পিঠে সদ্য-মারা আলকাতরা। আলকাতরার গন্ধে বাবার যৌবন দেখতে পাই। পাশে দাদা ও আমি। হাতে ন্যাকড়ার তুলি। আমাদের সাজানো ঘরের বেড়ায় ফেত্তে আলকাতরা মারা হচ্ছে। আহা, আলকাতরা-মাখা সে-এক স্মৃতিচিত্র বটে! জীবন এগোয়। গন্ধে পিছিয়েও আসে। জীবনে তাই পথের গন্ধ, গাছের গন্ধ, প্রতিটি গ্রাম-নদী-বাঁওড়-বাঁকের আলাদা আলাদা গন্ধ পাওয়া দরকার খুব।

চাঁদার কথা বলতে গেলে চাঁদার হাটের কথা মনে পড়ে। বাগদা রোডের দু-পাশে এই হাট। খোঁজ নিয়ে জেনেছি ১৯৫৬ সালে এই হাট শুরু হয়। দেশভাগের আগে এসবই ছিল জলজঙ্গল। দেশভাগ নতুন নতুন জনপদের জন্ম দিল কিংবা পুরোনো জনপদে ভিড় বাড়াল। প্রয়োজন হল হাটের। হাট বাংলার প্রাণ। হাটের আধুনিক সংস্করণ শপিং মল—–যা কিনা কর্পোরেট দুনিয়ার মুঠোয়। কর্পোরেট চমকায়। যা চমকায় তা কখনও কখনও সোনাও হয়। কিন্তু সোনার বাংলা হয় না। সোনার বাংলা তো এইসব চাঁদার হাটের ভিতর, বাঁওড়ের ভিতর, ধানখেত আর সাহাবাড়ির ভৌতিক নির্জনতার ভিতর থাকে রমরমা।

ব্যস্ততা হাটের গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে। কর্পোরেট তো তাই-ই চায়——ব্যস্ততা ও মল। মানুষকে ইঁদুর বানিয়ে আবার সেই ইঁদুর মারার ওষুধ বিক্রি করছে কর্পোরেট-রাক্ষস। আর আমি খালি ইঁদুর-দৌড়াচ্ছি। ছেলেকেও বলছি, Follow the rat-race! শুনেছি, গিনিপিগ কম পড়ে যাওয়ায় আজকাল ইঁদুরদের উপর নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে।

চাঁদাহাটের কথা হবে আর বারোভাজার কথা হবে না, তাই হয়? পাত্রে
বারো প্রকারের ভাজার সঙ্গে পেঁয়াজ-আদা-ধনেপাতা-আমতেল-মশলা ইত্যাদি মিশিয়ে শিল্পের অমায়িক ঝাঁকুনি। ব্যস, হয়ে গেল ‘বারোভাজা’! তবে যে বারোভাজার কথা বলতে চাইছি সজোরে, সে ভাজা খাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। বিশ বছর আগেই তা হারিয়ে গেছে হাট থেকে। এখনও যা বিক্রি হয়, তা আমার বেশ-ই লাগে। কিন্তু গ্রামের প্রবীণ জিভ বলে, “নাহ্‌, আগের নাহান মজাডা নাই কলাম! ব্যাবাক ফাজায়ে গ্যাছে!” এ-যেন বিভূতিভূষণের ‘হাট’ গল্প!

প্রবীণ সভাইপুর থেকে পটল নিয়ে এসেছেন। পটল বিক্রি হলে নুন-তেল নিয়ে ফিরে যাবেন গ্রামে। নৌকোয়। বিকেল থেকেই দুটো নৌকো পারাপার করছিল পাঞ্চিতাবাঁওড়। সেই বাঁওড়ের উপর রাত নেমে আসছে। তারারা পৃথিবীর সব আলো শুষে নিয়ে মিটমিট করে দূর-সম্পর্কীয় আত্মীয়দের মতো হাসছে আকাশে। সেই মিশমিশে অন্ধকারে টর্চ জ্বেলে ঝলমলে আনন্দকথায় ফিরে যাচ্ছে হাটমানুষেরা। বারোভাজার টানে তাঁদের রসচোয়ানো চঞ্চল জিভ থেকে কথারস, জীবনরস চলে যাচ্ছে অন্তরে।

Advertisement
পূর্ববর্তী নিবন্ধবর্ণরাজা -(সূচনা পর্ব,ভাষণ পর্ব,ভ্রমণ পর্ব,কবির আগমন পর্ব)- কামাল খাঁ’র ছড়া গুচ্ছ
পরবর্তী নিবন্ধ“বর্ণমালার অনন্ত সংগীত”-অনুপম সৌরিশ সরকারের কবিতা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে